উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব তিন
উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ
দলিপা ভাবলেন, এই তাহলে মজলিস খা হুমায়ুন! আত্মসমর্পণ করলে হয়তো বেঁচে থাকা যাবে। তবে যে অসম্মান ও লজ্জা তার জন্য অপেক্ষা করছে, তারচেয়ে যুদ্ধ করতে করতে মরে যাওয়াই তো শ্রেয়। মাথা নোয়ালেন না তিনি। হাত থেকে তরবারিও ফেলে দিলেন না। তার বিশ্বস্ত সৈন্যদেরও একই মনোভাব — যতক্ষণ বাঁচবো লড়াই করেই বাঁচবো। শত্রুর কাছে মাথা নত করবো না কিছুতেই। প্রবল বিক্রমে তারা আঘাত ও পাল্টা আঘাত চালিয়ে যেতে লাগলেন। মজলিস খা হুমায়ুনের সৈন্যরাও এক একজন ছুটে আসছে হায়েনার মতো। তাদের কারো দিলেই যেন মৃত্যুভয় নেই। শত্রুর সাথে তলোয়ার চালনা, ঢাল দিয়ে তাদের আঘাত প্রতিহত করে আবার শত্রুকে পাল্টা আঘাত করার ক্ষিপ্রতা ও কৌশল দেখে তাজ্জব দলিপা ভাবলেন, পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তবে তার আগে মৃত্যু শ্রেয়। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে এক মুহূর্ত তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। তখনই তার পেছন দিক থেকে এগিয়ে আসা এক সৈন্যের তলোয়ারের এক কোপে কাটা পড়লো দলিপার মাথা। যে কয়েকজন সৈন্য জীবিত ছিল, সবাই প্রাণভিক্ষা চাইলো। মজলিস খা হুমায়ুন তাদের পাঠিয়ে দিলেন বন্দিশালায়। তারপর তিনি দলবলে এগিয়ে চললেন গড়দলিপার দিকে। আরো কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর বন শেষ হয়ে গেল। সামনে বিশাল ফসলের মাঠ। ধানকাটা হয়ে গেছে। বিবর্ণ নাড়াগুলো বুকে নিয়ে মাঠগুলো চুপ হয়ে আছে। কোনো কোনো জমিনে শুরু হয়েছে আবাদ। হয়তো কৃষকরাও সেখানে ছিল। মজলিস খা হুমায়ুনের বিশাল বাহিনি ছুটে আসার সংবাদ পেয়ে তারা হয়তো প্রাণভয়ে এখান থেকে পালিয়ে গেছে। কোনো কৃষক কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করবে না। নারী-শিশু-বৃদ্ধদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না। হোক তারা আমাদের শত্রুপক্ষের লোক, তাদের সাথে ধৈর্যের সাথে মানবিক আচরণ করবে। তবে কোনো আঘাত এলে প্রতিহত করবে। মনে রাখবে আমাদের লক্ষ গড়দলিপার ধনরত্ন হস্তগত করা। বিনা কারণে রক্তপাত নয়। জোরে চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন হুমায়ুন। কারণ আর বেশি দূরে নয় গড়দলিপা। ওই তো দুর্গ দেখা যাচ্ছে। বিকালের আলো-ছায়া খেলে যাচ্ছে দুর্গের ওপর। আর কিছুক্ষণ পরই সৈন্যরা ঢুকে পড়বে দুর্গের ভেতর। তারা যাতে জয়ের আনন্দে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে চড়াও হয়ে না পড়ে নারী-শিশু-বৃদ্ধ ও সাধারণ মানুষের ওপর।
দুর্গের ফটক খোলা। মজলিস খা হুমায়ুন ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন, সব কক্ষ ফাঁকা। ভেতরে কেউ নেই। কোচরাজার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, চাকরবাকর সবাই পালিয়ে গেছে। হয়তো বেশি দূর যেতে পারে নি। ইচ্ছে করলে ঘোড়া ছুটিয়ে তাদের ধরা যায়। কিন্তু তার দরকারই বা কী? মজলিস খা হুমায়ুন ভাবলেন, কাঙ্ক্ষিত ধনসম্পদ পেলেই তো হয়। দলিপার পরিজন প্রাণভয়ে ভীত। নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিশ ছাড়া রাজকোষাগার খালি করে সবকিছুৃ তারা নিশ্চয় নিয়ে যেতে পারে নি। সেই সময়ও তাদের হাতে ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দলিপার সবগুলো ধনাগার তন্ন তন্ন করে খুঁজে নিয়ে এলো সেনারা। হুমায়ূন যা ভেবেছিলেন, তাই। তাড়াহুড়ার কারণে আসলেই তারা খুব বেশি কিছু নিয়ে যেতে পারে নি। যা কিছু পাওয়া গেল তা প্রত্যাশার চেয়েও ঢের বেশি। সব হিসাবনিকাশ করে খাজাঞ্চিখানা প্রধানের নিকট বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, মহামান্য সুলতানের নিকট এসব অর্থ সোনাদানা, জহরত অতিসত্বর পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর। সেই সাথে মুসাবিদা করে পাঠিয়ে দাও গড়দলিপা জয়ের সুসংবাদ। সৈন্যদের বললেন, এবার বিশ্রাম আর আনন্দ কর তোমরা। তবে কেউ-ই সীমা লঙ্ঘন কর না। শত্রুদের ওপর সব সময় নজর রাখবে। যাতে তারা আবার সংগঠিত হয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে না পারে। সবার দায়-দায়িত্ব পুনরায় বণ্টন করে দিলেন তিনি।
কয়েকদিন চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি বুঝতে পারলেন দলিপার প্রতিরোধ শক্তি সব ভেঙে গেছে। এমন কেউ নেই যে মজলিস খা হুমায়ুনকে হটিয়ে গড়দলিপা পুনরুদ্ধার করবে। তবু শত্রুকে কখনো তুচ্ছ ভাবতে নেই। সব সময় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে কেউ প্রবল শক্তি নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে।
গড়দলিপার চারদিকে ঘন বন। কাঁটগুল্মে আচ্ছাদিত। এ অঞ্চলের মাটি খুব উর্বর। কোনো বীজ মাটিতে পড়লেই কয়েকদিন পর চারা গজিয়ে ওঠে। যত্ন ছাড়াই দ্রুত বেড়ে ওঠে গাছ। মজলিস খা হুমায়ুন ভাবলেন, এসব বনজঙ্গল কেটে আবাদ করলে নিশ্চয় ভালো ফসল পাওয়া যাবে। খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা থাকবে না। তিনি উদ্যোগ নিলেন গড়দলিপার সামনের সব বন পরিষ্কার করে ফেলবেন।
সৈন্যসামন্ত, কুলি-মজুর নিয়ে একদিন তিনি শুরু করলেন জঙ্গল পরিষ্কারের কাজ। সবাই জমিনের আগাছা তুলে ফেলছে। মজলিস খা হুমায়ুন সিপাহসালারকে নিয়ে কাজ তদারকি করছেন। ভালোই এগিয়ে যাচ্ছে কাজ। বনের মধ্যে দিয়ে একটা সরু পথ চলে গেছে উত্তর দিকে। সেই পথ দিয়ে তিনি অগ্রসর হতে লাগলেন সামনে। পথটি কতদূর গিয়ে, কোথায় শেষ হয়েছে কে জানে! এই ঘন বনের ভেতর দিয়েই কি দলিপার পরিবার-পরিজন পালিয়ে গেছে? যদি তাই হয়, তাহলে এই পথ কোনো নদীর পাড়ে গিয়ে মিশে গেছে হয়তো। কিংবা সোজা চলে গেছে দূরের ওই পাহাড়ের দিকে। আজকে আরো কিছুদূর না হয় ঘুরে আসা যাক। চারদিকে পাখি ডাকছে, কিচিরমিচির, বিচিত্র সুরে। নিচে শুকনো পাতা মচমচ করে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। যতই ভেতরে যাচ্ছেন, বন আরো ঘন ও ছায়া নিবিড় হয়ে উঠছে। অচেনা ফুলের গন্ধে ভরে উঠছে মনটা। হাঁটতে হাঁটতে তিনি ভাবলেন, আহ! কী সুন্দর জায়গা! আর কী শান্তি! মনে হয় বেহেশতে প্রবেশ করে ফেলেছি। অনন্তকাল যদি এই পথে হাঁটা যেত! বন আরো ঘন হয়ে উঠল। তবু হাঁটা তিনি থামাতে পারলেন না। মজলিস খা হুমায়ুনের মনে হচ্ছে, কীসের মোহে, কীসের ঘোরে যেন তিনি ছুটে চলেছেন সামনে। যতই তিনি সামনে যাচ্ছেন, ততই আনন্দের অনুরণন বেজে চলেছে মনে ও শরীরে। এমন কেন হচ্ছে আজ! তার সিপাহসালার নজবত উল্লাহও কিছু বলছে না। তাদের সাথে রয়েছে আরো বিশজন সেপাই। তারাও চুপ। চোখে-মুখে তাদের ভয় বা কোনো ক্লাান্তি নেই। হয়তো তাদেরও হাঁটতে ভালো লাগছে। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর হাঁটা থামিয়ে দিলেন তারা। সিপাহসালার নজবত উল্লাহ বললেন, মহারাজ, যদি কিছু মনে না করেন, এবার ফেরা যাক। অচেনা পথ, আর বেশি দূর যাওয়া ঠিক হবে না।
হুমায়ুন মিষ্টি হেসে বললেন, কিন্তু আমার তো হাঁটতেই ভালো লাগছে। ঠিকাছে, তুমি যখন বলছো, ফেরা যাক।
পেছন ফিরে গড়দলিপার দিকে হাঁটতে লাগলেন তারা। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরই অবাক হলেন, সামনে একজন লোক রাস্তা অবরোধ করে বসে আছে। তিনি চমকে উঠলেন। এটা পরাজিত ও নিহত দলিপার উত্তরসুরীর কোনো চাল নয় তো! শত্রুপক্ষের কুহকবিভ্রম! তারা কি মূল সৈন্যসামন্ত থেকে খুব দূরে চলে এসেছেন! কত দুর এসেছেন খেয়ালও নেই। তাদের সৈন্যসামন্ত ও কুলি-মজুরদের কারো গলার স্বর এখানে এসে পৌঁছছে না। তারা মাত্র বাইশজন লোক এই গভীর অরণ্যে। তাহলে তারা কি শত্রু দ্বারা চারদিকে বেষ্টিত? এমন সময় লোকটি হিঃ হিঃ করে হেসে উঠল, হুমায়ুন, তুমি যা ভাবছো, তা ঠিক নয়। আমি তোমার শত্রুদের কেউ নই। আরো কাছে আসো আমার। আরো কাছে।
