উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব-এগারো
উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা
১১.
আঁধারের রঙ বরাবর আমাকে নিষ্ঠুর শত্রুর মতো ঘিরে থাকে। আমি সেই আঁধারে থই হারিয়ে পর্যুদস্ত না হওয়া পর্যন্ত ঐ শত্রুর মনে কোনো শান্তি থাকে না। তাই আমি যখন ফের তুষারের ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে সুখের কুচকাওয়াজে সামিল হয়েছি তখনই অলক্ষ্যে থাকা কেউ একজন আমার সুখটুকু কেড়ে নিয়ে আমাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য সুনিপুণভাবে ছক তৈরি করেছে। আমার জীবন থেকে তুষারকে সরিয়ে নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, জীবনের অমল আলো আমার জন্য নয়।
তুষারের মৃত্যুর পর থেকে বাড়িতে শ্বাস নেওয়ার মতো কোনো বায়বীয় পদার্থের উপস্থিতি ছিল না। পুরো বাড়িঘর জুড়ে তুষার তুষার গন্ধ নিথর হয়ে জমে থাকতো। কেমন একটা বোধহীন অস্বস্তি আচ্ছন্ন করে রাখতো সব সময়। অথচ তুষার যেদিন মারা গেল সেদিন আমি কাঁদিনি। তুষারের নিথর শরীরের ওপরে আছড়ে পড়ে বিলাপ করে মামী কেঁদেছিল। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে মামা অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় তুষারের লাশ বাড়ি পৌঁছানোর আগেই মামাকে শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাড়ির উঠানে তুষারের লাশ নিয়ে ভ্যান এসে দাঁড়াতেই গ্রাম ভেঙে মানুষ জড়ো হয়েছিল।
আমি কলতলায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে তুষারকে দেখছিলাম। ওর পরনে হলুদ গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট ছিল। ঢ্যাঙ্গা গড়নের তুষারের মাথাটা ছিল বড় বেখাপ্পা। সেই বড় মাথায় ছিল কুচকুচে কালো চুল। মৃত তুষারের চোখ জোড়া বন্ধ ছিল। মৃত মানুষের সাথে ঘুমন্ত মানুষের সাদৃশ্য থাকার কথা। কিন্তু কেমন যে বেদনার্ত ছিল তুষারের মুখটা! মৃত্যুর সময় কি খুব কষ্ট পেয়েছিল ও? যেখানে আমার মরে যাওয়ার কথা ছিল সেখানে আমার বদলে তুষার কেন চলে গেল! এ কোন সমীকরণ!
সকালে বের হওয়ার সময় তুষার আমাকে ইশারা করেছিল, বুঝিয়েছিল আমি যেন হিজলতলায় যাই। কিন্তু সেদিন তুষারের পিছু নেওয়ার ফুরসৎ মামী আমাকে দেয়নি। মামীর উপর নিষ্ফল ক্রোধ দেখিয়ে আমি কচি কচি ঢেঁড়স কুচি কুচি করে কাটছিলাম আর আপনমনে বকছিলাম। সবজি কাটা শেষ না হতেই মামী আমাকে চাল ঝাড়তে দিয়েছিল। ভয়ে ভয়ে মামীর দিকে তাকিয়ে বার বার ভেবেছি, এখনই অনুমতি চেয়ে নিই। কিন্তু মামীর চোখ বলছিল, অপ্রত্যাশিত যে কোনো আবদারে কুরুক্ষেত্র ঘটবে। হয়তো ডালে চালে মিলিয়ে এনে বলবে, নে সব খুঁটে আলাদা কর।
সেদিন দুরন্ত তুষার উত্তর পাড়ার ছেলেদের সাথে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়েছিল। আমার জন্য পুকুরপাড়ে হিজলতলায় অপেক্ষায় থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে ও হয়তো নিজের মতো সময় কাটাতে চেয়েছিল। আনন্দে হুল্লোড়ে বন্ধুদের কাছ থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন তুষার খেয়ালই করেনি ওর পা কখন আলপথে পড়ে থাকা পল্লী বিদ্যুতের খুঁটির বিদ্যুৎতরঙ্গে জড়িয়েছে। আর সেদিনই তুষার বিদ্যুৎতরঙ্গের মতো আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। আহা! মৃত্যু কত পরাক্রমশালী! আমরা মেনেও মানি না। টের পেয়েও পাই না। অথচ মৃত্যুগন্ধ আমাদের শরীরেই লেগে থাকে। জীবনের সৌরভ দিয়ে আমরা সেই গন্ধ ঢেকে রাখি। তবু এর গন্ধের তীব্রতা সেই সৌরভ ছাপিয়ে একদিন ঠিকই আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নাগালের বাইরে নিয়ে যায় একেকটা প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষকে! মৃত্যু! কত অবশ্যম্ভাবী আর অজেয় শব্দ! একে একে সব মানুষকে মৃত্যুর কাছেই তো আত্মসমর্পণ করতে হয়!
তুষারের মৃত্যুতে বাড়ির সবাই একটা ধাক্কা খেয়েছিল। হঠাৎ করে তুষার নেই। তুষারের অস্তিত্ব নেই। মাটির নিচে ঘুমঘোরে তুষার বন্দি। একটা মানুষ, তার একটা শরীর…চোখের সামনে থেকে হুট করে মিলিয়ে গেল! একটা মানুষের স্মৃতির অস্তিত্ব কত দিনের? কত বছরের? জীবিত মানুষের জন্য একজন মৃত মানুষের অস্তিত্ব আমৃত্যু থাকার কথা। কিন্তু প্রতিক্রিয়াহীন আমাকে দেখে তখন বোঝার উপায় ছিল না, তুষার নামক কোনো মানুষ একটা সময়ে এই পৃথিবীতে ছিল। তুষার মারা যাওয়ার পর আমার দিনলিপির এই স্বাভাবিকতা মামীকে পর্যন্ত অবাক করতো। মামী বকা দেওয়ার আগেই আমি ঘরকন্নার কাজ করতাম। মামা মাঝেমাঝে আমাকে ডেকে তুষারের স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে কাঁদতেন। আমি নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতাম। মামার কান্নার তোড়ে আমার শরীরজুড়ে একটা বোধহীন শূন্যতা ছড়িয়ে পড়তো। সেই অনুভবের কথা আমি কাউকে ভেঙে বলতে পারতাম না। ধীর স্বরে মামাকে শুধু বলতাম, ‘তোমাকে চা বানায় দিই? সাথে মুড়ি মাখানো দিবো? খাবা?’
আমি বরাবরই এমন ছিলাম। নিজের কথাগুলো মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারতাম না। নিজের ক্ষতের গভীরতাও কাউকে দেখাতে পারতাম না। ফুপুজি বলতো আমার জ্ঞানবুদ্ধি আর দশজনের চেয়ে আলাদা। কিন্তু তুষারের অনুপস্থিতির ভার সামলে নেওয়ার শক্তি সেই সময়ে আমার ভেতরে কীভাবে এসেছিল, তা আমার জানা নেই। জীবনের কত যে রূপ! তুষার আর আমার আনন্দ থৈ থৈ দিনগুলো চোখের পলকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। আমি বুঝে গিয়েছিলাম, তুষার আর ফিরবে না।
আমার ঠোঁটের কাটা দাগে ওর হাতের উষ্ণ স্পর্শ আমি আর পাবো না। ও আমাকে আর কোনো দিনও বলবে না ‘নূর, তোরে আমি ভালোবাসি। ঠোঁট-তালুকাটাও ভালোবাসি, তোরে আমি খুব ভালোবাসি।’তুষার নেই…কোথাও নেই…তবু এই জগৎ-সংসারকে দেখানোর মতো কোনো শন্যতায় আমি ব্যাকুল হতাম না। ঘরবাড়ির কাজ করতে করতে কেবল টের পেতাম, আমার বুকের ভেতরে কোথায় যেন একটা ছিদ্র হয়ে গেছে, যার গভীরতা অতলস্পর্শী। আমার মনে আছে, আমি স্বাভাবিক থাকলেও মামীর অবিশ্রান্ত কান্নায় বাড়িঘর কেমন ভৌতিক হয়ে উঠতো।
প্রতিটা মুহূর্তে সবাই মনে করতে বাধ্য হতো, এই বাড়িতে কেউ একজন নেই। শুধু আমি স্বার্থপরের মতো তুষারকে ভুলতে চাইতাম। একটা সময়ে ভুলেও গেলাম। তুষারের লম্বাটে মুখ আর স্বচ্ছ দুই চোখ আমার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এলো। আমার বুকের ভেতরটা হয়ে গেল অনুভূতিহীন। তুষারের প্রস্থানে সত্যি চোখের এক ফোঁটা পানিও আমি খরচ করিনি। কী জানি! হয়তো দুঃসহ বেদনায় ভারাক্রান্ত হতে হতে আমি সব বোধই হারিয়ে ফেলেছিলাম।
আসলে কিছু কিছু মানুষ জীবনভর পাতাচূর্ণ সুখস্মৃতি হয়ে থাকে। আবার কিছু মানুষ প্রিয় রাগ হয়ে গেঁথে থাকে মনের খেয়ালে। তাই মৃত্যুডাকে জাগতিক মায়া ছেড়ে তারা চিরতরে দূরে চলে গেলেও প্রিয় গল্পের মতো বুকসিন্দুকে বন্দি হয়ে রয়। ঠিক তেমনিভাবে তুষার চলে গেলেও ওর সাথে যাপিত জীবনের স্মৃতি জীবনের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য হয়ে আমার পায়ে পায়ে জড়িয়ে থাকে। আমি তা যত অগ্রাহ্য করি তত বাঁধা পড়ে যাই। কিশোরকালের প্রেমের স্মৃতিতে এইভাবে বাঁধা পড়ে থাকাই যেন আমার নিয়তির লিখন। দেখতে দেখতে আমার চলে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে।
যদিও চাটমোহর থেকে আমাকে তাড়ানোর জন্য তখন কারও কোনো ব্যস্ততা ছিল না। যার জন্য আমাকে এই বাড়ি থেকে দূর করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই যখন নেই তখন আমাকে নিয়ে আর কারও মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু আমার জন্য এই বাড়িতে থাকা সম্ভব ছিল না। তাই আমি স্বেচ্ছায় নিজের যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করেছিলাম। আমি যেদিন সোনারা গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য এই বাড়ির চৌকাঠ ডিঙালাম, মামী পিছু ডাকল, ‘তোক কি বেইমান ডাকবো? অত নূর নূর করতো আমার গ্যাদাটা, একটু কাঁদলি না তার জন্য! আসলে তুই তো বেইমানের জাত। রক্তই বেইমানের।’
বেইমানের রক্তে নীরব ভালোবাসার কল্লোলে ভাসতে ভাসতে নিরুত্তর আমি সামনে পা বাড়ালাম। অনেক দূরের পথ পেরিয়ে আমার বাপের বাড়ি। আমি পথ পেরিয়ে চললাম, পিছনে পড়ে রইল তুষারের আলিঙ্গনের উষ্ণতা আর আমার শৈশব-কৈশোরের মধুর স্মৃতি।
