উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- আট
উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা
৮.
কৈশোরে তুষার ছাড়া আরেকজনের প্রতি আমার দুর্নিবার আকষণ ছিল। মানুষটা আমার জীবনে না এলে বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে নেওয়ার কৌশল কখনও হয়তো আমার শেখাই হতো না। সেলিনা আপা নিজে খুব কুশলী মানুষ ছিলেন না। কিন্তু তার কথা ছিল ধারালো আর নিপুণ। আপার কথার জাল কেটে বের হওয়া সহজ ছিল না।
মনে আছে, আপার কথার জালে জড়িয়ে পড়েই মামা আমাকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। নাছোড়বান্দা আপা টানা সাত দিন বাড়িতে হামলা করেছিলেন। বাড়ির সবাইকে বুঝাতে চেয়েছিলেন, আমার মতো মেধাবী ছাত্রীর এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়া জরুরি। স্কুলের ঝরে পড়া মেয়েদের তালিকা থেকে নাম কাটানোর অহেতুক আবদারের জন্য আপা মামীর গালমন্দও শুনেছিলেন বিস্তর। কিন্ত সেলিনা আপা দমে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। মামীর কথার পিঠে যুক্তির পর যুক্তি দিয়ে মামীকে আপা বেকায়দায় ফেলে দিতেন। আপা আমাদের বাংলা পড়াতেন। আমার আজও আপার ছাইরঙা মেঘের মতো মুখটা স্পষ্ট মনে আছে। আপা যখন হাসতেন তখন কী যে সুন্দর দেখাতো আপাকে!
নানি আপাকে দেখলেই নিচু গলায় বলতো, ‘আবিয়াইত্তা গেদি।’ পাড়ার লোকেরাও আড়ালে আপাকে নিয়ে নানা কথা বলত। আমরা জানতাম কালো বলে আপার জন্য কখনও ভালো ঘর, বর আসেনি। কিন্তু আপা এসব পরোয়া করতেন বলে মনে হতো না।
একবার সেলিনা আপার উদ্যোগে আমাদের স্কুলে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। আপা আমাদের স্কুলে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কোনো বিনোদনমূলক বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হতো না। অবশ্য বছরে একবার কুরআন পাঠ বা হামদ-নাত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। ক্লাসের কিছু চেনা মুখ তেল চুপচুপে লাজুক চেহারা নিয়ে স্যার-আপাদের সামনে দুলে দুলে গাইতো,
‘মনে বড় আশা ছিল যাবো মদীনায়…তোরা দেখে যা মা আমিনার কোলে…।’
আমরা বিপুল উল্লাসে সেই ভুবন ভোলানো গান শুনে স্যারদের বারণ সত্ত্বেও করতালি দিতাম। কিন্তু সেবার সেলিনা আপা খুব দৌড়াদৌড়ি করে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছিলেন। লাজলজ্জা ভেঙে কিছু মেয়ে সুরে-বেসুরে দেশাত্ববোধক গান গেয়েছিল। আর অনুষ্ঠানের আয়োজক সেলিনা আপা মাঠভরা শ্রোতাদের সামনে গেয়েছিলেন, আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে/এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে/আমার এই দেহখানি তুলে ধরো/তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো।
মনে পড়ে, সেদিন আমি থির হয়ে আপার গান শুনেছিলাম। গড়পরতা জীবনে বেড়ে ওঠা আমার রবীন্দ্রসঙ্গীতের মর্মার্থ বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা তখন ছিল না। তবু সেই গান আমার জীবনে ছিল একটা স্ফুলিঙ্গের মতো। এরপর সময়ে অসময়ে কত দিন যে আপার কণ্ঠের সেই মধুর গান কানের কাছে বেজেছে তার কোনো হিসাব নেই।
এই ছিল আমার সেলিনা আপা। যিনি জাদুমন্ত্রে আমার দুইটা হাতকে দুইটা ডানা করে দিয়েছিলেন। এরপর এক ঝটকায় আমাকে উঁচু থেকে ছেড়ে দিয়েছেন আর আমি উড়তে শুরু করেছি।
সেলিনা আপাকে বাড়ির উঠানে পা রাখতে দেখলেই মামী আমাকে লবণ বা মরিচ আনার ছুতোয় শায়লা বুবুর বাড়ি পাঠিয়ে দিতো। সেলিনা আপা তবু ছিনে জোঁকের মতো আমার পিছনে লেগে থাকতো। একদিন আপা মামীকে উপেক্ষা করে মামার সম্মতি নিয়ে আমাকে স্কুলে নিয়ে গেল। পরে তা নিয়ে বাড়িতে হুলস্থ’ল হয়েছিল। মামীর মুখে হাজার গালমন্দ শুনেও মামা মাথা নিচু করে থেকেছে আর আমাকে চুপিচুপি বলেছে, ‘তোর মামীর কথায় কান দেওয়ার কাম নাই। আমার মতো ঠ্যাটা মাইরা পইড়া থাক।’
মামার কথা শুনে আমিও ঠ্যাটা মেরে পড়ে থাকতাম। মামীর গালমন্দ কানে না তুলে পড়ালেখায় মন দিতাম। আমার স্কুলে যাতায়াত তুষারের সঙ্গে সাক্ষাতের অবাধ সুযোগ করে দিয়েছিল। কী এক আনন্দের বয়সই না ছিল তখন! পথে দেরি করার আনন্দ কত যে অবারিত সুখ দিতো! ফিরতি পথে মাঝে মাঝে দুজনে ঘুড়ির মতো উড়তাম। কী করে ভালোবাসতে হয় তা বুঝতাম না তখনও। শুধু বুঝতাম যতদূর পর্যন্ত সবুজ দেখা যায় ততদূর পর্যন্ত আনন্দে ছুটে বেড়ানোর নামই ভালোবাসা।
অমন আনন্দের কালে তুষার ছিল আমার শিক্ষক আর আমি ছিলাম ওর অনুগত ছাত্রী। তুষারের কাছে মনোযোগী আমি আমার কৈশোরের আনন্দপাঠ নিতাম। আমরা দুজনই জানতাম আমাদের ভালোবাসামুখর সময়টুকু মামীর নজরে পড়তে দেওয়া চলবে না।
পড়ায় মন বসানো কঠিন হলেও একদিন আমি এস.এস.সি পাস করে ফেললাম। যেদিন আমার পরীক্ষার রেজাল্ট দেয় সেদিন মামীর ঠোঁটের কোণেও আমি হাসি দেখেছি। মামী কি খুশি হয়েছিল? নাকি তাচ্ছিল্যে হেসেছিল? তাই হয়তো আমার কলেজে ভর্তি হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না। তবু আমি স্কুলের পাট চুকিয়ে কলেজে ভর্তির জন্য মামীর আনুকূল্যের আশায় তাকিয়ে ছিলাম।
তুষার আর আমার ছুটোছুটি তখন অনেকটা কমে এসেছে। মামীর নজরবন্দিতে থেকে ছটফটানির বদলে আমরা তখন স্থির শান্ত জলের মতো আমাদের বড় হওয়া উপভোগ করতে শিখে গিয়েছি। সামান্য দৃষ্টি বিনিময়ে আমরা নিজেদের না বলা গোপন কথা বলতেও শিখেছি। কিন্তু মামী ঠিকই কৌশল করে আমার পায়ে শিকল পরিয়েছিল। ঘরের কাজের ব্যস্ততায় বাহিরমুখী হওয়ার সুযোগ পেতাম না। তুষারও শহরে চলে গিয়েছিল। কলেজে ভর্তি হয়েছিল। সেখানে ওর নিজের মামার বাসায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। আমি চাইলেই ওর দেখা পেতাম না। আহা ঐ সময়ে কত আকুলতা নিয়ে যে আমি তুষারের বাড়ি ফেরার দিনের জন্য অপেক্ষা করতাম!
সপ্তাহে অন্তত দুই বার তুষার বাড়ি আসতো। মামী তুষারকে নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকত যে আমি ওকে একা পেতাম না। মামীর রক্তচক্ষুর ভয়ে তুষার বাড়িতে এলে সহজে ওর সামনেও যেতাম না। বুকের তীরে বাঁধ দেওয়ার হাতেখড়ি তো আমার শৈশব থেকেই হয়েছে। ততদিনে এই কাজে আমি দক্ষতাও অর্জন করেছি। সেদিন তুষার আসার কথা। আমি যেই কাজে হাত দিচ্ছি তাতেই ভুল হয়ে যাচ্ছে। এর ওপরে নানির বিলাপ শুনতে শুনতে বার বার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলাম।
‘গেদিটাক বান্দি বানায় রাখছে রে। অভিশাপ লাগবো। অভিশাপে সব ধংস হবিনি।’
মামী নিজের ধ্বংস ঠেকানোর জন্য কি না জানি না, আমার ধ্বংস ঠেকানোর জন্য নতুন ঘর খুঁজছিল। কিন্তু বাপ-খেদানি মেয়ের জন্য ঘর-বর পাওয়া তো সহজ ছিল না। আমাকে বিয়ে করতে এলে সবকিছুর আগে আমার রক্তের ধারার খোঁজ নেওয়াও জরুরি ছিল। মামীর চেষ্টার তবু কমতি ছিল না। এই চেষ্টাতে নানি প্রতিবার পানি ঢেলে দিতেন। থেকে থেকে নানির হুংকার শোনা যেত, ‘যাগোর গেদি হেগোরে বিয়া দিতে দে’ এদিকে যদিও মামীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস মামার ছিল না তবু মামা মৃদুস্বরে প্রতিবাদ করতো।
বুঝতাম, এই ঘরের মেয়ে আমি না। যেই মাটি-কাদা শরীরে মেখে বড় হয়েছি, যেই মাটি আমার সর্বস্ব জুড়ে ছিল সেই মাটি আমার না। বরং ফেলে আসা বাপের ঘরই আমার আসল ঠিকানা। গৃহবন্দি সময় কাটানোই তখন মুশকিল ছিল। সেলিনা আপার মতো কেউ আমাকে উদ্ধার করতে আসবে সেই আশায় পথ চেয়ে থাকতে থাকতে একদিন খবর পেলাম, সেলিনা আপা আত্মহত্যা করেছে। ঢাকা শহরে পড়তে গিয়ে আপা আর গ্রামে ফিরে আসেনি। গ্রামে মাটি হয়নি আপার। গ্রামের মোল্লাদের ফতোয়ার কারণে আত্মহত্যায় মড়ার কবর হবে না জানার পর সেলিনা আপার বাবা সপরিবারে ঢাকায় চলে গিয়েছিল। আপার মৃত্যুর সংবাদে আমি হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। যেই মানুষটা আমাদের আলোতে আনতে চেয়েছিল সেই মানুষটা নিজে কেন আঁধারকে আলিঙ্গন করেছিল, তার রহস্য কোনোদিন পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে। দীর্ঘদিন কথার ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে গ্রামের আর সবার মতো আমিও সেলিনা আপাকে ভুলে যেতে শুরু করেছিলাম। হঠাৎ একদিন ঘর গোছাতে গিয়ে আপার লাইব্রেরির দুইটা বই পেয়েছিলাম, মনে পড়েছিল
রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ আর ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ বই দুইটা ফেরত দিবো দিবো ভেবেও কী করে যেন আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
গ্রামের কাদা-মাটির সরল ছাঁচে বেড়ে ওঠা মেয়েদের জীবনে সেলিনা আপা জাদুকরের মতো ছিলেন। তার জাদুস্পর্শে প্রথম আমার অন্তরচক্ষু খুলেছে। আগে ভাবতাম এই বেণীপথ, মাটি, ফসল, বিল, নদী, আকাশ আর ঘাসফুলের শোভাই পৃথিবী। কিন্তু সেলিনা আপার কারণে চোখ মেলে পৃথিবীর ভেতর আরেক পৃথিবী দেখেছি। যেই পৃথিবীতে মেয়েদের মাথা উঁচু করে থাকতে হয়, নিজের জিনিস নিজেকেই আদায় করে নিতে হয়। আপা বার বার বলতেন, ‘পড়ালেখা ছাড়া এই সমাজে মেয়েদের দুই পয়সার দাম নেই।’ তাই আপা আমার মতো পরের বাড়ির আশ্রিতাকে সমাজের ভেতর দামী করে তোলার চেষ্টায় ব্যাকুল ছিলেন। কিন্তু জীবনের কী অদ্ভুত হিসাব! সব বিস্মৃত হয়ে আপা তার দামী জীবনটা নিজেই শেষ করলেন! প্রত্যেকটা মানুষ পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পর বুকে একটা ক্ষত তৈরি হয়। সেই ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার জন্য থাকে শুধু চোখের পানি। ধীরে ধীরে ক্ষতের গভীরতা কমে গেলে মানুষটার জন্য চোখের পানিও ফুরিয়ে যায়। তারপর আবার নতুন কারও জন্য নতুন কোনো ক্ষত তৈরি হয়। কিন্তু এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো থেকে যায় স্মৃতির পালক হয়ে। আবার কারও কারও সান্নিধ্যে কাটানো স্বল্পকালীন সময়ও জীবনের পথ চলায় পরম দামী হয়ে ওঠে। কারণ তারা পৃথিবী থেকে নীরবে চলে যায় ঠিকই কিন্তু অন্যের জীবনে রেখে যায় গভীর ছাপ। তাই কোনো স্মৃতিমেদুর অবসরে পিছন ফিরে তাকাতে গেলে তাদের কথা মনে করে অশেষ কৃতজ্ঞতায় নতজানু হতে হয়। আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখে নীরবে প্রস্থান করা সেই মানুষের নাম সেলিনা আপা।
