উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব চার
সাথে সাথে নজবত উল্লাহ খাপ থেকে তলোয়ার বের করতে যাচ্ছিলেন। বিশজন সেপাইও নজবুতউল্লার নির্দেশের অপেক্ষায় চোখে চোখ রাখলো। চোখের ইঙ্গিতে তাদের সবাইকে নিষেধ করে দিলেন হুমায়ুন। তারপর চারদিকে ভালো করে তাকালেন, কোথাও কেউ আছে কি না, গাছের আড়ালে, ঝোপঝাড়ের পাশে। কিংবা খুব কাছে পাতা কোনো গোপন ফাঁদ! যা মুহূর্তেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। লোকটি আবারো হাসলো। মৃত্যুকে এত ভয় পাও কেন, হুমায়ূন? একদিন তো মরতেই হবে। তোমাকে, আমাকে, সবাইকে। তবে এখন ভয় পেয়ো না। তোমার শত্রুদের কেউ এখানে নেই। শুধু এখানে না, আশপাশে তাদের কোথাও কেউ নেই? ভালো করে দেখো।
এই লোকটিও তো হতে পারে, তাদের কেউ একজন!
আশ্চর্য, এটুকু ভাবার সাথে সাথে লোকটি আবারো হাসলো। তবে কিছু বলল না। খুব সতর্কতার সাথে লোকটির দিকে তিনি ভালো করে তাকালেন হুমায়ূন। তার গায় জরাজীর্ণ বেশ। শুভ্র কেশ, শুভ্র দাড়ি। চেহারা থেকে কেমন যেন দ্যুতি বের হচ্ছে। কিন্তু তার শরীর কোমর অব্দি মাটিতে পোঁতা কেন? মজলিস খা হুমায়ুন ভাবলেন, পাগল নাকি লোকটা! তা না হলে কেউ নিজেকে এভাবে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে রাখে? কিন্তু একটু আগেও তো তারা এই পথ দিয়েই গিয়েছেন। তখন তো লোকটিকে দেখেন নি। রাস্তায় কোনো মাটি খোঁড়াখুঁড়িও ছিল না। এখান থেকে কত দূরই বা অগ্রসর হয়েছিলেন তারা! এরই মধ্যে লোকটি মাটি খুঁড়ে নিজেকে অর্ধেক পুঁতে ফেলেছে? তিনি ভয় ফেলেন না। নির্দেশ দিলেন, এই পাগল, রাস্তা ছেড়ে দাও। আমরা গড়দলিপায় যাবো।
পাগল মিটিমিটি হেসে বলল, জানি! তবে আমাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা আপনার নেই, হুমায়ূন। এই রাস্তা আমি কেবল একটি মাত্র শর্তেই ছেড়ে দিতে পারি, আর তা হলো এইখানে একটি গড় নির্মাণ করতে হবে। আমার নামেই সেই গড়ের নাম রাখতে হবে গড়জরিপা।
তাহলে উনার নাম জরিপা! বেশভূষায় তো মনে হয় সুফিসাধক। নাকি ভণ্ড-প্রতারক? মজলিস খা হুমায়ুন ভাবলেন, কার মধ্যে কী আছে, বোঝা যায় না। পাগলদের ক্ষেপানো উচিত নয়। সে যখন বলছেই এখানে একটি গড় নির্মাণ করে তার নামে সেই গড়ের নাম রাখতে — গড়জরিপা, তা মেনে নিলে ক্ষতি কী? সে সুফিসাধক হলে ইসলামের খেদমত হবে। সাথে সাথে তিনি ঘোষণা দিলেন, ঠিকাছে, তাই হবে। এখানে বিশাল একটি কেল্লা নির্মাণ করা হবে। সেই কেল্লার নাম হবে গড়জরিপা। এবার খুশি?
তাই যেন হয়। কথার বরখেলাপ করবেন না জনাব। তাহলে ফল ভালো হবে না। আপনার সব সম্মান, গৌরব নচ্ছাত হয়ে যাবে। মনে রাখবেন।
চোখের পলকে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল সেই পাগল। কিন্তু একটু আগে ওই তো ওখানেই তো ছিল লোকটা। ওই যে রাস্তায় এখনো মাটি খোঁড়াখুঁড়ির চিহ্ন। ওটা কি সেই পাগলেরই কাজ নয়! সে কি ভুল কিছু দেখেছে? তাছাড়া সে তো একা নয়, তার সাথে, নজবত উল্লাহ, এখনো দাঁড়িয়ে আছে এই একই জায়গায়, তারা দুজনই তো ওই পাগলকে ওখানেই দেখেছিল। কেউ তো তা অস্বীকার করতে পারবে না। জ্বলজ্যান্ত একজন মানুষ মুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল! এখানে আশপাশে বনজঙ্গল এমন ঘন নয় যে কারও পক্ষে লুকিয়ে থাকা সম্ভব। বড় বড় গজারি গাছের নিচে বহুদূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। এমন কী একটি খোরগোস যদি দৌড়ে যায়ও, তবু তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পায়ের নিচে ছোট ছোট বিচালি ঘাস, ফাঁকে ফাঁকে গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। ডালপালা ছড়িয়ে, কিছু পুরনো পাতা ঝরিয়ে দাঁড়িয়ে গজারি গাছ যেন আকাশ ছুঁতে চাচ্ছে। এর মধ্যে লোকটির হঠাৎ অন্তর্ধ্যান নিশ্চয় মোজেজা, নয় তো আর কী-ই বা বলা যায়? মায়া? জাদু? না, তা হতে পারে না। মজলিস খা হুমায়ুন ভাবলেন, নিশ্চয় এটি শুভ সংকেত। বঙ্গের শাসনকর্তা হিসাবেই থাকতে যাচ্ছেন তিনি!
আস্তে আস্তে খোঁড়া মাটির কাছে চলে এলেন হুমাযুন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন পাগলের সেই চিহ্নিত স্থানে বিশাল এক দুর্গ নির্মাণ করতে হবে। দলিপায় ফিরে, ধনরত্নের নিপুণ হিসাবের বিবরণ ও বিপুল উপঢৌকনসহ দূত পাঠিয়ে দিলেন সুলতানের কাছে। এই এলাকায় বিশাল দুর্গ নিমাণের কারণ ও প্রয়োজনীতা সুলতানকে অবহিত করতেও তিনি ভুললেন না।
কিছু দিন পর শুরু করলেন দুর্গ নির্মাণের কাজ। পাগলের সেই চিহ্নিত স্থানকে কেন্দ্র ধরে চারদিকে বেষ্টন করা হলো এগার শত একর জমি। স্থাপত্যবিদ আসাফ-উদ-দৌলা একটি নকশা দাঁড় করিয়ে দেখালেন মজলিস খা হুমায়ুনকে। দুর্গের চারদিকে সাতটি মাটির প্রাচীর। প্রত্যেক দুটি প্রাচীরের ভেতর একটি পরিখা। প্রতিটি পরিখার প্রশস্ত ষাট হাত, উচ্চতা ২০/২৫ হাতের নিচে নয়। এই পরিখা অতিক্রম করে দুর্গের ভেতরে শত্রুদের প্রবেশ দুঃসাধ্য তো বটেই, অসম্ভবও। পরিখা ছাড়াও জলের সংকট মেটানোর জন্য অনেকগুলো পুকুর খনন করতে হবে। দুর্গের চারদিকে থাকবে চারটি সুদৃশ্য বৃহৎ দরোজা। উত্তরের দরোজার নাম হযরত আলী। দক্ষিণের দরোজার নাম হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। পূর্ব ও পশ্চিমের দরোজার নাম হযরত হাসান ও হযরত হোসেন। দুর্গের মাঝখানে একটি বড় গম্বুজ থাকবে মা ফাতেমার নামে। ভবনের সামনে খুদাই করে লেখা থাকবে গড়জরিপা। প্রহরীরা দিনরাত পাহারা দিবে দরোজায়, যাতে কারও অনুপ্রবেশ না ঘটে এই দুর্গে।
শের আলী গাজীর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দুর্গ নির্মাণের দৃশ্য। দিনরাত শত শত, হাজার হাজার লোক কাজ করছে। মাটি পুড়িয়ে চুন-সুরকি দিয়ে গড়ে তোলছে সুরম্য ইমারত। অনেকে মাটি খুঁড়ে, নকশা অনুযায়ী তৈরি করছে পরিখা ও মাটির দেয়াল। লোকজনের কথাবার্তা, হৈ চৈ-এ এগারো শত একর এলাকা মুখর হয়ে উঠছে। দুর্গের অভ্যন্তরে এই যে সভাসদ কক্ষে অমাত্যদের নিয়ে বসে আছেন শের আলী গাজী, এখানে একদিন বসতেন মজলিস খা হুমায়ুন! তাঁরই নির্মিত গড়জরিপা এখন দশকাহনিয়ার রাজধানী!
সভা শেষ করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন শের আলী গাজী। তাকালেন তার সামনে দক্ষিণ দিকের ফটকের দিকে। পুরনো হলেও এখনো বেশ শক্ত। এই ফটক ছাড়াও দুর্গের তিন দিকে আরো তিনটি ফটক রয়েছে। সারা বছরই সেগুলো বন্ধ থাকে। খোলার প্রয়োজন পড়ে না। দুর্গের ভেতরে বসবাসের জন্য শের আলী গাজী শুধু একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন। মূল দুর্গে অনেকগুলো কক্ষ। কিছু কক্ষে তার নায়েব ও কর্মচারীরা থকে। অন্য কক্ষগুলোর দরোজা তেমন খোলা হয় না। যে সব কক্ষে শের আলী গাজীর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ঢাল-তলোয়ার, তৈজসপত্র কাঠের আলমারীতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, সে সব কক্ষ, মাসে মাসে দু একবার খুলে ধুলো-বালি, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়।
একদিন যারা খুব দাপটের সাথে এখানে ছিলেন, আজ তারা নেই। তাদের ব্যবহৃত জিনিশপত্র কিছু কিছু আছে। তাও একদিন হারিয়ে যাবে। ওই তো ওখানে ঘুমিয়ে আছেন মজলিস খা হুমায়ূন। শের আলী গাজী ভাবলেন, আমি নিজেও কি বেশি দিন থাকতে পারবো এখানে? তার মতো আমাকেও তো একদিন ঘুমিয়ে পড়তে হবে চিরতরে। তবু মানুষ! আহা মানুষ! অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতার পেছনে অন্ধের মতো ছোটে। আমাকেও ছুটতে হচ্ছে। যতদিন বেঁচে আছি, এই ছুটে চলা বন্ধ হবে না।
বিকাল গড়িয়ে নেমে আসছে সন্ধ্যা। পশ্চিমের আকাশ সোনারঙে মুড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। শের আলী গাজী হেঁটে চললেন অন্দরমহলের দিকে।
