উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব দুই
উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ
তা আমি জানি, বন্ধু।
মহামান্য সুলতানের স্বপ্ন আমাকে পুরণ করতেই হবে।
নিশ্চয় আল্লাহ নেক লোকদের সাথেই থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরই বিজয়ী করেন। তোমার সাথে আবার কবে দেখা হবে জানি না। তবে তোমার সুসংবাদের অপেক্ষায় রইলাম, বন্ধু।
কত বছরের গাঢ় সম্পর্ক ও ভালোবাসা দুজনের। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বুকটা বেশ মোচড় দিয়েই উঠল হুমায়ূনের। শকটে উঠে বসতে না বসতেই দেখলেন তার অনুগত সেনাবাহিনি প্রধান নজবত উল্লাহ হাজির।
আমরা প্রস্তুত। জনাবের অনুমতি পেলে কালই রওয়ানা দিতে পারি।
সবকিছুই যখন ঠিকঠাক, তাহলে আর দেরি কেন? কালই আমরা গড়দলিপার উদ্দেশ্যে শুরু করবো যাত্রা।
বাড়ি ফিরে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আপাতত পরিবার পরিজন এখানেই থাকুক। যুদ্ধজয়ের পর সেখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করেই না হয় দূত মারফত সংবাদ পাঠাবেন তাদের যাওয়ার জন্য। নিজের জন্য জিনিশপত্র বাঁধাছাদা কম ঝামেলার না। বাড়ির আয়া ও খানসামারা এসব কাজে এখন ভীষণ ব্যস্ত। মজলিস খা হুমায়ূন খেয়াল রাখলেন, অতীব প্রয়োজনীয় কোনো জিনিশ যাতে বাদ পড়ে না যায়।
রাতে ভালো ঘুম হল না হুমায়ূনের। নতুন দেশ, নতুন জায়গা। কত রকম সংকট ও সম্ভাবনা, আনন্দ ও বেদনা। তাছাড়া রাস্তাঘাটে কত রকম বিপদ-আপদ, কত রকম ঝক্কিঝামেলার যে মুখোমুখি হতে হবে তাদের। তার কি কোনো শেষ আছে? তবু জীবন তো কখনো থেমে থাকে না। সব বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে যেতে না পারলে সাফল্য কি কখনো ধরা দেয় কারো হাতে? যত বেশি সংকট, তত বেশি সম্ভাবনা। জীবনের ঝুলিতে জমা হয় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা ছাড়া জীবনের মূল্যই বা কী আছে পৃথিবীতে? বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষই জীবনকে নিংড়ে নিংড়ে উপভোগ করতে পারে। অভিজ্ঞতাহীন মানুষের কাছে সুখকর বিষয়ও বিরক্তিকর ঠেকে। চারপাশের রূপ-রস-গন্ধ আস্বাদন করার উপায় সে জানবেই বা কীভাবে? মনের মধ্যে কত রকম চিন্তার বুদবুদ, আনন্দ-উদ্বেগ উত্তেজনার ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে একটি রাত যেন তার ঘুম-নির্ঘুমেই কেটে গেল।
পরদিন সকালে সৈন্যসামন্ত নিয়ে রওয়ানা হলেন বঙ্গজয়ের উদ্দেশে। রাত-দিন অনেক পাহাড়পর্বত ডিঙিয়ে, সমতল ভূমি মাড়িয়ে, অনেক নদীনালা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত, প্রায় মাসাধিক কাল পর তিনি এসে পৌঁছলেন দশকাহনিয়ায় ব্রহ্মপুত্রের তীরে। অবাক দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন নদীর দিকে। এ কেমন নদী! এপাড় থেকে ও পাড় দেখা যায় না। শুধু ধু ধু মোটা সবুজ রেখা দিগন্তে মিলিয়ে গেছে। এত বড় নদী পার হবেন কীভাবে? ছুতোরদের তিনি নির্দেশ দিলেন, তাড়াতাড়ি বন থেকে গাছ কেটে বড় বড় নৌকা তৈরি করতে। ততক্ষণ পর্যন্ত তাবু গেঁড়ে অপেক্ষা এই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। কয়েকদিন সময় তো লাগবেই। শীত এখনো বিদায় নেয় নি। বসন্ত আসতেও আর বেশি দেরি নেই। কোনো কোনোদিন হালকাপাতলা কুয়াশা পড়ে চারদিকে। আকাশও খানিকটা ঝাপসা হয়ে থাকে। তবে মেঘের ঘনঘটা নেই। জ্যোতির্বিদ সৈয়দ বরক শাহ বলেছেন, আরো দিন পনের বৃষ্টি হবে না। এর মধ্যেই গড়দলিপা জয় করতে হবে। ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে যেতে হবে বর্ষা শুরুর আগেই। বর্ষাকালে এই এলাকা ভয়ঙ্কর রূপ ধারন করে, বোঝা যায়।
নৌকা নির্মাণ কাজকর্মের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন হুমায়ুন। তার গুপ্তচর হুজমত উল্লা সংবাদ নিয়ে এল, মান্যবর, সিপাহসালার, শোনলাম নদীর ওই পাড়ে ধনরত্নের কোনো অভাব নাই। এক ঝুড়ি মাটি খুঁড়লে দুই ঝুড়ি ধনরত্ন পাওয়া যায়।
তাই! কী বল তুমি! এত ধনরত্ন পৃথিবীর কোথাও আছে নাকি?
অন্য কোথাও না থাকলেও গড়দলিপায় আছে।
মজলিস খা হুমায়ুন মিটিমিটি হাসলেন। মনে মনে তিনিও বেশ অধৈর্য হয়ে উঠেছেন, কোচরাজার অঢেল ধনসম্পদ। নদী পার হয়ে ওপাড়ে গিয়ে যত তাড়াতাড়ি ওই ধনরত্ন সংগ্রহ করা যায়, ততই মঙ্গল। কিন্তু এখনো নৌকা বানানোই শেষ হয় নি। ছুতোরদের তিনি জোরে ধমক দিলেন, তাড়াতাড়ি কর। নির্ধারিত সময়ের আগে নৌকাগুলো প্রস্তুত করতে পারলে, তোমাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।
ছুতোররা আরো তাড়াতাড়ি কাজে হাত চালালো। কেউ কেউ জুড়ে দিচ্ছে তলার তক্তা। কেউ কেউ নায়ের আগা ও পাছার গলুই। একদল পাটাতনের কাঠ কাটছে, আরেক দল বিছিয়ে দিচ্ছে নায়। এভাবে দ্রুত তৈরি হচ্ছে বড় বড় নৌকা। সেগুলো একে একে জলে নামিয়ে দিতেই রাজ্য জয়ের স্বপ্ন যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল হুমায়ুনের।
এক এলাকায় বেশিদিন থাকলে এলাকাবাসীর ওপর বেশ চাপ পড়ে। যদিও তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, কারো উপর জুলুম না করতে। গরু-ছাগল-ভেড়া, হাঁস-মুরগি, তরকারি, চাল-ডাল, তেল-নুনের প্রয়োজন হলে এলাকার বাজার থেকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তা সংগ্রহ করতে। নজবত উল্লাহ বলেছেন, ব্যাপারটা তার নজরদারিতে আছে। এখনো পর্যন্ত কেউ তার সৈন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি। সাধারণ লোকজন তো ভয়েই এদিকে আসে না। সম্রাটের সৈন্য বলে কথা! খামাখা কে বিপদের জালে নিজেকে জড়াতে যায়! তারপরও প্রত্যেক এলাকায় নেতৃস্থানীয় কিছু সৎ, সাহসী, জ্ঞানী ও অভিজাত লোক থাকে, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করে না। কিছু ধুরন্ধর লোকও থাকে যারা সম্রাটের লোকদের সাথে খাতির জমিয়ে এলাকার সাধারণ লোকের উপর শোষণ করে। সহজ-সরল গরীব মানুষের সম্পদ লুট করে নেয়। কার কি উদ্দেশ্য, তা মজলিস খা হুমায়ুন তাদের চোখ-মুখের দিকে একনজর তাকিয়েই বুঝতে পারেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে দেরি করেন না। তবে, এখনো পর্যন্ত এ এলাকার কেউ তার সৈন্যসামন্ত বা লোকজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নিয়ে তার কাছে আসে নি। নজবত উল্লাহ হয়তো কঠিন হাতেই সব নিয়ন্ত্রণ করছেন।
নির্ধারিত সময়ের আগেই তাদের প্রয়োজনীয় সব নৌকা তৈরি হয়ে গেল। পরিষ্কার আকাশ দেখে, বাতাসের ভাও বুঝে, বলা চলে অনেকটাই নিরাকজলে, বিসমিল্লাহ বলে, আল্লাহ-রসুল আর বদরগাজীর নাম নিয়ে, সেগুলো যাত্রা শুরু করলো ওপারের দিকে। প্রত্যেক সৈনিকের চোখে-মুখে জ্বলে উঠেছে যুদ্ধংদেহী মনোভাব, মনোবল, সতর্কতা, সাহস ও রাজ্যজয়ের স্বপ্ন। হুমায়ুন বুঝতে পারলেন, স্বপ্নজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। স্বপ্নজয়ের পেছনে থাকে বহুজনের সমবায়ী প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ। কোনো স্বপ্নই একা সফল করা যায় না। থাকে অনেক অনেক অংশীজনের দুর্দম কৃতিত্ব। সৈন্যসহ দলের সব স্তরের মানুষের মধ্যে স্বপ্ন যখন ছড়িয়ে দিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করা যায়, তখন মনে-প্রাণে তারা জেগে ওঠে দুর্বার শক্তিতে, প্রবল পাহাড়ি ঢলের মতো, কিছুতেই রোধ করা যায় না। একদিকে বাধা দিলে আরেক দিকে সবকিছু তছনছ করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। হুমায়ুন মনে মনে বললেন, আমাদের এই অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে দলিপার সাধ্য নেই ঠেকানোর।
কোচরাজা দলিপা সংবাদ পেয়েছিলেন মুসলমান লুঠতোরাজরা আসছে এ পাড়ে। ভেবেছিলেন তাদের সংখ্যা অল্পই হবে। তাছাড়া সাঁতারে পটু নয় তারা। তীরে নামার আগেই তীর নিক্ষেপ করে নৌকাগুলো ডুবিয়ে ব্রহ্মপুত্রে তাদের সলিল সমাধী ঘটাতে পারবেন। কিন্তু হায়! অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত এ যে এক বিশাল দুর্ধর্ষ নৌবহর! তাদের প্রতিরোধ করার শক্তি তার কোথায়? কিন্তু বিনা বাধায়, জীবন থাকতে এত সাধের গড়দলিপা ছেড়ে দিবেন ওই দস্যুদের হাতে! তা হতে পারে না। নিজের সৈন্যসামন্ত তারও তো কম নেই। তারা এক একজন ভয়ঙ্করও কম নয়। তীর-ধনুক নিয়ে তাদের সাথে তিনি তীরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন মরণপণ যুদ্ধের জন্য। নৌকাগুলো লক্ষ্যসীমায় আসতে না আসতেই তারা ঝাঁকে ঝাঁকে নিক্ষেপ করে এক একজন সৈন্যকে গেঁথে ফেলতে চাইলেন তীরের চোখা ফলায়। তাদের কারো নিশানাই তো অব্যর্থ হবার কথা নয়। যদি সামনের সারির কয়েকটি নৌকার সৈন্যদের এভাবে গেঁথে ফেলা যায়, তাহলে পেছনের নৌকাগুলো আর সামনে এগোতে সাহস পাবে না। তারা নৌকা ঘুরিয়ে ফিরে যাবে ও পাড়ে। আর যদি কোনো নৌকা এ পাড়ে ভেড়াতে সাহস করে, তাহলে তীরে ভেড়ার আগেই তাদের বিদ্ধ করে ফেলবে। কিন্তু হায়! এ কী হচ্ছে আজ! লোহার বর্ম ভেদ করে তীরগুলো শত্রুদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারলো না! শোনা গেল না ওদের কারও মর্মভেদী আর্তনাদ! আর আজ বাতাসের বেগও কত তীব্র! সব বাধা উপেক্ষা করে নৌকাগুলো তীরের দিকে দ্রুত ছুটে আসছে। দলিপা তার বিশ্বস্ত যোদ্ধাদের নির্দেশ দিলেন তীর ছোঁড়া অব্যাহত রাখতে। আরো নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথেই নৌকাগুলো থেকে শুরু হলো পাল্টা আক্রমণ। তীরের দিকে অনবরত অগ্নিগোলা নিক্ষেপ। তাদের নিশানাও অদ্ভুত ও অব্যর্থ। দলিপার কয়েকজন সেনা চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে না পড়তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে লাগলো পুরো সৈন্য বাহিনি। যতই তিনি চিৎকার করে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বলছেন, ততই তারা পিছু হটে যাচ্ছে। আর এর মধ্যেই কি না নৌকাগুলো ভীড়ে গেল তীরে! সেখান থেকে সৈন্যরা ঢাল-তলোয়ার হাতে লাফিয়ে নামলো ডাঙায়। ঢাল-তলোয়ারের ঝনঝনানি। দলিপার আশপাশে যে অল্প কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনা ছিল তারা সবাই ঘেরাও হয়ে গেছে মজলিস খাঁ হুমায়ুনের সৈন্যদের দ্বারা। এখন উপায়! পালাবারও তো পথ নেই। হায় ভগবান! এই ছিল আমার ললাটে! শত্রুদের মধ্যে থেকে একজনের কণ্ঠ গর্জে উঠল, দলিপা, আত্মসমর্পণ করলে প্রাণে বেঁচে যেতে পারেন। নতুবা আমার সৈন্যরা আপনাদের পিষে মেরে ফেলবে।
