উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর দশ
উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস
১০
এহাকবরের এখন যৌবনের বয়স কিন্তু সে যুবক নয় মোটেই। কোনোকালে যুবক ছিল, তাও নয়। তবে কিছুকাল আগে তার বউ আর গোটা পাঁচেক পোলাপান ছিল আর বর্গাচাষ করার বিঘাকয়েক জমিও। সুফলার দিনে খাজনা কয়টা দিয়ে দু‘বেলা দু‘মুঠো খেয়ে চলে যেত। পূবকান্দির শেষ মাথায় বাস করা তিলি তাঁতি নাপিত বারুই কামার কুমার জেলে পাড়ার আগে এহাকবরের একচালা। বছর কয়েক আগের দুর্ভিক্ষে একমাত্র মেয়ে আর নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই বাঁচাতে পারে নাই। বাঁচাতে পার নাই এমন কি বর্গাচাষের জমিটুকুও। আধ মন ধানের বদলা টিপ সই দিয়ে দখল নিয়েছে সরকারের লোক। এতে অবশ্য এহাকবরের তেমন কোন ক্ষতি হয় নাই। সে এখন মাঠে যায় না, বদলে ষোলগুটি খেলে আর বালুগোছায় সারা দিন দা ধার দিয়ে দিন কাটায়। হয় নিজের, নয় অন্যের। একটা দা ধার করে সে পায় এক পুরা মুড়ি অথবা এক সানকি পান্তা, কখনো বা কিছুই না। এহাকবর অবশ্য বাড়ির ভিতর ঢোকে না। দক্ষিণধারে গাছের ছায়া খুঁজে আপন মনে দায়ে শান দিয়ে যায়। একটা দা নিয়ে বসে সেই বাড়ির তাবৎ জিনিসের শান দিয়ে দেয়া তার অভ্যাস। আর শান করার জিনিস যদি মোটে একটাই থাকে কিংবা শানেরই আদৌ দরকার নাই তবুও সে অনুরোধ করে একটা কিছু নিয়ে সারাটা দিন শেষ করে দিতে। সব বাড়িই যে কাজ দেয় খেতে দেয় তা তো নয় কিন্তু তার কাছে খাওয়া না খাওয়া কোন ব্যাপার না, ব্যাপার হলো দা বটি সে শান দিবেই। সব বাড়ির লোক তাকে দিয়ে শান দেয়ার কাজ সেরে নিলেও নেয় না সরকারবাড়ির লোকেরা। এমন কঠোর প্রহরা, হাবা কি কাবান্নি কিংবা আব্বাস বা কুদ্দুসের সামনে পড়বেই, ওমর সরকারকে দেখলে সে অবশ্য পালাতে চায় কারণ দেখে ফেললে বলবে, আবাগীর আবাগী, এত মানুষ আমগো নাদার বাত খাইয়া বাঁচলো আর তুই বাঁচলি না! বলার ভাবটা এমন, যেন বহুকাল আগের সেই দুর্ভিক্ষে এহাকবরের মৃত্যু হয়েছে, সামনে ঘোরাঘুরি করছে এহাকবরের প্রেতাত্মা, অথচ সে ইচ্ছা করলেই বেঁচে যেতে পারত। এহাকবর তখন মাথা নত করে পূবে কিংবা পশ্চিমে হাঁটা দিবে শশব্যস্ত হয়ে। আর গ্রামের লোকে তো তাকে খানেকটা ছিটগ্রস্থ বলেই জানে ফলে তার ব্যস্ততা কি প্রস্থানকে তারা আমলেই নেয় না। আর কে না জানে, সেই সময় মানুষ বাঁচার জন্য এমনকি অন্যের ঘরের পিড়া কেটে ভাত পর্যন্ত চুরি করলেও এহাকবর তা না করে বরং মৃত্যুর পরোয়ানার জন্য অপেক্ষা করেছে। এহাকবর তো সারা জীবন আহাম্মক, চোখের সামনে বউ বাচ্চাদের মৃত্যু হাহাকার ছাড়া আর কিছুর জোগান দেয় নাই। বিয়ানে চাল মন ২০ টাকা তো বিয়ালে ৪০ টাকা, যদিও সরকারের গরুর নাদায় ভাতের আকাল হয়নি। হোগলায় পেঁচিয়ে লাশ ভাসানোর সময় দুঃখ ছিল একটাই, মৃত্যু তো সবারই হবে কিন্তু এদের কাপড়টুকুও দেয়া গেল না! প্রথম দিকে মাস্টার কিছু ব্যবস্থা করতে পারলেও পরে তিনিও আর পারেন নাই। আর কি আশ্চর্য, নতুন ধান উঠার পরই হলো আসল মহামারী, নতুন ভাত পেটে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন মৃত্যু উৎসব যেন! আর তার কিছুদিন পর দেখা গেল কিছু নব্য বড়োলোক, যারা ভাতই পেত না এমন কিছু লোক এখন নিত্য আড়ং যায় আর ঘটি ভরে দুধ কিনে আনে, শোনা যায় চায়ের কেটলিও আছে রশিঘরে। এহাকবর অবশ্য এদের নিয়ে মজা করে বলে, পেটে গু থাকলে কত রহম কইরা আগা যায়, চিকন চিকন লাদা লাদা জিলাপি!
আর এহাকবরের দায়ে ধার দেয়া চলে বিরতিহীন। বহুক্ষণ ধরে ধার দিয়ে বার বার পালকস্পর্শে তা পরীক্ষা করে। এভাবে চলছে বছরের বছর। দুর্ভিক্ষের বছর কয়েক পর গত অগ্রহায়ণে সোনাবিলের কটকতারা ধানে যখন রঙ লাগে আহাম্মক এহাকবর মনে করতে পারে, এই তো সেদিন সে ধান বুনেছিল আর বার বার স্ত্রীকে প্রবোধ দিয়ে বলেছে, আর কয়ডা দিন বাঁইচ্যা থাক, এমন ধান অইছে, বছরকার খোরাক হইয়া যাইব।
আর এই জৈষ্ঠ্য মাসে, রোজার পুরোটা সময় কারো বাড়িতে ঈদের আগাম আনন্দ থাক না থাক সরকারবাড়িতে হাতে কাটা সেমাই বানিয়ে রোদে শুকিয়ে চিনামাটির বৈয়ামে ভরা চলে। ঈদের দিন সকালে নারকেল কোড়া আর ঘন দুধ দিয়ে রান্না হবে সেই সেমাই, ওমর সরকার তার ছেলেদের নিয়ে খেয়ে নামাজে যাবে। এসে খাবে ঘরে জবাই করা খাসির মাংস, মুরগির মাংস, খিচুরি আর ক্ষীর, রোদ উঠলে ঘরে পাতা দই আর খই। এত কিছুর পরও থাকবে আমন চালের ভাত আর কাঁচা আম দিয়ে শিং মাছের চুয়া। বিকালে আবার দই আসবে ঘোষদের বাড়ি থেকে। আর নাপিতরা এসে ক্ষৌরকর্ম করে যাবে ঈদের আগের দিন।
যথারীতি ঈদের সেমাই খেয়ে নামাজ পড়তে যায় ওমর সরকার, নামাজ শেষে বাড়ি না ফিরে একটু ঘুরে আসতে চায়, একদা কত না দাপট ছিল। লোকে পথ ছেড়ে নামায় গিয়ে হাঁপাত।
পূবকান্দি কী কাজ ছিল কে জানে, অন্যদিন অন্তত তিনজন থাকে সাথে কিন্তু আজ একা। ওমর সরকার যেতে যেতে দেখে, ঈদের দিনেও এহাকবর কার বাড়ির দক্ষিণধারে বালুগোছায় দা ধার দিয়ে চলেছে, বেচারা! খালিগায়ে উপুর হয়ে বসা এহাকবরের ঘাড়ের অংশটুকুই চোখে পড়ে; নোয়ান মাথা, হাত গভীর নিবিষ্ট কর্মে। না দেখার ভান করে চলে যেতে যেতে সরকার বলে, আছোছনি বালা এহাকবর!
উত্তর শুনতে সরকারও দাঁড়ায় না, এহাকবরও উত্তর দেয় না। যেমন ধার দিচ্ছিল তেমনি মাথা নত করে তা করে যায়। ঘণ্টাা খানেক পর ফিরে আসে সরকার, প্রস্তুত ছিল এহাকবর, এমন সুন্দর দিনেই হতে পারে কাজটা! যখন সুযোগ আছে, সরকার আজ সঙ্গী ছাড়া বেরিয়েছে না! পরনে আতর সুগন্ধে সাদা ধবধবে পানজাবি লুঙ্গি, মাথায় কিস্তি টুপি আর চিনাদের বানানো পাম্পসু পায়ে। আতরতুলা দাড়ি মুখে চেহারায় যেন নুরানি জোশ।
অতিক্রম করে চলে যাচ্ছিল সরকার। দৃশ্যমান মজবুত গর্দান, কোপটা সে দেয় দাঁত মুখ খিঁচিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে। এত বছরের শান দেয়া দা, শরীর আর মাথা দু‘আলাদা হয়ে পড়ে আছে এই আশায় চোখটা খুললে ওমর সরকার মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, আরে কী করো এহাকবর, কী করো! কি অবাক কান্ড, বেঁচে আছে, আবার কথা কয়! ভ্যাবাচেগা খাওয়া এহাকবর একবার দেখে সরকারকে আর একবার দেখে উল্টো করে ধরা দা-টা। ক্ষণকাল মাত্র সে চিন্তা করে, এবার দা সোজা করে ধরে এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করলে সরকার শুধু চিৎকার করে আর হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচায়,— আরে কী করো এহাকবর!
হৈচৈ শুনে মানুষ আসে। ক্ষতি বিশেষ হয়নি, সরকারের দু‘হাতের বাহু থেকে কবজি পর্যন্ত শুধু মাংসগুলো খুলে পড়েছে আর ছিন্ন হয়েছে গোটা দুই আঙ্গুল।
পরদিন হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ আসে। এহাকবর ঘরের কাঁরের উপর বসে থাকে পা ঝুলিয়ে। পুলিশ বলে, নাম শালা, থানায় যাবি। এহাকবর বলে, এহন নিয়া কী করবেন, খুন কইরা লই, একবারে আইয়েন!
কিন্তু গ্রামের লোক হেসে খুন, বছর বছর ধইরা শান দিয়া শালায় উল্টা কোপ দেয়া শিখলো!
আর এই সব দুর্দিনে কে বা কারা লেংটাকে ধরে আনে সরকারবাড়ির উঠানে, যা হোক একটা কিছু প্রতিবিধান দিতেই হবে। ঢাকা থেকে তিনদিন চিকিৎসা নিয়ে গতকালই কেবল ফিরেছে সরকার। লেংটা উঠানে বসে কবরী কলা খায় টপাটপ, এর বাইরে কোন কিছু দেয়ার কোন লক্ষণই কেউ দেখতে পায় না। অথচ লেংটার সুনাম এখন গ্রাম ছাড়িয়ে মহকুমা ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে। তিন বছর আগের কাহিনী এখনো মানুষের মুখেমুখে টাটকা। মেঘনার গভীর পানিতে বিশে পঞ্চাশে জেলেদের জাল আটকে গেলে লেংটার অনুরোধে মল্লমমাঝিকে নামতে হয় মেঘনার তলদেশে খিজির আলাইহে সাল্লামের মসজিদে কারণ মল্লমই একমাত্র যে কিনা কখনো আসর নামাজ কাজা করেনি। মল্লম নদীর নিচে মসজিদে নামাজ পড়েছে ইমামের পিছে, জাল ছাড়িয়ে এনেছে আর ফিরে আসার সময় এক অদ্ভুত আর্জি জানায় ইমামকে, হুজুর আমার যেন খাওন না লাগে, আমি যেন না খাইয়াই বাঁইচ্যা থাকতে পারি বাকি জীবন, হুজুর আমরা বড়ো গরিব। তারপর তিনমাসেরও অধিক সময় সে বেঁচে ছিল, ক্ষুধার জন্য একমুঠ ভাতও সে খরচ করেনি। বউ বড়ো নাদান, পীড়াপীড়িতে যদি না বলতো তাহলে হয়তো আরো অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকত না খেয়ে। বোকা বউটার জন্যই এমন এক আশ্চর্য নিয়ামত চেয়ে আনা সত্ত্বেও সে বেঁচে থাকতে পারল না, গ্রামবাসীর অন্তত তাই মত।
আর এই তো সে দিন লেংটা মল্লমমাঝির বউকে গিয়ে বলে, চলেন দই পাতি। গরীব মানুষ সে দুধ পাবে কই, কিন্তু পাতিলের ঢাকনা খুলে দেখে পাতিল ভরা দুধ। দই পাতা হলে বলে, যাই গো চিড়া লইয়া আই, এক লগে খামু। তারপর তিন মাস তার আর দেখা নাই গাঁয়ে। ফিরলো পাক্কা তিন মাস পর ঘাড়ে চিড়ার পুটলি। তারপর দইয়ের পাতিলের মুখ খুলে পোকা পড়া দই দেখবে বলে সবাই অপেক্ষা করে থাকলেও দেখে টাটকা জমাট দই। আর দুই হাড়ি দই লেংটা সারা গ্রামের মানুষকে চিড়া দিয়ে পরিবেশন করে আরেক বার চমকে দিলেও লেংটা এর মধ্যে কোন অলৌকিকত্ব খুঁজে পায় না।
সেই লেংটা, সকালবেলা সরকারের উঠানে বাঁশের মোড়ায় বসে পটাপট কলা খায়। খাঁ-খাঁ রোদের কোন তাপই তার গায়ে লাগে না। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, জিজ্ঞাসা করে হাওয়াবিবি শাড়ির আড়াল থেকে, কও তো আমার ভাইয়ের যে এত বড়ো একটা বিপদ গেলো ঈদের দিনে, ক্ষত কাটাইয়া কি তাড়াড়াড়ি সাইরা উঠতে পারব? উত্তরে হাসে লেংটা। এক মনে কলা খাওয়া চলে, কলা খাওয়ার এই আনন্দে আবার উত্তর কীসের, কবরী কলা হইল কলা। বার বার প্রশ্ন করে কোন উত্তর না পেয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা হাওয়াবিবি অন্দরে গিয়ে বসে থাকে, অন্তরে গভীর হতাশা। কে একজন লেংটার কলা খাওয়ায় মোটেই অভিভূত না হয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলে, এত কামেল লোক আপনে একটা উত্তর দিলেই তো পারেন! কলা খাওয়া শেষ করে দৌড়ে উঠান পেরিয়ে যেতে যেতে তাচ্ছিল্যভরে বলে, অগো খাচলত্ বদল করা দরকার!
হাওয়াবিবি আমেনাবিবি কথাটা না শোনার ভান করলেও মনে বড়ো খচখচ করে।
এদিকে লেংটা কলা খেয়ে জাবর কাটতে কাটতে দৌড়ায়, এই তার হাঁটার রীতি, যেন কেউ তাড়া করছে, ধরতে পারলে বেশ একটা ধোলাই হবে। তো লেংটা দৌড়ে সরকারবাড়ি ছেড়ে মাস্টারবাড়ি ছেড়ে কাজিবাড়ির উঠানে উঁকি দেয়,— কী করো গো মা-সোনারা?
লেংটাকে দেখে উঠান লেপারত মা সোনারা এগিয়ে আসে, না তাদের মাথায় কাপড় না আচরনে কোন দ্বিধা যেন লেংটা তাদের ছোটবোন। মা সোনারা বলে, উডানে আইয়া দেহ আমাগো কী অবস্থা!
— ক্যান কী অইছে গো!
—খাল থেইক্যা পানি আনি উডান লেপার লইগ্যা, ঢালতে না ঢালতে হুগায় যায়, উডান লেপুম কেমনে আর ধান হুগামু কেমনে, এদিকে হিদ্ধ ধান পাইল্যায় পইড়া রইছে পাহালের উপড়েই!
তারপর লেংটা আর কী করে, ফোকলা দাঁতে ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে উঠানে এসে দাঁড়ায়, বলে, চলো তোমগো পানির ব্যবস্থা করি, কলসি নাদা বদনা যা আছে ভইরা লও গো!
বউগুলি কিছু বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে দেখে লেংটা তার নেংটি সরিয়ে উঠান ভাসাতে থাকে পানিতে। সম্বিত ফিরে এলে তারা নাদা বদনা সব ভরতে থাকে আর ঘটনা ঘটিয়ে মুর্হূতেই লেংটা অদৃশ্য।
