উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- সাত
উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা
৭.
ফুপুজি আসার পরের দিনটা ছিল আমার জীবনের ঐশ্বর্যময় দিন। আমার ফেলে আসা সময়ে অমন বৈভবের দিন যেন আর একটিও নেই। আজও আমি সেদিনের একেক মিনিট সেকেন্ডের হিসাব দিতে পারি। পারাই তো উচিত। এত বছর পর আমার স্বজনেরা আমাকে দেখতে এলো, আনন্দের কী আর কূলকিনারা ছিল! যদিও ফুপুজির এভাবে নানাবাড়িতে আসার কারণটা আমি প্রথমে ধরতে পারিনি।
আমার বয়স তখন সুন্দরের। একেবারে আনকোরা ষোলোর সৌন্দর্য শরীরে, মনে। প্রিয়জনের আলিঙ্গন বহু বছর পর সেদিন আমাকে আহ্লাদীও করে তুলেছিল। রাত জাগা ক্লান্তি ক্লান্তিই মনে হচ্ছিল না। তবু সেদিন রাত ফুরিয়ে যাওয়ার ক্ষণে আমার আর ফুপুজির চোখে ঘুম নামে। ভোরের আলো গায়ে মাখতে মাখতে আমরা দুজন পরমাত্মার মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমের আয়োজন করি। সেদিন আমার বাইরে যাওয়ার কোনো তাড়া ছিল না। প্রতিদিনের পৃথিবীতে আমার জন্য এমন কোনো অভ্যর্থনা অপেক্ষা করে না যে আমাকে তড়িঘড়ি বিছানা ছাড়তে হবে। ঘরকন্না ভিন্ন অন্য কোনো পাঠ আমার জন্য বরাদ্দ ছিল না। স্কুলের পাট চুকে গিয়েছিল কয়েক মাস আগেই।
মামীর অভিযোগ স্কুলে গেলে আমাকে চোখে চোখে রাখা দায়। স্কুলের নাম করে আমি না কি পোষা বিড়ালের মতো তুষারের পিছু পিছু ঘুরে বেড়াই। তবে তুষার কিন্তু আমাকে নিয়ে আর আগের মতো ঘুরতে চাইতো না। মামীকে তা বোঝানোই মুশকিল ছিল। তুষার হঠাৎ করে কেমন যেন বড় হয়ে গিয়েছিল। ওর নতুন নতুন বন্ধু জুটেছিল। আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর ওর কী আর সময় ছিল! আমার প্রতি তুষারের মনোযোগহীনতায় সেই সময়ে চুপিচুপি কত যে কাঁদতাম! কিন্তু তুষারকে তা বোঝানোর সুযোগ কোথায়! মামী সারাক্ষণ আমাকে বাড়ির কাজে ব্যস্ত রাখতো। ফুপুজির আগমনে সেদিনের সকালে ছুটির দিনের আমেজ ছিল। হঠাৎ তবু মামীর তীক্ণ চিৎকারে বিছানা ছাড়তে হয়েছিল।
ঘর ছেড়ে উঠানে পা রাখতেই কানে এসেছিল মামীর ইঙ্গিতময় কথা। আমি রুটিনমাফিক মামীর তর্জন-গর্জনে পাত্তা না দিয়ে মুখ ধোয়ার জন্য কলপাড়ে দাঁড়িয়ে মামীর হাতের জ্বলন্ত কাঠের ফালিটা আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মামী সেই জ্বলন্ত কাঠ আমার দিকে ছুঁড়ে মেরেছিল। আত্মরক্ষার্থে বাতাস ছাড়া অন্য কোনো অবলম্বন না পেয়ে আমি পা পিছলে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম। গতিতে বাধা পেয়ে সেই কাঠ আমার পায়ের ওপরে পড়েছিল। ব্যথার চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিস্ময় নিয়ে আমি মামীর রুদ্র চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ততক্ষণে বাড়ির সবাই উঠানে এসে দাঁড়িয়েছিল।
কী ঘটেছে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মামী ছুটে এসে আমার পিঠে দুমাদুম কিল-চাপড় মারতে শুরু করেছিল। তখনই হঠাৎ তুষার ছুটে এসেছিল। পরম রক্ষাকর্তার মতো আমাকে মামীর সামনে থেকে টেনে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়েছিল। ভালো-খারাপের মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে আমি তুষারের মুঠোতে নিজের হাত ছেড়ে দিয়েছিলাম। খানিক পরে মামী আবার তেড়ে এসেছিল।
‘তোক না কল্যাম তুষার তোর এর মিদিন আসার কাম নাই।’
‘তোরেও তো কইলাম মা তুই এবা করিস না।’
তুষারের দৃঢ় মুখটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। কান পাতলেই শুনতে পাই মা-ছেলের কথোপথন।
‘বাড় বাড়িস না কইলাম। আইজই শয়তানটাক বাইর করতিছি। যাগারে জিনিস উয়েরাই লিয়ে যাইক। আলাই-বালাই দূর হইক।’
‘তোক তো কইলাম মা। নূরেক কোনো জায়গায় যাইবের দেব না। ও এহেনেই থাকপি। তুই যতই ওক ওর বাপের বাড়ি পাঠানোর তাল করিস আমি দেবনানে।’
‘তুই কলিই হবিনি? হারামজাদা!’
‘গাইল পাইরে লাভ নাই। তোক আমি কইছি না নূরেক আমি বিয়ে করবো। এই বাড়ির থেন নূরেক কেউ খেদাবেইর পারবি না।’
তুষারের কথা শুনে মামীর চেয়ে বেশি চমকে উঠেছিলাম আমি। কী শুনলাম! শরীরের রোমে রোমে লক্ষ পিঁপড়া ছুটতে শুরু করল। মনে হলো, এই বিষপিঁপড়ার দংশনেই বুঝি বা আমার মুক্তি মিলবে!
তুষারের কথা শেষ হতে না হতেই মামী ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তুষার আমার রক্ষাকর্তা হয়ে ছুটে গেলেও আমি ঠিক সেই মুহূর্তে অনড় বসেছিলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় কী করা উচিত আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ফুপুজি এসে জড়িয়ে ধরতেই আমার শরীর মোমের মতো গলে গিয়েছিল। অদ্ভুত এক ভালোলাগা আচ্ছন্ন করেছিল আমাকে! তুষার! তুষার আমাকে বিয়ে করবে! কী সুখ! কী সুখ!
শ্রবণেন্দ্রিয়ের সুখ সেদিনই কি প্রথম পেয়েছিলাম? সেদিনের পর থেকে কতদিন যে শুধু হাওয়ায় ভেসে বেড়িয়েছি। দিনরাত আনন্দের বিহ্বলতায় উড়েছি। নেচেছি শুভ্র পালকের মতো। সেদিনের পর থেকে উঠতে বসতে দিনরাত শুধু কানে ভেসে আসত তুষারের আওড়ানো ভালোবাসার মন্ত্র,‘আমি নূরেক বিয়ে করবো।’ শুধু একটি বাক্য! তবু কী অদ্ভুত পরাক্রমশালী! এরপর থেকে কী যেন হয় আমার। মামীর ভাষ্যমতে বেলেল্লেপনা বাড়ে।
আমি তুষারের সামনে যাওয়ার ছল খুঁজি। তুষারের কথার যোগ্য সমার্থক শব্দ হাতড়ে বেড়াই আর আয়নার বেদিতে নিজেকে সমর্পণ করতে করতে তুষারের কাছ থেকে শেখা মন্ত্র পাঠ করি আর বিরামহীন উড়ে চলি। কোনো চোখের শাসন, মুখের ভাষণ আমার উড়ে চলায় বাঁধা দিতে পারে না। আপনমনে ভাসি। হাসি। আর তুষারকে ভালোবাসি।
আমার অকারণ হাসি, অকারণ কান্নায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মামী তার গালমন্দের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। মামীর শব্দকোষে বাপ-খেদানির সাথে সাথে চরিত্র সম্পর্কিত হরেক গালির সংযুক্তি ঘটে। আমি পরোয়া করি না। কানে তুলো গুঁজে তুলোর মতো ভারহীন ভেসে বেড়াই। আমার তখন সুখের সীমা নেই।
ঐবার ফুপুজি আমাকে সঙ্গে নিতে পারেনি। আসলে আমিই যাইনি। মামার সাথে তুষারকে হাটে যাওয়ার ছুতোয় বাইরে পাঠিয়ে মামী আমাকে ময়লার ঝুড়ির মতো টেনে বাড়ির সীমানার বাইরে ফেলে দিয়েছিল। ফুপুজিও নিদারুণ নিষ্ঠুরতার সঙ্গে আমার হাত টানাটানি করছিল। মামী আর ফুপুজির টানাটানিতে অস্থির হয়ে আমি মামীর হাতে কামড়ে দিয়ে এক দৌড়ে ডেঙা বিলের পাড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরলে মামী আমাকে খুব মেরেছিল। তুষারকে আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে মামীর চেষ্টার অন্ত ছিল না। কিন্তু প্রকৃতঅর্থে আমাদের দুজনের ঘনিষ্ঠতা খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। দূর থেকে চোখে চোখ পড়লে আমরা দুজনেই শুধু অচেনা আনন্দে হেসে উঠতাম। সেই হাসির শব্দ ছিল না। কিন্তু প্রচ- ছন্দময় ছিল সেই হাসি, প্রচ- বর্ণময় ছিল এর সুখ! তুষারের সঙ্গ পাওয়ার বাসনায় একদিন আমি সবার চোখ পালিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলাম। সে আরেক গল্প। বিলের পারাপার চষে বেড়াচ্ছি। আর আমার চোখ তুষারকে খুঁজছে। পরিচিত পথে পরিচিত মানুষটার নিশানা পাচ্ছিলাম না। কত স্মৃতিমুখর এই বিলের পানি, চারপাশের ভেজা বাতাস! আহা! কার্তিকের কত কুয়াশা সকালে বিলে পলো চষেছি আমি আর তুষার। বিলের পা-ুর বর্ণের পানিতে তখন ছিল মাছের বাহার। তুষার আর আমি দলেবলে মাছ মেরে যখন কাদা মাখামাখি করে বাড়ি ফিরতাম তখন খুশিতে মামীর কুঞ্চিত ভ্রুজোড়াও সরলরেখায় রূপ নিতো। গজার, আইড়, বোয়াল, শোল মাছ দেখে দুএকবার সশব্দে হেসে ফেলতো মামী। সেদিন মামী ভাঙ্গুরা গিয়েছিল। তার বাপের বাড়িতে। কে না কে অসুস্থ ছিল, তাকে দেখতে। সন্ধ্যায় ফেরার কথা। মামীর অনুপস্থিতিতে হঠাৎ পাওয়া স্বাধীনতায় আমার তখন মাথা খারাপের মতো অবস্থা। নির্জন সকালে অচিন জেলের দোঁয়ার থেকে মাছ চুরি করছিলাম। পেয়েছি কি না মনে নেই। হঠাৎ জলের তীরে পরিচিত পায়ের শব্দে আমার ঘোর লাগে।
‘নূর!’
আমি নিরুত্তর।
‘নূর, নূর। এ্যাই নূর!’
আমি নিশ্চুপ থাকি। যেন আজীবন এই ডাকের পুনরাবৃত্তি চাই। তাই শব্দহীন কান পাতি তুমুল কৌতূহলে।
‘নূর রে…’
বহু চেনা বহু কাঙ্ক্ষ্মিত কণ্ঠস্বরের কাতরতা আমাকে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। চমকে যাওয়া আমার হাত গলে সুযোগসন্ধানী বেলে, চিংড়ি মাছের দল পালিয়ে যায়। আমারও পালাতে ইচ্ছে করে কিন্তু কীসের লোভ যেন আমার পা জোড়াকে জল-কাদায় ডুবিয়ে রাখে।
‘নূর, শুনছিস না! তুই যে কিছু বললি না। তোর তো দেখাই পাই না!’
‘কী বলি!’
‘ভালোবাসার কথা ফেরত দিলি না?
কথা খুঁজে না পেয়ে আমি থরথর করে কাঁপতে থাকি।
‘তোরে আমি ভালোবাসি। ঠোঁট-তালুকাটাও ভালোবাসি, তোরে আমি খুব ভালোবাসি।’
তুষারের মুখে ভালোবাসার প্রিয়তম উচ্চারণে আমি তখন দোঁয়ায় আটকা মাছের মতো ছটফটাচ্ছি। মুক্তি চাইছি আবার ধরা পড়ার ব্যাকুলতায় ছটফটাচ্ছি। তুষার কম্পনরত আমাকে ধরে ফেলতেই আমি প্রথমবারের মতো ব্যাখ্যাহীন বুঝেছিলাম, ভালোবাসা কী। ভালোবাসার প্রথম স্পর্শ পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমি তুষারকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। কী যে অদ্ভুত ছিল সেই স্পর্শের সুখ! এক অপার্থিব সৌরভে ভেসে যাওয়ার ক্ষণ ছিল তা! তুষারের হাত ধরে দিনরাত কত ছুটেছি। মারামারি করেছি। আঁচড়ে-কামড়ে একাকার করেছি ওকে। কিন্তু বিলের পাড়ের সেদিনের স্পর্শটুকু ছিল একেবারে নতুন। একেবারে অচেনা। যেই অনুভূতিটুকু আজও বুকের গভীরে গোপন সুখের কাঁটার মতো বিঁধে আছে। যদিও আমি সেদিন বুঝতে পারিনি সৃষ্টিকর্তা আমার জন্য আরও বিপুল বিস্ময় বরাদ্দ রেখেছিলেন। অবশ্য আমার জীবনে ঘটনার বৈচিত্র্যে ততদিনে আমি বিস্মিত হতেও ভুলে গিয়েছিলাম।
আমার ষোলো বছর বয়সের প্রবঞ্চনা প্রগাঢ় আতিথেয়তা নিয়ে আমার জন্য বসে ছিল আর তুষারের দেওয়া প্রথম স্পর্শটুকুর আনন্দ ফুরাতে না ফুরাতেই তুষার আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল! অথচ একটা সময়ে কী আকুলতা নিয়েই না আমরা দুজন আমাদের বড় হওয়ার ক্ষণের জন্য অপেক্ষা করেছি! তখনও ভাবিনি বড় হওয়ার আগেই তুষার আমার নাগালের বাইরে চলে যাবে। আমি ওকে আর ধরে রাখতে পারবো না।
