উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব চার
৪.
আমার বয়স যখন বারো বছর তখন মা মারা যায়। আমার স্মৃতি সঞ্চয়ের প্রথম দিন ছিল মায়ের মৃত্যু দিন। সেদিন থেকেই আমি আমার ছেলেবেলার গল্পগুলোকে বুকের গোপন বাকসোতে জমা রাখতে শুরু করেছিলাম। তখন জানতাম না যে একদিন এইসব স্মৃতিই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে, এই অমূল্য সম্পদ যেন হারিয়ে না যায় সেজন্য এদেরকে সযতনে বাকসো বন্দি করে রেখে দিতে হবে। এসব না বুঝেও নিজের অজান্তেই আমি এতদিন পরম যত্নে স্মৃতিবাকসো পাহারা দিয়েছি। আজ সেই বাকসো খোলার দিন। বর্তমানে বসতি গড়া আমার সেই বাকসোতে ডুব দেওয়ার দিন। আজ আমার নিস্তব্ধতাকে ভেঙেচুড়ে একাকার করার দিন।
মৃত্যুর আগে মা শারীরিক-মানসিকভাবে অনেকটা সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। মাকে সুস্থ করতে বড় মামার চেষ্টার অন্ত ছিল না। মাকে তিনি বারকয়েক শহরে নিয়ে গিয়েছিলেন। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ধীরে ধীরে মায়ের অবস্থা পাল্টে যাচ্ছিল। দাদাবাড়ির মতো এই বাড়িতে মায়ের কোনো আলাদা ঘর ছিল না। মা, আমি আর নানি রাতে এক ঘরে ঘুমাতাম। আমাদের বিছানায় ফুল আঁকা অয়েলক্লথ বিছানো থাকতো। মায়ের শরীরের ভেজা গন্ধে আমার বা নানির কোনো অসুবিধা হতো না। মা-ও আগের মতো কাউকে আক্রমণ করতো না। মা কথাও বলতো খুব কম। হঠাৎ হঠাৎ লঘুস্বরে আমাকে ডেকে বলতো, ‘এ নূর, নূর, দ্যাক তো রে গেটের কাছত কেটা অ্যালো, মনে হয় তোর বাপ।’
মায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠার এই আচরণটুকুই শুধু ছিল অস্বাভাবিক। বাড়ির সবাই মায়ের এই অস্বাভাবিকতা দেখতে পেত কিন্তু কেউ বাবাকে কোনো খবর দিতো কি না জানি না। হয়তো বাবা খবর পেয়েও আসতো না। মা তবু বাবার জন্য প্রতীক্ষায় থাকতো। মায়ের সুস্থতার পরেও আমি মায়ের বিশেষ কোনো মনোযোগ পেতাম না। তাই আমারও মায়ের সঙ্গ পাওয়ার তেমন কোনো লোভ ছিল না। নানাবাড়িতে সবার অনুগ্রহে বেড়ে ওঠা আমার মায়ের প্রতি কোনো দাবী গড়ে ওঠেনি। তবু মা ছিল। যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে অন্তত একবার বাবার খোঁজ নিতে আমাকে কাছে ডাকতো। মা যেদিন মারা গেল সেদিন পুরো দুপুর টো-টো চক্কর শেষে তুষারের পিছু পিছু বাড়িতে ঢুকে ভাতের আশায় সরাসরি রান্না ঘরে পা দিয়েছিলাম। স্কুলফেরত খেলতে খেলতে একমাত্র ক্ষুধা পেলেই আমি আর তুষার বাড়িমুখো হতাম। সেদিনও পেটের তাগিদে স্কুলের পোশাক কাদা-জলে মাখামাখি করেই বাড়িতে ঢুকেছি। আমার আবছা আবছা মনে আছে, বাড়ির লোকজন আমাকে আর তুষারকে পাত্তা না দিয়ে মাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। বিছানায় শায়িত মায়ের চোখ দুটা অগ্নিগোলকের মতো বের হয়ে আসছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে মায়ের চাহনি যেন আরও দুর্মর হয়ে উঠেছিল। আমার দিকে তাকিয়ে মা দুর্বল কণ্ঠে বলেছিল, ‘এ নূর তোর বাপ আচ্চেরে। দরজাখান খুলি দে।’
সেদিন তো অত বুঝিনি। এতকাল পড়ে আনমনে সেই দিনটিকে নতুনভাবে চিত্রিত করতে করতে আমি মায়ের মুখ নানাভাবে দেখতে পাই। সত্যি বলতে কী, শুধু মায়ের অস্থির কণ্ঠস্বরই আমার স্মৃতিতে আছে। সকল ঘোর কাটিয়ে একটা কাতর কণ্ঠস্বর হঠাৎ হঠাৎ অচেনা এক তরঙ্গের মতো বেজে উঠছিল, ‘এ নূর তোর বাপ আচ্চে রে।’
আমি বাড়িতে আসা মানুষের ভিড়ে বাবাকে খুঁজেছিলাম। দৌড়ে দরজা অবধি ছুটেও গিয়েছি। অথচ কী অবাক কাণ্ড, বাবার চেহারা আমার মনে ছিল না। অত লোকের ভিড়ে কীভাবে আমি অচেনা বাবাকে খুঁজে পাবো জানতাম না। তবুও আমি বাবাকে খুঁজেছি। সেদিন বাবা আসেনি। বাবার বদলে ভিড় ঠেলে কয়েকজন লোক খাটিয়া এনে উঠানে রেখেছিল। কাফনে মোড়া লাশ খাটিয়ায় তুলে খাটিয়া বহনকারী অচেনা লোকগুলো ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আশাহাদু আন্না মোহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুলাহ’ধ্বনি তুলতে তুলতে চোখের আড়াল হয়ে গিয়েছিল। বাতাসে ভেসে বেড়ানো আগরবাতির অপরিচিত সৌরভের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা আমি অপার বিস্ময় নিয়ে তুষারের হাত ধরে মায়ের পিছু নিয়েছিলাম। ভিড়ের মধ্যে কারা যেন বলছিল, ‘অমন খারাপ লোকের কি আর বউ-বাচ্চার কথা মনে আছে? শেষকালে নুরুন্নাহার স্বামীরে একনজর দেখতে পারল না। মনের আশ পুরা হইল না। স্বামীটা জম্মের খারাপ।’
মনে পড়ে, ফুপুজি বলতো, ‘খারপের মদ্যে ভালোটা নুকি থাকে। সর্ষ্যাদানার নাকান সেই ভালার ওজন, কিন্তুক খুব ভারি।’বড় হতে হতে নিজেকে প্রশ্ন করতাম, বাবার মধ্যে ‘ভালো’ খুঁজে পেতে হলে আমাকে কি আরেক জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? অপেক্ষায় আমার ক্লান্তি আসে। তাই আমি অপেক্ষায় থাকি না। আমার শরীর, আমার মন থেকে যার বসত যোজন যোজন মাইল দূরে তার জন্য অর্থহীন অপেক্ষায় থাকতে প্রকৃতি আমাকে শেখায়নি। তবে আমি শুধু তুষারের জন্য অপেক্ষা করতাম। তুষারের পর আর যার পদধ্বনির জন্য আমি অপেক্ষা করতাম সে ছিল আমার মামা। আমার সারাদিনের কাজের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল মামার জন্য কিছু করতে পারা। তার কাঁটা কাঁটা গোঁফের নিচে পান খাওয়া, সিগারেট টানা কালো ঠোঁট জোড়ার ফাঁক থেকে নিঃসৃত ‘মা’ ডাকটি আমার শৈশবকে মায়ায় বেঁধে রাখতো। আমার মামার নাম শাফায়েত মিয়া, মিয়া বাড়ির একমাত্র ছেলে। বাড়ির প্রধান কর্তা হিসেবে মামা ছিলেন মামীর সম্পূর্ণ বিপরীত। মামীর সার্বিক আচরণের প্রতিক্রিয়ায় মামা ছিলেন একজন মুখ হাঁ করা নির্বাক দর্শক। বিঘা বিঘা জমির চাষবাসের খোঁজখবর নিতে নিতে মামা ঘরে দুদণ্ড স্থির মতো থাকতে পারতেন না। গঞ্জে তার রড-সিমেন্টের দোকানও ছিল, তাকে সেখানেও বসতে হতো।
আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মামার মতো নিম্নকণ্ঠী মানুষের অস্তিত্ব সংসারে খুঁজে পাওয়া ছিল মুশকিল। মামীর ব্যক্তিত্বের কাছে মামাকে বরাবর নিষ্প্রভ দেখাতো। মামী পাড়া বেড়াতে বের হলে মামা যেন একটু স্বস্তি পেতেন। আমার কাছে এক বাটি গুড় মুড়ি আর চায়ের আবদার করতে করতে মাথায় হাত বুলাতেন, ‘মায়ের মতো দেখতে হইছিস রে মা।নুরুন্নাহারের ঠিক তোর মতোই পিঠ ভরা চুল ছিল।’
কোনো কোনো দিন ক্লান্ত শিশুর মতো টলমল পায়ে সামনে এসে আবদার করতেন, ‘মা এট্টু আদা চা দিবি?’ মামার আবদার শুনে আমি দৌড়ে যেতাম। মায়ের অনুপস্থিতির পর এই ডাকটুকুর জন্য মনে মনে ভীষণ কাঙাল ছিলাম। তবে মা মারা যাওয়ার পর তুষার আমার অস্তিত্বের জন্য আরও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তুষারের সাহচর্যে আমি মায়ের মৃত্যুর শোকও ভুলে যাই। সব বিষয়ে তুষারের সঙ্গে আমার সন্ধি হতে থাকে।
ঐ তুষারই একমাত্র মানুষ যার জন্য মায়ের অনুপস্থিতি আমাকে মুহূর্তের জন্যও কাবু করতে পারেনি। তবু হঠাৎ হঠাৎ কোনো কোনো আত্মীয়-স্বজন আমাকে কাবু করতে ব্যস্ত হয়ে উঠতো। আমাকে আমার বাপের বাড়ির গল্প শোনাতো। আমার বাবার দ্বিতীয় সংসার, দ্বিতীয় সন্তানের গল্প শোনাতো। এসব শুনে মামী আর নানি বাবাকে শাপ-শাপান্ত করলেও আমি বিশেষ পাত্তা দিতাম না। কারণ আমার ঐ জীবনে বাবা চরিত্রটির কোনো ভূমিকাই ছিল না। এছাড়া অন্যের জীবন নিয়ে চর্চা করা আমার নিতান্তই অপছন্দের ছিল। আমার একমাত্র পছন্দের বিষয় ছিল তুষারের ছায়াসঙ্গী হওয়া।
