ইলিয়াস ফারুকী’র কবিতা গুচ্ছ
১.
মিথ্যার স্বপ্নজাল
কঠিন সময় চোখের মনিতে যদি,
আনন্দে ব্যাকুল জীবন বহতা নদী
রোদেলা বন্যায় সোনালী শৈশব করে,
শাসনে সোহাগে নিমগ্ন সাধনা ঝরে।
সোনার কাঁকন পরা সাহসীরা পোড়ে
শাসক আর সোহাগীদের বাহুডোরে।
২.
শোক বদলে যায় আনন্দে
বাতাসে ইলশেগুঁড়ি শোক,
অচেনা দেয়াল তোলা মানুষেরা
সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
বরফ জমলেই হিমালয় হয়না
যার যায় সেই শুধু বোঝে হিমালয়ের রোদন,
এবং শোক বুঝতে বুঝতে পাথর হয়ে যায়।
হিজড়ারা হাততালি বাজালে বুঝতে হবে
এবার ঘোষণা হলো যুদ্ধ,
কিসের যুদ্ধ প্রেম না বিরহের!
নাগর যেন মরণপন চিমটি কাঁটে সুখের ঘোরে,
তেমনি নোনাজলের সরবতে স্বাগত জানিয়ে
শালা শালীরা মুখ টিপে হাসে চুপিসারে,
যুবরাজের পোশাক পরে তবু
জমিদারি হাতছাড়া হয়ে যায়।
৩.
প্রেম এবং প্রেমিকা
প্রেমকে প্রশ্ন করলাম
কেমন হতে চাও তুমি
সে উত্তরে বললো
হতে চাই কর্ষিত উৎকর্ষ ভুমি।
যেখানে থাকবে প্রেমের নোলক দোলা
আর কর্ষিত কষ্টের মধুর সিঞ্চন।
প্রেমিকা বিমোহিত উত্তর জেনে,
ব্যস্ত সময় কাটায় অনুভব লেনদেনে।
৪.
পাখি
পাখিদেরও আদালত বসে!
সারাদিনের ন্যায় অন্যায় প্রেম ভালোবাসার।
বিকেলে বিচার পর্বে ওরা মেনে নেয় ঘোষিত রায়,
এরপর রায় কার্যকর হয়ে তৎক্ষনাৎ
নিশ্চুপ ওরা মেনে নেয় শাস্তির বিধান।
সকল রায়ই কার্যকর হয়ে।
একটি রায় থমকে যায়,
যা কার্যকরে ওরা পুরো অসহায়।
ওরা তুলে রাখে সেই রায়,
হাসরের অপেক্ষায়!
সেই কাঠগড়ায় শুধু মানুষ দাড়ায়।
৫.
প্রশ্ন
এক পাগল প্রশ্ন করে
‘বল-তো কে, সারাজীবন হাসে দাঁত কেলিয়ে!’
জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, মন্ত্রী শাস্ত্রী সবাই খোঁজে উত্তর।
অনেক বৈঠক হয়ে, আলোচনা চলে
চা, নাস্তা কিংবা লাঞ্চ ডিনারও চলে
দিন আর রাত পার হয়ে যায়
তবুও উত্তর পাওয়া হয়ে যায় দুরাশা।
হঠাৎ একজন মাহুত প্রশ্ন শুনে বলে হায়!
এতো অতি সহজেই বলে দেয়া যায়,
দেখোনা আমার হাতি সারাজীবন দাঁত কেলায়।
এবার মাহুত প্রশ্ন করে, বলে
‘বল-তো দেখি নিষ্ঠুরতায় কোন প্রানী সর্বাগ্রে দাড়ায়!’
পাগল হাসে, বলে নিজের হাতে রেখে অঙ্কুশ
প্রশ্ন করিস, নিষ্ঠুরতার কার বেশি দায়!
৬.
লাটিম
মানুষ ঘুরছে, শব্দ ঘুরছে, ঘুরছে নগর বাউল
ধান্ধায় ঘুরছে রাতের রানী চমৎকার ফাউল,
বাবারা ঘুরেন সন্তানের আহার জোগাড়ে,
মায়েরাও দিনভর ঘুরছেন রসের ভাগাড়ে।
ব্যবসা ঘুরছে অর্থে শুধু অর্থের জোগানে
প্রেমিক ঘুরছে প্রেমিকার মর্তের বাগানে
ঘুরছে সবাই এখানে ওখানে মিথ্যার পিছনে
পৃথিবী ঘুরছে মানুষ ঘুরছে লাটিমের ঘুর্ণনে।
৭.
বেদনা
বেদনা হয় ওপথ চলতে ঠোকর খেলে,
বেদনা হয় ধারের টাকা ফেরৎ চাইলে,
বেদনা হয় মুচকি হাসির ফোঁড়ন খেলে,
বেদনা হয় হাসতে হাসতে বাঁকা কথায়,
বেদনা হয় প্রতিবেশীর দমক গাড়িতে,
সুন্দরীর অবজ্ঞাতে সুপ্ত তবু বেদনা-তো।
সব বেদনা কিচ্ছুনা প্রিয়তম আস্কারায়,
ঐ বেদনাই ভয়ংকর প্রিয়ার মৌনতায়।
৮.
অন্ধকার
কাকে খোঁজ তুমি নগরালয়, অতল মোহনায়
যাকে তুমি দেখোনি কোনদিন
যার ছায়াও আড়ালে ছিলো
বন্দর আব্বাসের পোতাশ্রয়।
ছায়ার ভিতরে বিস্ময়ের ঘোর
অস্পষ্ট কায়া হেঁটে বেড়ায়ে
আমাদের দেখলে অস্থিরতা কিলবিল করে
অস্তিত্বের খোঁজ গুম হয়ে যায়।
নীল তিমির করুণ কান্নার শব্দ
সকলে শুনতে পায় না।
যারা কষ্টের অন্ধকার চোখ মুছে মুক্তো ঝরায়
কেবল তারাই সুনিশ্চিত পাতাল নদীর সন্ধান পান।
৯.
ভিক্ষা
হঠাৎ দেখি,
নগরীর সোনাতলা বাস স্ট্যাণ্ডে এক ভিক্ষুক
চিৎকার করে চাইছে ভিক্ষা এই বলে,
‘হে আল্লাহ চক্ষু ভিক্ষা দাও।’
আমি তাজ্জব! বলে কী লোকটা
কৌতূহল মেটাতে কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম,
‘তোমার ডাগর দুচোখ দিব্বি মায়া হরিণের মতো,
তোমার দারুণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তবু তুমি চোখ ভিক্ষা চাও কেন।’
ভিক্ষুক আমাকে চমকে দিয়ে বললো,
‘বাবা পেট-তো ভরে যায় যেভাবেই হোক,
চোখ ভরেনা মোটেই, আমি ভরা চোখ সম্পদ চাই,
ওদের মতন যাদের ঘরে শুধু বাজে শানাই
যাদের কলমের যাদুতে জগৎ রোশনাই
তারা লা-জাওয়াব, ওদের কাছেই সব সোনা রোদ ধরা চাঁই।’
১০.
মুক্তির সনদ
জগৎ জুড়ে হাঁকডাক মুক্তির
শোষণ থেকে, শাসন থেকে
অলক্ষ্যে থাকা রুগ্ন ভাষণ থেকে
জোচ্চুরি আর জুয়াড়ি থেকে
বল্গাহীন সমাজতন্ত্র থেকে
এক চোখা গনতন্ত্র থেকে।
ঘুমহীন রাত থেকে
কিংবা চুমোহীন প্রেম থেকে।
ক্ষমতায় বসা সৈরসাশক থেকে।
বেয়াদব গাড়ি চালক থেকে।
নদীর ভাঙ্গন থেকে,
অর্থের বিনিময়ে প্রেম থেকে।
নারীর প্রেমহীন আলিঙ্গন থেকে।
১১.
মুক্তি
নরক আগুন থেকে উড়ে মুক্ত ঘুড়ি
আকাশে উড়াল দিতে চায় মেরে তুড়ি
ভেঙ্গে যায় ভুলভাল বুঝাবুঝি, ক্ষত
শেষ হোক প্রতারণার দ্বৌরত মত।
জীবনটা স্বাদহীন বিষাক্ত ফল না।
হৃদয়ে গভীরে থাকে মুক্তির দ্যোতনা।
রমল করার মতো হেঁটে চলে যায়।
মানুষ বোঝেনা কোথায় তাহার দায়।
ধার করা দমে চলে জীবন যৌবন
তবু কত ঠাট বাট নর্তন কুন্দন।
১২.
মুখোশধারী বীর
জাতীয় স্মৃতি সৌধ থেকে রাশিয়ার দ্য মাদারল্যাণ্ড কলস,
কিংবা স্ট্যাচু অব লিবার্টি থেকে আইফেল টাওয়ার
সকল অর্জন ম্লান হয়ে যায়,
আফসোস হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়,
কান্নার দমকে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠে,
তারপর তীত চুমু খেয়ে হুঁশ ফিরে আসে।
হুশিয়ারি পাই নিজের ভেতর থেকে
সতর্ক সংকেত বাজে নার্ভাসতন্ত্রে
এবং জীবনের ক্ষণ ক্ষীন হতে হতে সটান দাঁড়িয়ে যায়।
রাত বিরাতে একাকী নাগর ইচ্ছে পূরণের দ্বন্দ্বে
বেওয়ারিশ লাশ হওয়া যাবে না।
তারপরও তক্ষকরা বসে থাকে না,
অনেক বিজাতীয়রা তক্কে তক্কে থাকে,
অভিজাত ড্রইং রুমেও থাকে ভদ্র মুখোশধারী।
১৩.
বর্ষা
সাদা পুতি ঝিরিঝিরি ছন্দের দোলক,
অবিরাম ঝরে যায় শ্রাবণী পুলক।
বেতুন ঝোপের ঝাড়ে সোনালী বিকেল,
সোঁদা মাঠ, সোঁদা ধান রূপালী নিকেল।
রোদের চাদরে লাগে রূপ সমাহার,
রঙধনু অলঙ্কার আকাশ মালার।
ভেজা শাখে ভেজা কাক শোক করে কার,
বৃষ্টি ভেজা পাতাগুলো তার অলঙ্কার।
ভিষণ বৃষ্টিতে লাগে উম উম ধারা,
গরম খিচুড়ি আর ভাজা মন কাড়া।
১৪.
অভিশাপ
ক্যকটাস সময়, না হাসে, না হাসতে দেয়,
নগর কোতওয়াল সিঁটি বাজায় সতর্ক সংকেতে
ফেরী করা সুখ অর্থের বিনিময়ে নাগরিক সুবিধা দেয়।
সাতকড়া প্রেম ভাগাভাগি হয়ে যায়
কারো ভালো লাগে, কেউ এড়িয়ে যাওয়া পছন্দ করে
তবু্ও সাতকড়ার ঘ্রাণ নিয়ে শরতের দূত অপেক্ষায় থাকে!
জীবন শৈত্য প্রবাহে থেমে থাকে,
নিকটের ভুলগুলো তড়িৎ শুধরানো যায়, কিন্তু
পেছনের ভুলগুলো অভিশাপ হয়ে ঝুলে থাকে,
জীবনের পরতে পরতে।
১৫.
নির্বাক
নিজেকে অস্বস্তিতে খুঁজে পাই,
নৈঃশব্দ্যের পাথর চেপে বসে মননে,
প্রমান নিশ্চিহ্ন করতে বরফের ছুরি চালিয়ে
সুপরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয় মানবতা!
বেশ্যাদেরও বিশ্রাম দিবস থাকে।
ওরা বেশ্যার পোশাক ঝেড়েও কুড়িয়ে নেয় ইতিহাস,
তারপর খোলা বাজারে নিলামে তোলে!
এইসব দেখে দেখে শুদ্ধ শরীরাও স্তব্ধ হয়ে যায়,
আর তার ক্ষণগুলো বিমুঢ় হতে হতে,
নির্বাক হয়ে যায় জীবন ধাঁধায়।
১৬.
দেয়াল
সুন্দরী এক কন্যা ছিল,
নদী তার বন্ধু ছিল, পাড় ছিল তার সখা,
নদীতে ঢেউ ছিল, গুঞ্জন ছিল হাওয়ার,
যুবকের কলতান ছিল,
মন ভোলা গান ছিল,
আবেগের টান ছিল,
এবং কন্যার অভিমান ছিল।
জীবন বাস্তবে হয়ে গেল ব্যস্ত,
কন্যাও জানিনা কোথায় হারাল,
নদীও হারালো তার দূরন্ত যৌবন,
বন্ধু গেল, ছন্দ গেল কালের কোঠরে,
তারপর একে একে সব চলে গেল,
ধিরে ধিরে সময়, দেয়াল তুলে দিল।
১৭.
নিলামের জল
কেন জানি মনে হলো আজ শুক্রবার,
বাসার সকলে শব্দহীন কথা বলছে
কারো যেন ঘুম না ভেঙ্গে যায়,
ছুটির নিদ্রার নুন না ছুটে যায়।
আজ শুক্রবার নিলামের জলে ভেসে যাবো,
হৃদয়ের আমেজগুলো সব আনন্দে বয়ে বেড়াবো।
