উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব পাঁচ
কানেট চোরে নিল অধরাতি
দূরে কোথাও যেন পাখি ডেকে উঠল এত রাতে। কোকিল! শের আলী গাজী ভাবলেন, না না, কোকিল আসবে কোত্থেকে? বসন্তকাল তো এখনো আসেই নি। মাঘ শেষ হতে আরো কিছুদিন বাকি। তাহলে এবার বসন্ত আসার আগেই কি ডাক শুরু করলো কোকিল! নাকি তিনি আধোঘুমে ভুল শুনছেন? এ কোকিল নয় — অন্য কোনো পাখি। তার মনটাই বা আজ হঠাৎ এত উতলা হয়ে উঠল কেন? ঘরে বসে থাকতে আর ইচ্ছে করছে না। তিনি উঠে বিছানায় বসে রইলেন কিছুক্ষণ। না, পাখিটা এখন আর ডাকছে না। হয়তো বা ডাকেই নি কোনো পাখি এত রাতে। নাকি ডেকেছিল, দূরে কোথাও!
তার স্ত্রী ফাতেমা বিবি পাশে নেই। তিনি পীর বংশের মেয়ে। ধর্মকর্ম নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। হয়তো অনেক আগেই বিছানা ছেড়ে তাহাজ্জুত নামাজে দাঁড়িয়েছেন। এখন হয়তো ফজর পড়ছেন। শের আলী গাজী বিছানা ছেড়ে জানালার কাছে গেলেন। পাল্লা ফাঁক করে বাইরে তাকালেন। এক টুকরো আলো ঘর থেকে লাফিয়ে পড়ল বাইরে। জানালার ও-পাশের আঁধার বেশ খানিকটা পাতলা হয়ে ছড়িয়ে আছে। তার ও-পাশে, একটু দূরে, ওই যে ঝোড়ঝাপ্টায় এখনো আঁধার ঘন হয়ে জমে আছে। শাদা শাদা পাতলা মিহি কুয়াশা। মাঘের শেষে শীত এখনো জেঁকে আছে ভালোই। আমগাছ ও জামগাছগুলো আঁধার ও কুয়াশা জড়িয়ে ভূতের মতো স্থির দাঁড়িয়ে। চারদিকে জেগে ওঠার একটা গোপন আয়োজন চলছে। যদিও পাখিটা এখন আর ডাকছে না কোথাও। তবু তার রেশ যেন রয়ে গেছে কানে। ওটা কি আদৌ উড়ে গেছে দূরে? নাকি এখানেই কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে? তার মনটা আজ বড় আনচান করছে কেন?
ওই তো ওদিকে হিজলগাছের ঘন সবুজ পাতার আড়াল থেকে ভেসে আসছে আরেকটা পাখির ডাক। ভারি মিষ্টি কণ্ঠ তো! মনপ্রাণ একেবারে জুড়িয়ে যায়। কী যেন নাম পাখিটার? কয়েকবার চেষ্টা করেও পাখিটার নাম মনে করতে পারলেন না শের আলী গাজী। মনে মনে বললেন, বড় বিচিত্র এদেশ। মনোরম এর প্রকৃতি। কত রকম পাখি যে এখানে দেখা যায়, কত কী যে নাম তাদের, তা বলে আর শেষ করা যাবে না। জমিদারি ছেড়ে দিয়ে একজীবন শুধু পাখির পেছনে কাটিয়ে দিলেও বোধ হয় সব পাখি তার চেনা হয়ে উঠবে না।
মসজিদ থেকে ভেসে এল মোয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠে আজান। … আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম…আরেকটা গাছের ডালে কিচিরমিচির ডেকে উঠল আরো কয়েকটা শালিক।
তিনি অজু করে ফজরের নামাজ পড়লেন। বিছানায় আর গেলেন না। ফাতেমা বিবি জায়নামাজে বসে একাগ্রচিত্তে তসবিহর দানা টিপছেন। শের আলী গাজী ঘরের দরোজা খুলে বাইরে এলেন। হাঁটতে হাঁটতে ফুলবাগানে ঢুকলেন। এদিকটায় হাস্নাহেনার ম ম গন্ধ, পাতলা আঁধার ও শাদা কুয়াশা ভেদ করে চারদিক ছড়িয়ে পড়ছে।
বাগানে নানা জাতের ফুল। হাস্নাহেনা, গন্ধরাজ, বেলী, বকুল, জবা, কাঁঠালিচাঁপা, চামেলী, নীল অপরাজিতা, চন্দ্রমল্লিকা আরো আছে অলকানন্দা। বাগানের মাঝামাঝি তিনটি বসরাই গোলাপ গাছ। সম্রাট বাবরের খুব প্রিয় ছিল গোলাপ। ভারতবর্ষের মাটিতে তিনিই প্রথম গোলাপের চারা পুঁতে দেন। তিনি কি সেই চারা বসরাই থেকে এনেছিলেন, নাকি অন্য কোনো দেশ থেকে? তা জানেন না শের আলী গাজী। তবে তিনি প্রায় পাঁচ মাস আগে চারাগুলো কোলকাতা থেকে এনেছেন। কোলকাতায় এই চারা এসেছে সুদূর বসরাই নগর থেকে। মালির নিবিড় পরিচর্যায় এই কয়েক মাসেই চারাগুলো ডালপালা ছড়িয়ে সবুজ পাতার সমারোহ ও ডালে ডালে তীক্ষ্ম কাঁটা নিয়ে বেশ বেড়ে উঠেছে। আজ বাগানে ঢুকে দেখলেন একটি গাছে ফুটে আছে টকটকে রক্ত গোলাপ। বসরাই গোলাপ এত সুন্দর হয়! কী টকটকে লাল! কী সুন্দর মিষ্টি গন্ধ! এ জন্যই খৈয়াম গোলাপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন? শায়ের লিখেছেন :
‘দীর্ণ হিয়ার কোন সে রাজার
রক্তে নাওয়া এই গোলাপ
কার দেওয়া সে লালচে আভা
হৃদয় ছে্যঁচা শোণিত ছাপ’
খৈয়াম কি ভুল বলেছেন? দীর্ন হিয়া শুধুমাত্র কেন রাজার হতে যাবে? এটি হতে পারে প্রেমিক-প্রেমিকার। বিরহের আঘাতে আঘাতে তাদের ঁেছ্যচা হৃদয়ের রক্ত যেন লেগে আছে গোলাপের পাপড়িতে। সেই সতেজ রক্তের পাপড়ি মেলে মনোহর সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে চারদিকে। পাপড়ির ভাঁজে অশ্রুর মতো জমে আছে কয়েক ফোঁটা শিশির। মনে হচ্ছে সৌন্দর্যের সব বেদনা এখানে জমে আছে কিংবা বেদনার সবটুকু সৌন্দর্য। তার মনে একটু আগে যে আনন্দ দোলা দিয়েছিল, তা মুহূর্তে উবে গেছে। এখন অনুভব করলেন বেদনা। সুন্দরের পাশে কলঙ্ক, আনন্দের পাশে বেদনা আছে বলেই কি জীবনে সুন্দর ও আনন্দকে গভীরভাবে স্পর্শ করার অনন্ত বাসনা মানুষের!
গোলাপটি তিনি ছিঁড়ে নিয়ে ফুলদানিতে রাখতে চাইলেন। হাত বাড়িয়ে দিয়েও আবার ফিরিয়ে আনলেন, না না, ঠিক হবে না। বরং এখানেই তার শোভা বেশ লাগছে। আহা! এই গোলাপের সৌন্দর্যও একদিন ফুরিয়ে যাবে! গোলাপটি শুকিয়ে এখানেই ঝরে পড়বে। শুধু গোলাপ কেন, খৈয়াম তো বলেছেন, ‘যে ফুলটি প্রস্ফুটিত হলো এক সময় তাকে মরতেই হবে।’ আহা মৃত্যু! আহা জীবন! এ দু-এর মাঝে মাত্র চুল পরিমাণ ফাঁক! এই ফাঁকটুকু কখন যে মিলে যাবে কেউ জানে না। মৃত্যু আছে বলেই জীবন মানুষের কাছে এত মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। তা না হলে জীবনের গুরুত্ব মানুষ আর কীভাবেই বা উপলব্ধি করতে পারত? গোলাপের কাছ থেকে তিনি ধীরে ধীরে সরে গেলেন হাস্নাহেনার দিকে। সেখান থেকে নীল অপরাজিতার কাছে। না, কোনোকিছুই আজ ভালো লাগছে না। তার মনটা বড় বিক্ষিপ্ত, আনমনা। কেন এমন হচ্ছে তিনি বুঝতে পারলেন না। কোনো কোনো সময় কোনো কারণ ছাড়াই তার মনের ভেতর কেন এত বেদনার মেঘ জড়ো হয়? আজ আর কিছুতেই ঘরে কিংবা কাছারিতে বসে জমিদারির প্রথাবদ্ধ খবরদারি করতে ভালো লাগবে না। আজ তার মন ছুটে যেতে চাইছে কাছে-দূরে কোথাও। কোথায়? তা ঠিক তিনি জানেন না। তবে আজ তিনি কিছুতেই ঘরে বসে থাকতে পারবেন না। তাকে বের হতে হবে। কোথায় যাওয়া যেতে পারে, শিকারে? না, মনের আনন্দের জন্য পশু-পাখি বধ করা আজ তার ভালো লাগছে না। তার চেয়ে বরং সারাদিন তিনি ঘুরে বেড়াবেন। গাছপালা, পশু-পাখি, ফসলের মাঠ দেখবেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও গোপন ঘ্রাণ মেখে নেবেন আত্মায়। নায়েবকে বলে শকট প্রস্তুত করতে বলবেন নাকি ময়ূরপঙ্খি নৌকা? ময়ূরপঙ্খি নৌকাই তো ভালো। মৃগী নদী দিয়ে গড়জরিপা থেকে দশকাহনিয়ার দর্শা গ্রামে কানুনগো অফিস। অনেকদিন ওই অফিসে যাওয়া হয় না। আজ সেখানে গিয়ে একটু খোঁজখবর নেয়া যেতে পারে। মৃগী নদীর দু পাড়ের দৃশ্য বেশ মনোরম। নদীতীরে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ঘাটে ঘাটে মানুষের আনোগোনা, খেয়া নৌকায় লোক পারাপার, এসব দেখতে তার ভালোই লাগে। এপাড় থেকে ওপাড়ে যায় মানুষ, আবার ওপাড় থেকে এপাড়ে। এ আসা-যাওয়াই যেন জগতের নিয়ম, বিধাতার খেলা। মনটা উদাস হয়ে যায়। ফুলবাগান থেকে বের হয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। রাস্তায় দেখা হয়ে গেল নায়েব দস্তগীরের সাথে। মসজিদ থেকে বের হয়ে তিনি ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। ডেকে বললেন, নায়েব সাহেব, দশকাহনিয়া দর্শা গ্রামে যাবো।
কানুনগো অফিস?
হুম। মাঝিকে ময়ূরপঙ্খি প্রস্তুত করতে বলেন। তাড়াতাড়িই বের হবো।
দস্তগীর বললেন, ঠিকাছে, জনাব, এখনই বলে দিচ্ছি।
তাড়াতাড়ি তিনি চলে গেলেন। চারদিক বেশ ফরসা হয়ে আসছে। গাছে গাছে পাখির কিচিরমিচির। পাখা ঝাপটানি। শের আলী গাজী ঘরে ঢোকলেন। ফাতেমা বিবি জায়নামাজ ছেড়ে বিছানায়। তার চোখের কোণে চিকচিক করছে পানি। মাঝে মাঝে জায়নামাজে বসে তিনি চাঁপাস্বরে কাঁদেন। আল্লাহর কাছে কী প্রার্থনা করে কাঁদেন, কে জানে! আজও হয়তো কেঁদেছেন। সেই কান্নার রেশ লেগে আছে চোখে। শের আলী গাজী কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। আলমারি খুলে গায়ের পোশাক বদলে নিলেন। ফাতেমা বিবি আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন। শের আলী গাজী জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে বিবি?
না, কিছু না। আঁচল দিয়ে তিনি চোখের কোণ মুছে ফেললেন।
বাইরে যাবো আজ।
কোথায়?
কানুনগো অফিস।
খুব কি কাজ?
না, তেমন না। যাবো একটু খোঁজখবর নিতে। অনেকদিন ওদিকে যাই না।
আজ কি না গেলে হয় না?
শের আলী গাজী চুপ করে রইলেন। ফাতেমা বললেন, মনটা অকারণেই ভার হয়ে আছে। কিছু ভালো লাগছে না।
ওহ, এই কথা! কিন্তু তারও তো ঘরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। স্ত্রীকে বললেন, আমি যাওয়ার জন্য মন স্থির করে ফেলেছি।
ফাতেমা বিবি কিছু বললেন না। স্বামীর দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখ থেকে আবারও গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা জল। সাথে সাথে সেই জল মুছতে তিনি ভুলে গেলেন। শের আলী গাজী বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আজ তোমার কী হয়েছে, বিবি? কাঁদছো কেন?
