উপন্যাস। পতঙ্গপ্রাণ। সমীর আহমেদ। প্রথম পর্ব
উপন্যাস ।। পতঙ্গপ্রাণ - সমীর আহমেদ
গড়জরিপা
ছায়া ঢাকা আঙিনায় প্রাতঃভ্রমণ করছিলেন হুমায়ূন। হঠাৎ খিড়কি দিয়ে রাজদূতকে ঢুকতে দেখে তিনি অবাক হলেন, এত সকালে! হঠাৎ কী এমন জরুরি তলব পড়ল যে…। সূর্য অবশ্য কিছুটা উপরে উঠে গেছে। বাড়ির ফটকের কাছে যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন রাজদূতের অপেক্ষায়।
গুস্তাফি মাফ করবেন জনাব। মহামান্য সুলতান আপনাকে এখনই তলব করেছেন।
হঠাৎ জরুরি তলব! মনে মনে বিড়বিড় করলেন তিনি। ঠিকাছে তুমি যাও। আমি এখনই আসছি।
ঘরে ঢুকে পোশাক পাল্টে তিনি তাড়াতাড়ি রওয়ানা হলেন মহামান্য সুলতান ফিরোজ শাহের দরবারে। তার স্ত্রী বললেন, জনাবের কি প্রাতঃরাশ করারও সময় হবে না আজ?
যেতে যেতে তিনি বললেন, না না। একদম সময় নেই। মহামান্য সুলতান তলব করেছেন।
দ্রুত উঠোন পেরিয়ে, খিড়কি খুলে দেখলেন সুলেমান শকট নিয়ে দাঁড়িয়ে। তাতে উঠে আসন গ্রহণ করতে করতে তিনি মনে মনে বললেন, নাহ! এই ছেলেটা তার প্রয়োজন বোঝে। সব সময় তার দিকে খেয়াল রাখে। তা না হলে এই সাত সকালে কেউ তো বলেনি তাকে শকটের কথা! রাজদূতকে দেখেই সে অনুমান করে নিয়েছে, তার মনিবকে এখনই বেরোতে হবে। তাই এরই মধ্যে সে আস্তাবল থেকে গাধা এনে শকটে জুড়ে দিয়ে এখানে হাজির! ছেলেটার বুদ্ধির তারিফ না করে পারা যায় না।
আঠার-উনিশ বছর বয়সী সুঠাম দেহের অধিকারী সুলেমান ততক্ষণে গাধার পিঠে চাবুক কষে শকট স্টার্ট দিয়েছে। মিনিট দশেক পরই তিনি রাজদরবারের প্রধান ফটকে। দ্বাররক্ষীর অনুমতি নিয়ে ফটক পার হয়ে রাজ দরবারে পৌঁছে দেখলেন রাজ অমাত্যবর্গের কেউই এখনো এসে পৌঁছেনি। শুধু কয়েকজন রাজ খানসামা নিজ নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে মহামান্য সুলতানের আদেশের অপেক্ষায়। তিনি কুর্নিশ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। ঠোঁটের কোণে হাসির উজ্জ্বল আভা কিঞ্চিৎ ছড়িয়ে মহামান্য সুলতান ফিরোজ শাহ বললেন, তুমি আজই প্রস্তুতি নাও, হুমায়ূন। দু একদিনের মধ্যেই সৈন্যসামন্ত নিয়ে রওয়ানা হবে বঙ্গদেশে। সেখানে দশকাহনিয়া নামক একটি জায়গা আছে। দশ বারোমাইল শুধু পানি আর পানি। দশ কাহন কড়ি না হলে খেয়া নৌকা এ পাড় থেকে ও পাড়ে যায় না। ব্রহ্মপুত্র নদের কাছেই বাস করেন কোচরাজা দলিপা। নিজের নামেই সে রাজ্যের নাম রেখেছে দলিপা। রাজধানী গড়দলিপা। সংবাদ পেয়েছি সেখানে প্রচুর ধনসম্পদ রয়েছে। সেই ধনসম্পদ আমাদের অধিকারে নিতে হবে। সমরবিদ্যায় তুমি বেশ দক্ষ। আগেও তুমি তোমার যোগ্যতা প্রদর্শন করেছ। কিন্তু প্রাপ্য সম্মান তোমাকে দিতে পারিনি। এবার বঙ্গদেশে যাও। গড়দলিপা জয় করতে পারলে, তুমিই হবে তার শাসনকর্তা।
মজলিস খা হুমায়ূন বললেন, যথা আজ্ঞা মহারাজ। এই অধমের প্রতি আপনার অনুগ্রহ। আমি বঙ্গদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবো।
যাও। আশা করি বিজয়ের বার্তা তুমি খুব তাড়াতাড়িই পাঠাতে পারবে।
যথা আজ্ঞা মহারাজ।
মজলিস খা হুমায়ূন শুনেছিলেন রাজধানী থেকে বঙ্গদেশ অনেক দূরে। বেশ দুর্গম এলাকা। মানুষগুলোও খুব দুর্ধর্ষ। তাছাড়া যেখানে তিনি যাচ্ছেন —দশকাহনিয়া, দশ বার মাইল যদি শুধু পানি আর পানিই হয়, তাহলে সৈন্যসামন্ত নিয়ে এতটা জলপথ পারাপার হওয়াও বেশ ঝুঁকির ব্যাপার। সব কিছু জেনেশুনে, শুধু ধনসম্পদ করায়ত্ব করতে তার প্রিয় সুলতান কি না তাকে পাঠানোর পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন! এ যে তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপেরই সামিল। অধিক ভালোবাসাও যে বিপদ ডেকে আনতে পারে, এবার তিনি তা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। কিন্তু মহামান্য সুলতান সিদ্ধান্ত যখন নিয়েই ফেলেছেন, তখন তো জীবনবাজি রেখে যেতেই হবে। তা না হলে তাকে তার বিরাগভাজন হতে হবে। আর এই সুযোগে প্রতিপক্ষ অমাত্যরা তার বিরুদ্ধে সুলতানের কান ভারি করে তোলবে। যা, আসলে আগুনে ঘি ঢালারই সামিল। তার চেয়ে ভালো যাত্রা শুরু করা। যদি রাজ্য জয় করে সত্যি সত্যি প্রচুর ধনসম্পদ পাঠিয়ে দেওয়া যায় রাজদরবারে, তাহলে চারদিকে তার নামডাক ছড়িয়ে পড়বে। সম্রাটের কাছে তার গুরুত্ব ও কদর আগের চেয়ে আরো বাড়বে। তার বিরুদ্ধে কথা বলতে প্রতিপক্ষরা সাহস পাবে না। গড়দলিপার শাসনকর্ত তো তিনি হবেনই। ভবিষ্যতে আরো বড় বড় রাজ্য জয়ের ভার পড়বে এই মজলিস খা হুমায়ুনের ওপর। শত প্রতিকুলতার মধ্যে সৌভাগ্য যেন তাকে হাতছানিয়ে দিয়ে ডাকছে। এ জন্যই লোকে বলে সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনা, কাঁটাযুক্ত গাছেই ফোটে সুন্দর ও সুগন্ধি গোলাপ। সুতরাং আর দেরি কেন?
গড়দলিপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর হুমায়ুন রাজ দরবার থেকে বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। আবার সেই শকটে। যত স্বপ্ন দেখেন ততই পুলকবোধ করেন। গড়দলিপার শাসক হতে যাচ্ছি আমি! তাহলে এত দিনে মহামান্য সুলতান আমাকে যথার্থ মর্যাদা দিলেন! যদিও তার সবটুকুই নির্ভর করছে যুদ্ধজয়ের ওপর। নাহ! গড়দলিপা আমাকে জয় করতেই হবে। এ সুযোগ আমি কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাই না। নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিতে হবে শ্রমে-ঘামে অদম্য সাহস আর ত্যাগে।
স্বপ্নঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে যেন সে ছুটে চলেছে অদম্য স্পৃহায়, দূর অজানায়। জয়ের স্বপ্ন যেন তাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে গড়দলিপার দিকে। সুলেমানকে তিনি খাজাঞ্চিখানার সামনে থামার ইঙ্গিত দিলেন। শকট থেকে নেমে ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই খাজাঞ্চিখানার প্রধান মোবারক আলী তাকে জড়িয়ে ধরলেন, সালাম বন্ধু। সৌভাগ্য তোমাকে বঙ্গে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আবার কতদিন পর দেখা হবে বন্ধুর সাথে কে জানে! না কি আর দেখাই হবে না! গড়দলিপার শাসনকর্তা হয়ে ভুলে যাবে আমাদের। তবু তোমার জন্য আমার ভালোবাসা ও দোয়া। তোমার প্রতি মহামান্য সুলতানের অনুগ্রহ দেখে আমি সত্যিই পুলকিত। মহামান্য সুলতানের নির্দেশে তোমার অর্থ ও রসদের ব্যবস্থাই করছিলাম।
মহামান্য সুলতান তাহলে গড়দলিপার ব্যাপারে এতই তৎপর! গোপনে গোপনে সবকিছু ঠিকঠাক করেই তাকে তলব করেছেন! অথচ ব্যাপারটি তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পান নি। হয়তো মহামান্য সুলতানই তাকে চমকে দেয়ার জন্য সবার মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছেন। এখন যেদিকেই তিনি পা ফেলবেন চমকে উঠবেন। আরো কত চমক যে তার জন্য অপেক্ষা করছে খোদাতাআলাই ভালো জানেন! একটি যুদ্ধযাত্রার জন্য রসদ, সৈন্য, হাতি, ঘোড়া, বাবুর্চি, খানসামা কোনো কিছুর জন্যই তাকে আর ভাবতে হবে না। মহামান্য সুলতান সবকিছু প্রস্তুত করেই রেখেছেন। মোবারক আলীকে বললেন, দোয়া কর বন্ধু। মহামান্য সুলতানের স্বপ্ন যেন পূরণ করতে পারি। আমি দুনিয়ার বাদশা হলেও তোমাকে ভুলতে পারব না।
