উপন্যাস

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- ছয়

উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব এক

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব দুই

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব তিন

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- ছয়

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- সাত

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- আট

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- নয়

৬.

বর্তমানের দৃশ্যপট থেকে অতীতের দুঃসহ স্মৃতিরা বহু কাল আগে থেকেই ঝাপসা হতে শুরু করেছে। এখন হাওয়ায় নৃত্যরত আছে শুধু কিছু মায়াময় স্মৃতি। এসব স্মৃতি ভাগাভাগি করবো বলে আজ মন স্থির করেছি। আঁধার সরিয়ে আজ তাই আলোতে চোখ রেখেছি। আঁধারে থাকতে থাকতে আমার চোখের কোণ কুঁচকে গেছে, পিঠ-মাথা মাটিতে ঠেকে গেছে। আর আঁধার চাই না। আজ শুধু আলোর গল্প চাই।
একে একে সব খুইয়েও অতীতের আলোভরা দিনের জন্য আজ আমার সকল মায়া উপচে পড়ছে। শিশুবেলায় হারিয়ে যাওয়ার নিপাট আনন্দে ভাসতে ভাসতে অন্ধকারকে ভুলে থাকতে আজ আমার শান্তি শান্তি লাগছে।
চাটমোহরের ভোরের বাতাস, কচুরিপানার ঝাড়বাতি, ঢলঢলে লাউয়ের ডগা, ডেঙার বিল, নৃত্যরত ফড়িং-ঘাসফড়িং, ঘুড়ির আস্ফালন, সুতাকাটা ঘুড়ির ফড়ফড়িয়ে নেমে আসা, কানু কাকার দোকানের জিলাপি, ঠোঙায় ভরা কটকটি আর চানাচুর! আর তুষারের নরম হাতের বাঁধন। তুষার! আহা, সুখ স্মৃতিগুলো মাঝে মাঝে বড় মধুর লাগে। অবেলায় কত কী যে মনে পড়ে!

আমাদের বড় হওয়ার দিনগুলো ছিল অসীম সুন্দর। মনে পড়ে, বুকের মায়াঘরে বন্দি স্বপ্নের ছটফটানি নিয়ে আমি তুষারের জন্য অপেক্ষা করতাম। যতক্ষণ ওর দেখা না পেতাম ততক্ষণ অবাধ্য পাখির মতো ছটফট করতাম। আর আমার ছটফটানি দেখে চোখ আর কথার শাসনে মামী আমাকে অস্থির করে তুলতো। কিন্তু তাতে তেমন কোনো ফল হতো না।
তখন আমি বড় হতে শুরু করেছি। মনের মতো আমার শরীরটাও বেয়াড়া হয়ে উঠতে চাইছে। শরীরের অনাবশ্যক বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন মামী আমাকে আবশ্যকীয় গালমন্দ করতে শুরু করেছে। বলা যায়, ভাষার অশ্লীলতায় মামী আমার শালীনতা রক্ষার চেষ্টা করতো। নানি দুজনের মাঝখানে বেকায়দায় পড়ে বলত, ‘অত আকথা, কু-কথা কও ক্যান বৌ। বাপ-খেদানি, মা মরা মাইয়াডা!’ মামীর কুকথায় আমার রাগ হতো না অথচ রাগ হতো নানির কথায়, বাপ-খেদানি কী! একদিন তুষারের ওপরে সেই রাগ ঝাড়লাম।

সেদিন তুষার আর আমি বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মামীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দুজনের মাছ ধরার প্রস্তুতি চলছিল। তুষার আমাকে বলেছিল, ‘তুই লেবুতলা থেকে পিঁপড়ার ডিম নিয়ে আয়।’ লেবুতলা! তার মানে বাড়িতে ফিরতে হবে! মামীর চোখে পড়ার ভয়ে আমি কিছুতেই বাড়িমুখো হওয়ার মতো ভুল করতে চাচ্ছিলাম না। আমার একগুঁয়েমিতে রেগে গিয়ে তুষার মামীর মতো আমার পিঠে ধুপধাপ কিল বসিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘যাহ্, শয়তান, বাপ-খেদানি! কথা শুনস না ক্যান!’ তখন আমার এমনই বয়স যে সামান্য কিছুতেই অভিমান হতো। সামান্য কটাক্ষেই কান্না পেত। কিন্তু সেদিন প্রিয় মানুষের মুখে অপ্রিয় উচ্চারণে অভিমান সরে গিয়ে আমার প্রচ- রাগ হলো। তুষারের পিঠে ধমাধম কিল-ঘুষি মেরে আমি বাড়ির পথে হাঁটা ধরলাম। গুণে গুণে তিনদিন তুষারের সঙ্গে কথা বলিনি। হায়, তখন কী আর জানতাম তুষারের সাথে কথা বলার দিন সত্যিই ফুরিয়ে আসছে!

সেদিন চারদিকে ছিল খরতাপ। শরীরে কাপড় পরতে না পরতেই ঘামে ভিজে নেয়ে উঠছিলাম। তাই হাতকাটা সেমিজ পরে বাড়ির উঠান ঝাড়– দিচ্ছিলাম। মামী আমাকে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে বলেছিল, ‘গতর দেখায়ে নাগর ধরবি মাগী! যা যা, ওড়না নে।’
একদিকে মামীর কথার উত্তাপ আরেকদিকে চৈত্রের খরতাপ– দুই অত্যাচার সহ্য না হলেও স্বীকার করতেই হবে ওড়না ফেলে সংসারের কাজ করলে যে শরীরে মানুষের চোখ পড়ে তা মামীর কাছ থেকেই আমি প্রথম শিখেছি। আসলে শরীর বিষয়ক পাঠ শেখানোর মতো কোনো সুহৃদ তো আমার ছিল না। কেউ কখনও বলেনি, এই নারী শরীরে অনেক বাঁক। বড় হবো আর এই বাঁকগুলোই আমার পরম শত্রু হয়ে উঠবে। মামীই প্রথম আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, নারী শরীরকে পুরুষের নজর বাঁচিয়ে রাখতে হয়। না হয় দুনিয়ায় ঘোর পাপ জেগে ওঠে।

আমি তখনও শরীর দেখানোর মানে বুঝি না। মানে বোঝানোর জন্য মামী সূঁচালো ভাষায় বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে আমাকে গালমন্দ করতে থাকে। এসব মন্দ কথা শরীরে বাতাসের মতো সয়ে যায় দেখে আমি কাঁদি না। শুধু নতুন আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গলায় ওড়না জড়াই। শরীরে ফুটে ওঠা অনাবশ্যক নারীচিহ্ন ঢাকতে সতর্ক হই। আবার নিজের শরীরের দিকে নজর দিয়ে দেখি, আসলেই শরীরের সৌন্দর্য অপরূপ। তখন আমার আনন্দ বাঁধ মানে না। আমি গুনগুন করি। নিজেকে দেখি। বার বার দেখি। সময় নিয়ে শরীরে পানি ঢালি, শরীর মুছি। যত্ন করে চুলে চিরুনি চালাই, চোখে কাজল পরি। আমি যা-ই করি তা-ই মামীর কাছে বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়। তাই মামী আমার পেছনে সারাক্ষণই লেগে থাকে আর কথার সূঁচে আমাকে খোঁচাতে থাকে।

নানি ততদিনে বয়সের ভারে কাবু হয়ে গেছে, তার পিঠ কুঁজো তবে শ্রবণশক্তি তীক্ষ। নানি বলতো, ‘গেদিটাক শান্তি দিলি না বউ। আল্লাহ্ তোক বুইঝাই গেদি দেয় নাই।’ অমন গেদির মুখে ঝাঁটা মেরে মামী ঘরের কাজে মন দেয়। আমিও উঠানে ঝাঁটা মারি। রাগ ঝাড়ি মাটির ওপরে। মাটিকে ঝেড়ে ঝেড়ে সাফসুতরো করতে থাকি। কিন্তু আমার দোষ তো সাফ হয় না। বেশিক্ষণ এক কাজে ব্যস্ত থাকা ফাঁকিবাজির লক্ষণ। কান টেনে মামী তাই আমাকে কলপাড়ে নিয়ে যায়। ওদিকে বিছানার চাদর পা দিয়ে মাড়াতে মাড়াতে আমার শরীর-মন নেচে ওঠে। এক অজানা খুশিতে আমি নাচি, তুষারের সাথে বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞার কষ্ট ভুলে নাচি।
সেদিন দুপুরবেলা ছোটো কাকা আর ফজিলা ফুপুজি বিনা নোটিশে এই বাড়িতে আসে। আমি কী যে এক বিপদে পড়ি! আমার আড়ষ্ট লাগে। পা আটকে যায়। ঘরের মানুষেরা জানায়, এরা আমার বাপের বাড়ির লোক। কী চায় এরা? কোথায় ছিল এতদিন! প্রথম দর্শনে ফুপুজি আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। মুখে, ঠোঁটের দাগে হাত রেখে বলে,‘এ্যাকন তোক কত সোন্দর নাগছে!’

ফুপুজির আদরে আহলাদে আমি সুন্দরী রাজকন্যা হই। আমার জন্য বরাদ্দ সব আদর ফুপুজি যেন একবেলার মধ্যেই ঢালতে থাকে। আদরের অনভ্যস্ততায় আমি খেই হারিয়ে ফেলি। মনে করার চেষ্টা করি, আমার মা নুরুন্নাহার, বাবা হেদায়েত উল্লাহ। আমি মা-মরা, বাপ-খেদানি। আমার নাম শুধু নূর না, নূর-ই-জান্নাত। যেই নাম আমার পূর্বপুরুষ রেখেছিল।
সেদিন রাতে আমি আর ফুপুজি এক বিছানায় ঘুমাতে যাই। প্রিয় সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে আমার সংকোচ কেটে যায়। বুকের ভেতরের জমাট বাঁধা কথার পাহাড় গলতে শুরু করে। আমি আনন্দ রাখার জায়গা পাই না। এত বছরের বিচ্ছিন্নতায় ফুপুজি বার বার আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। সেই কান্না আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা সঙ্গীত বলে মনে হয়। মনে হয় যেন পুরানো প্রাণসখীর সাথে এক জনম পরে দেখা, চোখের পানি তাই খুব স্বাভাবিক বিষয়।

সেই রাতে ফুপুজির কাছ থেকে আমি আমার ফেলে আসা প্রতিটা দিনক্ষণের হিসাব নিতে চাই। তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে বিদ্ধ করি। কিন্তু কথার চেয়ে কান্নার দিকে ফুপুজির মনোযোগ বেশি থাকায় শত অভিযোগ জানিয়েও ফল পাই না। একটা সময়ে আমার রাগ হয়, ফুপুজিকে ধমক দিই,‘এ্যাতো পিরিতি! কান্দিস ক্যা? ঢঙ ধরচে না! কোথায় ছিলি অ্যাদ্দিন?’ ফুপুজি আমার বকুনি শুনে আরও সুরময় কাঁদতে থাকে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরি। পুরানো ভালোবাসার ঘ্রাণ আমাকে আপাদমস্তক স্পর্শ করে। মায়ের স্পর্শের মতো ফুপুজির স্পর্শও আমার কাছে দামী হয়ে ওঠে। ফুপুজি তার মমতামাখা হাত দিয়ে আমাকে আঁকড়ে রাখে। আমি কেঁপে উঠি, ভালোবাসার স্পর্শে। আপনজনের কাছে ভালোবাসা খুঁজতে আমি অতীতকেই আঁকড়ে ধরি। বর্তমানকে শুনতে চাই না। শোনাতে চাই না। ফুপুজি আমার ছটফটানি দেখে হাসে। রাতের বুনো অন্ধকারে ধীরে ধীরে আমরা গল্পকথকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হই।

উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব তিন উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- সাত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *