ছোটগল্প। শেষ রাতের জোনাকি। কানিজ পারিজাত
ঘটনাটা চোখের নিমিষেই ঘটে গেল; মোমেনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই। পশ্চিম পাড়ার জব্বার কাকা যখন আলুথালু থেঁতলে যাওয়া মোমেনাকে কোনোরকমে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখনও হতবিহ্বল মোমেনা, উত্তরের ঘরের মাচার কোণায় রাখা কয়েকটা পাকা তেঁতুল আর খানচারেক লেবুপাতার কথাই ভাবছিল। পুবপাড়া থেকে পশ্চিমপাড়া খুব একটা দূর নয়, মাঝে শুধু ফকিরবাড়ির খাল আর খালের ওপর বাঁশের সাঁকো, এলোমেলো, দুমড়েমুচড়ে যাওয়া মোমেনা যখন জব্বার কাকার সাথে পশ্চিমপাড়ায় তাদের বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ায় তখন বেলা পড়ে এসেছে। সেই অল্প ঝাঁজের রোদে মোমেনার উপর চোখ পড়তেই জব্বার কাকার ছেলের বউ আলেয়া শিউরে ওঠে— ‘ও আল্লাহ!
কেমনে? তার অস্ফুট কথার উত্তরে জব্বার কাকা মুখ খোলার আগেই পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল— ‘পাপ’। মোমেনা এই প্রথম খেয়াল করল, তাদের পেছনে অনেক মানুষ। পুবপাড়া থেকে ওরা তাদের পেছন পেছন এসেছে। যারা ঘটনা দেখেছে তারা তো এসেছেই, যারা দেখেনি— তারাও এসেছে, ঘটনা দেখার আশায়। ওরা সকলেই মোমেনার চেনা অথচ আজ ওদের চাউনিগুলো কেমন অচেনা ঠেকছে।
পুব দিকের একটা ঘরে মোমেনাকে বসানো হয়েছে। তার সারা গায়ে মারের দাগ— গাল, পিঠ ফুলে গেছে, কোথাও কোথাও ছিলে গিয়ে রক্তের ছিটা দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বাজে দেখাচ্ছে তার চোখ, ডানদিকের একটা চোখ ফুলে বুঁজে গেছে। আলেয়া কাপড় গরম করে সেঁক দিতে এল; মোমেনা যেন শীতল-বরফ, হঠাৎ উষ্ণতার স্পর্শে গলতে শুরু করল, একটুখানি কেঁপে উঠেই— ডুকরে কাঁদতে শুরু করল। বাইরের উঠানে তখনও জটলা; মানুষের গুঞ্জন। সব ছাপিয়ে মোমেনার কানে একটা কথা এসে আছড়ে পড়ে— ‘পাপে ছাড়ে না বাপেরে।’ মোমেনা শূন্য দৃষ্টিতে পাপের সন্ধানে খাবি খেতে থাকে। কিছুক্ষণ আগেই তো সে সারাদিনের খাটুনি শেষে পুকুর ঘাটে গোসল শেষে ফিরছিল। পথে রাজনভাই তাকে দেখে হাতভর্তি গাছপাকা তেঁতুল থেকে ক’খানা হাতে ধরিয়ে দিল, আরও খানিকটা এগিয়ে হিনা বু’দের বাড়ি পার হবার সময় হিনাবু’ও তাকে খানচারেক লেবুপাতা ছিঁড়ে দিয়ে বলেছিল, ‘বিকালে মাখাইস ভালো কইরে, আসবানি’। উত্তরের ঘরের মাচার কোনায় ওগুলো রেখে ঘুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই দানবের মতো তার উপর হামলে পড়ে সেলিম মিয়া। চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচরে উঠোনে ফেলে বেদম মারতে থাকে; সাথে ভীষণ গালাগালি, বাড়ির লোকেরা তো বটেই; আশেপাশের উৎসাহী মানুষগুলো যখন এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে মোমেনার মার খাওয়া দেখছিল— তখন কোথা থেকে যেন জব্বার কাকা এসে তাকে উদ্ধার করে। চোখের নিমেষেই ঘটে যাওয়া এই ঘটনার কিছুই বুঝে উঠতে পারে না মোমেনা। শুধু এইটুকু বুঝতে পারে, আর একটু হলেই স্বামী সেলিম মিয়ার হাতে মরতে বসেছিল সে— একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে।
দুই
‘স্বামীতি ফ্যালায় দিলি বিটিগে কোনো উপোয় নাই’— আলেয়ার দাদিশাশুড়ি মারজান বেগমের এমন কথায় একযোগে সায় দেয় উপস্থিত নারীকূল, এরা আশপাশের বাড়ির উৎসুক বৌ-ঝি; ঘরের মধ্যে মোমেনাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। মারজান বেগম ছানিপড়া চোখে ঘোলা দৃষ্টি ফেলে টেনে টেনে বলে— ‘বিটিগি পায় পায় দোষ— এমন পাপ করবো ক্যা যে স্বামীতি রাকফে না। ফ্যালায় দেবে!!’ সকলেই একযোগে ‘হা’ ‘হু’ করে ওঠে; মোমেনা নিশ্চুপ। তার শূন্যদৃষ্টি পাপের সন্ধানে পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরতে থাকে ঘরের মাচা-বেড়া-চৌকাঠ ডিঙ্গিয়ে বাপের বাড়ির সেই ছোট্ট উঠানে, আট বছর আগের এক সন্ধ্যায়। আটবছর আগে সেলিম মিয়া যখন মোমেনাকে বিয়ে করে নিয়ে আসে তখনও মোমেনা পুকুরের জলে ঝাপ দিয়ে সাঁতরায়, মাটি দিয়ে হাড়ি পাতিল বানিয়ে খেলে, বড়ই ছেঁচে ছেঁচে ধনে পাতা দিয়ে খায়, ক্ষেত থেকে কোচর ভরে মটরশুঁটি তোলে আর বিকেল হলেই খোলামাঠে ছেলেদের সাথে রঙিন রঙিন ঘুড়ি ওড়ায়। বয়স চৌদ্দ হলেও মোমেনার ছিল বাড়ন্ত শরীর; আরও ছিল ঢলঢলে একখানা মুখ। আর সেই ঢলঢলানো শরীর আর মুখ দেখেই বুকে সুখটান লাগে প্রবাসী সেলিম মিয়ার। ‘এত ছোট মাইয়েরে বিয়ে দেবেন?’ মোমেনার মায়ের এমন প্রশ্নের উত্তরে মোমেনার বাপ বলেছিল— ‘তুমার কি হুঁস আছে? এই ছেলে বিদেশে থাহে— সোনার দেশে কাম করে। তুমার মাইয়েরে সোনার গয়না দিয়ে মুড়ায় রাখবে। আর গৃহস্থ ঘর—হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল সব আছে, এক্কেবারে আঁটানো সংসার। এই ছেলে নিজে তুমার মাইয়েরে খেলার মাঠে দেইখে পছন্দ করছে। ওর তো কপাল ভালো— নাইলে সারাদিন লাফানো এই মাইয়েরে তুমি কই দিবা?’ ভারি গয়না, পিছল শাড়ি আর জরির মালায় মুড়ে একসন্ধ্যায় মোমেনা যখন স্বামীর বাড়ি এসে পৌঁছায়— তখন পেছনে বাপের বাড়ির উঠানে আলগোছে পড়ে থাকে তার খেলনা হাড়ি-কুড়ি আর একখানা রঙিন ঘুড়ি। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ— কিশোরী মোমেনা কেমন কুঁকড়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি কুঁকড়ে থাকে পনের বছরের বড়ো স্বামী সেলিম মিয়াকে দেখলে। ঠিক দেড়মাস পরে সেলিম মিয়া ফিরে যায় দূর দেশে— মোমেনা পড়ে থাকে সেলিম মিয়ার আঁটানো সংসারে, সুতোকাটা ঘুড়ি হয়ে। নিয়ম করে দুই-তিন বছর পরপর দেশে আসত সেলিম মিয়া। দুই মাস থেকে ফিরে যেত বিদেশে। এই অল্প সময়ে মোমেনা তাকে চিনতে চিনতেই সে আবার অচেনা হয়ে যেত। ভরা সংসারে শাশুড়ি-দেবর-ননদের ফাই ফরমাস খাটতে খাটতে মোমেনা কেমন রঙহীন হতে থাকে। ভুলে যায় নিজের কথা— রঙিন ঘুড়িটার কথা। সেলিম মিয়া ফোন করত মাঝে মাঝে। বাড়ির কাছের বাজারের দোকানে গিয়ে কথা বলে আসতে হতো। বাড়ির লোকেরা কথা বলার পরে মোমেনার সুযোগ আসত—
— বাড়ির সবার কথা শুনবা
— জ্বি।
— বাড়ির বাইরে বেশি যাবা না।
— জ্বি।
— বড়োরা কাজ করতে বললে সাথে সাথে করে দিবা।
— জ্বি।
— বাইরের মানুষের সাথে বেশি কথা বলবা না।
— জ্বি।
সেলিম মিয়ার সাথে মোমেনার কথোপকথন এক সংক্ষিপ্ত শব্দে সীমাবদ্ধ হতে থাকে।
তিন
রাত নেমে এসেছে। ‘যা হবার কাল সকালে হবে’ — এমন নির্ণয় শুনে পাতলা হয়ে এসেছে ভীড় ও গুঞ্জন। পুবের যে ঘরটায় মোমেনা বসে আছে সেটি মাচাল ঘর— চারদিকে বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা, একপাশে মাচা— একপাশে খাট। মোমেনার মনে পড়ে— এমন এক রাতে সে বসেছিল আট বছর আগে— সেলিম মিয়ার ঘরে। সেলিম মিয়া সেই অচেনা রাতটাকে আরও বেশি অচেনা করে তুলেছিল। সেলিম মিয়া ছুঁয়েছিল মোমেনাকে, তার বাড়ন্তত্ম শরীরটাকে, মনটাকে নয়। টিনের থালায় ভাত-তরকারি নিয়ে ঘরে ঢোকে আলেয়া। জব্বার কাকার ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে মোমেনার চাচাতো ভাইয়ের সাথে। তাই এই বাড়িতে মোমেনার খানিক কদর আছে; আসা-যাওয়ায় আলেয়া তার সই হয়েছে। কিন্তু আজ যেন আলেয়া কেমন কঠিন— কেমন দূরের। মুখে শক্ত ভাব রেখে একটু কড়া গলায় আলেয়া বলে— ‘যার জন্যি এই পাপ, সে কোন জায়গায়?’ মোমেনা অবাক হয়, অস্ফুটে বলে— ‘কিডা’?
—‘ক্যান, রাজনভাই? তারে নিয়েই তো তোর নামে কথা ওঠছে।’ মোমেনা একটু অবাক হলেও, কেমন যেন দমে যায়। কী কথা উঠেছে, সে জানে না, তবে জানে একবছর আগে ফুলগড়ের মেলা থেকে ফেরার পথে উঠেছিল বাউকুড়ানির বাতাস, উঠেছিল কালবৈশাখি ঝড়। সেই ঝড়ে উড়ে ছিল মোমেনার শাড়ি, খুলে ছিল মনের বদ্ধ কপাট। মোমেনার শ্বশুরবাড়ির কাছে ফুলগড়ে প্রতিবছর বৈশাখ মাসে যে মেলা বসে, গতবছর সেই মেলাতে যাবার অনুমতি মিলেছিল মোমেনারও, দেবর-ননদ ও বাড়ির আরও কয়েকজনের সঙ্গে ফুলগড়ের মেলায় গিয়েছিল সে। সন্ধ্যার একটু আগে আগে তারা যখন ফিরছিল, তখনই দূরে মাঠের মধ্যে উঠল বাউকুড়ানির বাতাস— মাগো মা, বাতাসের সে কী ঘূর্ণি! কারা যেন বলে উঠল— ‘আজকে কালবৈশাখি আসতি পারে, লক্ষণ ভালো না।’ সত্যিই তাই; খানিক বাদে আকাশ অন্ধকার করে উঠল বিরাট কালো মেঘ, মেলা ফিরতি লোকেদের হুটোপুটি শুরু হলো— ‘ঝড় আসছে ঝড়, কালবৈশাখি ঝড়।’ চারদিকে মানুষের ছোটাছুটি দাপাদাপিতে দলছুট হয়ে যায় মোমেনা। ঝড়ের প্রচণ্ড দাপটে দিশেহারা হয়ে ঠাঁই নেয় পথের পাশের এক পাকুড় গাছের তলায়— কোথা থেকে যেন উড়ে এসেছিল রাজনভাই; তাকে গাছের তলায় দেখে বলেছিল, ‘ভাবি, গাছের নিচে ক্যা? দ্যাখতাছো না বাজ পড়তেছে, সইরে আসো।’ রাস্তার দুই পাশে বিরান মাঠ, অন্ধকার আকাশ, শোঁ শোঁ বাতাস, বৃষ্টি আর বাজের মধ্যে রাজনের পিছে পিছে হাঁটতে থাকে মোমেনা। বুকের ভিতর এক অজানা ভয়ে ঢিপঢিপ করছিল তার। রাজন ভাইরা তার শ্বশুরবাড়ি পুবপাড়াতেই থাকে, তাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে; তবে তার এই বাড়িতে যাতায়াত আছে। তবু কেমন এক অজানা অস্বস্তি হচ্ছে। এমনিতেই তার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের থেকে সে দলছুট হয়ে গেছে, এই অন্ধকারে ঝড়ঝঞ্ঝায় কি করে ফিরবে সে? ঝড়ের দাপটে রাজন আর মোমেনা কাছের গ্রাম নন্দীপাড়ার এক বাড়িতে ঠাঁই নেয়। সে বাড়ির লোকেরা তাদের যত্ন করেছিল, মুড়ি-বাতাসা খেতে দিয়ে বলেছিল, ‘ভাই, ভাবিরে নিয়ে না হলি আমাগে বাড়ি থাইকেই যান, সকাল হলি চলি যাইয়েন, ঐ পাশে ঘর একখান খালি আছে’। মোমেনা আর রাজন দু’জন কেমন চমকে উঠে চুপ হয়ে গিয়েছিল। এরা তাদের দেখেই জামাই-বউ ভাবল। আসলে রাজন মোমেনার থেকে বছর চারেক বড়ো; দেখতে সুপুরুষ। আর জরির পার দেওয়া ফুলছাপা রঙিন শাড়িতে মোমেনাকে নতুন বউ নতুন বউ লাগছিল; অবশ্য তারা নিজেদের পরিচয় দেবার সুযোগও পায়নি। ঝড় থামলে রাজনই বলে ওঠে— ‘আমাগেরে যাতিই হবে, বাড়িতি বিমারী লোক পইড়ে আছে।’ বাকি পথটুকু মোমেনা আর রাজন কেমন চুপ হয়ে পথ হেঁটেছিল। বাবুবাড়ির মোড় পার হলে ডানদিকে শ্মশান। দূর থেকে শ্মশানের দাঁড়িয়ে থাকা বাবলা গাছের পাতাগুলো যখন নড়ে উঠল— মোমেনা কেমন ভয়ে সিঁটিয়ে রাজনের দিকে ঘেঁষে আসে। রাজন হঠাৎ বলে ওঠে— ‘ভয় পাচ্ছ ভাবি? ভয়ের কিছু নাই, আমি তো আছি।’ ভয়ে জবুথবু ক্লান্ত মোমেনা নিজের অজান্তে রাজনের হাত খামচে ধরে— শ্মশান পার হয়েও সে হাত ছাড়তে পারে না। আরো খানিক দূর এগোতেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, সুনসান নিশীথ রাতে অজস্র জোনাকিতে ছেয়ে যায় চারপাশ। জোনাকিরা যেন সবুজ মিটমিট আলো জ্বেলে পথ দেখায় পৃথিবীর পথে হারিয়ে যাওয়া দুই ক্লান্ত পথিককে। অদ্ভুত এক ঘোর আসে মোমেনার— অদ্ভুত এক আবেশ। মনে হয়— এই পথটা যদি আর শেষ না হতো, জোনাকির এই আলো যদি কখনোই আর ফুরিয়ে না যেত! বাড়ি ফিরে শত প্রশ্নের জবাব ও ব্যাখ্যা দিতে দিতে ক্লান্ত মোমেনা বিছানায় যাবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙে তার এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে, কে যেন কানের কাছে বলে ওঠে— ‘আমি তো আছি।’
হঠাৎ করেই মোমেনার ফ্যাকাশে জীবনটা কেমন রঙিন হয়ে ওঠে। এ যেন এক অন্য মোমেনা— কথায় কথায় হাসে, কাজে ক্লান্তি নেই, মনমরা ভাব নেই, উঠানের কোনে ধান খাওয়া শালিক দেখে হাসে, পুচকে ধানটুনি দেখে হাসে, রান্নাঘরে কাঁটা খাওয়া বিড়ালটাকে দেখে আদর করে, গরুগুলোকে যত্ন করে খাওয়ায়। মোমেনার এই পরিবর্তনে পাশের বাড়ির হিনা’বু এসে মোমেনার শাশুড়ি মাজেদা বেগমকে বলে— ‘ও কাকি, তুমাগে বাড়ির বউরে কি জ্বিনে ধরছে নাকি? হাত দেখি যম্মের চলা চলে।’ শাশুড়ি উত্তরে ঠোঁট ভেংচে বলেছিল— ‘জ্বিনে ধরছে না পিশাচে ধরছে— কিডা জানে? সইন্ধেবেলা আইছে ঝড়ের ভিতর দিয়ে’। মোমেনা একটু যেন চুপসে যায়। সেদিনের পর থেকে রাজনভাই খুব কম এসেছে এই বাড়িতে, আসলেও কেন যেন মোমেনার চোখে চোখ রাখতে পারেনি। মোমেনাও চোখ মেলাতে পারেনি। তবু রাজনভাই যখন হেঁটে যেত মোমেনা পেছন থেকে তাকিয়ে দেখত, রাজনভাই যখন পুকুরে জাল ফেলে শখের মাছ ধরত— মোমেনা দেখত, কেউ বিপদে পড়লে, কোথাও আনন্দ হলে রাজনভাই ছুটে যেত— মোমেনা নীরবে দেখত— তার দেখতে ভালো লাগত। আরো একটা জিনিস দেখতে ভালো লাগত মোমেনার; সে হলো রাতের জোনাকি। সারাদিনের কাজের মাঝে মোমেনা জোনাকি দেখার আশায় থাকত। সন্ধ্যা নামলেই দুচোখ ভরে, প্রাণভরে দেখত জোনাকি— রাতের জোনাকিরা আলো জ্বালে, তারা নেচে বেড়ায়, তারা যেন কথা কয়— “আমি তো আছি।” মোমেনার এই পরিবর্তন আর কারো চোখে ধরা না পড়লেও, একজনের চোখে ঠিকই ধরা পড়েছিল। ছানোয়ার বেপারি— মোমেনার বড়ো ননদের স্বামী।
চার
আলেয়া জ্বলতে থাকা কুপিটার সলতে ঠিক করে, তারপর ভার মুখে বলে— ‘আব্বা গেছে পুবপাড়ায়— উনাগের সাথে কথা বলতি— কী বলবে আর? কী বুঝাবে? পাপের পক্ষে কি আর কথা কওয়া যায়?’ মোমেনা নিশ্চুপ— এই টুকুতেই পাপ হলো? মনটা একটু খুলেছিল মোমেনা— শরীরটা বন্ধ রেখে, শুধু মনটাই একটু খুলেছিল, তাতেই পাপ হলো? মোমেনার মনে পড়ে, সেদিন সন্ধ্যায় সে যখন জানালা দিয়ে বাইরের জোনাকি দেখছিল, তখন পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়— ছানোয়ার বেপারি, তার বড়ো ননদের স্বামী। কাছের গঞ্জে পেঁয়াজ-রসুনের ব্যবসা করে। ব্যবসার কাজে এসে প্রায়ই শ্বশুরবাড়ি থাকে। সবার সামনে ধর্মকর্ম করে বেড়ানো লোকটা মোমেনাকে একা পেলেই কি সব বলে— তুমারে দেখলি আমার কি যে মায়া লাগে! মোমেনা চুপ। তুমি একটা পাখির মতো।
—জ্বি?
না-মানে-তুমি একটা হালকা পাখির মতো, কী যে মায়া লাগে আমার, তুমারে দেখলি! মোমেনা আবার চুপ ।
—সেলিম এট্টা গাধা, ও এট্টা ছাগল, না হলি এইরম কাম কেউ করে? মোমেনা না বুঝে আবার বলে— জ্বি?
একটুখানি হেসে ছানোয়ার বেপারি বলে— ‘বুইজলে না, তাই না? শোনো, সুমায়ের এক ফোঁড়, আর অসুমায়ের দশ ফোঁড়।’
মোমেনা না বোঝা দৃষ্টিতে তাকায়—
ছানোয়ার বেপারী আরও একটু ভেজা হাসি দিয়ে বলে, ‘বুইজলে না, তাই না? এত কম বুজলি কেমনে হবি?’ আচ্ছা তোমারে ইট্টু বুজাই— গুড় জ্বাল দিয়া তো দ্যাখছো; প্রথম দিনির রস দিয়ে যে পাটালি হয়, রস বাসি হইয়ে গিলি কি সেই পাটালি হয়? হয় না! তখন হইয়ে যায় চিটেগুড়। আবার গুড় বানানোর জন্যি সেইরকম জ্বাল দিয়া লাগবি। জ্বাল বেশি হলি পুইড়ে যাবি— তিতে হয়ে যাবি। সময়মতো তাপ দিলি, সময়মতো রসে ঘন ঘন ঘুটা দিলি পাওয়া যাবি স্বাদের গুড়— স্বাদের পাটালি, বুজিছো? মোমেনা তখনও নিশ্চুপ— শক্ত মুখে তাকিয়ে থাকে। তুমি মনে হয় ব্ধুসইজলেনা— ছানোয়ার বেপারি একটু যেন ভাঁজ ভাঙছে এমন ভাবে বলে— ধরো আমি যদি সেলিমির মতো হতাম, আমার যদি এইরম পাখির মতো সুন্দর একখান বউ থাকত, আমি কি তারে ফ্যালায়ে দূরে বইসে থাকতাম? কোনোদিন না— আমি আর এট্টা পাখি হইয়ে উড়ে যাইয়ে তার কোলে বসতাম। মোমেনা এবার শক্ত মুখে বলে— ‘আর কিছু বলবেন ভাইজান? আমার চুলোর পিঠে কাজ আছে।
শুকনো হেসে ছানোয়ার বেপারি বলে— ‘না আমি আসছিলাম ত্যালের শিশির জন্যি, সরিষার ত্যাল। আমার কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগতিছে, গা ডা এট্টু গরম করা দরকার।’ মোমেনা ভার মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। শুরু থেকেই লোকটাকে পছন্দ হয় না তার। কেমন ঘোলা ঘোলা চোখে তাকায়। মোমেনা পুকুরঘাটে নাইতে গেলে, সেদিকে হাঁটাহাঁটি করে— পুকুর পাড়ের বাবলা গাছের ডাল ভেঙে মেছোয়াক আনতে যায়। সবার সামনে ধর্মকর্ম করে, ধর্ম নিয়ে মোমেনাকে উপদেশ দেয়, আর একা পেলেই ভিন্ন মানুষ, কেমন কেমন সব কথা বলে। আলেয়া হঠাৎ বলে ওঠে— ‘এমন পাপ করার চাইতে মইরে যাওয়াও ভাল।’ মোমেনা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করে— কী কথা ওঠছে আমার নামে? কী পাপ করছি?
—যা করছিস, তাই ওঠছে, তাই ছড়াইছে—
—কী করছি?
এখন যেন কিছুই জানিসনে। তুই আর রাজন খারাপ কাজ করছিস না? তোগের দুইজনরে এক ঘরে দেখা গেছে! সাক্ষী আছে।
—কিডা সাক্ষী?
—ছানোয়ার বেপারি, তোর নুনদাই। মোমেনার মনে পড়ে সাতমাস আগে— বাড়িতে যখন কেউ ছিল না, ব্যবসার কাজে দুপুরবেলা হাজির ছানোয়ার বেপারি। মোমেনা তাকে খেতে দিয়ে উত্তরের ঘরে কাজ করছিল— হঠাৎ পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরে ছানোয়ার বেপারি ।
— ‘তুমার জন্যি খুব মায়া লাগে পাখি। তুমার কষ্ট আমার সইহ্য হয় না— আমি তুমারে সুখ দিতি চাই— সেলিম তুমারে যা দিতি পারে নাই— আমি তা দেব। কেউ জানবে না— খালি তুমি আর আমি জানব, সবকিছু গোপন গোপন চলবে— মোমেনা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করে— ‘খবরদার ভাইজান, ছাইড়ে দেন, আমি কিন্তু বুজিরে সব কয়ে দেব।’ তাদের ধস্তাধস্তির সময়ে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় রাজন। এ বাড়ি থেকে নেওয়া মাছ ধরার বড়ো জালটা ফেরৎ দিতে এসেছে। মোমেনার ধাক্কায় রাজনের গায়ের কাছে ছিটকে পড়ে ছানোয়ার বেপারী। রাজন তার জামা ধরে চোয়ালে বসিয়ে দেয় এক বিরাট ঘুসি। রাজনের কিল ঘুসির হাত থেকে বাঁচতে পায়ে ধরে ছানোয়ার। বাড়ির জামাই, সেই পরিচয়ে মাফ চাইতে থাকে। রাজন তাকে বলে— ‘জামাই বইলে ছাইড়ে দিলাম, না হলি জ্যান্ত মাটিতি গাইরে দিতাম— এই গেরাম থেইকে বাইর হতি দিতাম না।’ ছানোয়ার মাফ চেয়েছিল রাজনের কাছে, মাফ চেয়েছিল মোমেনার কাছে— লোকে জানলে তার মান ইজ্জত যাবে। সেই ঘটনা মোমেনা ভুলেছিল, তবে ছানোয়ার ভোলেনি, তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলেছে— অপমানের ক্ষত নিয়ে। সেলিম মিয়া ফেরার পর জ্বেলে দিয়েছে আগুন— প্রতিশোধের আগুন।
পাঁচ
বাইরের উঠানে আবার কথা শোনা যায়— জব্বার কাকার গলা। আলেয়া বের হয়ে যায়। কিছু কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে… মোমেনা নিশ্চুপ। বাঁশের চাটাইয়ের বেড়ার ফাঁক দিয়ে মিষ্টি একটা বাতাস এসে নাকে লাগছে— লেবু ফুলের ঘ্রাণ, আলেয়াদের উঠানে লেবুগাছ আছে। আলাদা করে রাজনভাইয়ের সাথে কোনোদিন কোনো কথা হয়নি মোমেনার। মোমেনার চোখের মুগ্ধতা সে কোনোদিন দেখেছে কি না তাও জানে না মোমেনা। শুধু এইটুকু জানে, সেদিনের পর থেকে রাজনভাই গাছ থেকে ফল পাড়লে, ক্ষেত থেকে আখ ভাঙলে বাড়িতে এসে ছোটদের দেওয়ার সময় মোমেনার হাতেও একটা ধরিয়ে দিত। মোমেনার মনে হতো রাজনভাইয়ের চোখ দুটো যেন তাকে বলছে— ‘ভয় নাই, আমি তো আছি।’ আলেয়া ঘরে ঢোকে, ‘ওরা খুব ক্ষেইপে আছে, সেলিম মিয়া তোরে আর ঘরে উঠাবে না— কাইল সকালে সালিশ ডাকছে, তোরে মনে হয় ঐ জায়গায় তালাক দেবে।’ মোমেনা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আলেয়া আরও একটু অস্থির হয়ে বলে— ‘তোগে বাড়িও খবর দিতি লোক পাঠাইছে, বিচারে তোর বাপ-ভাইরে থাকতি বলছে।’ বাপ আর ভাইয়ের কথায় কেমন দুর্বল হয়ে যায় মোমেনা। তার বাপ ভাই? বিয়ের পর তার বাপ ভাই এ বাড়িতে এসেছে কয়েকবার— খুব বেশি কদর পায়নি। একবার তার বাপ পিঠে আর নারকেল নিয়ে এসেছিল— গঞ্জ থেকে সঙ্গে করে এনেছিল— এক প্যাকেট দানাদার। সে দানাদারের একটুকরো তার বাপের সামনে দেওয়া হয়নি— পায়নি মোমেনাও। তার সেই বাপ কি এই অপমান সইতে পারবে? আর রাজনভাই? কিছু না করেও সাদামনের ভালো ঐ মানুষটার এই অপমান, এই বিপদ— মোমেনা এতক্ষণ বাইরে ভেঙেচুরে গিয়েছিল। এবার সে ভাঙল ভেতরে, দুমড়েমুচড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল মোমেনার মন। আলেয়া খানিক বাদে আবার ঘরে আসে, খুব অস্থিরভাবে মোমেনাকে বুঝানোর মতো করে বলে—
— ‘শোন, এট্টা উপায় হলিও হতি পারে। ছানোয়ার বেপারি, তোর নুনদাই, সে নাকি আব্বারে কয়েছে— “সেলিমির বউরে যাইয়ে কন কাইল যদি সালিশিতি সবাইর সামনে মাপ চায়, সেলিমির পায় ধরে, বাড়ির লোকেগের— আমার সবার পায় ধরে, তাহলি আমি এট্টা চিষ্টা কইরে দেখতি পারি— সেলিম ওরে রাখে কি না।”
আলেয়া এবার কণ্ঠ নরম করে মোমেনাকে বুঝায়— ‘দ্যাখ ভুল যা হবার হইছে, যে পাপ হইছে তাতো ফিরানো যাবে না, এহন মাপ চাইয়েনে, পায়ে ধর, মাপ চালি যদি উরা তোরে মাপ করে— সেলিম মিয়া তোরে না ফ্যালায়ে যদি ঘরে উঠোয়, না হলি এমন অপমানের চাইতে মইরে যাওয়া ভালো।’ মোমেনা স্তব্ধ নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকে।
ছয়
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মোমেনা। গৃহস্থবাড়ি, সে জানে কোথায় আছে জিনিসটা। এই ঘরেই ছিল — মাচার কোণায়। আলেয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর সব দুঃখের বাঁধ ভেঙে হাউমাউ করে কেঁদেছে মোমেনা। অনেক দিনের জমানো কান্না বের হবার পর বুকটা কেমন হালকা লাগছে। সিদ্ধান্তটা নিতে আর দেরি হয়নি। মোমেনা এখন ধীরস্থির শান্ত— হাতে বোতলটা ধরে বসে আছে, কীটনাশকের বোতল। কুপি নিভে গেছে বেশ আগেই, সেই মাঝরাতে। ঘর এখন অন্ধকার— সে ভালোই হয়েছে— অন্ধকারেই অন্ধকার যাত্রা। বোতলের মুখ খুলছে মোমেনা— হঠাৎ তার হাত থেমে যায়— অন্ধকার ঘরে সবুজ সবুজ আলো— জোনাকির আলো। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে কয়েকটা জোনাকি ঢুকে পড়েছে ঘরে— সবুজ মিটমিট আলো জ্বেলে উড়ে উড়ে নেচে নেচে বেড়াচ্ছে। আহ্ধসঢ়;! কী সুন্দর! জীবন কী সুন্দর! অদ্ভুত এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় মোমেনা। পূবের আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হয়ে আসছে। মোমেনা অপেক্ষা করছে সকাল হবার। সিদ্ধান্ত পাল্টে গেছে তার। সকলের মুখোমুখি হবে সে— বলবে কিছু কথা, সত্য কথা। সেলিমের কথা, ছানোয়ার বেপারির কথা— নিজের কথা। ঘরের ভেতর শেষরাতের জোনাকিগুলো তখনও উড়ে বেড়াচ্ছে— ধীরস্থির— দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মোমেনা অপেক্ষায় আছে সকাল হবার।
