উপন্যাস

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব আট

উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব ছয়

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব পাঁচ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব চার

উপন্যাস। পতঙ্গপ্রাণ। সমীর আহমেদ। প্রথম পর্ব

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব দুই

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব তিন

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব সাত

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব আট

কী রূপ হেরিলাম

একটি মায়াবী রূপের জালের মধ্যে যেন শের আলী গাজী আটকা পড়ে গেছেন। বারবার চেষ্টা করার পরও সেখান থেকে কিছুতেই বের হয়ে আসতে পারছেন না। যেদিকে পা বাড়ান শুধু সুন্দরের ফাঁদ, মৃত্যুর ফাঁদ। তাহলে এই ফাঁদে তিলে তিলে মরে যাওয়াই কি তার নিয়তি! তা না হলে কেন তিনি ভুলতে পারছেন না পদ্মগন্ধাকে? সেই ভীত কম্পমান ডাগর ডাগর চোখ, বাঁশির মতো নাক, কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট, চাঁপাকলির মতো আঙুল, পিঠের ওপর দীঘল কালো ঢেউ খেলানো বেনী, গোলাকার মুখের গঠন, ক্ষীণকটি, আলতা রাঙানো চরণ যুগল, সব মিলিয়ে অপূর্ব দেহবল্লরী, দেবী সরস্বতী যেন সেদিন স্বয়ং স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিল তার সামনে। তারপর খুবই সংগোপনে তার দেহে-মনে-প্রাণে অলৌকিক বীণার ঝঙ্কার বাজিয়ে চলে গেছে। এখনো সেই সুর কিছুতেই থামছে না। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে তিনি দেখতে পান সেই দেবীর মুখ। স্বর্গ ছেড়ে মর্ত্যে সেদিন কেন এসেছিল সে? আর এসেছিল যদি, কেন সে তার সামনে পড়ে গেল! এখনো নিচের দিকে তাকালে তার চোখে পড়ে ভাঙা জলের কলস। কত যুগ, কত কাল অপেক্ষার পর তৃষিত মাটি শুষে নিয়েছিল জল। টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া কলসের চাড়ার ওপর অক্ষত কান্দা। আহ ‘তুই যদি হইতে গলের মালা’! তারপর স্মিত হাসি দিয়ে দেবীর অন্তর্ধ্যান।
সেদিন আর কোথাও তিনি যাননি। ফিরে এসেছেন গড়জরিপায়। তার লোকজন তো বিশ্বাসই করতে পারেনি, এত তাড়াতাড়ি তিনি ফিরে যাবেন। তারা বেশ অবাক হয়েছিল। নায়েব জিজ্ঞেস করেছিল, কোনো সমস্যা, হুজুর? শরীর খারাপ?
না না। আমি ঠিক আছি। চলো ফিরে যাই। আজ আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। আরেকদিন কানুনগো অফিসে যাবো।
কাউকে কিছুই তিনি বুঝতে দেননি। তারাও ভেবেছে, গাজীর মতিগতি তো অনেকটা এরকমই। কোনোদিন ময়ূরপঙ্খিতে সারারাত জোছনা দেখে দেখে কাটিয়ে দেন। কোনোদিন আবার একঘণ্টাও না। তার মনের ভাব বোঝা বেশ কঠিন।
জমিদারি কাজে তিনি মন বসাতে পারছেন না। মন বসাতে পারছেন না সংসারেও। চাকরবাকর আড়ালে-আবডালে কানাঘুষা করে, কী হয়েছে আমাদের জমিদার সাহেবের? কেন তিনি অমন অমনোযোগী, মনমরা হয়ে থাকেন? এমন তো কোনোদিন দেখি নাই। জমিদারির কোথাও তো কোনো সমস্যার আভাস পাই নাই। তাহলে? তাদের পাশ থেকে কেউ ফিসফিস করে বলে, সমস্যা শুধু জমিদারিতেই থাকে? আর কোথাও থাকে না বুঝি! এ জগৎসংসারে কখন কার কোথা থেকে যে অন্তর্গত বিষাদের সুর বেজে ওঠে, কে জানে! কেউ মনের কথা খুলে না বললে তা আমাদের বোধগম্যতার অতীতই থেকে যায়। ফাতেমা বিবি তসবির দানা টিপতে টিপতে তার দিকে তীক্ষ্ম নজর হেনে বলেন, আপনার ভেতরে আপনাকে তো আমি খুঁজে পাই না গাজী। সেদিন কানুনগো অফিস থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আপনি কেমন যেন আনমনা হয়ে থাকেন। আপনার চোখে-মুখে বিষণ্নতা, যখনই তাকাই অপার শূন্যতা, কোথায় কী হারিয়ে এলেন আপনি, বলবেন আমাকে?
বেদনার ওপর হাসির প্রলেপ ছড়িয়ে দিলেই কি তা ঢেকে রাখা যায়! তবু শের আলী গাজী চেষ্টা করেন। ফাতেমাকে বলেন, তুমি তো জানো, মাঝে মাঝে আমার মন অকারণেই ভার হয়ে যায়। এ জগৎসংসার আমাকে বিমনা করে তোলে। আবার আপনিই ঠিক হয়ে যায়। এ নিয়ে ভেবো না, বিবি।
ফাতেমা বিবি কিছুটা শ্লেষের হাসি ছড়িয়ে বলেন, অকারণে কিছুই হয় না কোথাও।
ধরা পড়েও শের আলী গাজী ধরা দিতে চান না। মুঠোর ফাঁক দিয়ে চড়ুই পাখির মতো ফুড়ুত করে বেরিয়ে যেতে চান এই অন্দরমহল থেকে, এই গড়জরিপা থেকে অনেক দূরে, লোকচক্ষুর আড়ালে। তিনি বলেন, আসলে আমি জানি না কেন এমন হয়। তুমি তো জানো বিবি আমি শায়ের খুব পছন্দ করি। আমার ভেতর কথা বলে ওঠেন হাফিজ, ওমর খৈয়াম, কবীর, গালিব, মিয়া তানসেন। তারাই আমাকে উদাস বানিয়ে ফেলেন। কিছুই আমার ভালো লাগে না। মন চায়, এই জমিদারি ছেড়ে, এই সংসার ছেড়ে চলে যাই দূরে কোথাও। তাদের মতো আমিও শায়ের লিখে জীবনটা কাটিয়ে দেই। খৈয়াম কী বলেছেন, শোনো :
‘তুঙ্গি ময় লাল খোহাম ওয়া দিওয়ানি
সদ্দ রুমকী বায়েদ ওয়া নিফসে নাজী
ওয়াজ গাছ মান ওয়াতু নিশফতে দর ওয়ারাজি
খোশতুর বুদ আম সামলাকাতই সুলতানী’
আহা! আমি যদি পারতাম, এই জমিদারি ছেড়ে, অল্প কিছু আহার আর সুরা নিয়ে বনের তরুতলে সারাজীবন শায়ের লিখে কাটিয়ে দিতে! খৈয়ামের মতো এমন একটি শায়ের যদি লিখতে পারতাম! কিন্তু আমি নিরিবিলি বসে দেখেছি, তালপাতা নিয়ে। কোনো ফল ফলে না। ভাব আমার মনে বাতাসের মতো আসা-যাওয়া করে। কিন্তু এমন আবেগ নিয়ে, শিল্পের এমন সত্ত্বা নিয়ে কিছুতেই ধরা দেয় না বাক্যে। তাই আমি খুব হতাশ… ফাতেমা বিবি বলেন, এটাই কি আপনার আসল কথা? নাকি আরো কিছু আছে? কী হয়েছে আপনার খুলে বলুন। আপনাকে আজ সত্যি খুব অন্যরকম লাগছে। এ আমার দেখা শের আলী গাজী নয়। আমার মনে হচ্ছে তাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। যা আশঙ্কা করেছিলাম, তাই কি ঘটতে যাচ্ছে! হায় খোদা!
শের আলী গাজী বলেন, বিবি, অযথা দুশ্চিন্তা কর না। আমার মন উতলা ঠিকই, তবে অন্য কোনো কারণে নয়। শুধু শায়েরের ভাব আমাকে তন্ময় করে রেখেছে। কদিন হয়তো এমন যাবে। তারপর আবার ঠিক হয়ে যাবে, সবকিছু আগের মতো হবে। যদিও যে জীবন আমরা যাপন করি, তা আসলে প্রকৃত জীবন নয়।
তাহলে প্রকৃত জীবন কী?
সব বন্ধন ছিন্ন করে মুক্ত জীবনযাপন করা। চারপাশের প্রকৃতির মতো। মানুষ তো কখনো বন্ধন মুক্ত হতে পারে না। বেঁচে থাকতে হলে তাকে কোনো না কোনো বন্ধনে জড়িয়ে পড়তে হয়।
শের আলী গাজী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, আসলে এই বিত্তবৈভব, ক্ষমতা, জমিদারি আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। আমার ভালো লাগে না। আমি হাঁপিয়ে উঠছি। হাফিজ কিংবা খৈয়ামের মতো যদি হতে পারতাম!
সে জীবনেও বড় ত্যাগ আছে, সাধনা আছে। তাছাড়া আল্লাহপাক সবাইকে সব ধরনের প্রতিভা দেন না। শায়ের চর্চা করলে তো আপনি এখানে বসেই করতে পারেন। আপনাকে নিষেধ করেছে কেউ?
না। তা কেউ করেনি। তবে… আমার মনে হয়, আপনার কয়েকদিন বিশ্রামে থাকা দরকার। কিংবা কোনো কাজের মধ্যে ডুবে থাকা দরকার, যা আপনি পছন্দ করেন।
শের আলী গাজী মৃদু হাসলেন। হ্যাঁ, যা আমি পছন্দ করি সেই কাজ! প্রকৃত জীবনে ফিরে যাওয়া কি আমার পক্ষে আর আদৌ সম্ভব বল? এই সংসার, এই জমিদারি, প্রভাব-প্রতিপত্তির মোহ তো ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
ফাতেমা বিবি বলেন, জানি না। তবে তাই যেন হয়।
অন্দরমহল ছেড়ে শের আলী গাজী আবারও বাগানে। গোলাপের রঙ কিছুটা অনুজ্জ্বল হয়ে গেলেও এখনো ঢের সতেজ। বিষণ্ন-করুণ এক চিলতে হাসির রেখা তার ঠোঁটে। গোলাপ নিয়ে সম্রাট বাবরের শায়ের তার মনে পড়ে গেল :
‘লালে লাল গোলাপের কুঁড়ির মতো আমার হৃদয়,
আগুনের ভাঁজে ভাঁজে মোড়া;
হাজারো বসন্তের হাওয়া কি পারবে কোনো দিন
হৃদয়ের সে কুঁড়িকে ফুটিয়ে দিতে গোলাপে?’

উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ

উপন্যাস- পতঙ্গপ্রাণ- সমীর আহমেদ- পর্ব সাত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *