কাব্যশীলন

যমুনা পাড়ের কথাসাহিত্যিক রাশেদ রেহমানের অর্জন- আলমগীর হোসেন

যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জের কাজীপুর। বিদগ্ধা যমুনা বুক চিড়ে জেগে ওঠা দূর্গম চরাঞ্চলের পলিমাটি থেকে উঠে আসা এক প্রতিভাবান কলমযোদ্ধার নাম রাশেদ রেহমান। আশির দশকের গোড়ার দিকে ১৯৮৪ সালের ৩রা মে নাটুয়ারপাড়ায় শেখ বংশের তরুণ কথাসাহিত্যিকের জন্ম। পিতা আজাহার আলী শেখ ও মাতা মোছা: রহিমা খাতুন, বাল্যকালে তার দূরান্তপনার সাক্ষ্য হয়ে আছে তার কবিতা–

দুঃখ সুখের যমুনা
রা শে দ রে হ মা ন

যমুনারে তোর চরে জন্মেছি, বুকে জমা সেই স্মৃতি
তীর ভাঙনে নিঠুর প্লাবনে; ভুলবো না তবু প্রীতি।
শান্ত নদীর অপরূপ শোভা দেখেছি নয়নভরে,
মাছরাঙ্গা-ঘুঘু-গাঙচিল-বক উড়তো চরে চরে।
পাল উড়ায়ে পানসীরা যেত কখনো’বা গুন টেনে,
ছলাৎ ছলাৎ বাইতো মাঝিরা বৈঠা ও লগি হেনে।
কলার ঢোঙরে জুতা পরে পায় হেঁটেছি দুপুর হলে,
তপ্ত বালুর মরুময় চর দুই পায়ে গেছি দলে।
ভেজা বালি দিয়ে অট্রালিকাও গড়েছি তটে বসে,
একটু বালি শুকিয়ে গেলেই পড়তো খসে খসে।
নল নল আর ঝাপুর ঝুপুর আরো কত জলকেলি,
গামছাতে ভরে ছোট মাছ ধরে নদীতে দিয়েছি ফেলি।
রিনিঝিনি সুর কতো যে মধুর ঢেউ তোলে কাশফুলে,
বকের সারি বালিহাঁস চিল ডুবে নিতো মাছ তুলে।
বর্ষা এলে পলি আর পলি উর্বরা মেঠো প্রান্তর,
সোনার ফসলে অবারিত চর ভরে দিত অন্তর।
যেখানেই থাকি সদা মনে রাখি জন্মদাত্রী নদী,
তোর বুক-চরে যাই যেন মরে প্রার্থনা নিরবধি।

রাশেদ রেহমান এর শিক্ষা জীবনে আগ্রাসী যমুনার করালগ্রাসি ভাঙনে সাময়িক লণ্ডভণ্ড হলে থেমে থাকেনি তার সমৃদ্ধতার যুদ্ধ। সংসারের ভরণপোষণের পাশাপাশি লেখালেখি ও পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন সমানতালে। যমুনার সূচি স্নিগ্ধ কলকল রব আর, মাঝির গুণটানা, তাকে কবিতার ছন্দ তুলে দিত ধনেপ্রাণে, তিনি শব্দের প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ ঐশ্বরিক ঐশ্বর্যময় আখ্যান তৈরি করেন। শব্দের ভাঁজে ভাঁজে জীবনকে যিনি তুলে ধরেন, অনুভূতির গভীরতা আর বাস্তবতার নির্মোহ রূপ যাঁর কলমে নতুন আলো পায়,
রাশেদ রেহমান শুধু গল্প বলেন না, মানুষের হৃদয়ের কথা বলেন—স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভালোবাসা আর সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে আসে তার প্রতিটি সৃষ্টিতে।
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তিনি কেবল একজন লেখক নন, বরং একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, নিবেদিতপ্রাণ সম্পাদক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। শেকড়সচেতন এই স্রষ্টা তাঁর বহুমুখী প্রতিভায় সমকালীন শিল্পাঙ্গনে নিজের একটি স্বতন্ত্র বলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

​রাশেদ রেহমানের সাহিত্যজীবনের এক উজ্জ্বল মাইলফলক তাঁর উপন্যাস ‘আজিরণ বেওয়া’ যা ওয়েবম্যাগ কাব্যশীলনেও ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, গ্রামীণ জীবনের নিটোল বাস্তবতা, মানবিকতা ও নিখুঁত চরিত্রায়নের কারণে গ্রন্থটি পাঠকহৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। এর জনপ্রিয়তার প্রমাণ মেলে অমর একুশে বইমেলায় উপন্যাসটির পঞ্চম সংস্করণের প্রকাশনায়। এই কালজয়ী সৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ আয়োজনে লাভ করেছেন ‘বঙ্গভূমি সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮’।
উপন্যাসটির সাফল্য কেবল মলাটবন্দি থাকেনি, তা ডানা মেলেছে সেলুলয়েডের পর্দায়। প্রখ্যাত নির্মাতা মির্জা সাখাওয়াত হোসাইনের প্রাথমিক ভাবনার পর এটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গীতালি হাসানের পরিচালনা ও প্রযোজনায় সরকারি অনুদান লাভ করে। দীর্ঘ চিত্রায়ন শেষে চলচ্চিত্রটি এখন সম্পাদনার টেবিলে, যা তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের সেতুবন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
রাশেদ রেহমান কেবল পাণ্ডুলিপিতে সীমাবদ্ধ নন; তিনি চলচ্চিত্রের নেপথ্য কারিগর হিসেবেও সক্রিয়। প্রখ্যাত পরিচালক মির্জা সাখাওয়াত হোসাইনের ‘স্বপ্নযাত্রা’, ‘একজন মহান পিতা’, ‘হরিজন’ ও ‘চুন’সহ দশটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তিনি প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। গুণী নির্মাতাদের সান্নিধ্যে অর্জিত এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ভবিষ্যতে একজন পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। অভিনয়ের আঙিনাতেও তাঁর বিচরণ প্রশংসনীয়; ‘একজন মহান পিতা’ চলচ্চিত্রে মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি অর্জন করেছেন ফতে লুহানী পুরস্কার। তাঁর কলম সচল রয়েছে সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:

• ​গল্পগ্রন্থ: ‘নির্জন চরাচরে’, ‘আঁধভাঙা চাঁদ’।

• ​উপন্যাস: ‘নদীর নাম যমুনা’, ‘ওপার-এপার’।

• ​কাব্য ও ছড়া: ‘দুঃখ সুখের যমুনা’, ‘টাইমলাইনের কবিতা’, ‘আবির রাঙা ছড়া’।

• ​নাটক: ‘কোমক’, ‘এপার ওপার’, ‘চর’, ‘শালিক’, ‘রক্তাক্ত পতাকা’, ‘বন্দি আমার মা’।

​এছাড়া তিনি শতাধিক কালজয়ী গানের রচয়িতা। সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র ‘আজিরন’-এ তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে দুটি অনন্য গান। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদনা করে যাচ্ছেন সাহিত্য কাগজ ‘ক্যাপ্টেন’। নবীন ও প্রান্তিক লেখকদের জন্য এটি একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। তিনি গর্বের সঙ্গে নিজেকে ‘ক্যাপ্টেন সম্পাদক’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সাংগঠনিকভাবেও তিনি সমান দক্ষ—‘ক্যাপ্টেন শহীদ এম মনসুর আলী সাহিত্য পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং ‘বঙ্গভূমি সাহিত্য পর্ষদ’ (বসাপ)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বহুমাত্রিক এই কর্মবীর তাঁর সৃজনশীলতার স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:

• ​কথাসাহিত্যে: শাহ জালাল স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার।

• ​উপন্যাসে: উত্তরণ সাহিত্য পুরস্কার, লালন একাডেমিক পুরস্কার (ছেউড়িয়া), এবং ইন্ডিয়া থেকে ‘দ্য বেস্ট নভেলিস্ট এ্যাওয়ার্ড-২০১৮’ (ICHFR)।

• ​ছোটগল্পে: অণুরীমা সাহিত্য পুরস্কার, দেশ বাংলার দুই বাংলা বর্ষসেরা পুরস্কার।

• ​অন্যান্য: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মজয়ন্তী পুরস্কার, শীতলপাটি সাহিত্য পুরস্কার, আইডিয়া প্রকাশন শিশু সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু দেশি-বিদেশি সম্মাননা।

​রাশেদ রেহমান এমন এক বিরল প্রতিভা, যিনি একইসঙ্গে মাটির ঘ্রাণ আর নাগরিক চেতনার সমন্বয় ঘটিয়েছেন তাঁর শিল্পকর্মে। গ্রাম থিয়েটার ও রেডিওতে পত্রলিখন থেকে শুরু হওয়া সেই কিশোরের অভিযাত্রা আজ বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। শেকড়সিক্ত এই সৃজনশীল পথচলা আগামীতে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আরও ঋদ্ধ করবে—এমন প্রত্যাশা করা মোটেও অতিশয়োক্তি হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *