উপন্যাস

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব দশ

উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব ছয়

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব পাঁচ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব চার

উপন্যাস। পতঙ্গপ্রাণ। সমীর আহমেদ। প্রথম পর্ব

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব দুই

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব তিন

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব সাত

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব আট

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব নয়

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব দশ

ঘোড়াটির নাম হামজা। অ্যারাবিয়ান প্রজাতির। বছর খানেক আগে শের আলী গাজী সিরিয়া থেকে এনেছেন। গায়ের রং ধূসর বাদামি। মুখে সাদা ছোপ। পায়ে মোজার মতো সাদা ছোপ। হাড়ের গঠন ঘন ও শক্ত। ঘাড় লম্বা ও বাঁকানো। লেজ উঁচু। ঘাড়ের ওপর কালো কেশর। খুবই সহনশীল ও ক্ষিপ্রগতি। গতিতে পৃথিবীর আর কোনো ঘোড়া এর সাথে পেরে ওঠে না। এরা সহজেই পোষ মানে। আরবের বেদুইনরা ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা, মরুভূমিতে যাতায়াত ও যুদ্ধের কাজে এ জাতের ঘোড়া ব্যবহার করতো হাজার হাজার বছর ধরে। তারা বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ দক্ষিণ বাতাস থেকে আরবীয় ঘোড়াটি তৈরি করে বলেছেন, ‘ও আরবীয়, আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি দক্ষিণের বাতাস থেকে। তোমার কাহিনিতে আমি রেখেছি যুদ্ধজয়, ক্ষিপ্র গতি ও প্রভু ভক্তি। আমি তোমাকে পৃথিবীর অন্যতম গৌরব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি।’ এরা খুবই অনুগত। নবী করিম (সা.) নাকি একবার তাঁর চারজন সাহাবী নিয়ে এ প্রজাতির ঘোড়ায় চড়ে মরুভূমির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মরূদ্যান দেখার পর ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত পাঁচটি ঘোড়াকে পানি পান ও ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেন। ঘোড়াগুলো যখনই পানি পান করার জন্য জলছত্রের কাছে পৌঁছেছে, তখনই তাদের আনুগত্য পরীক্ষার জন্য ডাক দেন। অতি তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত হওয়া সত্ত্বেও ঘোড়াগুলো তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে আসে কাছে। হামজাও তার খুব ভক্ত। সিংহের মতোই সাহসী ও শক্তিশালী। শের আলী গাজী নিজে এ ঘোড়াটির যত্ন নেন। তার ধূসর ও মিহি লোমযুক্ত শরীর থেকে যেন তেল চুইয়ে পড়ছে।
খুরে খুরে ধূলো উড়িয়ে খটাখট শব্দে আশপাশ দাপিয়ে-কাঁপিয়ে শের আলী গাজীকে নিয়ে সকালের মিষ্টি রোদের ভেতর দিয়ে হামজা ছুটছে দ্রুত গতিতে। তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে লোকজন বলছে, আহ! ঘোড়া বটে! যেমন সুন্দর, তেমনই তেজ। আমাগো জমিদার শের আলী গাজী বলে কথা! তার ছাড়া এ তল্লাটে এত সুন্দর বলবান ঘোড়া আর কারো নাই।
হামজা ছুটছে গ্রামের রাস্তা দিয়ে। আশপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা, মানুষজন পেছনে ফেলে দর্শার কানুনগো অফিসের দিকে। সে বেপরোয়া, অপ্রতিরোধ্য। ছুটতে ছুটতে তিনি পৌঁছে গেলেন কানুনগো অফিসে। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলেন লোকজন কাজ করছে নিবিষ্ট মনে। এখানে প্রবেশ করে তিনি কী করবেন? কোনো কাজ তো নেই। মনের খেয়ালে ছুটে এসেছেন এখানে। কানুনগো অফিসেও তিনি থামলেন না। বরং সে এলাকা কয়েকটা চক্কর দিয়ে আবার ছুটে গেলেন দর্শা গ্রামের অপর প্রান্তে বসন্তরঞ্জনের বাড়ির দিকে। ঘোড়ায় সওয়ার হলে তার শরীরের রক্ত টগবগ করে যেন ফুটতে থাকে। কোনো কিছুই তিনি পরোয়া করেন না। কোমরের খাপে ধারালো তরবারি। মুঘলদের দুর্দান্ত কোনো যোদ্ধার মতো তাকে মনে হয়।
সূর্য বেশ ওপরে উঠে গেছে। বসন্তরঞ্জনের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই তার অভিব্যক্তিতে কেমন যেন একটা জড়তা ও ভয় ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। মোসাদ্দেক যেমন বলেছিল, প্রথম দুটি বাড়ির পর, তৃতীয় বাড়ি, বৈদ্যবাড়ি নামেই সবাই চেনে। ওই তো দেখা যাচ্ছে বাড়িটি। আম-জাম, সুপারি-নারকেল আর দেবদারুর ছায়ায় ঢাকা।
শের আলী গাজী ছুটে এলেন বৈদ্য বসন্তরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে। লাগাম টেনে ধরলেন হামজার। চিঁহি চিঁহি শব্দ করে সে থেমে গেল। পদ্মগন্ধা বাড়ি আছে তো! হামজাকে একটা গাছের সাথে বেঁধে রাস্তা থেকে নেমে যাওয়া সরু হালট দিয়ে হেঁটে গেলেন পদ্মগন্ধার আঙ্গিনায়। বাড়িতে উঠার সরু রাস্তা। রাস্তার দু পাশে সারি সারি ভেষজ উদ্ভিদের বাগান। থানকুনি, তুলসি, পুদিনা, অঞ্জন, অড়হর, অনন্তমূল, অর্জুন, উলটচণ্ডাল, কর্পূর, করবী, কলকাসুন্দা, কালোমেঘ, গন্ধভাদালি লতা, চিরতা, ঢোল কলমি, বন মরিচ, বহেরা আরো কত রকম উদ্ভিদ! সব গাছ তিনি চিনতে পারেন না। এই যে ভেষজ উদ্ভিদ, যা কিছু তিনি চেনেন, তা হেকিম আলী আকবরই তাকে চিনিয়েছেন। তিনিই তাকে বারবার দেখিয়েছেন কোনটা অড়হর, কোনটা কালোমেঘ। কোন উদ্ভিদের কী গুণাগুণ। তা না হলে ভেষজবিদ্যার সবটুকু তার অজানাই থেকে যেত। ভেষজ উদ্ভিদের মনকাড়া বনজগন্ধে ভরে আছে আঙিনা। এতক্ষণে আশপাশের লোকজন তার দিকে এগিয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু কেউ এদিকে আসছে না। বাড়িটা নীরব, নিথর। রোগীদেরও ভীড় নেই। নাকি এটি বৈদ্য বাড়ি নয়? মোসাদ্দেক তাকে ভুল তথ্য দিয়েছে? নাকি সে ভুল করে অন্য কোনো বাড়িতে ঢুকে পড়েছে? কিন্তু আঙিনায় এই ভেষজ উদ্ভিদের বাগান দেখে তার কিছুতেই মনে হয় না যে সে ভুল জায়গায় এসেছে। এদিকে গাঁয়ের কেউ না কেউ এতক্ষণে নিশ্চয় তাকে দেখেছে। চিনতেও পেরেছে নিশ্চয়। জমিদার বলেই কি ভয়ে কেউ এদিকে এগিয়ে আসছে না? তাকে এত ভয় পায় কেন ওরা? সে বাঘ না ভাল্লুক যে ওদের খেয়ে ফেললেন। এদেশের লোকজন কেন জমিদারকে এত ভয় পায়! এতদিনে তারা কি তার সম্পর্কে কিছুই জানে নি, বোঝে নি?
আঙিনায় গোয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন শের আলী গাজী। গরু শূন্য গোয়াল। বাড়িতে কেউ আছেন? বেশ বিনয়ের সাথেই হাঁক দিলেন। কেউ এগিয়ে এলে কী যে বলবেন! হ্যাঁ, তৃষ্ণার কথা। এত পথ ছোটাছুটি করে যথার্থই তৃষ্ণার্ত তিনি। কারো সাড়াশব্দ না পেয়ে আবার হাঁক দিলেন, একটু জল খাবো। কেউ আছেন? এবারও কারো সাড়া নেই। শের আলী গাজীর মনে হলো, বাড়িতে কেউ আছে, তবে সাড়া দিচ্ছে না। তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন। দাঁড়িয়ে থাকলে নিশ্চয় আসবে। কিন্তু সে পদ্মগন্ধা তো! আর কারো তার দরকার নেই।
আরেকটু অপেক্ষার পর দেখলেন, কলাবতীর মতো ঘোমটা টেনে বামহাতে বড় একটা কাসার থালায় নাড়ু আর মুড়ি নিয়ে, ডানহাতে কাসার জলের গ্লাস নিয়ে কেউ একজন এগিয়ে আসছে। পদ্মগন্ধা তো! আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে তার মনে হলো, এ পদ্মগন্ধাই। তা না হলে এমন একটা মিষ্টি গন্ধ কেন ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে! কিন্তু তারপরও তার মনে দ্বিধা ও ভয়, যদি সে না হয়! আরো কাছাকাছি আসতেই মাথার ঘোমটা বাতাসে অকষ্মাৎ সরে গেলে দেখলেন এই সেই দেবী — পদ্মগন্ধা! আজ তার মাঝে আগের সেই দ্বিধা ও ভয় নেই। আরেকটু কাছে এসে থেমে গেল পদ্মগন্ধা। চোখে-মুখে স্মিত হাসি। পথিক কি খুবই তৃষ্ণার্ত?
কী বলবেন শের আলী গাজী? তার কণ্ঠ কেন জড়িয়ে আসছে এভাবে! অনেক কষ্টে জড়তা চেপে তিনি জবাব দিলেন, যথার্থই। সকাল থেকে অনেক পথ ছুটতে হয়েছে।
নিন। তৃষ্ণা মেটান আগে। তারপর এ সামান্যই জল খাবার। যদি আপনার পছন্দ হয়।
কেন হবে না। নাড়ু-মুড়ি তো আমার খুব পছন্দের খাবার।
কিন্তু হিন্দুর হাতের যে!
এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমরা সবাই তো মানুষ।
তাই! আমার কেন যেন মনে হতো আপনি আবার আসবেন এ গাঁয়ে।
শের আলী গাজীর বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। তৃষ্ণায় গলা আরো শুকিয়ে আসতে লাগলো। মনে মনে বললেন, তাহলে তুমিও আমার কথা ভেবেছিলে সুন্দরী! শের আলী গাজীর চোখে-মুখে আনন্দের ঢেউ। পদ্মগন্ধার দিকে তিনি নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। হেসে বললেন, তাই বুঝি! এখন থেকে মাঝে মাঝে তো আসতেই হবে এ গাঁয়ে। এলে তৃষ্ণা মেটানোর মতো জল পাবো তো?
নিশ্চয়।
জলের গ্লাসটা নেয়ার জন্য তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। পদ্মগন্ধাও গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন। কিন্তু কীভাবে কী যে হলো, শের আলী গাজী বুঝতে পারলেন না, গ্লাসটা হাত দিয়ে ধরতে না ধরতেই পড়ে গেল মাটিতে। কাঁচের হলে তো ভেঙেই যেত। কাঁসার গ্লাস। নিচে কাত হয়ে পড়ে আছে। একটু পানিও নেই। তাছাড়া পানি থাকলেও কি তা পান করার মতো? পদ্মগন্ধার দৃষ্টি বিষণ্ন হয়ে উঠল। শের আলী গাজী হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন গ্লাসের দিকে। মাটি শুষে নিচ্ছে জল। পদ্মগন্ধা কম্পিত হাতে প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, এটুকু মুখে দিন। আমি আবার এনে দিচ্ছি জল। তবে অনুরোধ জল খেয়েই আপনি চলে যাবেন। আমার মা-বাবা কেউই বাড়িতে নেই।
কোথায় গেছে তারা?
বাবা, দূরে কোথাও রোগী দেখতে গেছে। মাও সঙ্গে গেছে।
ওহ! তাহলে তো বাড়িতে বসাও যাবে না।
বাড়িতে আমি একলা। পাড়াপড়শিরা যদি কিছু মনে করে বসে!
তাহলে আর দেরি করি না। আজ তৃষ্ণা নিয়েই ফিরে যাই। আরেকদিন এসে পান করবো জল। সেদিন খুব সাবধানে থাকবো, হাত থেকে জলের ভরা গ্লাস যেন পড়ে না যায় মাটিতে।
মা বলেন কী জানেন?
কী?
হাত থেকে কোনো কিছু পড়ে যাওয়া অমঙ্গল।
তাই! কিন্তু এ সব আমি বিশ্বাস করি না। আমি আবার আসবো।
মাটি থেকে জলের গ্লাস তুলে পদ্মগন্ধা পা বাড়ালো ঘরের দিকে। শের আলী গাজী উঠোন থেকে উঠে এলেন সড়কে। ঘোড়ায় চড়ে পদ্মগন্ধার ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, দূর থেকে এক জোড়া মায়াবী চোখ তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তীরের ফলার মতো চোখা সেই দৃষ্টি। শের আলী গাজীর বুকের ভেতর বুঝি বিঁধে গেল গোলাপের বিষকাঁটা! হৃদয় ছিন্নভিন্ন হোক, রক্তাক্ত হোক, তবু এ দৃষ্টি গেঁথে থাক আমার পরাণের ভেতর! তার মনে পড়ে গেল কবীরের শায়ের :
‘নয়না অন্তর আও তু তিউহি ন্যায়ন ঝাপেউঁ
না হউ দেখুঁ আরো কু না তুঝে দেখন দেউ’
পদ্মগন্ধা, তুমি আমার চোখের ভেতর এসো। এখন থেকে চোখ বুজে, শুধু তোমাকে ছাড়া আর কাউকে আমি দেখতে চাই না। তৃষ্ণা ও হাহাকার নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন তিনি রাজধানী গড়জরিপার দিকে।

উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব নয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *