উপন্যাস

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- নয়

উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব এক

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব দুই

উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব তিন

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- ছয়

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- সাত

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- আট

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- নয়

৯.

ছোটোবেলা থেকে দেখেছি আমার কাছের মানুষেরা একে একে আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এটাই আমার নিয়তি। একদিন আমার আত্মালগ্ন থাকা শায়লা বুবুর মতো এক মা-কেও আমি তাই আলো থেকে আঁধারে হারিয়ে যেতে দেখেছি।
সেলিনা আপার মতো শায়লা বুবুর স্মৃতিও আমার জীবনে অমলিন হয়ে আছে। আমার নানাবাড়ির দুই বাড়ি পরেই শায়লা বুবুর বাবার বাড়ি ছিল। বাচ্চা হওয়ার সময় বুবু বাপের বাড়ি নাইওরে এসেছিল। তার স্বামী সৌদি আরবে থাকতো। দুই বছর পর দেশে ফিরে পতিদেবতা বীজ বুনে গেছে, এই কথা বলে শায়লা বুবু মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতো। বুবু ছিল সেলিনা আপার সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের মানুষ। তার কাছে ঘরের চৌকাঠই ছিল পৃথিবীর শেষ সীমানা। ‘মেয়েদের বেশি পড়ালেখা করার দরকার নেই, বিয়ের পরে মা হওয়াটাই নারী জীবনের সার্থকতা’ এই ছিল বুবুর জীবন দর্শন।
তার দর্শন পরিবর্তন করা আমার সাধ্যের বাইরে ছিল। আমি চেষ্টা করে করে ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত বুবুর গল্পকথা শোনাতেই বেশি মনোযোগ দিতাম।
শায়লা বুবু একজন সুখী মানুষ ছিল। বাপের বাড়িতে সে আদরে-আহ্লাদে দিন কাটাতো আর বাজারের দোকানের ফোনে তার স্বামী কল করেছে শুনতে পেলে সীমাহীন আনন্দ নিয়ে ছুটে আমাদের বাড়িতে আসতো। সে নিজে কথা বলতো না, তার শ্বশুরই ছেলের সঙ্গে কথা বলতো। অথচ স্বামীর ফোন করার খবরটা বুবু এমনভাবে দিতো যেন সে নিজে সরাসরি তার সাথে কথা বলেছে। আবার কোনো কোনো দিন বুবু মন খারাপ করে আমাদের বাড়িতে আসতো। বুবু খোঁপায় বা হাতের বাজুতে তার শাশুড়ির দেওয়া রূপার তাবিজ দেখাতে দেখাতে বলতো, তার শাশুড়ি নাতির জন্য নাম ঠিক করে রেখেছে। বুবু দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বিদেশফেরত ছেলে নাতির হাত ধরে জুম্মার নামাজ পড়তে গেছে শাশুড়ির সেই স্বপ্নবৃত্তান্তও জানাতো।
শেষ পর্যন্ত শায়লা বুবুর ছেলে সন্তান হয়নি, মেয়েই হয়েছিল। কিন্তু শায়লা বুবু বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। গ্রাম্য দাইয়ের দক্ষ হাতে বুবুর সন্তান ভূমিষ্ট হলেও বুবু মারা যায়। নিজের সন্তানকে একনজর দেখার সৌভাগ্যও বুবুর হয়নি। বুবুর সদ্য ভূমিষ্ট মেয়ের মায়া ভরা মুখ দেখে আমার বুক কেঁপে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, সেদিন আরেক নূরের জন্ম হয়েছিল তাই পৃথিবীর কেউ তাকে কোনো সাদর সম্ভাষণ জানায়নি।
যেদিন বুবু মারা যায় সেদিন দুপুরবেলাতেও বুবু দিব্যি আমার সাথে কৎবেল ভর্তা ভাগাভাগি করে খেয়েছিল। মেয়ের নাম শায়লার সাথে মিলিয়ে লায়লা রাখবে সেই গল্পও করে গিয়েছিল। উঠানে পা ছড়িয়ে বসে মামীর কাছ থেকে শুনেছিল আঁতুড়ঘরে লোহার শিক রাখার বদলে পেরেক রাখলেও চলে। মামী অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতো বুবুকে নানান শলা-পরামর্শ দিচ্ছিল, বুবু কী খাবে, কী খাবে না, কোন কাত হয়ে ঘুমাবে, অবেলার কোথায় যাবে না ইত্যাদি। আমি চোখ বড় বড় করে দুজনের কথোপকথন গিলছিলাম। মামী বুবুকে জ্ঞান বিতরণ করতে গিয়ে এত তন্ময় হয়েছিল যে আমার ধ্যানী মুখ তার নজরে পড়েনি। আমাকে গালমন্দ করতেও ভুলে গিয়েছিল।
আলাইবালাই তাড়ানোর বুদ্ধি নিতে নিতে শায়লা বুবু আমাকে বলেছিল,‘আমার কোনো কষ্ট নাই রে নূর। কষ্টটাও আইজকাল আনন্দের মতোন লাগে। মাইয়্যাডা যখন পেটের মদ্দে লাথি মারে তহন কী যে আনন্দ লাগে রে! অমন কষ্ট কষ্ট আনন্দ আমি জীবনে পাই নাই রে।’বলতে বলতে বুবুর চোখ ছলছল করে উঠেছিল। সতৃষ্ণ চোখে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘গেদি হইব তুমি কি তা জানো বুবু?’
‘হ, জানি।’
‘আজব ঘটনা!’
‘আমি স্বপ্নে দেখছি। আমার ফুলের মতোন নরম তুলতুলা মাইয়্যাডা আমার গলা জড়ায় আছে।’আমি তখন দস্যি মেয়ের মত খুব হেসেছিলাম।
‘তোমার শাশুড়ি মা-ও তো স্বপ্ন দেখছে। গ্যাদার স্বপ্ন!’
‘দেখুক, মাইয়্যাই আমার মনপছন্দ। মাইয়া হইল মায়ের জাত।’
‘মা হওয়া খুব কষ্টের না বুবু?’
‘না রে, দুনিয়াতে এর থেইকা সুখের আর কিছু নাই।’
শায়লা বুবুর বাবার আদি বাড়ি অন্য জেলায়। বুবুর কথায় চাটমোহরের টান নেই। কিন্তু স্বামী-সংসারের প্রতি তার টান ছিল খুব। আবার আমার মতো বাপ-খেদানি, ঠোঁট-তালুকাটা গেদির জন্য তার দুই চোখে স্বপ্নও ছিল। শায়লা বুবু আমাকে খুব সুন্দর একটা জীবনের লোভ দেখাতো। সেই লোভে পড়ে আমি বুবুর সাহচর্য তুমুল উপভোগ করতাম। ফাঁকফোকর খুঁজে বাড়িঘরের কাজকর্ম ফেলে বুবুর সাথে গল্প করতে বসে যেতাম। বুবু সর্ষে মাখানো কাঁচা আম খেতে খেতে বলতো, ‘তোরও একদিন অমন আনন্দ হইব রে! আমার মতোন তুইও একদিন মা হবি। একখান মাইয়া আরেকখান পোলাহইব তোর। তোর শাশুড়ি তোরে রাজকন্যা সাজায় রাখব।’
‘কী যে কও না বুবু!’
‘হ! তুইও একদিন স্বামী সোহাগে ঢলঢল হবি।’
বুবুর মুখে এসব শুনে শুনে আমি স্বপ্ন দেখার মতো ভুল করতাম। শায়লা বুবুর উঁচু পেট আর মুখের ঝলমলে হাসি দেখে আমারও মা হতে ইচ্ছা করতো। অমন উঁচু একটা পেট নিয়ে মাথা উঁচু করে দম্ভ নিয়ে হাঁটতে মন চাইতো। ক্ষণে ক্ষণে মাথা নিচু করে লাজুক স্বরে মুখরোচক খাবার খাওয়ার আহ্লাদী আবদার করতে ইচ্ছে হতো। বুবু আমার মতিগতি দেখে আনন্দ পেত খুব। নিজের সুখের গল্প করতে করতে আমাকে সুখী হওয়ার বর দিতো। কিন্তু নিজেকে ভরপুর সুখী করার ভাবনার পূর্ণতার আগেই ভয়ে আমার বুক ফাঁকা হয়ে আসতো। মামীর হুংকার শুনে মনে পড়ে যেত আমার অতীত আর বর্তমানের সীমাবদ্ধতা। মনে পড়ে যেত, বাপ-খেদানি মেয়ের অমন স্বপ্ন দেখার ধৃষ্টতা করতে নেই।
বুবু আমাকে প্রবোধ দিতো। বলতো, এসব দিনের হিসাব একদিন ফুরিয়ে যাবে। দিনবদলের সাথে সাথে আমার জীবন আরও স্বপ্নরঙিন হবে। শায়লা বুবুর মৃত্যুর পর ক’দিন আমার খুব কষ্টে কেটেছে। তীব্র শোকে নিমজ্জিত হতে হতে আমি বার বার স্মৃতিতাড়িত হয়েছি। কিন্তু কী আজব ব্যাপার। বুবুর প্রস্থানের পর বুবুর চেয়ে আমার মাকেই বেশি মনে পড়তো। মায়ের মুখটা মনে পড়তো আর মায়ের শরীরের উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগতো। মা হওয়ার কষ্ট অনেক! মাকে দেখে মাতৃত্বের অনুভূতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাই একটা সময়ে প্রকট ছিল যা স্বল্পসময়ের জন্য শায়লা বুবু বদলে দিয়েছিল। বুবুর মৃত্যুর পর অতীতের বেদনাধূসর স্মৃতির গভীরতায় হাবুডুবু খেতে খেতে মুহূর্তের জন্য সাধ জাগতো, আমি আমার মায়ের মা হই। মায়ের পুরো জীবনের অপমান, শরীরের জ্বালা-যন্ত্রণা সব নিজের করে নিই। কিন্তু পারতাম না। আমার মাকে তো আমি প্রয়োজনের সময়েই পাইনি। আমার জীবনের অন্যতম অবলম্বন হয়ে কেবল মায়ের শরীরের ঘ্রাণই রয়ে গেছে। শায়লা বুবুর আশীর্বাদে ক্ষণিকের জন্য ধন্য যেই আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, একদিন আমার সংসার হবে, আমিও একদিন স্বামী সোহাগে ঢলঢল করবো সেই আমি তার মৃত্যুর পর চির চেনা আঁধারের গণ্ডিতে ফিরে গেলাম।
মৃত্যুশোকের মতো আর কোনো কষ্টের উপলব্ধি মানুষের জীবনে আছে কি না আমার জানা নেই। মৃত্যু ডাক দিলে একটা মানুষ হঠাৎ করে যেন অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়। সেলিনা আপা আর শায়লা বুবুও সেই আঁধারে হারিয়ে গেল। তাদের মৃত্যুর পর আমার জীবনের আনন্দআলো যেন ফুরিয়ে এলো। আমি বুঝে গেলাম, যতই খুঁজি আলোর রথ! আঁধারই যেন চির চেনা পথ!

উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- আট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *