উপন্যাস

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব-বারো

উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব এক

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব দুই

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব তিন

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- ছয়

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- সাত

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- আট

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- নয়

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব-দশ

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব-এগারো

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব-বারো

১২.

সোনারা গ্রামে আসার পর থেকে অদ্ভুত এক বিষাদ, অদ্ভুত এক তৃষ্ণা নিয়ে আমার দিন কাটছে। এই গ্রাম চাটমোহরের মতো সবুজ হলেও রঙের সজীবতায় বিস্তর তফাৎ দুই গ্রামের। এই সবুজ প্রাণহীন। এই সবুজ তারুণ্যহীন। এই সবুজের একাকিত্ব আমি নিতে পারছি না। কী করে এই সংকট কাটানো যায় তা ভাবতে ভাবতে আমি ক্রমশ আরও একা হয়ে যাচ্ছি। নিজের মতো নিজের ভেতরে থাকাটা জরুরি করে তুলতে গিয়ে আমি কাউকে আপনও করতে পারছি না। এই বাড়িতে আমি যে নিজের কোনো পৃথক অস্তিত্ব তৈরি করার চেষ্টা করি না সেটা একমাত্র মালা টের পায়। তাই হয়তো আনন্দযোগ হয়ে দিনরাত ও আমার পিছন পিছন ঘোরে।
‘তোক বুবু কয়া ডাকিম, না খালা কয়া ডাকিম রে?’
‘খালা কয়া ডাকপু ক্যা? মোক তুই বুবু কয়া ডাকত।’
মালার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে বলি, ‘তোর আর মোর বাপ একটাই!’
‘হ, ফুপু কছে, কাকায় কছে।’
‘তোর মাও কয় নাই?’
‘কছে, মা কছে তুই মোর বুবু হোস। কিন্তুক তোক মোর খালার নাকান নাগে।’
‘তাহালে তুই মোক না হয় খালা কয়া ডাক।’
‘কিন্তুক, তোর আর মোর বাপতো একটাই!’
‘হ, তাহালে তো বুবু করিই ডাকা নাগে!’ আমার বাক্যে কটাক্ষ থাকে না। আমিও মালার মতো বিস্মিত হই।
আমাদের দুজনের বাবার নাম হেদায়েত উল্লাহ! তবে আমরা দুজনই আমাদের বাবাকে মনে রাখার মতো করে দেখিনি। মালার জন্মের বছর চারেক পরেই হেরোইন রাখার অভিযোগে মাদকের মামলায় বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। ঐবার বাবা সহজে ছাড়া পায়নি। ছোটো কাকা বাবার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে কোর্ট-কাচারিতে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছে, লাভ হয়নি। ব্যবসার সবচেয়ে রমরমা সময়ে বিশাল চালানসহ বাবা হাতেনাতে গ্রেফতার হয়েছিল। দীর্ঘদিন মামলা চলাকালীন বাবা জামিনও পায়নি। তারপর বিচার শেষে বাবার সাজা হয়। ফুপুজি সবার অগোচরে জেলখানায় গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করে আসে। রেহনুমা যায় না। রেহনুমাকে আমি সম্বোধনহীন ডাকি। ডাকার অবশ্য খুব বেশি সুযোগ তৈরি করি না। রেহনুমা আমার চেয়ে বছর বারো-তেরো বড় হবে। এই বাড়িতে আমার আগমন যার কাছে নিতান্তই অস্বস্তির বিষয় হওয়ার কথা সে-ই আমাকে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। কিন্তু আমি এখনও রেহনুমার সঙ্গে সহজ হতে পারিনি। অথচ আমার সঙ্গে তার আচরণ খুব সহজ, স্বাভাবিক। যেন সে আমার অপেক্ষাতেই ছিল।
প্রথম দর্শনেই রেহনুমা বলেছে, ‘তুই দেরি করলু ক্যা?’ যেন আমার আরো আগেই আসার কথা ছিল। রেহনুমার সাবলীলতায় আমার অস্বস্তি বাড়ে। তখন পর্যন্ত মানুষের ভালো ব্যবহার নিতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। মামা বাড়িতে লাথি-ঝাঁটা খেয়ে বড় হতে হতে নিজের গুরুত্ব কবেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাই এই বাড়ির সদস্যরা আমাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলেও সারাক্ষণ একটা নিরাসক্তি আমাকে ঘিরে থাকে। কিন্তু যেই সময়টা আমি পেছনে ফেলে এসেছি, নিরাসক্ত থাকার চেষ্টা করলেও তার দায় আমি এড়াতে পারি না। নিঃসঙ্গতার দাঁতাল রাত্রিতে বাহির বাড়িতে দাঁড়ালে কোথা থেকে ঝটকা মেরে হু হু বাতাস এসে বুকের ভেতরে জবুথবু হয়ে থাকা কান্নাকে উসকে দেয়। ঠোঁটের কাটা দাগে হাত রাখলে আমার মনে পড়ে যায়, তুষার এই ঠোঁট-তালুকাটা নূরকে ভালোবাসতো। হাতের ক্ষত চিহ্নে হাত রাখলে মনে পড়ে যায়, তুষারের জন্য আমি একদিন মরতে চেয়েছিলাম। দিনের আলোয় এসব পাত্তা না দিয়ে আমি মালার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টায় মত্ত হই। মালার সঙ্গে গল্প করে করে পানসে সময় মধুময় করার চেষ্টা করি। কিন্তু রেহনুমা আমাকে আকর্ষণ করার যতই চেষ্টা করুক, আমি ওর সাথে সহজ হতে পারি না। টের পাই সম্পর্কের বৈচিত্র্য আমাদের মধ্যে সন্ধি গড়তে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ দিয় যায়, মালা আর আমি সহজ হই। এই যে এখনও মালা আমার মনোযোগের আশায় হাত ধরে টানছে। মালার বয়স আট-নয়। চেহারাটা বড় মিষ্টি। মায়ের মুখ কেটে বসানো। শরীরে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। সময়ে-অসময়ে মালা উদোম হয়ে ঘোরে, তখন শরীরের হাড় গোনা যায়। আমি ইশারা করলে জামা নিয়ে এসে পরে। মালাকে আমি জামা পরে থাকার গুরুত্ব বোঝাতে গেলে সে নানা কথায় আমার মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়।
‘বুবু মুই কিন্তুক ম্যালা শোলক জানম।’
‘বাহবা!’
‘হ।’
‘ক দ্যাখম।’
‘দৌড়ি গেনু, দৌড়ি আনু। নাল নাঠি ছাড়ি আনু।’
আমি ফটকি ভাঙতে পারি না শুনে মালা হেসে গড়িয়ে পড়ে।
‘বুবু। মাও যে হাগব্যার গেছে, নাল নাঠি গো!’
মালার সঙ্গে এবার আমিও হেসে উঠি। ওর শিশুসুলভ সারল্যে মুখর হই। নিজের হাতের মুঠোতে ওর মুঠো পুরে বলি, ‘আসেক তোর চুলত ত্যাল দিয়া দ্যাম। বেণী করি দ্যাম।’মনোযোগের জন্য মুখিয়ে থাকা মালা খুশিতে আমার হাত আঁকড়ে ধরে। আমি আর মালা, শরীরে একই রক্তস্রোত বহন করা ভিন্ন বয়সের ভিন্ন দুই মানুষ একে-অপরের সঙ্গে মিতালী পাতাই। আমাদের এভাবে একাত্ম হতে দেখে ফুপুজি গাল ভরে হাসে।

উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব-এগারো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *