উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব তেরো
উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস
১৩
বেশ কিছু বছর আগে দলুকে পাঠিয়েছিল ঢাকায় আলিয়া মাদ্রাসায় পড়তে। কিন্তু কয়েকমাস সেখানে পড়াশোনা করেই সে নিখোঁজ হয়ে গেলে চন্দ্রভানুর বাপ এই মা মরা ছেলেটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। আর এই সুযোগে সে রীতিমত বাবু হয়ে ওঠে এবং ঢাকা আর কামারকারা করে বেড়ায়। ঘাড়ে ঝোলানো ব্যাগে থাকে চিরুনি, আয়না, রুমাল আর গানের বই। রোদ বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে হাতে থাকে ছাতা। কারণ ঝড়-বাদল, খাঁ-খাঁ রোদ কোন কিছুই তার সফরকে দমাতে পারে না। ছোট বয়সে আলগা দোষ ছিল তারও, হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যেত আর অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া যেত তালগাছের মাথায় বসা অবস্থায় আর গাছ থেকে নামাতে নামাতে মানত করা হয়ে যেত— নাতি আমার বাঁইচ্যা থাকলে আল্লার ইচ্ছায় আলেম বানামু। আলেম কামেল কিছুই না হয়ে সে হলো ভাদাইম্যা। গ্রামে আসে, জমি বেচে টাকা নিয়ে আবার ঢাকা চলে যায়। আগে বাপের এক আধটু বাধা ছিল, সর্পদংশনে তার মৃত্যুর পর আর কোন বাধাই থাকলো না। বোনের বাড়ি সে সচরাচর আসে না, কিন্তু বোনের সুসংবাদে হাজিরা না দিলে লোকনিন্দা না কি কারণে যেন সে শিমুলচর আসে। আর এসে সে মজে যায়। কারণ দুটো, প্রথমতঃ শিমুলচর এসে পায় অভাবনীয় আতিথেয়তা, খাওয়াদাওয়ার এন্তার জোগাড় এমনকি তাকে দেখে খাসি পর্যন্ত জবাই হওয়া আর দ্বিতীয়ত ছোটকাজিবাড়ির রূপসী কন্যা।
ছন্নছাড়া ছোটভাইকে চন্দ্রভানু জীবনের বহুদিক নিয়ে কথা বলে হয়রান হয়ে বলা যখন ছেড়েই দেয়েছে, তখনই সে কিছুদিনের জন্য আস্তানা গাড়ে বোনের বাড়ি। আর এ সুযোগে চন্দ্র আবার কত কী-ই না বুঝাতে চায়, দেখাতে চায় নতুন করে। ছন্নছাড়া জীবনের একটা উদাহরণ ছিল সরকারবাড়ির কাছকাছি একেবারে গা ঘেঁষে প্রধানবাড়িতে। একদা তারাই এ তল্লাটের মাথা থাকলেও এখন নির্বংশ প্রায়। সেই পরিবারের শেষ বংশধর কালা প্রধান, একদা তাকেও পাঠানো হয়েছিল ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায়। সেও দলুর মত বছর খানেক বিদ্যা অর্জন করে ক্ষ্যান্ত দিয়ে এমনকি জমিজামা বিক্রিবাট্টাও শেষ করে এনেছে। শোনা যায় সে ঢাকার কোন ছাতা কোম্পানির মেয়েকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়েছে। গ্রামে কালা প্রধানদের জমিদারি আছে—এর প্রমাণ দিতেই সব বিক্রি করে শ্বশুরকে মেলা টাকা নিয়ে দিয়েছে, এখন অবশ্য যে কোন সময় কাইল্যা শ্বশুরের গলা ধাক্কা খেয়ে পথে এসে দাঁড়াতে পারে কিংবা হয়ত দাঁড়িয়েছেও ইতিমধ্যে। আর এখন শুধুমাত্র ভিটা আগলে বসে আছে বৃদ্ধামা, রোগেশোকে জর্জরিত, সংসারে কষ্ট ভাগ করে নেয়ার মানুষ বলতে গ্রামের যত ছোটছোট ছেলেমেয়ে। বুড়ির চালে সীম লাউ আর চিচিংগা কুমড়া আর শরীর ভালো থাকলে ওঁচা নিয়ে দক্ষিণধারের ডোবা থেকে কিছু ছটকা চিংড়িমাছ ধরে আনা— এই তার জীবিকার জোগান কি রসদ। আর বিকালে কোঁকাতে কোঁকাতে যখন এসব নিয়ে রাঁধতে বসে তখন ছোট ছেলেমেয়েরাই নিজ নিজ বাড়ি থেকে বড়োমার জন্য নিয়ে আসে হলুদমরিচনুন। বড়োমার রান্নায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে বার বার বলবে, ‘বড়মা নুন কই, অলদি-মইচ কই, বড়োমা ভাত ছাড়া খাইবেন কিদ্যা? তরকারি রান্না হতে হতে কেউ বাড়ি থেকে চুরি করে এক থালা ভাত এনে দেয়। তার আগে বড়োমার কাঁপা হাতে তরকারি কোটা দেখে, চুলা ধরানো দেখে এমনকি চুলা ধরাতে নিজেরা অংশগ্রহণ করে তারপর কীভাবে তাদেরই এনে দেয়া মশল্লায় তরকারি টগবগ ফোটে তাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। কেউ কেউ বলে বড়োমা আমি নারুম, মাটির হাড়িতে নাড়তে গিয়ে হাড়ি ভেঙে ফেললেও বড়োমা তাদের কিছুই না বলে আবার রান্নার জোগাড় করে। আর জ্বরটর হলে ওরাই মাথায় পানি ঢালে। ঘর থেকে ভাত তরকারি এনে দেয়, খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে ‘বড়োমা না খাইলে তো মইরা যাইবেন’। পরদিন সকালেই ছোটে বড়োমার অবস্থা দেখতে। ভাতে পিঁপড়া আর আরশোলার উৎসব দেখে ওরা মন খারাপ করলেও হতোদ্দ্যাম হয় না মোটেই, কেউ চিড়া আনে কেউ মুড়ি। আর সত্যি হলো বুড়িকে নিয়ে যত উৎসাহ ছোটোদের ততই নিরুৎসাহ রক্তের সম্পর্কের কিংবা প্রতিবেশীদের। কারণ সবারই এক বাক্য, জমিগুলো, এমন কি সিন্দুক ভরা পিতলের জিনিসগুলো তার কাছেই কেন সব বিক্রি করা হলো না, আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী হিসাবে তারই তো অধিকার ছিল বেশি, এখন ‘ যে হাই (স্বামী) গো কাছে বেচছে তারা আইয়া দেহুক, ভাতপানি দিক’। আর এই যে ভিটামাটি, এটা তো আর বিক্রি হয় নাই, বুড়ি এ বিষয়েও নীরব, তার তো উচিত অন্তত এটা নিয়ে কথা বলা! দুই দিকের প্রতিবেশীদের সারাদিনের আক্রমণ ‘ বাড়ির মিদ্যে যে শত্রু থাহে, তারে চিনুম কেমনে’ আর চমৎকার শোলক ‘হালুক পাতায় বর্শি বায়, আত্তি গাইত্যা আদার দেয়, চান্দা মাছে খায়’ এই শোলকের যে কী অর্থ তা কেবল তারাই জানে। আর ভিটা অন্য প্রতিবেশীরা লিখাবার জন্য ওঁত পেতে আছে এই আশংকায় স্বগতোক্তি করতে শোনা যায় ‘আশায় থাকলো কাউয়া, পাকলে খাইও ডেউয়া’ ইত্যাদি, বুড়ি হজম করতে করতে শেষ পর্যন্ত এখন এক প্রকার নির্বাকই।
তবে সারা বছর বুড়ির উপর যত ঝড়ই বয়ে যাক ঈদে আবার এই প্রতিবেশীরা নিজেরাই বলে কয়ে স্বামীদের দিয়ে হাট থেকে দশহাতি একটা ঘন নীল কি সবুজ শাড়ি আনিয়ে চৌকির উপর ছুঁড়ে ফেলে বলবে ‘ নেও গো বালা মাইনষের ঝি, পইড়ো কিন্তু শাড়িডা!
তো চন্দ্রভানু বুদ্ধি করে হাবাকে দিয়ে দলুকে পাঠায় বড়োমার পড়ো পড়ো দোচালা ঘরটায়। বিকালে বুড়ি রাধছিল সীম আর ইচা, পাশে বসেছিল অন্তত ৭/৮জন মেয়ে। আগন্তুককে তারা চেনে না কিন্তু হাবাকে দেখে তারা বুঝতে পারে এ সরকার বাড়ির কুটুম। কিন্তু কী হেতু তাদের আগমন না বোঝে মেয়েরা না বোঝে বড়োমা। বড়োমা আপন মনে চুলায় নাড়ার আগুন ঠেলে দেয়, দিতে দিতে দলুর সার্ট পরা সাহেবিপনা দেখে নিজের ছেলেকে নিয়ে কত কী যে ভাবে! ছেলেটাকে কিছুতেই মানুষ করা গেল না! কালার বাপেরও ছিল খুব মেজাজ। স্ত্রীর সঙ্গে রাগ করে কাহিনী তৈরিতে ছিল কারিগর। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর সঙ্গে রাগ করে আনাড়ি হাতে কাঠ কাঠতে গিয়ে পায়ে কোপ ফেলে পঙ্গু হয়ে পড়ে ছিল এক যুগ। ঘরে পড়ে থেকে অকালে মারা গেলে কালা হয়ে পড়ে ছন্নছাড়া ভাদাইম্যা।
হাবা বলে, ভাইজু, হেয় হইলো কালামামার মা, হের পোলাই আপনের লগে ঢাহায় পড়ত, তারে কি আপনে চিনতেন! অদূরে বড়ো মেন্দিগাছের নীচে দাঁড়িয়ে নাক কুচকায় দলু, মেন্দিফুলের ঘ্রাণ তার অসহ্য। দূর থেকে সে বুড়িকে দেখে, না বাচ্চামেয়েদের দেখে, হাবা ঠিক বুঝতে পারে না। মিহি গলায় এক বালিকা বলে ওঠে, মজার ছালন রান্দা হইতেছে, খাইতে অইলে কাছে আইয়েন! কটকট করে কথা বলা মেয়েটি জানে চন্দ্রকাকির ভাই, স্বভাবে ভাদাইম্যা, কিন্তু দেখতে মনোহর!
কিন্তু চন্দ্রভানুর ছবকে কোন কাজ হয় না, সে এখন এমনকি পূবকান্দি যাওয়া ধরেছে আর সোম আর বিষুদবার হাট থেকে কিনে আনে কাঁচ বসানো দুল আলতা আর পুঁতির মালা। যার জন্য এসব কিনে, সে ছোটকাজির ছোটমেয়ে মনু, রূপে যেমন তারচেয়ে শতগুণে কথায়। আর দলুর উপর যখন চাপ আসে পূবকান্দি না যাওয়ার তখন এই মনোয়ারার কাছ থেকেই সে তার বোনের লীলাকাহিনীর রসময় বর্ণনা শোনে। তার প্রধান কারণ ততদিনে দু‘জনের প্রেমলীলা কামলীলায় পরিণত হয়েছে। তো এই মনোয়ারা বেগম মনুই তাকে হাইমচরের কাহিনী শোনায়। রসিয়ে রসিয়ে বলে — তোমার বইনের হাউস মিডাইয়া শেষে কিনা আবুদ পোলা রজব ওরুন্ডি অইয়া গেল, কেউ খুঁইজ্যাই দেখল না, বাঁইচ্যা রইল না মরল এতিম মানুষডায়, মাইনষে কয় পরীতে নিছে, আসলে কীয়ে যে নিছে আল্লায় জানে!
কিন্তু দলুর কাহিনী বহুদিন গোপন থাকল সর্বসাধারণে কারণ তাদের মিলন হতো খুব ভোরে অন্ধকার থাকতে খালের শেষ মাথায়। দু‘জনে পানিতে নামে, কাপড় থাকে ডাঙায়, মনুকে বুঝিয়েছে, পানিতে এসব হলে গুনা হয় না, পোলাপানও হয় না।
তারপর মনুর পেটে বাচ্চা চলে আসলে পালাতে চায় দলু — আমার তো বাড়িত কাম আছে, আইসা বইনেরে কমু মাস কয়েক বাদে, তোমারে বিয়া কইরা নিয়া যামু, হাচা!
— এহন কও!
— বইনে রাজি না হইয়া আরো ঝামেলা পাকাইবো, জানো তো সে কেমন!
— তার তো কথা কওয়ার মুখ নাই, আগে রজবের সন্তান পেটে নেয়ার বহু চেষ্টা করছে, এহন কারডা নিছে কে জানে! তার এত বড়ো বড়ো কতা কী!
— তুমি এইসব কী কতা কইতেছ?
— একদম হাচা, সব্বাই জানে, ডরে কেউ কয় না। কুদ্দুস ভাউরারে অবশ্য কেউ ডরায় না, ওর বলে কোন সোধবোধ নাই! তাইলে আর পোলাপানা অয় কেমনে! মাইনে বুজছ তো?
এইবার দলু বিরক্ত হয়, মনুকে ছাড়ার যা হোক একটা কারণ কারণ খুঁজে পাওয়া গেল, বেসরম মাগি।
মনু তাড়াতাড়ি ফেরার তাগাদা দিলেও দলু জানে আগামী পাঁচ বছর সে এই গাঁয়ে পা রাখবে না।
শেষ যেদিন দলু আর মনোয়ারা খালের পানিতে নেমেছিল তখন খুব ভোর। অন্ধকার থাকতেই মনোয়ারা বলেছিল শীত লাগে, পানিতে নামুম না, তোমার পোলার তো ঠাণ্ডা লাগবো প্রাণের স্বামী। দলু আড়চোখে তাকিয়ে এই প্রথম মনুর কথায় বিশ্বাস করে। সে খেয়াল কওে দেখে পেটটা সত্যি যেন বড়। পানিতে হাত ধরে ওকে নামাতে নামাতে শাড়ির নিচ দিয়ে হাত চালায়। হাত চালিয়ে যেখানে গিয়ে হাত থামবার কথা সেখানে না গিয়ে থামে আরো উপরে, পেটে হাত রেখে ও আঁতকে ওঠে, লাউয়ের আকার একটা জিনিস সে স্পষ্ট পরখ করতে পেরে কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে যায় আর মনু বলে ওঠে, কী অইল! দলু কী করে, মনুকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলে মনু ডুবে যেতে যেতে ভেসে উঠে খিলখিল করে হাসে। বলে, ব্যবস্থা কবে করবা?
— তাতাড়ি, সাতদিন বাদে পিনিস নিয়া আসুম, তোমারে রাজরানী বানাইয়া লইয়া যামু, তুমি এই কয়ডা দিন একটু গোপন রাখবা।
মনু পেটের দিকে হাত নির্দেশ করে বলে, তাতাড়ি না আইলে বাপ ডাকবো কারে? দলু এবার মনুকে বুকের উপর তুলে নেয়, কেমন একটু মায়াও লাগে। সে জানে, এই শেষ দেখা, আর কোনদিন দেখা হবে না। তারা ডাঙায় উঠে এসে পাশাপাশি শুয়ে থাকে ভোর হওয়া পর্যন্ত।
সেই ভোরের পর মাত্র দুই মাস সময় মনু শিমুলচর পূবকান্দিতে ছিল। পরিবারকে বাঁচানোর জন্য একগাছা দড়ি আর বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা গাবগাছ তাকে মুক্তি দিয়েছিল শেষ বর্ষায়। মনুর মৃত্যুর বহুকাল পরেও যখন কিশোর গাবগাছটা বড়ো হয়ে মহীরুহ হয় তখন তারা বলে, মনুর বিলের গাবগাছ থেইক্যা কয়ডা গাব পাইড়া আনিছ তো জালে দিমু, বেলাবেলি যাইছ, মনুর ভূতে নাইলে ধরবো!
