উপন্যাস

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব সাত

উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব ছয়

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব পাঁচ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব চার

উপন্যাস। পতঙ্গপ্রাণ। সমীর আহমেদ। প্রথম পর্ব

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব দুই

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব তিন

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব সাত

শীতকালে রোদের আহামরি তেজ না থাকলেও দাড় বাইতে বাইতে মাঝিরা ঘেমে উঠছে। সকাল থেকে ওরা কিছুই মুখে দেয়ার সুযোগ পায়নি। না- খেয়ে আর কতক্ষণ বাইতে পারবে দাড়! তাছাড়া তার নিজেরও তো ক্ষুধা লেগেছে। ওই তো দর্শা গ্রাম। তারপরেই কানুনগো অফিস। অফিস প্রধান রমাবল্লভ নন্দী। বয়সে তরুণ, সুদর্শন চেহারা। কানুনগো পদে নতুন নিয়োগ পেয়েছে। ভূমিকর নির্ধারণ ও আদায়, জমির মূল্য নির্ধারণ, জমি কেনাবেচা, বন্দকী বা বিনামূল্যে দেয়া উপহারের ফলাফল লিপিবদ্ধ করা, বার্ষিক উৎপাদিত শস্যের হিসাবনিকাশ ইত্যাদি তথ্য ভিন্ন ভিন্ন রেজিস্ট্রারে সংরক্ষণ করে, হালনাগাদ তথ্য ও আদায়কৃত ভূমিকর কেন্দ্রে প্রদান করাই তার কাজ। শের আলী গাজী এ পর্যন্ত কোনো কানুনগোকে তোয়াক্কা করেন নি। তার অধিকৃত ভূমির করও তিনি কেন্দ্রে প্রদান করেন না অনেক বছর। কোনো কানুনগো তার কাছে ভূমির কর চাইতেও সাহস পায় না। তারা তার ক্ষমতা ও প্রভাবপ্রতিপত্তি সম্পর্কে বেশ ওয়াকিবহাল। কেন্দ্রশাসকগণও শের আলী গাজীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ করেন না। হয়তো পাহলোয়ান গাজীর বংশধর বলে! তাছাড়া সবাই জানে, সোনার গাঁ ও জঙ্গলবাড়ির ঈশা খাঁর সাথে রয়েছে তার গভীর আঁতাত। ঈশা খাঁর নামে বাঘে-মোষে একঘাটে জল খায়। সুসঙ্গের রাজা রঘুনাথকে ধরে নিয়ে সে বন্দি করে রেখেছিল জঙ্গলবাড়িতে। দুর্ধর্ষ হাজং বাহিনি না থাকলে তাকে হয়তো সারাজীবন ওই জঙ্গলবাড়ির বন্দিশালায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতো। সেই ঈশা খাঁ তাকে বেশ সম্মান করে। ভালোবাসে। গাজী বংশের সাথে তার মোটেও বৈরিতা নেই। জমিদারি পরিচালনায় তিনি ঈশা খাঁর মতোই সম্পূর্ণ স্বাধীন।
ওই তো দর্শাগ্রামের ঘাট দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন ছেলেমেয়ে খেলাধুলা করছিল। এখন নৌকার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ঘাটে আর লোকজন নেই। শের আলী গাজী বললেন, এই ঘাটে ময়ূরপঙ্খি ভিড়াও। খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নাও। তারপর আবার শুরু করবে যাত্রা।
ঘাটের দিকে নৌকা আসতে দেখেই ছেলেমেয়েগুলো বাড়ির দিকে দৌড় দিলো। আস্তে আস্তে ঘাটে ভিড়ানো হলো ময়ূরপঙ্খি। পাচকরা খাবার গরম করে রেখেছিল। খাসির মাংস, কাশ্মিরী নান। শের আলী গাজী কামরায় গিয়ে যৎসামান্য মুখে তুলে বেরিয়ে এলেন। এখন নৌকায় বসে থাকতে তার আর ভালো লাগছে না। তীরে উঠে নদীর পাড় ধরে উজানে কিংবা ভাটির দিকে গিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে আসা যায়। কিংবা হালট ধরে হাঁটতে হাঁটতে আশপাশের ফসলের খেত, সবুজ ঝোপঝাড়, বুনোফুলের গন্ধ শুঁকে শুঁকে কিছুদূর হেঁটে আসা যায় গ্রামের দিক থেকেও। এই ফাঁকে মাঝি ও কর্মচারীগণ ভোজনপর্ব শেষ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুক। তিনি তাকিয়ে দেখলেন ময়ূরপঙ্খি থেকে ঘাটে নামানো আছে গজারি কাঠের সিঁড়ি। সেদিকে পা বাড়াতেই দুজন বরকন্দাজ ও দুজন লেঠেল ছুটে এলো তার সঙ্গে যেতে। তিনি বামহাত তুলে তাদের নিষেধ করে দিলেন। তারা বিরস মনে তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। শের আলী গাজী আস্তে আস্তে নিচে নেমে উঠে গেলেন পাড়ে। আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। আশপাশের ঝোপঝাড়ে শীতে জবুথবু ও বিবর্ণ ডালপালা ও লতাপাতায় নতুন কুঁড়ি বসন্তের আভাস দিচ্ছে। অনতিদূরে দর্শা গ্রাম, বেশ বড় এবং লম্বা। উত্তর দিকে কানুনগো অফিস। আম-জাম-কাঠালসহ আরো নানাজাতের গাছের নিবিড় ছায়া ও সবুজে আচ্ছাদিত এ গ্রাম। মাঝে মাঝে তাল-নারকেল-সুপারি- দেবদারু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। অল্প দূরে মৃগী নদীর কূল ঘেঁষে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ঘন কাশবন। শাদা শাদা কাশফুল সগৌরবে মাথা উঁচু করে ফুটে আছে। খসে পড়া পাপড়ি বাতাসে তুলোর মতো উড়ে যাচ্ছে। শের আলী গাজী ঠিক করে ফেললেন, ভাটিতে নয়, তিনি হেঁটে যাবেন উজানে ওই কাশবনের দিকে। তারপরই তো দর্শা গ্রাম।
মিষ্টি রোদের মধ্যে দিয়ে তিনি হেঁটে চললেন। ময়ূরপঙ্খি থেকে পেয়াদা ও বরকন্দাজ এবং লেঠেল বাহিনি হায় হায় করে উঠল, ওই বনে যদি হিংস্র কোনো প্রাণি থাকে! শের আলী গাজীকে নিরাপত্তা দিতে তারা ব্যাকূল, কিন্তু ওদিকে যাওয়া তো নিষেধ। যদিও জমিদার সাহেবের কোমরে তরবারির খাপে ঐতিহ্যবাহী চকচকে তরবারি আছে। একটি কোপে যে কোনো মানুষ কিংবা হিংস্র প্রাণির গর্দান মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবেন, তারপরও তার শান্ত্রী বাহিনি কান উৎকর্ণ হয়ে নৌকায় দাঁড়িয়ে চোখ রাখছেন তার ওপর। সামান্যতম দুর্ঘটনার আভাস পেলেই তারা লাঠিশোঠা, বন্দুক ও তরবারি নিয়ে ছুটে যাবেন মনিবকে রক্ষা করতে। তারা ভালো করেই জরিপ করে দেখলো, কাশবন বেশি দূর বিস্তৃত নয়, ওপাশে আবার ফাঁকা মাঠ।
শের আলী গাজী মনে করেছিলেন কাশবনে ঢুকতেই পারবেন না। কিন্তু ঘন হলেও নদীর পাড় ঘেঁষে উজান ঠেলে এগিয়ে গেছে পায়েচলা সরু রাস্তা। আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার পর তিনি আশ্চর্য হলেন। দর্শা গ্রাম থেকে আরেকটি প্রশস্ত রাস্তা এই কাশবনের ভেতর দিয়ে নদীতে নেমে গেছে। তার মানে এখানে আরেকটি ঘাট! দর্শা গ্রামে হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই বাস। তাহলে মেয়েদের আব্রুর কথা ভেবেই কি এই রাস্তা! তিনি এক পলকে দেখলেন রাস্তাটি বেশ নির্জন। ঘাটে নদীতে পা ডুবিয়ে কলসে জল ভরছে একটি সুন্দরী মেয়ে। তার পরনে লাল শাড়ি। কপালে টিপ। শের আলী গাজী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুন্দরীর জল ভরা দেখলেন। মনে মনে তিনি বললেন :
‘জল ভরো সুন্দরী কইন্যা জলে দিছো ঢেউ
হাসিমুখে কও না কথা সঙ্গে নাই মোর কেউ।’
মনে মনে হাসলেন তিনি। জল ভরা শেষে একটি ঝাঁকি দিয়ে কলস কাখে নিয়ে সে আনমনে ধীরে ধীরে ঘাটের ঢাল বেয়ে উঠে আসতে লাগলো ওপরে; সাপের ফণার মতো পেছনে বেণী করা চুল দুলিয়ে দুলিয়ে। তার চেহারা গোলগাল, কাঁচা হলুদবর্ণ গা। অদ্ভুত মায়াবী দুটো চোখ। এত সুন্দরী মেয়ে এই দর্শা গ্রামে! তাকে তো এখানে নয়, রাজপুরীতে মানায়। তিনি কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছেন না।
সুন্দরী আসছিল নিচের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ সামনে রাজকীয় বেশভূষায় দীপ্তিমান সুদর্শন পুরুষ দেখে সে ভীত ও চমকিত। নির্জন রাস্তাটি ধরে গ্রামের দিকে তাকিয়ে সে আরো হতাশ হলো। কোথাও কেউ নেই। ভয়ে তাঁর বুকটা ধ্বক করে উঠল। এ কী স্বপ্ন না কি বাস্তব! সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। আবার এই সুদর্শন পুরুষের থেকে সে চোখও অন্যদিকে ফেরাতে পারছে না। অস্পষ্ট কণ্ঠে সে বলল, আপনি! এখানে কী করছেন?
শের আলী গাজীর বুকও কেন এত ধড়ফড় করছে! তিনি তো বংশপরম্পরায় বীর পুরুষ। গাজীবংশের লোক সে। জমিদারি রক্ত তার শিরাউপশিরায় বহমান। ঈশা খাঁর সাথে রয়েছে তার দহরম মহরম সম্পর্ক। তারপরও এই সুন্দরীর সামনে কথা বলতে তার কণ্ঠ কেন এত জড়িয়ে যাচ্ছে! নিজেকে কিছুটা সংযত করে ঠোঁটের কোণে সরুরেখার হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন, আমি শের আলী গাজী।
আপনিই শের আলী গাজী!
সুন্দরী আরো অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে।
হ্যাঁ, আমিই। কেন বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?
মেয়েটি কোনো কথা বলল না। মাথা নিচু করে আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে। বাড়ির দিকে পা বাড়াবে, নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে বুঝতে পারছিল না। কাখের কলসটি আজ হঠাৎ এত ভারি মনে হচ্ছে কেন? কলসটি সে বাম কাখ থেকে ডান কাখে নেবে কি না ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে সে পা বাড়ালো বাড়ির দিকে। শের আলী গাজীর আরেকটু কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ তার কাখ থেকে জলের কলস মাটিতে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। শুধু কান্দাটি অক্ষত। শের আলী গাজী বললেন, কলস যে ভেঙে গেল সুন্দরী।
মেয়েটি কিছু বলল না। লজ্জায় তার চোখ-মুখ রাঙা হয়ে উঠছে। ভাঙা কলসের কান্দার দিকে তাকিয়ে গাজী ভাবলেন, ইশ, শ্রীকৃষ্ণের মতো অলৌকিক ক্ষমতা যদি তার থাকতো, তাহলে এ কান্দাটিই ফুলের মালা করে তার গলায় পরিয়ে দেয়া যেত। তাকে কিছুটা ভীত দেখে তিনি অভয় দিলেন, কোনো ভয় নেই। নাম কী তোমার?
সুন্দরী কম্পিতকণ্ঠে বলল, পদ্মগন্ধা।
পদ্মগন্ধা! বাহ সুন্দর নাম! ঠিক যেন দেবী!
পদ্মগন্ধার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল কিঞ্চিৎ হাসি।
আমি এখন যাই।
শের আলী গাজী বলতে চাইলেন, যেও না, আরো কিছুক্ষণ থাকো। কিন্তু বলতে পারলেন না। হঠাৎ তার পাশ দিয়ে গ্রামের দিকে দৌড় দিলো পদ্মগন্ধা। এমনটি যে ঘটবে তিনি তা ভাবতেই পারেন নি। বিস্মিত হয়ে পদ্মগন্ধার ছুটে যাওয়া দেখতে লাগলেন, যতক্ষণ না সে গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়লো। তার ঠোঁটের কোণে জমে উঠল উল্লসিত হাসির রেখা।

উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব তিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *