উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব বারো-তেরো
উপন্যাস ।। আজিরন বেওয়া - রাশেদ রেহমান
বারো
মাঘ মাস প্রায় শেষ। শীতের কনকনে ভাবটা কমতে শুরু করেছে। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনীবার্তা চারদিকে। শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার রাঙা আভা আর কোকিলের কুহু কুহু ডাকই বার্তা দেয় প্রেমের ঋতু বসন্তের। আসি আসি বসন্তের এমনই এক সকালে হালকা কুয়াশা ভেদ করে ঝলমলে সোনামাখা মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে মাটির গায়ে; সেই রোদে উঠোনে শুকাতে দেয়া খড়ের ওপর বসে মেয়ে আদরীকে কাছে ডাকে বছির, ‘মা আদরী, অ্যাল্লা এহেনে আয় তো মা।’বাবাকে কাছে পেয়ে আদরীও ভীষণ খুশি। মেয়েটা বড্ড বাবাঘেঁষা হয়েছে। সারাক্ষণ বাবার কাছে কাছে থাকে। বাপের ডাক শুনলেই ছোট ছোট পায়ে ভোঁ দৌড়। দ্রুম করে ঘাড়ের ওপরে পড়েই গলা জড়িয়ে ধরে, ’বাজান কী কন?’
মেয়ের বাজান ডাকে আত্মাটা বিনা শরবতে জুড়িয়ে যায় বছিরের। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে। তাই মেয়ে আদরীকে মায়ের মতোই আদর করে সে। মেয়ের পিতৃভক্তি দেখে বারবার মায়ের কথা মনে পড়ে তার। এ জন্য মেয়েকে মা ডাকে। আদরীর সবধরনের আবদার পূরণের চেষ্টা করে। রাতে জোনাক পোকা ধরে দেয়। নিজেকে সওদাগরি ঘোড়া বানিয়ে মেয়েকে সওয়ারি করে ।
মেয়ে আহ্লাদি কণ্ঠে বলে, ‘বাজান, হাফিজা নানি কইছে চাঁদের বুড়ির সুতা মাথায় দিলে চুল কালা হয়। আমারে তুমি চাঁদের বুড়ির সুতা আইনা দিবা ?’ মেয়ের এমন আদুরে আবদার পূরণ করতে কোন বাবা না চায়! বছিরও তাই করে। মেয়ের কথামতো খেতের আইল ঘুরে মেয়ের জন্য চাঁদের বুড়ির সুতা কুড়িয়ে আনে। রাতে বাবার বুকের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে আদরী। এ সময় বছিরের বড়ো ভালো লাগে। ভালো লাগে মেয়ের বাজান ডাক, মেয়ের আদুরি কথাবার্তা, আবদার আর বাবার প্রতি ভালোবাসা। আহ! এমন শান্তি বুঝি আর কিছুতেই মেলে না। বছির উদ্দিনের নীরবতা দেখে আদরী বলে, ‘বাজান কথা কও না ক্যা?’
মেয়ের কথায় সম্বিত ফিরে পায় বছির। বলে, ‘তোর মাকে এহেনে ভাত দিয়া যাবার ক।’
বাবার কথা শুনে কপালে চুমু দিয়ে দৌড়ে ঘরে যায় আদরী। মেয়ের এমন আদর পেতেই বারবার ছুটে আসতে ইচ্ছে করে বছিরের। বাড়িতে থেকে যেতে চায় মন। কিন্তু অভাব তার সে আশায় বাদ সাধে। ঘর ছেড়ে না গেলে রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। কী করে পরিবারের ভরণপোষণ চালাবে? এ যে তার প্রধান দায়িত্ব। আমৃত্যু তাকে এ দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। থাকতে হবে পরিবার-পরিজন থেকে দূরে। আহ! গরিবের কপালের লিখন বুঝি এতই করুণ! মনের ইচ্ছা, ভালো লাগা বলতে কিছু আর থাকে না যেখানে।
মেয়ের কথামতো কিছুক্ষণের মধ্যে আজিরন এক বদনা পানি আর রসুন পাতা ও কাঁচা মরিচ দিয়ে তৈরি বেগুন ভর্তাসহ এক থালা কড়কড়া ভাত নিয়ে আয় বছিরের জন্য। খড়ের গাদায় ভাত খেতে দিয়ে স্বামীর পাশে বসে আজিরন। বলে, ‘হোনেন আজিবারের বাপ, একখান কথা কইবার চাই।’
‘কী কথা কও?’
‘এইবার সিলেট কাবারে না গেলে অয় না?’
‘ক্যান? এই কথা কও ক্যা? সিলেট না গেলে চলমু ক্যামনে? এডা তো অসময়ের কামাই। তাছাড়া এতগুলা মাইনসের পেটের ভাতই বা কেমনে আইব?’ বিস্ময়মাখা কণ্ঠে জানায় বছির। বছিরের এমন কথায় আজিরন বলে, ‘দ্যাহেন আজিবারের বাপ, আগে সম্বল বলতে পিণ্ডা ছাড়া কিছু ছিল না। এহন দুইডা গরু আছে, পাঁচ-ছয়ডা ছাগল, হাঁস-মুরগি, আল্লাহ্র রহমতে কম নাই। তাছাড়া গতবার সিলেট কাবারে যে ঘটনা ঘটছে, তাতে আপনারে আর সিলেট কাবারে যাইবার দিতে মন চায় না।’
এবারে বছির বুঝতে পারে কেন আজিরন তাকে সিলেটে কাবারে দিতে চায় না। সিলেটের হাওর অঞ্চলে শত শত একর জমিতে ধান আবাদ হয় শুকনো মৌসুমে। বর্ষা এলে পুরো হাওর অঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। বর্ষা আসার আগেই জমির মালিক মহাজনরা ধানচুক্তি ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ করায়। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নৌকার মালিকরা সিলেটে হাওরের মালিকদের সাথে ধান কাটার চুক্তি করে আসে। চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার দিনমজুর নিয়ে নৌকাসহ সিলেট গিয়ে হাওরে ধান কেটে আসে তারা। মাইনে বাবদ নৌকাভর্তি ধান নিয়ে নিজ গ্রামে ফেরে। হাওরে ধান কাটার সময় প্রখর রোদ এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে তৃষ্ণার্ত হয়ে কামলারা হাওরের পচা দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেয়ে কলেরা, আমাশয়, জণ্ডিসের মতো রোগে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার অভাবে অনেকে আবার হাওরেই মারা যায়। লাশ পর্যন্ত বাড়িতে আনা সম্ভব হয় না; হাওরেই সৎকার করতে হয়। তাই আজিরন নিষেধ করছে বছিরকে কাবারে যেতে। তার ভয় সেখানে, এমন সর্বনাশ বছিরেরও হতে পারে।
আজিরনকে বোঝায় বছির, ‘গতবারের ঘটনা একটা দুর্ঘটনা। তাছাড়া গত বিশ বছর ধরে সিলেট কাবার হরছি। আমি হুনছি যে ঘটনা ঘটেছে হের জন্য মহাজনের দোষ নাই।’
ঘটনাটা এ রকম, সিলেট কাবার শেষে নৌকাভর্তি ধান নিয়া বাড়ি ফেরার পথে বেশিরভাগ সময় নদীর পানি পান করতে হয়। একজন লোক ময়লা পানি খেয়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। নৌকার মোক্তার কামলার কথামতো ওকে পানি খাওয়ায় না। ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়ায় লোকটা একেবারে মরণাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে মৃত ভেবে ভৈরব এসে নৌকা থেকে নদীতে ফেলে দেয় তাকে।
এদিকে ঘাটে খবর ছড়িয়ে পড়ে ফজল সিলেট কাবারে গিয়ে ডায়রিয়ায় মারা গেছে। নৌকার মহাজন ফজলের মাকে পঞ্চাশ মণ ধান দেয় এবং গরু দেয় ফজলের তামদারির জন্য। কিন্তু তামদারির দিন সকালে ফজল এসে বাড়িতে হাজির হয়। সবাই অবাক হয়। মরা মানুষ কীভাবে ফিরল?
ফজল বলে, তাকে পানিতে ফেলে দেবার পর পেট ভর্তি পানি খেয়ে শরীরে কিছুটা শক্তি পায়। তারপর কোনোমতে সাঁতরে কিনারে এলে স্থানীয় লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে সুস্থ করে তোলে। পরে এই ঘটনার জন্য গ্রাম্য শালিসে নৌকার মহাজনকে শাস্তি দেয়। এ ঘটনা শোনার পর থেকে আজিরনের ভেতর ভয় ঢুকে যায়। স্বামীকে নিয়ে তাই শঙ্কা মনে। শেষে আজিরন বলে—
‘আপনে যহন আমার কথা হুনবেন না তয় কী আর করা। যাইবার সময় মানিককে সঙ্গে নিয়া যাইবেন। হুনছি মানিক কাবারে যাইবার চায় না।’
‘ঠিক আছে।’ সায় দেয় বছির।
মানিককে সাথে নিয়ে কাবারে যায় বছির। যাবার সময় ভাগ্নি সুফিয়াকে বাড়িতে রেখে যায়। আজিরনকে বলে যায় সুফিয়ার দিকে খেয়াল রাখতে। কেবল মানিক চুপচাপ। তার কোনো কিছু বলার নেই। আগেরবার যাওয়ার সময় সুফিয়াকে রেখে যেতে তার মন খারাপ হয়েছিল, এবার ঠিক উল্টো কারণে তার মন খারাপ। তাই তেমন কিছু না বলে বছিরের সাথে ঘর থেকে বাইর হয় সে। অন্যদিকে সুফিয়া মহাখুশি। কারণ, মামার বাড়িতে সাইফুলের সাথে মেলামেশায় বাধা নেই। এ কারণে নানা মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে মানিককে কাবারে পাঠাতে সে সক্ষম হয়। নারীর মিষ্টি কথায় কতক্ষণ নিরব থাকা যায়! সেখানে স্ত্রীর কথা তো গন্দম ফল। খাইলে নরক, না খাইলে একঘেঁয়েমি। বছির উদ্দিন ধান কাটতে সিলেট যাবার পর থেকে আজিরনের ঘুম হয় না। একটু ঘুম হলেও নানা ধরনের দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায়। বাড়িতে মা অসুস্থ, কখন জানি চলে যায়। আজিরনের কাছে খবর আসে তার মা ভীষণ অসুস্থ। আজিবার ও সুফিয়াকে রেখে হারান, পরান ও আদরীকে নিয়ে মাকে দেখতে যায়। এদিকে গ্রামের অবস্থাও ভালো না। প্রায় প্রতি রাতেই চোর ঢোকে গ্রামে। বিভিন্ন বাড়িতে চুরি হয়। তাই আজিবার গরু পাহারা দেওয়ার জন্য গোয়ালঘরের মাচায় ঘুমায়। এই সুযোগটাই সুফিয়া ও সাইফুল কাজে লাগায়। বাঁধা-বিপত্তিহীনভাবে চলে তাদের কামলীলা।
তেরো
মাঝরাত। সাবধানি পায়ে গরুচোর ঢোকে কেরাম ব্যাপারির গোয়ালঘরে। দড়ি খুলতে গিয়ে গরুর গুঁতা খেয়ে ‘মাগো’ বলে কঁকিয়ে উঠে দৌড় দেয় চোর। কেরাম ব্যাপারির গোয়ালঘর আজিরনের গোয়ালঘরের পাশাপাশি হওয়ায় আজিবার চোর চোর বলে চোরের পিছে দৌড়ায়। কিন্তু গরু চোর রাতের অন্ধকারে নিমিষেই পালিয়ে যায়। গ্রামের সবাই চোর চোর বলে আজিবারের পিছু ছোটে এবং একসময় চোর সন্দেহে ধরে মারতে মারতে মন্টু মাতব্বরের বাড়ি নিয়ে যায়। আজিরন খবর পেয়ে রাতেই বাবার বাড়ি থেকে ছুটে আসে মন্টু মাতব্বরের বাড়ি। চুরির ঘটনা শুনে অবিশ্বাসমাখা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কেন তার ছেলে চুরি করতে যাবে! এমন ঘটনা তার দ্বারা ঘটেনি! গ্রামের এতগুলো লোকের সাব্যস্তকরণ। সত্যিই ঘটনার সাথে আজিবার জড়িত? মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে সে বুঝে উঠতে পারে না ব্যাপারটা। আবার ভাবে, তার অনুপস্থিতিতে আজিবার লোভে পড়ে এমন কাজ করেছে? না, তার ছেলে চুরি করতে পারে না! বহু অনুনয়-বিনয় করে মাতব্বরের পা ধরে আজিবারের জন্য ক্ষমা চায়।
কিন্তু কে শোনে দুঃখীর কথা! সমাজের সুশীতল বৃক্ষছায়া ধনীদের পক্ষে। এমনকি ঈশ্বরও। দারিদ্র্যপীড়িত দেশে ধনীরা কখনোই গরিবদের দিকে তাকায় না। গরিবের স্বার্থ ধনিক শ্রেণির অনুগ্রহের সাথে জড়িয়ে থাকায় গরিবরাও গরিবের কথা বলতে সাহস করে না। বিচার, মামলা, মোকদ্দমা সবই পয়সাওয়ালাদের জন্য। এখানে দরিদ্ররা পরগাছার মতো। ইচ্ছে হলে বিনা দোষে উপড়ে ফেলা যায়। সেখানে চুরির বিষয়টি তো আরও নাজুক। ধনীদের ধারণা, অভাবে পড়ে গরিবরাই চুরি করে। কিন্তু ধনীর জোচ্চুরির কোনো বিচার নাই। বিচার কেবল গরিবের জন্যই। তাই তারা চুরি না করলেও চোর। ডাকাতি না করলেও ডাকাত। সুবিচারের আশা তাই ক্ষীণ। আজিবারের বেলায়ও তাই ঘটেছে। চুরি না করেও সে এখন চোর।
অভাব-অনটনের মাঝে থেকেও আজিরন কোনোদিন কারো কিছু ছুঁয়ে দ্যাখেনি। বাড়ির মধ্যে কেরাম ব্যাপারির গাছের আম পড়েছে কিন্তু সে ছেলে মেয়েদের ঘরে আটকে রেখেছে, তবুও আম ছুঁতে পর্যন্ত দেয়নি। না খেয়ে থেকেছে কত রাত, কত দিন, তবুও কোনোদিন খারাপ চিন্তা তার মাথায় আসেনি। সন্তানদেরও সে শিক্ষা দিয়েছে। এখন তার পরিবার মোটামুটি সচ্ছল। তবে কেন এই পরীক্ষায় ফেলল তাকে বিধাতা? সারারাত তিনটি নিষ্পাপ শিশু নিয়ে আজিবারের পাশে বসে থাকে আজিরন। আজিবারের হাত বাঁধা। এমন পরিস্থিতি আসবে তা কোনোদিন ভাবেওনি আজিরন। তাই ছেলের এমন অবস্থা দেখে বুক ফেটে কান্না আসে তার। চিৎকার করে সমাজকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে ছেলের হাতের বাঁধন খুলে দিতে। ইচ্ছে করে মনের ভার দূর করতে ডুকরে কাঁদতে। কিন্তু তাতেও ভয়, যদি সমাজপতিদের ঘুম ভেঙে যায়? যে ছেলের গায়ে সে কোনোদিন হাত তোলেনি আজ তাকেই চুরির দায়ে নির্দয়ের মতো মেরে রক্তাক্ত করেছে! ছেলের দিকে তাকালে আজিরনের বুক ঠেলে কান্না আসে। কিছুতেই রোধ করতে পারে না সে কান্না। শেষে আঁচলে চোখ মুছে আজিবারের জামা খুলে দেখে। জামা খুলতেই আঁতকে ওঠে। আজিবারের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। কোথাও কোথাও লাঠির আঘাতে ফেটে গেছে। সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আজিবারের ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে মা আজিরন অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। শ্রাবণের বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকে তার চোখের জল। তার অঝোর ধারার কান্নার সাথে পাল্লা দিয়ে শেষ হয় রাত। ভীষণ কষ্টের রাত। এত বছরের সংসার জীবনে যা কোনোদিন আজিরনকে এভাবে অনুভব করতে হয়নি।
