উপন্যাস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চৌদ্দ 

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব দুই

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চার

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পাঁচ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ছয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব সাত

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর আট

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর নয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর দশ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর এগারো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব তেরো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চৌদ্দ 

১৪   

কার্তিকের খুব কুয়াশা আলো ছড়ায় দুধ ধানের ডগায়। আর অন্ধকার থাকতে হিন্দু বউগুলি গাইস্যা দিতে যায় বর্গাচাষের জমির আলে। বিশেষ কিছু না, সামান্য নারকেল কোরা, একটা করে কবরী কলা আর এক মুঠো ভিজানো চিড়া। শুদ্ধ কাপড় পরে মাথায় মস্ত সিঁদুর দিয়ে ওই অন্ধকারেই জমির আলে গাইস্যা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সত্যি কথা হলো দুর্ভিক্ষের ছোবলের পর গত ৫/৬ টা বছরে বউ হারানোরা যারা বউ খরিদ করতে পেরেছে তারাই যায় অন্নদেবীকে তুষ্ট করতে। বউগুলি বড়ো লক্ষ্মী, এমনকি কার্তিকে বড়ো আকালের সময়ও বাড়ির গেরস্থের গাইস্যার খরচ বহন করতে হয় না, তারাই বন্দোবস্ত করে রাখে।

এখন এই ভোরে আমেনাবিবিকে খবর দেয়া হয় নাই, সরকারবাড়ির আর কাউকে জাগিয়েও তোলা হয় নাই। ওমর সরকার জেগে উঠে অজুর প্রস্তুতি নিতে নিতে হাবা অজুর বদনা এগিয়ে দেয়। যদিও হাবার এই হঠাৎ কর্মস্পৃহা অবাক হওয়ার মতো তথাপি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করে না সরকার। কিন্তু হাবা জানায়, প্রসব বেদনায় চূড়ান্ত ছটফট করছে ছোটবউ, দাই ডাকার আগেই হয়তো কিছু হয়ে যাবে। ওমর সরকার চঞ্চল হয়ে উঠে ঘরের দিকে রওয়ানা দেয় অজু না করে। কিন্তু নিজের চেনা জানা উঠান হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়, কামিনিগাছের গুড়িটায় হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে উঠানে। কষ্ট করে উঠতে উঠতে কুদ্দুসের ঘরের দিকে তাকিয়ে আবার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। কীভাবে আমেনাবিবি টের পেল কী জানি, সেও এসে দরোজা খুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকায় সরকারের দিকে। আর সকলের প্রশ্নের উত্তর দিতে কাবান্নি ঘর থেকে বেরিয়ে বলে ওঠে, আসমানের চাঁন্দের মত মাইয়্যা অইছে!

আমেনাবিবি ছোটে চন্দ্রভানুর ঘরের দিকে আর সরকারও অজুর বদনা হাতে নিয়ে পাকা শানবাঁধানো পিড়ায় উঠে যায়। আবছা অন্ধকারেও সরকারের তৃপ্ত চেহারাটা দেখতে পায় হাবা। ছেলে হলে সরকার কি এখন আজান দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিত!
ঝকঝকে রুপার মত এক বিন্দু মেয়ে, যথার্থই চন্দ্রভানুর মেয়ে যেমন হওয়া উচিত। আমেনাবিবি হারিকেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাতনির মুখ-হাত-পা-পেট-লিঙ্গ দেখে। পাশেই রক্ত ভেজা ন্যাকড়া, রক্ত মোছা শেষে করে কাবান্নি এখন কোথায় গেল! তারপর তাকিয়ে দেখে মেঝের পাটিতে কাত হয়ে শুয়ে আছে চন্দ্রভানু। সারা বিছানা তখন রক্তে ভাসছে, আহারে বউটা কত কষ্ট পেল অথচ আমি কিছুই জানতে পারলাম না! এবার যেন আমেনাবিবি একটু বিরক্ত, দাই বেটিকে কেন খবর দিচ্ছে না, চন্দ্রকে কখন পরিষ্কার করবে! কাবান্নিটা গেলো কোথায়!

কাবান্নি ফেরে সহসাই, হাসি হাসি মুখ করে বলে, ফুলডা গাইড়া আইলাম উত্তরধারে, এহনই সাফসুতরা করুম।
আমেনাবিবি বিরক্ত হয়ে বলে, ভাওলচকের দাইরে খবর দে, তুই একলা কয়ডা করবি! খাইদ্য পইথ্য ছেকাছেকি, কত কাম!
কাবান্নি শশব্যস্ত হয়ে বলে, খবর দিছি আইয়া পড়ব। আমেনাবিবি কপাল কুচকে কপট বিরক্ত নিয়ে দেখে কাবান্নিই চন্দ্রকে পরিষ্কার করার কাজে নেমে পড়েছে। কামারকারা থেকে আসা কাজের লোকগুলো ঘরে ঢুকতে পারে না বলে বাইরে থেকে গরমপানি আগুন জোগান দেয় আর রান্নাবান্নার দায়িত্ব নেয়।
দুপুর নাগাদ ঘোষেরা নৌকা বোঝাই মিষ্টি নিয়ে হাজির। উঠান ভরে যায় মিষ্টি, দই আর ক্ষীরের হাড়িতে; হাটে গঞ্জে মিষ্টি যাবার আগেই খবর দেয়া হয়েছিল সকাল সকাল।
বিকালের দৃশ্যটা বড়োই মনোরম, মানুষ দক্ষিণধার দিয়ে যায় আর একটা করে রসগোল্লা পায় হাতে। চন্দুভানুর ঘরে যায় ছানার মিষ্টি, টিন ভরা চিড়া ভাজা, ঝালের নাড়ু। আর দুষ্ট দৃষ্টি ঠেকানোর জন্য আইল্যা ভরা আগুন, লোহা আর রসুন ঘরের ভিতর চারধারে।

সকাল হতে না হতে চন্দ্রভানুকে খেতে হয়েছে কালিজিড়া আর গোলমরিচের ভর্তা, কাঁচাকলার ঝোল, মুরগির ঝোল সঙ্গে গরম ধোঁয়া ওঠা নরম ভাত। ধোঁয়া ওঠা ভাত খেয়ে চন্দ্রভানু নবজাতকের ছুঁচাল নখগুলোতে ফুঁ দিলে তা ঝুরঝুর ঝরে পড়তে থাকবে, সতীসাধ্বীদের যেমন হয় … আর যদিও কার্তিক, আকাশে রোদ থাকবেই, তবু ভালো করে চুল বেঁধে যখন জানালার কবাট খুলবে তখন একবিন্দু মেঘও আকাশ থেকে সরে গিয়ে সূর্য্য খলখল করে হেসে উঠবে; নবজাতকের কাঁথাকাপড় শুকাতে ঝলমলে রোদ খুব দরকার যে। প্রসূতির সেবায়ও বহু আয়োজন, আমেনাবিবির নির্দেশানুযায়ী সারাদিন চিবাতে হয়েছে ভাজাচিড়া আর ঝালেরনাড়ু। যত শুকনা জিনিস খাবে তত শরীর শুকাবে, গায়ের অতিরিক্ত পানি শুকিয়ে শরীর হবে ঝরঝরে টানটান।

বিকালে কামারকারা থেকে আসে এক চাচা, সঙ্গে আসে একমন মিষ্টি আর দুইটা খাসি। উঠানের একপাশে বড়ো করে চুলা কাটা হয়, সন্ধ্যায় খাসি জবাই হবে, কুটুম সকালেই ফিরে যাবে, শহরে সে মোক্তারি করে, সরকার যতই অনুরোধ করুক থাকার তার অবকাশ নাই।
আর গ্রামের লোক মিষ্টি খায় দফায় দফায় কিন্তু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে সবাই যে বাড়ি ফেরে এমনও তো নয়। প্লাবনসমভূমি জোয়ারভাটার দেশের লোকের মনের ভাব বদলায় ক্ষণে ক্ষণে। পীরসাহেব আর বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া রজবও বুঝি ভেসে ভেসে ওঠে কখনো কোন কোন কথার আড়ে। সেখানে যে যা ভাবে ভাবুক তাতে সরকারদেও কোন কালেই কিছু যায় আসেনি আর সরকারদের বাড়িতে আজ বড়ো আনন্দ, সে আনন্দে দু’একজন শরিক হতে চাইলেও আজ তাদের আপত্তি থাকার কথা না।

কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ সমস্ত গ্রাম এক বিরুদ্ধ মনোভঙ্গি ধারণ করে। নবজাতককে দেখতে এসে যারা হাসি হাসি মুখ করে ফিরেছে তারা এখন ঘরের কানচিতে দাঁড়িয়ে ফিশ্ফিশ্ করে,

 — হায় আল্লা এইডা কী কন! কতাডা কি হাচা?
— হাচা মিছা জানি না, তয় সবাই এইডা নিয়া জল্পনাকল্পনা করতাছে।

জল্পনাকল্পনা অথবা বাস্তব সত্য যাই হোক, কার সাধ্য ওমর সরকারকে এ কথা জানাতে যায়। কিন্তু রাতে মাস্টারবাড়ি পর্যন্ত খবর পৌঁছে গেলে মাস্টার শালা ওমর সরকারকে এই বিপদ থেকে কীভাবে বাঁচাবে তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। বস্তুত তিনি সরকারের বহু কর্মকান্ডেই বিরক্ত ফলে কিছুটা নিস্পৃহও ছিলেন এতকাল। কিন্তু এখন কিছু একটা করতে হবে। ঘটনা সত্যি হলে পুরো গ্রাম হামলে পড়বে। প্রতিশোধ নেয়ার এ সুযোগ তারা হাত ছাড়া করবে না। দুর্ভিক্ষের সময় সরকার যা করেছে, এমনকি দশ সের ধানের বিনিময়ে টিপ সই দিয়ে শেষ সম্বল জমিটুকু কেড়ে নেয়া, এখনই সময় প্রতিশোধের!

এশার নামাজের সময় হয়েছে অনেকক্ষণ, এখন নামাজ শেষে আহারান্তে নিদ্রা যাওয়ার সময়। কিন্তু স্ত্রীর ভাইয়ের এই বিপদের দিনে আর যা হোক হাতপা গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। ত্রিশ ভরি ওজনের হারটা নিয়ে ভাবী ননদের যে গণ্ডগোলটা চলছে তাতে অন্য কেউ হলে পিছিয়ে যেত কিন্তু মাস্টার এই সব তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মাথা ঘামান না। ভাবেন একমাত্র মেয়ে হিসাবে হাওয়াবিবির যেমন পাওয়া অধিকার আছে তেমনি একমাত্র বউ হিসাবে আমেনাবিবিরও অধিকার আছে, হাওয়াকে তার মা গলার হারটা দিয়ে গেছে বলে যতই প্রচার করুক স্বাক্ষী তো আর নাই! তবে প্রশ্ন একটা থাকেই, আমেনাবিবির যে এত গহনা, বন্ধক রাখা ভরি ভরি সোনা মাটির নিচে রাখা, তা কি শুধু অমাবশ্যার রাত দেখে বের করে মাজা ঘঁষা করার জন্য!

খরম পায়ে ধীরে চিন্তাযুক্ত মাস্টার এসে দাঁড়ান সরকারবাড়ির বৈঠকখানার দরজায়। এমন ঘুটঘুটে রাত, এমন রাত মাস্টার কত বছর যে দেখেননি! সন্ধ্যায় হ্যাজাক জ্বালিয়ে বড়ো চুলায় খাসি রান্নার আয়োজন হয়েছিল এখন সে সব কই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। হয়ত রান্না শেষ, রান্না করা মাংশ হয়ত বড়ো জামবাটিতে তার বাড়িতে গেছেও কিংবা হয়ত উড়ো খবরে রান্নাবান্না বন্ধ করে সব মুষড়ে পড়েছে, কিংবা কি জানি কি, মাস্টার আর ভাবতে পারেন না। সাধারণত যা হয়, বৈঠকখানায় গিয়ে দাঁড়ালেও ভিতরবাড়ি নিয়ে যায়, আজ তা হল না, হাবা এসে বৈঠকখানায় বসতে দেয়। সরকার হয়ত নামাজ পড়ছিল, আসতে বেশ সময় নেয়। ততক্ষণে আমেনাবিবি কুদ্দুসকে পাঠায় ভিতরবাড়ি নিয়ে যেতে। কুদ্দুসের চেহারায় তেমন কিছু খুঁজে পান না মাস্টার। হাসিখুশি বোকাসোকা চেহারার কুদ্দুসের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও মাস্টার কিন্তু চুপচাপ বৈঠকখানায় বসে থাকেন। আর সত্যি অর্থেই, এই জীবনে প্রথম বোকা কুদ্দুসের উপর এক ধরনের রাগ হয় তাঁর।
কুদ্দুস ফিরে গেলে পরক্ষণেই হাবার দেখানো হারিকেনের আলোয় এসে ঢোকে সরকার। মাস্টার কীভাবে শুরু করবে বুঝতে না পেরে উসখুস করেন।
সরকারই প্রথম কথা বলে
— কোনো সমস্যা ভাইজান?
মাস্টার মাথা হেট করে বসে থাকেন। থমথমে মুখ তুলে ঘরের আসবাব দেখেন।

— বাড়ির সবাই ভালা আছে তো? সরকারের উৎকন্ঠা।
—  আছে।
— তয়!
— কুদ্দুসের একটা খবর শুইন্যা আইলাম।ওমর সরকার হা হা করে হাসে। মাস্টার চমকে ওঠেন।
— খবর তো মিষ্টি দিয়াই পাডাইছি, হেই বেইন্যা বেলায়! কুদ্দুসের মাইয়া হইছে, হেই ঐতিহাসিক মালা দিয়া আমগো তার মোখ দেহা হইয়া গেছে! আর আপনে এই আন্ধাইরে নাতি দেখতে আইছেন!
মাস্টার এবার বড়ো করে একটা শ্বাস নেন। কার্তিকেও বড্ড গরম লাগলে হাত পাখাটা খোঁজে মনে মনে।

— একটা খবর হুইন্যা আইলাম, বুঝতে পারতেছি না খবরডা হাচা না মিছা!
— কী খবর!
— সন্তানডা কি কুদ্দুসের বউ নিজে প্রসব করাইছে?
— না, কাবান্নি আছিল, ভাওয়াল চকের দাই কইলো বাচ্চা বিয়ানে অইবো আমি বিয়ানেই যামু, হেয় বলে কাইল আইছিল। তয় দাই আওয়ার আগেই কাম অইয়া গেছে। কাবান্নিই ধরছে পরথম, কারো তো ধরন লাগব, কেন ভাইজান, কামের মানুষ ধরলে কী কোনো সমস্যা?
— না, সেইডা কোন সমস্যা না। সমস্যা অন্য জায়গায়।

অস্বস্থি বোধ করে সরকার। সম্পর্কে বড়ো আত্মীয় না হলে কখন ধমক দিয়ে কাপড় নষ্ট করিয়ে দিত। একে বড়ো বোনের জামাই তদুপরি মাস্টার মানুষ, সাত গ্রামের সম্মানি, ধৈর্য্য তাকে ধরতেই হয়।

— ভাইজান কী কইতে আইছেন কইয়া ফেলেন!
— ঘটনাডা একটু যাচাই বাছাই কইরা কওয়া ভালা।

এবার সরকার নড়েচড়ে বসে। এই রাতবিরাতে মাস্টার কী কথা নিয়া আসছে! সবটাতে তার মাস্টারি না করলে কি চলে না! নাকি গুরুতর কিছু, যা মুখে বলা তার জন্য কষ্ট! রজবের কথা মনে আসে, শিশুর মুখের আদলটা কোথায় যেন তার সাথে মিলে যায়। কিন্তু সে তো এক বছর আগেই গ্রাম ছাড়া হয়েছে। রজবকে নিয়ে কান কথার অবসান হয়েছে বছরেরও বেশী। সেই তো ডেকে এনে বলেছে এর পর এ গাঁয়ে দেখলে সত্যি তাকে পরীস্থানে পাঠিয়ে দেবে!

মাস্টার উঠে দাঁড়ায়। উৎসুক দৃষ্টিতে মাস্টারের দিকে একবার চোখ ঘুরিয়েই সরকার আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে ওঠে, বাড়ি যান, বিশ্রাম নেন ভাইজান, শইলডা মনে কয় ভালা নাই।                 

রজবকে নিয়ে কানাঘুষার বয়স বছরের উপর, এখন মাস্টার কী কথা নিয়ে আসতে পারে? আর মাস্টারি করতে করতে মনে হয় মাথায় আর কিছু নাই, আর গ্রামের ইসকুলে মাস্টারির তো কোন রিটায়ার নাই, সরকারি হলে আরো পাঁচ বছর আগেই কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিত, এই যখন ভাবতে ভাবতে উঠান পেরিয়ে বসত ঘরে ঢুকছে সরকার ঠিক তখনি ঢিলটা এসে পড়ে টিনের চালে। শব্দটা এতই জোরে হয় যে সে বসে পড়ে মাটিতে। সামান্য বিরতির পর আরো একটা, তারপর আরো একটা তারপর বিরতিহীন। সব ঘরে পড়ে দু’একটা কিন্তু চন্দ্রভানুর ঘরে অগুনতি। সরকার যে কী ভাবে ঘরে ঢুকে মাথা বাঁচাল সে কেবল সরকারই জানে। হতবিহবল সরকার ইচ্ছা করলে বন্দুক উঁচিয়ে ঠা ঠা গুলি করতে পারত, বাইরে এসে তার ঐতিহাসিক হুংকারটা ছাড়তে পারত কিংবা হাবা আর মাছুকে হেঁকে মোকাবেলা করতে বলতে পারত; কিন্তু  সে কিছুই করে না।

আর ঢিলের শব্দে ঘুমন্ত মানুষ সব জেগে উঠে, প্রথমে ভাবে কিয়ামত নেমে এসেছে আল্লার দুনিয়ায়, এখনি সব ডুবিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এক ঘুম দিয়ে ওঠা মানুষ শব্দ নিয়ে তাৎক্ষণিক আর কিছুই ভাবতে পারে না।
আর শব্দ কমে এলে গভীর রাতে ফের মাস্টার আসে, শলা হয়।

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব তেরো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *