উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব দশ-এগারো
উপন্যাস ।। আজিরন বেওয়া - রাশেদ রেহমান
দশ
রেডিওতে কাজিপুরে ঝড়ের খবর শুনে মাইনে বাবদ টাকা-পয়সা মহাজনের কাছ থেকে তুলে মানিককে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয় বছির। আসার পথে ঢেকুরিয়া হাট থেকে দুই সের মহিষের গোস্ত কেনে। মানিককে বলে, ‘বাবা মানিক, আইজ আমার বাড়িত থাইক্যা কাইল ব্যানা সুফিয়াকে নিয়ে বাড়ি যাইও। মানিকের মনেও কোকিল ডাকে। তারও ভীষণ আনন্দ। ঘরে ফেরার আনন্দ। স্ত্রীর কাছে ফেরার আনন্দ। কতদিন সে সুফিয়াকে আদর করে না। বহুদিন পর আবার সে সুফিয়াকে কাছে পাবে, আদর করবে, ভালোবাসবে। মনে মনে কত কিছু ভেবে রেখেছে। তার যে অনেক কথা বলার আছে যুবতী বউকে। তাই মামার কথায় সে সন্তুষ্ট হতে পারে না। তার ইচ্ছে আজই বউকে নিয়ে নিজ ঘরে উঠবে।
বছিরের বাড়িতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়। কারণ, লগি-বৈঠার নৌকায় নদী পার হতে হয়। মাঝির সরাৎ সরাৎ বৈঠা বওয়া তার কাছে মন্থর মনে হয়। বৈঠা নিজেই হাতে নেয় বছির। তাতেই ত্বরিত আসতে পারে বাড়ি। জোছনাধোয়া মায়াবী রাত। গোস্ত রান্না করে সুফিয়া। মানিকসহ সবাইকে খাওয়ায় আজিরন। সন্তানরা অনেক দিন পর গোস্ত দিয়ে পরম তৃপ্তির সাথে খায়। তাদের কাছে আজকের খাওয়া অমৃতের মতো লাগে। তাদের খাওয়া দেখে আজিরনের ভালো লাগে। মনটা খুশিতে ভরে যায়। চোখের কোণে পানি জমে।
খাওয়া শেষে বাড়ি যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে মানিক। ষোড়শী যৌবনা বউ সুফিয়াকে একান্তভাবে পাওয়ার কামনা-বাসনা তাকে পাগল করে তোলে। অনেক দিন সে ভরাযৌবনা বউকে রেখে খিয়ারে ছিল। সে জানে এমন স্ত্রী বাড়ি রেখে দূরে গেলে তার মন কেমন আনচান হয়। কেমন করে সে স্বামীকে কাছে পাওয়ার জন্য। মানিকের অবস্থা তেমনই হয়েছে।
আজিরন মানিকের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলে, ‘দু-এক দিন বাদে সুফিয়াকে নিয়ে আবার বেড়াতে আইসো কিন্তু।’
মানিক হেসে মাথা নাড়ে। তারপর সুফিয়াকে নিয়ে রাতেই বাড়ি চলে যায়। বাড়ি ফিরে মানিক অনেক দিনের জমানো ভালোবাসা আর উষ্ণতার পাললিক পরশ এঁকে দেয় সুফিয়ার সারা শরীরে। কিন্তু সুফিয়ার তাতে মন ভরে না। মানিকের সাময়িক উত্তেজনা তার শরীরের চাহিদা মেটাতে পারে না, বরং বাড়িয়ে দেয়। মানিক ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে সুফিয়ার জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির কামার্ত অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ছটফট করতে থাকে সে। সে বুঝতে পারে যে আগুন সাইফুল তার মনে জ্বালিয়ে দিয়েছে তা মানিকের পক্ষে নেভানো সম্ভব নয়। রাতটা কাটানোই তার কাছে বড়ো কষ্টের হয়ে ধরা দেয়। সাইফুলেরও সে রাতে ঘুম হয় না। রাতভর ছটফট করে। কী করবে ভেবে পায় না। সুফিয়াকে কাছে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। যে করেই হোক সুফিয়াকে কাছে পেতেই হবে। না হলে তার কামনার জ্বালা মিটবে না।
এগারো
সে রাতের পরের দিনটা কোনোমতে পার করে সাইফুল। তার পরদিন রাত নয়টা বাজতেই সুফিয়াকে দেখার জন্য মানিকের বাড়ি যায় সে। বাড়ির পালান থেকেই ডাকাডাকি করে সাইফুল—
‘মানিক ভাই বাড়িতে আছেন? মানিক ভাই।’
ডাক শুনে মানিক দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে। সাইফুলের হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে। অনুনয়ের সাথে বলে, ‘আপনে আমারে ভাই কন ক্যা? আপনে মানিক কইবেন। পনেরো বছর আপনেদের বাড়িতে চাকর খাটছি। আপনের মা-বাবাই তো আমাকে ছোট থেকে মানুষ কইরছে। আপনের মা-বাবা না দেখলে আমার কী হইত আল্লাহ্ই জানে। তা কী মনে কইরা গরিবের বাড়িতে আইছেন?
‘দ্যাখো মানিক, গরিব-ধনী সবাই আল্লাহ্র বান্দা। তাছাড়া তুমি ছোট হলেও বিয়ে-শাদি করেছ। তোমার বউয়ের সামনে তোমার নাম ধরে ডাকলে কেমন দেখায় না! ও যে কথা বলতে আইছি; কামলা-টামলা দিবা নাকি?’ উপযাচক হয়েই জানতে চায় সাইফুল। যেন মানিকের জন্য তার কত দরদ, মানিকের অভাব যেন তাকেও পীড়া দেয়।
মানিক বলে, ‘না ভাই। দুই মাস খিয়ারে ধান কাইটা আইছি। সামনে সিলেট কাবারে যামু। তাই যে কয়দিন হাতে পাই একটু জিরামু।’
এ কথা শুনে সাইফুল নিরাশ কণ্ঠে বলে, ‘ঠিক আছে।’
মানিক সরল মনে বলে, ‘সাইফুল ভাই, আমার বাড়িত যহন আইছেন একমুঠ ডাল-ভাত খাইলে খুশি অইমু।‘ এ সময় সাইফুল চালাকি করে বলে, ‘আমি ভাত খেলে কামলা চাইব কেডা? তাছাড়া দশ-বারোজন কামলা দরকার।’
এমন কথায় সোজা-সরল মানিক বলে, ‘আপনে ভাত খাইতে বয়েন; আমি পশ্চিম পাড়া যাইয়া কামলা চাইয়া আহি। সুফিয়া, সাইফুল ভাইকে তাড়াতাড়ি খাইতে দাও। মাছের মাথাডা দিও কইলাম।’
‘আচ্ছা যাও। দশ-বারোটা কামলা ঠিক করবা কিন্তু।’ জানায় সাইফুল।
মানিক ঘর থেকে বের হতেই কেরোসিনের কুপি নিভে যায়। আদিম নেশায় মেতে ওঠে দুটি নিশাচর প্রাণী। তৃষ্ণার্ত সুফিয়ার কামার্তদেহ গত রাতের মানিকের অপারগতার হিসাবটুকু সাইফুলের কাছ থেকে বুঝে নেয় কড়ায়-গণ্ডায়। নিমিষেই প্রশান্তির বর্ষণে উরুসন্ধির ঝরনাধারায় শুদ্ধিতার জল ঢেলে সুফিয়ার শরীরে লেপ্টে থাকা সাইফুলের শরীর ছাড়িয়ে নেয়। এমন সময় মানিকের ডাকে দরজা খোলে সাইফুল। সুফিয়া তড়িঘড়ি করে কুপি জ্বালায়। সাইফুল জড়োসড়ো হয়ে বসে চৌকির এক কোনায়।
দরজা বন্ধ, কুপি নেভানো দেখে সুফিয়াকে সন্দেহ করে মানিক। কিন্তু কিছু বলে না। অন্যদিকে লজ্জা পেয়ে কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সাইফুল। মানিক নির্বাক বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। সুফিয়াও কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে।
সুফিয়া যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন মানিকের ঘুম ভেঙে যায়। মানিক ভাবতে থাকে, সুফিয়া আগের মতো নেই। সে নষ্ট হয়ে গেছে। এ জন্য নিজেকেই দায়ী করে সে। ভাবে বিশ্বাসের ঘর চুরি হয়েছে তার। যে তার দেবতা সমতুল্য, যার বাবা তার পিতার মতো, তাকে বিশ্বাস না করে উপায় কী? তাই বলে সরলতা ও দুর্বলতার সুযোগ মানুষ এভাবে নেয়! মানিক ভাবে, তারা দরিদ্র হতে পারে কিন্তু তাদের মন পবিত্র। মালিক যদি কর্মচারীর ঘরে চুরি করে তাহলে কীভাবে ঠেকাবে সে চুরি? কোথায় মানুষের মনুষ্যত্ব, নারীর সতীত্ব আর মানুষের বিবেক? কবে জাগ্রত হবে মনুষ্যত্বহীনদের আত্মিক সত্তা?
আরও কত ভাবনাই মানিকের মনে এসে ভিড় করে। নানা প্রশ্ন মনের কোণে উঁকিঝুঁকি মারে। নিজেকে সে প্রশ্ন করে, প্রথম দেখাতেই এমন কাজ করতে পারে কেউ? নিজেই আবার তার উত্তর দেয়, অবশ্যই না। ফের প্রশ্ন করে নিজেকে, তবে কি সুফিয়ার সাথে সাইফুলের আগেই গোপন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? তা না হলে কী করে এসব সম্ভব?
ভাবতে ভাবতে মানিকের অন্তর ডুকরে কেঁদে ওঠে। নিজেকে বড়ো একা মনে হয় এই নশ্বর পৃথিবীতে। তার কেউ নেই। সে খুব একা। যাকে আপন ভাবত, যে ছিল অন্ধকারে পথচলার দীপ্ত শিখা সে অন্যের হয়ে গেছে। পৃথিবীটাকেই তার স্বার্থপর, প্রতারক মনে হয়। তার মনে হয় পৃথিবীতে সে শুধুই একা। বড়ো একা।
যন্ত্রণায় বুকের ভেতরটা ছটফট করতে থাকে মানিকের। তার মনে হয় বুকের ওপর দিয়ে চলন্ত ট্রেন পিষে গেলে ভালো হতো। ভাবে, পিতা-মাতা মরার সময় কেন তাকে সঙ্গে নিয়ে গেল না! এ সময় পাশে গভীর ঘুমে নিথর হয়ে পড়ে থাকা সুফিয়াকে তার ধর্ষিতার বিকৃত লাশ মনে হয়।
ধীরে ধীরে রাত গভীর হয়। বাড়তে থাকে মানিকের ভাবনা। কার জন্য এত পরিশ্রম? যাকে সুখী করার জন্য দিন-রাত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা কামাই, সেই কিনা…! এভাবেই চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে রাত ভোর করে।
অভিশপ্ত রাতের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বছির উদ্দিনের বাড়ি চলে যায় মানিক। মামি আজিরনকে রাতের বিষয়টি খুলে বলে এবং মামাকে জানাতে নিষেধ করে। হাজার হোক আপন ভাগ্নি। শুনলে ভীষণ কষ্ট পাবে সে।
আজিরন মানিককে বলে, ‘তুমি কোনো চিন্তা কইরো না, নিশ্চিন্তে সিলেট কাবারে যাও। তোমার নির্বুদ্ধিতার কারণে সাইফুল সুযোগডা পাইছে। সাইফুল যাতে এ বাড়িত না আইসপার পারে ওর মাকে বইলে হেই ব্যবস্থা কইরতাছি। সুফিয়ার সব দায়িত্ব আমার ওপর রাইখপার পারো। তোমার বিশ্বাসের অমর্যাদা হইবার দিমু না।‘
‘হেই বিশ্বাস আমার আছে মামি। কিন্তু মনডায় মানে না। ঠিক আছে আইজকা আহি।’
আজিরনের আশ্বাস পেয়ে বাড়ির পথ ধরে মানিক। কিন্তু তার মনকে প্রবোধ দিতে পারে না। মনের কোণে অবিশ্বাসের মেঘ একবার ঘন হলে তা হালকা করা ভারি শক্ত যে। তার রক্তাক্ত হৃদনদীতে দুকুল হারাবার গ্লানি, লজ্জা, ক্রোধ। কী করার কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
