উপন্যাস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ষোল

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব দুই

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চার

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পাঁচ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ছয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব সাত

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর আট

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর নয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর দশ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর এগারো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব তেরো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চৌদ্দ 

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পনেরো 

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ষোল

১৬

ধান উঠলে গান হয় আর রাত জেগে ধান ভানে চিড়া কোটে মনের আনন্দে, যেমন আদিকাল থেকে হয়ে আসছে। ছাড়াবাড়িতে যখন গাতকদল কবিগান করে তখন বড়ো ফুর্তি হয়, বাহাসে নারী না নর, কে বড়ো এই বিরাট সমস্যার মিমাংসা করতে গিয়ে যুক্তিতর্ক নিয়ে চুল ছেঁড়াছিঁড়ি সময়টা দীর্ঘ হলেও পরক্ষণেই তারা মেনে নেয় বীজের দরকার আবার বোপণ করার জন্য উপযুক্ত কর্ষিত ভূমির দরকার, পাথরে পদ্ম ফোঁটেই না।
কিন্তু এবার গাতকদল পূবকান্দি যায়, পশ্চিমকান্দি যায়, এই মধ্যগ্রাম শিমুলচর বিলকুল তারা চেনেই না। গাঙ দিয়ে নৌকা এসে খালে না নেমে নালা দিয়ে গাঁয়ে ওঠে, খালে নৌকা নামালেই তো উঠতে হয় শিমুলচর সরকারবাড়ি। আর চিনবে কি, যে গান বেঁধেছে গাতকেরা! বাতাসে গান ভাসতে ভাসতে মধ্য শিমুলচরেও আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে মুখে —

হাবায় আর কাবান্নি বাচ্চা চুরি করলো
পাট ক্ষেতের ভিত্রে বাচ্চা কাইন্দা উঠলো।
তিন পয়সার খুনি রঙে বিছ্না বসন রাঙাইল
তিন দিনের বাচ্চারে নুন খাওয়াইয়া মারলো।

আগো হাবা আগো কাবান্নি তোরা কী পাইলি?
দুইডা বালা দুইডা গরু, এই তোরা চাইলি?

হাক্কার তলে মাছ ধরে কোন জাউল্লার পুতে
কয়ডা হইল্যা, কয়ডা বাইং, মাগুর ধরে যুতে
পুডি মাছে আক করে, গু খায় ঘাউরা মাছে
কী যে ঘটে সেই গেরামে এমন কার্তিক মাসে 
চোরা মাইয়া কান্দে লইয়া হাক্কা দিয়া যায
ফুলের মধু ফুলে থাহে বোয়াল মাছে খায়
রাইত কান্দে দিন কান্দে, কান্দে জগত পরান
কান্দে কুশাই, কুশাইর বউ, যদি বা খোদা গড়ান।

সকালবেলা টোডা হাতে দক্ষিণধারের বেলগাছের মাথা থেকে রাজসীম পাড়তে পাড়তে হাবার মনে কী হয়, সে সীম পাড়া বাদ দিয়ে নামায় ঢেঙ্গা ঢেঁড়শগাছের ডগা থেকে টোডা দিয়ে ঢেঁড়শ পাড়তে লেগে যায়। কিন্তু এবারেও সে খুশি না। এ জাতীয় ঢেঁড়শ বীজ বোনার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে যখন মনে মনে গুষ্টি উদ্ধার করছিল ঠিক তখনই ঐ সকালে, তারই নামে গান গাইতে গাইতে কয়েকটা রাখাল গরু নিয়ে চলে যায় মাঠে। হাবা ঠিক বুঝতে পারে না গানের কথিত হাবা কি সে নিজে! সে তাদের পিছন পিছন খানেকটা গেলে রাখালরা এমন ভাবে গরুর দড়ি ছেড়ে ওর দিকে তাকায়, গরুগুলোও বুঝি তাকায়, ও ভাবে, কাছে নদী থাকলে এখনি সে ডুবে মরত!

কনকনে শীতের সকালের নরম রোদটা ক্রমশ হলুদ হয়ে আসলেও ওর ঢেঁড়শ পাড়া শেষ হয় না। শেষে কী যে হয়, একহাত সমান রাজসীম দুই হাতে দু’টো নিয়ে যাত্রাদলের নায়কের মতো, নাকি ভিলেনের মত বাতাসে শাঁ শাঁ তলোয়াল চালায়, কচি লকলকে রাজসীম বাতাসের ঘায়ে ভেঙে চুরমার হলেও মাঝবয়সী হাবা বহুক্ষণ তলোয়ার চালিয়ে ক্ষ্যামা দেয়। এক সময় ক্লান্ত হাবা নামায় ঢেঁড়শের ওড়া ফেলে বসে থাকলে রাখালদের টুকরা টুকরা ভেসে আসা গান কানে সিসা ঢেলে দেয়, জগতে তার আর কিছুই ভাল লাগে না।

আর কাবান্নি লোহার কড়াইয়ে চালের গুড়ার গোলা ছিটিয়ে দিয়ে খুন্তি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তোলে, ছিটে পিঠা আর বকের মাংস কুদ্দুসের পছন্দের খাবার। যদিও কাবান্নি জানে কুদ্দুস এ সবের কিছুই স্পর্শ করবে না। খাবার দেখে আরো জোরে কেঁদে উঠে বলবে, আমাল চন্দ্ররে আইনা দাও, আমাল মাইয়ালে কে মাল্লো, তারে আমি খুন কলমু!
বাড়িতে সে তামাকে বুঁদ হয়ে থাকে আর চন্দ্রর নাম জপ করে, সরকার ভুলেও তার খবর রাখে না।

বৈশাখ মাসেও চন্দ্রকে আনে না সরকার, নাকি ওরাই পাঠায় না তা গ্রামের লোকের কাছে ধাঁধাঁ। বুকের রক্ত ঢেলে তা দিয়ে বাচ্চা ফোঁটানোর কালে ডাহুক ডেকে ডেকে হয়রান হলে এমনকি কুদ্দুসের মতো মানুষেরও কি যে জিঘাংসা জাগে! কখনও তক্ষক ডেকে উঠলে পাটের ঘরে গিয়ে দড়ি পাকায়, ফাঁস নেয়ার প্রস্তুতির প্রথম পর্ব। কিন্তু শেষরাতে দেখে নিজের বোকামির স্মারক দড়িটা, ‘এত চিকন দলি দিয়া হইবো না’ বলে দড়িটা ছুড়ে ফেলে উঠানে। তারপর ঘুমাতে গিয়ে কীযে স্বপ্ন দেখে, গ্রামের মানুষ তার গায়ের লুঙ্গিগেঞ্জি হিড়হিড় করে খুলে নিচ্ছে, চামড়া ছিলা গরুর মত দেখাচ্ছে তাকে ‘সরকারের পুত, গাঙে আয় তরে অউজকা চুবামু’। আর সে পাটের ঘর থেকে বের হয় না, তার মনে হয়, গায়ের লোকজন তাকে মারার জন্য বসে আছে দাক্ষিণধারে। আমেনাবিবি কবিরাজ আনে, ঝাড়ফুঁক করে কিন্তু অবস্থা দিনে দিনে আরো খারাপ হয়। এমনকি পাটঘর, ধানের মটকা আর মিষ্টি আলুর স্তূপ, কুরচা যাওয়া মুরগির চুলচুলা, এসবের ভিতরই সে সহজ থাকে।

চন্দ্রভানুর ভালো না থাকার খবর কীভাবে সে পায় কে জানে। নাকি দলুই খবর পাঠায়! ঘোরের মধ্যে শুধু বলে, আমাল চন্দ্র ভালা নাই গো, তারে আইনা দাও। ইতিমধ্যে বছর গড়ালেও মনুর আত্মহনন আর চন্দ্রভানুর কুশাইমাঝির কন্যা হত্যা দগদগে ঘা সারা গ্রামে চলমান। কী কারণে কে জানে, গাতকদের গানের কাহিনীতে দলুর বিশ্বাসঘাতকতা কি মনুর আত্মহত্যা স্থান পায় না।

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পনেরো 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *