উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব ছয়
জানি না। তবে আজ আমার মন ভালো নেই। মনে হচ্ছে আমার কী যেন নেই। কিংবা মূল্যবান কিছু আমি হারাতে যাচ্ছি। বুকের ভেতরটা বেশ খাঁ খাঁ করছে। খোয়াব দেখেছি, মাঝরাতে আামার কানের ঝুমকা চোরে নিয়ে গেছে। ঘুম ভেঙে গেল। ভাবলাম, এ কিছু নয় — নিছকই স্বপ্ন। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। তখন স্বপ্ন দেখলাম, আমার কাছ থেকে এক টুকরো আলো ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। আবার ঘুম ভেঙে গেল। তখন ভাবলাম, এটা শুধু স্বপ্ন না — একটা সংকেত। সতর্ক বার্তা। যা, আমার রবের পক্ষ থেকে এসেছে। হয়তো সত্যিই কিছু হারাতে যাচ্ছি আমি, যা, আসলে খুবই মূল্যবান। তারপর থেকেই মনটা…
আশ্চর্য! তারও তো এমনিই অনুভূত হচ্ছে। কিঞ্চিৎ হেসে বললেন, এ কিছু নয়। মানুষ কতো অকারণেই তো স্বপ্ন দেখে। আবার ভুলেও যায়। এ কিছু নয়, বিবি। ভুলে যাও। মনি স্থির কর। সব ঠিক হয়ে যাবে।
ফাতেমা বিবি বললেন, আপনার কথা যেন সত্যি হয়। কিন্তু আমার ভেতরে কীসের যেন শঙ্কা। বহুদিন এমন হয় না। এর আগে যখন এমনটি হয়েছে, তা সত্যি হয়ে গেছে। আপনার মনে আছে কিনা জানি না। সেবার যখন…
থাক! শের আলী গাজী আবার মৃদু হাসলেন, জগতে হাজারো কাজ থাকতে কতো তুচ্ছ বিষয় নিয়েই না আমরা ভাবি। গুরুত্ব দিই। স্ত্রীকে বললেন, আল্লাহ ভরসা। বিপদআপদে তিনিই তো আমাদের সহায়। তাকে স্মরণ কর। নিশ্চয় তিনি আমাদের সহায়।
অবশ্যই তিনি আমাদের সহায়। আমার রব যেন আমার থেকে দূরে সরে না যান।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফাতেমা বিবি বললেন, তবু আগামী কাল গেলে হয় না!
শের আলী গাজীও আগামী কাল যাওয়ার কথা ভেবেছেন। কী এমন কাজ যে আজই যেতে হবে! কাল, পরশু কিংবা আরো পরে গেলেও তো ক্ষতি নেই। কিন্তু তার মন কিছুতেই বাড়িতে থেকে যেতে সায় দিচ্ছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভেতরে কেমন যেন একটা অস্থিরতা। কোনো বিষয়ে একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে এমন হয়। এখানে এখন তাঁর মন টিকছে না। কিন্তু ফাতেমাকে তা বলা যাবে না। তাহলে সে আরো দুশ্চিন্তা করবে। তাকে আটকানোর জন্য আরো অনুরোধ করবে, যা তার কাছে এখন একেবারে অসহ্য। কোনো বিষয়ে একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তা পরিবর্তন করতে একেবারেই ইচ্ছে হয় না তার। তাতে লাভ-ক্ষতি যা-ই হোক না কেন, তিনি সব সময় নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি গলায় হিরা ও মুক্তার মালা পরে বললেন, অযথা ভেবো না, বিবি। বিশ্রাম নাও।
ফাতেমা বিবি বোঝেন তার স্বামীর মতিগতি। তাকে এখন কিছুতেই ফেরানো যাবে না। কারও বারণই এখন তিনি কানে তুলবেন না। যাক, ভালোয় ভালোয় যেন তিনি ফিরে আসেন। পথে, কোনো বিপদ যেন না হয়। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। শের আলী গাজী তা মোটেও পাত্তা দিলেন না, বললেন, তবে সময় থাকলে একবার শাহ কামালের দরগা থেকেও ঘুরে আসতে পারি।
ফাতেমা বিবি খুশি হলেন, তাই! তাহলে তো ভালোই হয়। আমার জন্য বাবার কাছে দোয়া চেয়ে আসবেন। আমার মনে হয় না আজ আমি ভালো স্বপ্ন দেখেছি।
ঠিকাছে। চিন্তা কর না। সময় থাকলে অবশ্যই যাবো। তোমার জন্য দোয়াও চাবো।
শাহ কামালের প্রতি খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা ফাতেমা বিবির। শের আলী গাজীরও কি কম? নামটা মনে পড়লেই শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে ওঠে তার মন। অনেক বড় বুজুর্গ মানুষ তিনি। অনেক বছর আগে মুলতান থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছেন এই দশকাহনিয়ায়। স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছেন ব্রহ্মপুত্র নদের ওই পাড়ে দুর্মট গ্রামে। ইস্পানদিয়ার খান গাজী ও রাজা মনীন্দ্রনাথের নিকট থেকে তিনি জায়গীর পেয়েছেন। গোয়ালপাড়ায় কড়ৈবাড়ির নিচে বহমান ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বাকলাইতে তার অনেক শিষ্য-ভক্ত। এই বাকলাইও তাকে নিষ্কর দিয়েছেন কড়ৈবাড়ির জমিদার। ভক্তবৃন্দরা সেখানে তার একটি খানকা বানিয়ে দিয়েছেন।
কত অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। এই তো ব্রহ্মপুত্র নদ তীব্র স্রোতে ভাঙতে ভাঙতে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল তাঁর আবাস ভিটার দিকে। তার ভক্তরা হতাশ হয়ে একদিন বলল, যেভাবে নদ ধেয়ে আসছে, তাতে এই খানকা শরিফ আর তো থাকবে না। খুব শীঘ্রই ব্রহ্মপুত্রে বিলিন হয়ে যাবে। এর কি কোনো বিহিত করা যায় না, হুজুর?
তিনি মৃদু হেসে বললেন, নিশ্চয়। যে উপরঅলা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন, নিশ্চয় তিনি একটা বিহিত করবেন, ইনশাল্লাহ…
ভক্তের কথা শুনে, তখনই তিনি হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। পাড়ে দাঁড়িয়ে বললেন, আর এদিকে আসবি না। যা, পূর্ব পাড়ে সরে যায়।
আর কী আশ্চর্য, তারপর থেকে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহিত স্রোত উল্টোদিকে পূর্বপাড় দিয়ে বইতে থাকে। শাহ কামালের আবাসের দিকে আর একবারও ভাঙে না। এমন কামেল পীরকে কি শ্রদ্ধা না করে পারা যায়! এই তো কিছুদিন আগে, শের আলী গাজী গিয়েছিলেন তার খানকায়। সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন বেশ কিছু মূল্যবান উপঢৌকন। সেদিকে তার ভ্রক্ষেপ নেই। তিনি যে এই এলাকার এত বড় একজন জমিদার, তা তার কাছে আলাদা কোনো গুরুত্ব বহন করেছে বলে মনে হয় নি গাজীর। তিনি আল্লাহর বান্দা, তারই একনিষ্ঠ গোলাম, আর কাউকে তিনি ভয় করেন না, এমনই ভাব তার ব্যক্তিত্বে ফুটে ওঠে। শের আলী গাজী তার হাতে চুমু খেতেই তিনি তার দিকে কিছুটা মগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, সংযত হও। সংযত হও, গাজী। পতঙ্গের মতো উড়ো না। আগুনে ঝাপ দিলে পতঙ্গ আর থাকে না। পুড়ে যায়, পুড়ে যায়।
বন্ধ চোখ তিনি আর খুললেন না। আর কোনো কথাও বললেন না। শুধু হাতের ইশারায় ইঙ্গিত দিলেন, যাও।
বুজুর্গ শাহ কামালের রুম থেকে বেরিয়ে এসে শের আলী গাজী খুব গম্ভীর ও বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলেন। হুজুর কেন তাকে এ কথা বললেন? কীসের ইঙ্গিত দিলেন তিনি? বারবার ভাবছিলেন, কী অর্থ বহন করে তার এসব কথার? তখন তার একজন শিষ্য বলে, হুজুর আসলে ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। ধ্যানের ঘোরেই হুজুর মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে শায়রের মতো উচ্চারণ করেন। ধ্যান ভাঙলে কী বলেছিলেন তা আর মনে করতে পারেন না। কাজেই আপনি এ নিয়ে অযথা ভাবনা করবেন না।
না না, ঠিকাছে।
কিন্তু তারপরও কয়েকদিন তার মন থেকে হতাশা কিছুতেই দূর হচ্ছিল না। এ কদিনে তার পরিবার বা জমিদারির কোথাও কোনো অশুভ ইঙ্গিত তিনি দেখতে পাননি। তখন তিনি ধরেই নিয়েছেন, তার শিষ্যের কথাই ঠিক, তিনি আসলে ওই সময় ধ্যানমগ্নই ছিলেন। কথাগুলো তিনি হয়তো তার উদ্দেশে বলেন নি।
আরো কিছুদিন পর শের আলী গাজী ভুলেই গিয়েছিলেন, সেদিন হুজুর তাকে কী বলেছিল। আজ ভাবলেন, দর্শা ঘুরে যদি হাতে সময় থাকে, তাহলে, দুর্মুটে যাবেন। হুজুর শাহ কামালের খানকায় না গিয়ে ঘরে ফিরবেনই না। দেখা যাক আজ হুজুর তাকে দেখে কী বলে? সেদিনের সেই কথা? নাকি নতুন কিছু? তাছাড়া বিবির মন ভালো করার জন্য তার কাছে দোয়া চাইবেন।
দরোজার বাইরে প্রহরীর গলা, মহারাজ, ময়ূরপঙ্খি প্রস্তুত।
তিনি ধীরে ধীরে দরোজার বাইরে পা রাখলেন। কী আশ্চর্য, এতক্ষণ স্ত্রীর কারণে তার মনে যেটুকু অবসাদ জমে উঠেছিল, বাইরে পা দেয়ার সাথে সাথে তা মিলিয়ে গেল! শীতের সকাল। সোনাঝরা রোদ! চনমনে হাওয়া। মাঘের শেষে হাওয়ায় বসন্তের আগাম বার্তা যেন খুব সংগোপনে ছড়িয়ে পড়ছে। আহ! এখন মনটা কী ঝরঝরে, ফুরফুরে লাগছে তার! মনে হয়, বহুদিন পর তিনি মুক্ত আলো-বাতাসে পা রাখলেন, শ্বাস-প্রশ্বাস নিলেন। তার এখন অবাঁধে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করছে, অসীম আকাশে উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে, এই তো আকাশটা। ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায়। চারপাশের গাছপালা, প্রকৃতি কী শান্ত! প্রহরীদের চোখে-মুখেও লেগে আছে মায়া। আনন্দের গহন সুর যেন গোপনে ছড়িয়ে পড়ছে। তার ভেতরে খেলে যাচ্ছে অদ্ভুত আনন্দের ঢেউ। ফাতেমার করুণ মুখ তার মনে পড়লো। অহেতুক দুশ্চিন্তা তার! এমন একটা অনুভবময় সুন্দর দিন তার নষ্ট করা উচিত নয়। সময়টাকে পুরোপুরি উপভোগ্য করে তুলতে হবে।
হুঁশিয়ার! বাংলার স্বাধীন জমিদার, মহামান্য শের আলী গাজী আসছেন।
ঘাটে অপেক্ষা করছে ময়ূরপঙ্খি নাও; অপরূপ রঙে সেজে একটা বিশাল ময়ূর যেন জলে পা ডুবিয়ে একমাত্র তার অপেক্ষায়। নায়েব, গোমস্তাদের নিয়ে তিনি ময়ূরপঙ্খিতে উঠলেন। ছইয়ের ভেতরে গিয়ে পালঙ্কে বসে পড়লেন একা। ছইয়ের বাইরে নায়েব, গোমস্তা। নায়ের আগে-পিছে বন্দুক ও তলোয়ার নিয়ে পাহারায় প্রহরীগণ। প্রহরীদের প্রধান নিয়ামত আলী শূন্যে গুলি ছুঁড়লেন। গুলির শব্দে চারদিক কেঁপে কেঁপে উঠল। কয়েকটি কাক কা কা করে উড়ে গেল দূরে। মাঝিরা নাও ছেড়ে দিলো। আগা নায়ে দু পাশে ছয়টি করে মোট বারটি দাড়। তালে তালে জলে ডুবছে, উপরে উঠছে। মাঝিদের কারো বয়সই ত্রিশ পেরোয়নি। সবারই স্বাস্থ্য সুঠাম। এমনকি পেছনে হাল ধরেছে যে, দাড়িদের চেয়ে তার বয়স একটু বেশি হলেও এখনো ত্রিশ পার করেনি সেও। ময়ূরপঙ্খি চালনায় তারা সবাই খুব দক্ষ ও অভিজ্ঞ। প্রত্যেকেরই বার তেরো বছর দাড়টানা ও হালধরার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
শীতকালেও মৃগীর স্রোত একেবারে কম নয়। উজানে নৌকা ঠেলতে গেলে কলকল, খলবল শব্দ হয় জলে। মাস্তুলে পাল বেঁধে গুটিয়ে রাখা হয়েছে। বাতাসের বেগ বাড়লেই বাঁধন খুলে দেয়া হবে। দাড়ের জোরে উজান ঠেলে সামনের দিকে ভালোই এগিয়ে যাচ্ছে নাও। মৃগীর জলও বেশ স্বচ্ছ। নিরাকজলে তাকালে নিজের চেহারা ভেসে ওঠে।
দুজন চাকর শের আলী গাজীর পালঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে। তারা সার্বক্ষণিক তার সেবায় নিয়োজিত। জমিদারের ইশারায় ইতোমধ্যেই তারা খুলে দিয়েছে ময়ূরপঙ্খির দুদিকের দুটি বড় জানালা। পালঙ্কের নরম আসনে বসে নদীর দু পাড়ের দৃশ্য ভালোই দেখা যায়। দেখা যায় টুকরো আকাশও। তারপরও শের আলী গাজীর ভালো লাগছে না। কেমন যেন বন্দি বন্দি লাগছে নিজেকে। তার মন তো আজ পাখি। সে আজ উড়তে চায়, ঘুরতে চায় আকাশের সীমানায়। ডানা মেলে উড়তে না পারলে সোনার খাঁচা কি কখনো কোনো পাখিরও ভালো লাগে? তিনি পালঙ্ক থেকে নেমে নৌকার সামনে গেলেন। নায়েব, গোমস্তাদের হুকুম দিলেন ছৈয়ের ভেতরে গিয়ে নিজেদের কক্ষে বসার জন্য। তারা ভেতরে চলে গেল। শের আলী গাজী বসে পড়লেন তার জন্য পাতা রাজকীয় আসনে। আজকের দিনের প্রকৃতির তাবৎ সৌন্দর্য তিনি একাই উপভোগ করতে চান, আপন খেয়ালে! তিনি তাকিয়ে থাকেন মৃগী নদীর জলের দিকে। নদীতে ভেসে যাচ্ছে কিছু কিছু কচুরিপানা। সেদিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে হাসলেন, ভাবসাগরে লোহাও ভাসে। আর এ তো কচুরিপানা!
নদীর দুপাড়ে মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে ঘাট। পোলাপান লাফঝাপ দেয় জলে। কৃষকরা তাদের গরুগুলো গোসল করায়। বউ-ঝিরা মাঝে মাঝে আসে জল নিতে। ঘোমটার আড়াল থেকে তারা ময়ূরপঙ্খি দেখে। এত সুন্দর নাও! কার গো এই নাও! আমাগো জমিদারের! নাওয়ের ওপর থেকে সহজে চোখ সরানো যায় না! শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তারপরও তারা তাড়াতাড়ি জল ভরে কলসি কাঙ্খে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। জমিদার তাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কাছেধারে কোথাও ভিড়বে নাকি ময়ূরপঙ্খি! একটু আগে যেসব পোলাপান জলে দৌড়ঝাপ করছিল, তারাও বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ময়ূরপঙ্খির দিকে। কৃষকরা গোসল ভুলে তাকিয়ে থাকে ময়ূলপঙ্খির দিকে। কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে জানতে চায়, কোথায় ভিড়বে এই নাও? কানুনগো অফিস? নাকি নদী ভ্রমণে বেরিয়েছেন জমিদার সাহেব? নাকি সামনে নৌকা থামিয়ে ঢুকে পড়বেন জঙ্গলে হরিণ কিংবা বাঘ শিকারে? সবাই মাথা উঁচু করে তাকাতে চায় ময়ূলপঙ্খির দিকে। কিন্তু বরকন্দাজগুলো যেভাবে বন্দুক তাক করে আছে! একটু হেরফের হলে কখন আবার গুলি ছুঁড়ে দেয়। আর পাইকপেয়াদাগুলোও লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে। দেখলেই ডর লাগে। যদিও সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। তবু তারা কেউই ডরে ভালো করে চোখ তুলে তাকায় না ময়ূলপঙ্খির দিকে। ঘাটের সবচেয়ে নির্বোধ লোকটিও মাথা নিচু করে থাকে। জমিদার বলে কথা! কখন কী মতিগতি হয় কে জানে! সে নিজের গোসল সারে কিংবা গরু ঝাপানোর দিকে মনোযোগ দেয়।
উত্তর থেকে রাশি রাশি জল নিয়ে আসে মৃগী। এ জলই নদীর প্রাণ! কী কলকল বেগে বয়ে চলে দিনরাত ভাটির দেশে! কত নাও বাণিজ্যের পসরা নিয়ে যাওয়া-আসা করে উজানে-ভাটিতে, কখনো দাড় বেয়ে, কখনো পাল তুলে। মাঝিদের কলরব, গানের সুর, জলের কল্লোলের সাথে মিশে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়, দূর দূরান্তে। ময়ূরপঙ্খির পালে লেগেছে দুরন্ত হাওয়া। কলকল করে এগিয়ে যাচ্ছে সে। নদীর পাড় থেকে খানিকটা দূরে বিশাল একটা বটবৃক্ষ, ডালপালা, শেকড়বাকড় ছড়িয়ে কত বছর যাবত দাঁড়িয়ে, কেউ জানে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, আমার বাবা, তার বাবা, তার বাবার বাবাও নাকি এমনি দেখেছে এই বৃক্ষ। বছর বছর শেকড়বাকড় গেড়ে, আশপাশের জায়গা-জমিন আরো দখল করে সদম্ভে দাঁড়িয়ে আছে এ প্রাচীন বৃক্ষ। তার ঘন নিবিড় শীতল ছায়ায় মাটিতে বসে, একটি গুঁড়িতে হেলান দিয়ে, মনপ্রাণ ডুবিয়ে বাঁশিতে সুর দিয়েছে এক রাখাল। কয়েকটি গরু চড়ে বেড়াচ্ছে কাছেধারে। বাঁশির জাদুময় সুরে তারাও এখন তাকিয়ে আছে রাখালের দিকে। বাঁশির বিরহসুরে শের আলী গাজীর মন মুহূর্তে উদাস। যত দূরে সরে যাবেন, এ বাঁশির সুরও হারিয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং ময়ুরপঙ্খি কিছুক্ষণের জন্য তীরে ভেড়ালে কেমন হয়! কিন্তু পালে যেভাবে হাওয়া লেগেছে, তা দেখে আর ইচ্ছে হলো না তীরে ভিড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য যাত্রাবিরতি করতে। ময়ূরপঙ্খি এগিয়ে যাচ্ছে। বাঁশির সুর বিষণ্নতা ছড়িয়ে তাকে মোহগ্রস্ত করে আস্তে আস্তে দূরবর্তী হচ্ছে। শের আলী গাজী ভাবলেন, আমরা বেদনা চাই না। কিন্তু কখনো কখনো বেদনাই আমাদের মনে অদ্ভুত আনন্দ সৃষ্টি করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূরে কোথাও। এই বংশীবাদকের খোঁজখবর নিতে হবে। তাকে চাকরি দিয়ে নিয়ে যেতে হবে রাজধানী গড়জরিপায়। মাঝে মাঝে সে তাকে শোনাবে বাঁশির মায়াবী সুর।
বাতাস যে কখন পড়ে গেছে তিনি খেয়ালই করেন নি। জলে ঝপাত ঝপাত উঠানামা করছে অনেকগুলো দাড়। উজান ঠেলে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে।
