উপন্যাস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ শেষ পর্ব

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব দুই

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চার

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পাঁচ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ছয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব সাত

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর আট

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর নয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর দশ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর এগারো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব তেরো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চৌদ্দ 

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পনেরো 

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ষোল

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ শেষ পর্ব

১৭ 

বাজপড়া আলোর মত উদ্ভাসিত আলোর দুপুর, বর্ষার পানি টান দিলে হোগলায় নানা পদের মাছ শুকানো দুপুর কিংবা ঝিমধরা দুপুরে ডাহুকের খানখান ডাক, ডিমে তা দেয়ার প্রস্তুতি। খালেবিলে পানি টান দেয়ায় মাছ কিলবিল পুটি, খলিসা, ভ্যাদা আর বৈচা মাছে, আর গর সেঁচে জালা বোঝাই করে শিং কৈ মাগুর টাকি শোলে। এমনকি খানাখন্দেও জীবিকায় ব্যস্ত মানুষের মাছ ধরার সময়। যদিও ত্রিশ বছর আগের মত কিলবিল মাছ আর নাই। কিন্তু উৎসব করে মাছ ধরার কমতি নাই একফোঁটাও।

 সেই দুপুরে চন্দ্রভানুকে কবরে নামানোর প্রস্তুতিপর্ব। প্রথমে মনে হয়েছে জানাজায় এত কম মানুষ তো কবরে নামানোর সময় হয়তো মানুষই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু অল্প সময়ে মানুষের ঢল নামে বিলে, কবরস্থান থেকে বেশ একটু তফাতে। আর আজিবর লাশের খুব কাছ থেকে জনতার অবয়ব লক্ষ্য করে। কুদ্দুস কয়েক বছর আগে দীর্ঘ রোগভোগের পর মারা যাওয়ায় তাকে আর এ তল্লাটে খুঁজে পাওয়া গেল না, কিন্তু পাওয়া গেলে কীভাবে কুদ্দুস চন্দ্রভানুর জন্য কাঁদত তা কল্পনা করে নিতে পারে অনেকেই।

আর চন্দ্রর ভাসুর আব্বাস, বড়ো ভাতের কষ্ট তার এখন। এখন অবশ্য শ্বাসকষ্ট নিয়ে কবরস্থানের একপাশে উবু হয়ে বসে শুন্যদৃষ্টি দিয়ে সব দেখে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষেও পর পর সে স্ত্রী মারা যায় অতিরুগ্নতায়। কিন্তু স্ত্রী বিয়োগের পর গত দুই বছরে পাঁচ সন্তান সবাই তাকে ছেড়ে গেছে একে একে শুধু বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। ছেড়ে গেছে ১৫/২০ বছর আগে সহায়সম্বল সব, গ্রামের লোকের ভাষায় ‘বাগে দিয়া ট্যাহা ভরা কলস, সোনাদানা সব বাইরায় গেছে, পাপের জিনিস!’।

আর চন্দ্রভানুর পালক মেয়ে আরজিনার ছেড়ে দেওয়া স্বামী আজিবরকে এখানে দেখতে পেয়ে গ্রামের মানুষ বাড়তি একটা উপভোগ্য বস্তু পায়। তারা মনে করতে পারে নিশ্চয়, সোনার বাসনটা সে-ই চুরি করেছিল আর আরজিনাকে বাদ দিয়ে চন্দ্রভানুর প্রতি তার অনুরাগ, যা কিনা চন্দ্রভানুই দেখতে পেয়েছিল, অথচ ঘটনা হলো, আরজিনাকে আজিবর গঞ্জনা দিত শাশুড়ির চরিত্রহীনতার কথা তুলেই। আর রজব, যে শিমুলচরের বিস্মৃত এক নাম, তাকে তো বাঁচিয়ে রাখতেই হবে গঞ্জনার প্রতিভূ হিসাবে। এত গুণবান আজিবর, যে পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ান পরিষদের চেয়ারম্যান হবে তাতে আর সন্দেহ কি! গ্রামবাসীর এই ভবিষ্যতবাণী বাস্তব হয় চন্দ্রভানুকে কবরে নামানোর বছর খানেকের মধ্যে। আর, আরেকটু যদি এগিয়ে গিয়ে বলা যায়, উত্তরকালে এমনকি পটপরিবর্তনে এমপি, তারও কিছু পরে আমেরিকা প্রবাসী হয়ে জবরদস্ত হোটেল ব্যবসায়ী হয়ে বালুময় জলাভূমির এই দেশে তিনতলা দালান করে বিলকুল দেশে না এসে, ইন্টারনেটে বসে নাতিকে দেখায় এই এই যে ব্রিজটা তার পাশে এই বাড়িটা তোমার গ্রান্ডপার, ভিলেজ নেইম ইজ শিমুলচর, আজিবর রহমান চৌধুরীর বাড়ি, এখন শুধু চৌধুরী বাড়ি …।

বলতে পারা যায় চন্দ্রকে কবরে নামানোর মধ্য দিয়েই সে গ্রামবাসীর আস্থা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ নেয়। যদিও স্মৃতিধর মানুষ এখনো অবলীলায় মনে করতে পারে আরজিনাকে বিয়ে করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রথম বউর দ্বিতীয় সন্তান প্রসবকালে পর্দার কথা বলে ঘরে ধাত্রী ঢুকতে না দেয়ার কথা, বলা চলে মেরে ফেলার প্রথম চেষ্টা। ফলাফল, গাছ বাঁচালেও ফল বাঁচেনি আর পরবর্তীতে, লোকের মুখের কথা, বিষ খাইয়ে কৌশলে মেরে পার পেয়ে যাওয়া। কিন্তু আরজিনাকে বিয়ে করতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। কী কারণে কে জানে, চন্দ্রও বিয়ে দিয়েছিল কিন্তু আজিবরের বউর প্রতি মন ছিল না। আর আরজিনার ছিল তার প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞা ‘আমগো নাদার ভাত খাইয়া না তোমার মায় তোমারে বাঁচাইছে’। কিন্তু মাত্র বছর কয়েক আগের আজিবরের কিঞ্চিত মহানুভবতার কথা তো আর গ্রামবাসী একেবারে অস্বীকার করতে পারে না! কূটলোকেরা অবশ্য সেই ঘটনাকেই আজিবরের রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভে প্রথম সাফল্য মনে করে। আরজিনার দ্বিতীয় স্বামীও অভাবের তাড়নায় তিন মেয়েসহ আরজিনাকে রেখে যায় চন্দ্রভানুর কাছে। বন্যা আর ভাতের অভাব পুরো গ্রামকে এমনি নাস্তানাবুত করে যে গোয়ালের গরুটা পর্যন্ত বিক্রি করে ভাত যোগাড় করতে হয় বহু পরিবারকে। গরু বিক্রির টাকাটা হাতে নিয়ে দালালকে জিজ্ঞাসা করে চন্দ্র, কার বাড়িতে যায় গরু?

 — আজিবর চৌধুরীর বাড়ি।

   চন্দ্র চমকে যায়, আজিবর কবে চৌধুরী হইল!

 — গরু কাইল চৌধুরী নিজেই নিতে যাইব।

পরদিন গরু নিতে আসে ইউপি মেম্বার আজিবর, হালে আজিবর চৌধুরী, গরুর দড়িটা হাতে নিয়ে উঠান ছাড়তে গেলে মেয়ে দৌড়ে গিয়ে পিতার হাত ধরে, আব্বা আমরা দুধ খামু কইত্যে? আজিবর থমকে যায়, ক্ষণকাল মাত্র বিলম্ব করে। বছর আটেক বয়স মুক্তামালার, দেখতে যেন চন্দ্রভানুরই আদল। আপন মেয়ের উদ্বেগাকুল প্রবল চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, আম্মা আপনেরে উপহার দিলাম গাইটা, আমার সাংঘাতিক অন্যায় হইতাছিল। কিন্তু এবার চন্দ্র টাকা ফেরত দিতে চাইলে আজিবর বিনয়ের সাথেই প্রত্যাখ্যান করে। জীবনে এমন সুযোগ কি আর বার বার আসে! চন্দ্র তাকে যতটা অমানুষ মনে করেছে, মেয়েকে ছাড়িয়ে নিয়েছে পাগল জামাইর বাহানা দিয়ে, আজ দেখে নিক আসলে সে অতটা খারাপ না, পাগল তো নয়ই! গ্রাম জুড়ে চন্দ্রর দারিদ্র্য যত না মুখে মুখে ফেরে তার চেয়ে মধুর মুখরোচক প্রতিশোধ হিসেবে জনে জনে ঘুরে বেড়ায় এই কাহিনী।

কবরে নামানোর আগে হঠাৎ দেলোয়ার শিকদার দলুর উপস্থিতি বিল জুড়ে আলাদা একটা আবহের সঞ্চার করে। আগত মানুষ আগ থেকে বুঝতেই পারে নাই এই দুপুরে বিলে একটা মরা মানুষকে সামনে রেখে এমন একটা ঐতিহাসিক নাটক মঞ্চস্থ হবে! ঘটনার আকস্মিকতায় মানুষ বরং বিহবল না হয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যায়। দেলোয়ারকে সাদা চাপ দাড়িতে খুব মানিয়েছে, কিন্তু চেহারার মধ্যে একটা চোর চোর ছাপ আবিষ্কার করার প্রয়াসও পায়  কেউ কেউ। তারা কি এখন তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পুরাকালের কোন মতি নামে মরা কোনো মানুষের ঘ্রাণ নিবে টেনে টেনে! অথবা তারা দেলোয়ারের মত এমন একজন বিশিষ্ট(!) লোকের এমন অবস্থায় পড়ে যাবার জন্য কটাক্ষ করবে!

কিন্তু শান্তি পায় না চন্দ্রভানুকে কবরে নামাতে প্রস্তুতি নিয়েছিল যারা। কারণ অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক আজিবর লাশ নামাতে কাঁধ দিবে। আজিবর তো এখন তার কেউ না, বহু কীর্তির পর বিয়ের বছর দু’একের মধ্যে একটা মেয়ের জন্ম দেয়ার পর সম্পর্ক চুকে বুকে গেছে আরজিনার সাথে। এই একবার মাত্র চন্দ্রভানুর আত্মীয়-পরিজনের সমর্থন পাওয়ার সম্ভবনা থাকলেও পায় না। কেননা যত কিছুই হোক, গ্রামের লোক শেষ পর্যন্ত হয়তো এক কালের হাভাতে আজিবরের সাথেই নিজেদের নৈকট্য অনুভব করে থাকবে। চন্দ্রর সোনার থালা হারালে গণক এনে তুলারাশির জাতক দিয়ে বাটি চালান দেয়া, আর বাঁশ চালান দিয়া কে ভোলে! চোর নির্ণয় করলে চোর বলে, আমি নিজেও তো তুলারাশি, রাশি তো রাশিরে খুঁজবই। কিন্তু রাশির কথা বাদ দিয়ে চন্দ্র এবার চালপড়া খাইয়ে প্রমাণ করে ছাড়ে যে আজিবরই চোর, কেননা চালপড়া খেয়ে একমাত্র সেই রক্তবমি করে, আর শেষ পর্যন্ত স্বীকার করলেও থালা সে ফিরিয়ে দেয় না কোনদিনই। তার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পাগল হয়ে গরে ডুবাতে ডুবাতে অসুস্থ হলে চন্দ্র সেই সুযোগে মেয়েকে ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেয়।

আর এখন অন্তহীন এক নিদ্রার অতলে বাস করেও আজিবরকে দেখতে পাবে চন্দ্রভানু। যার চাউনিতে ছিল কাম লোভ আর পিপাসা। হায়, সেই এখন তাকে কবরে নামানোর জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে! উপস্থিত মানুষের মনোভঙ্গিতে আশাহত চন্দ্র, তারাও কি এই বছর পাঁচেকের মধ্যে আজিবরের ক্রিয়াকর্ম ভুলে বসে আছে! কতটা খারাপ লোক সে! কতটা নিরাপদহীন সে প্রতিবেশীদের জন্য! ভয়ংকর জীবগুলোকে গভীর রাতে লঞ্চে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল সে-ই। সারেং বুঝতে পেরে লঞ্চটা চরে আটকে দিয়ে বসেছিল জোয়ারের অপেক্ষায়।  ‘আলো না ফুটলে কেমনে বুজুম কোন দিক দিয়া চরে ঠেকলো’। সারেং ধরে নিয়েছিল সকালে মানুষ জেগে উঠলে হায়েনাগুলো বেশি মানুষ মারতে পারবে না। তারপর ভোরে লঞ্চ শিমুলচর ঠেকলে সে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ঐটা সরকারদের বাড়ি আর নিজে ঘুরা পথে বাড়ি এসে মুরগি খাসি ডাব জোগাড় করে বসে থাকে। কী যে বিশাল ভাগ্য আজিবরের, তার সাতদিন পর যদি নারায়ণগঞ্জে শান্তি কমিটির কাজে না যেত তো সেদিনের তিন পাকবাহিনীর সাথে যে দুই দোসরকে পাড়িয়ে পাড়িয়ে ভর্তা করে মেরেছিল গ্রামবাসী, আজিবরের কপালেও তাই জুটত। গুলি করেই মেরে ফেলতে পারত, কিন্তু কি হলো কমান্ডারের, নাহ্, গ্রামবাসী এদের নিজ হাতে শাস্তি দিক মনের আশ মিটিয়ে। মারা যাওয়ার পর দেখা গেল পাকহানাদারদের জিহবা ঝুলে পড়েছে চিবুক ছাড়িয়ে বুকের কাছে আর দালালরা মরে গিয়েও চোখ খুলে দেখতে থাকে স্বাধীনচেতা বাঙালীর উৎসব আনন্দ কতটা দিলখোলা হতে পারে!   

গত মাসে পক্ষাঘাত আক্রান্ত হয় শতবর্ষী মাস্টার, এই গ্রামে সবচে যার উপর নির্ভর করা যায়। বিছানায় না পড়লে তিনি আজকে এসে অন্তত এক মুঠো মাটি ছড়িয়ে দিতেন এ বিশ্বাস চন্দ্র অন্তত করে। মাস্টার কি আজকের দিনটা সুস্থ থাকতে পারতেন না! এই তো সেদিনের কথা, মাস্টারের বউকে এক ডুলা বাইল্যামাছ দিয়ে ফ্যান নিয়ে যায় মন্তাজ, বাঁচার জন্য ফেন। আর মাস্টারের বউ সেই মাছের একবাটি নিয়ে এসে দেখে চন্দ্রর ঘরে চাল বাড়ন্ত। আর দুর্ভিক্ষ হলেও মাস্টার দুধ ছাড়া ভাত খেতে পারে না বলে চন্দ্র রিলিফের একমুঠ গুড়া দুধ দিয়ে যায়। কিন্তু গুড়া দুধের কটু গন্ধ পছন্দ না হওয়ায় মাস্টারের বউ তা কাগজ মুড়ে ধানের মটকায় ফেলে রাখে। আর যেহেতু মাস্টার এ বেলার রান্না ও বেলা খাবেন না, গুড়াদুধের কটু গন্ধও সহ্য করবেন না (বস্তুত তিনি রিলিফের জিনিস খাবেন না) তাই ভাতে পানি ঢেলে খেতে খেতে পিতা হামিদউদ্দিন মাস্টারের হাতে তৈরী স্কুলের দুর্দশার কথা ভেবে বেঁচে থাকার আনন্দই হারিয়ে ফেলেন। স্ত্রীকে, এমন কি জনে জনে বলে বেড়াতে লাগলেন যেভাবে মানুষ মরা শুরু হইছে তা অব্যাহত থাকলে ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার ছাত্র খুঁইজা পাবো না!

কিন্তু কবরে নামানোর আগে ঘরের পাশের কুলগাছটা, অরবরইগাছটা, এমনকি সন্ধ্যায় পিড়ার গা ছুঁয়ে ফুটে থাকা থলো থলো সন্ধ্যমালতি ফুলগুলার জন্য বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে! এমনকি একেবারে অবহেলায় যে মোরগফুলের ঝাড়টা মোরগের ঝুঁটির মত গাঢ় লাল ফুল অবিরল ফুটিয়ে যায় তার জন্যও বেদনা জাগে। ঘরের র‌্যাকে সাজানো প্রত্যহ মাজা পিতলের গুটিকয় ঘটিবাটিচামচ, বেশীর ভাগই অভাবে বিক্রি করে দিতে হয়েছে, কারুকার্যময় খাট, যদিও বিক্রি করতে হয়েছে আগেই কিন্তু এখন চোখের সামনে এসে জড় হয় এই সব। একদিন এইসব ছিল তার জীবনে, হায়, কোন কিছুই শেষ পর্যন্ত ফলবান হয় না!

মিলবাড়ির একটানা শব্দটা বিলের দুরন্ত বাতাসের সঙ্গে মিলেমিশে চলে যায় বহুদিন আগের মাস্টারের করা বহু কষ্টের কাঠের পুলটার দিকে, দক্ষিণ থেকে উত্তরে। এখন ছুড়ি

বুড়ি সকলেই পুল পেরিয়ে দেখো কি সুন্দর এসে হাজির হয়েছে চন্দ্রভানুর শেষকৃত্য দেখতে! নাকি স্মৃতির মগজ ঝালিয়ে নিতে, বাপের বাড়ি থেকে বান্দি নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে আসা, পিনিসে বেড়াতে যাওয়া, লুট হওয়া, জোয়ার ভাটায় দুই নদীর মোহনায় গমন সংগম কিংবা শেষ পর্যন্ত কুশাইমাঝির বাচ্চা চুরি…। হাজার অভাব বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছুতেই নিজেকে সাধারণে নামিয়ে না আনা।

আর যা হোক আজিবরের কথা তো তাদের অবশ্যই মনে পড়বে যেহেতু সে বিশাল কর্মভঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাছেই!

চন্দ্রভানুর মৃত্যু চন্দ্রভানুকে বিস্ময়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না যখন দেখে চই ( আটার পাতলা লেই) খাওয়া মানুষও কঁকিয়ে খুঁড়িয়ে বিলের চারপাশে হাজির হয়েছে। এটা কি তবে সদরঘাটে দেখা সিনেমার মতই কোন উত্তেজক দৃশ্য, যেখানে মানুষ অসহ সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, এমনকি রোগশোক ভুলেও মেতে থাকতে পারে!

রোগশোক আকালদুর্ভিক্ষ পেরিয়েও যে শিমুলচরে এত মানুষ আজও বেঁচে আছে, মৃত্যু না হলে বুঝি চন্দ্রভানুরও কখনো জানা হতো না। কিন্তু যে ঝকঝকে রোদ আর গভীর নীলাকাশের নীচে তার অন্তিমযাত্রা শুরু হয়েছিল তা হঠাৎই মেঘলা আকাশের নিচে ছায়াচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। যেন বা সন্ধ্যাবেলা, কিংবা ঘোর বর্ষার সকালবেলা, বর্ষণ শুরু হয়নি কিন্তু শুরু হতে বিশেষ বাকি নাই। দূরে মাছ ধরছিল যারা তারা জাল ফেলে আকাশ দেখে। আর নিজেদের মধ্যে আলাপে বড়ো বেশি মগ্নতা  ‘আইজ্যা চোরায় না আবার কান্ধ লাগায়’, বলার ফাঁকে আকাশে না তাকিয়ে একবার বলে ওঠে, কী গো এই না রইদ দেকলাম, মেগ করলো কহন?

দূরের গাছপালা আসন্ন সন্ধ্যার প্রহরে ঝিম ধরলে আর পাখিরা, বকেরা, টিয়ারা কিচমিচ করতে করতে দলে দলে বিল পেরিয়ে ঘরে ফিরতে থাকলে, এমনকি যাবতীয় সন্ধ্যাপোকারা ওড়াওড়ি শুরু করলে সচকিত হয় উপস্থিতরা। ভরা দুপুরে পাখি তো ঘরে ফেরে না! হতবিহবল এমনিতেই, তার উপর মধ্যাহ্নে সমাগত সন্ধ্যার আকাশে তাকিয়ে কী যে বলবে এই সূর্য গ্রহণ নিয়ে বুঝতেই পারে না। কথা না বলে বরং মরে গিয়েও বড়ো বেশী অপয়া চন্দ্রভানুকে নিয়েই কথা বলা যাক! শেষর্কৃত্যের শেষ মুহূর্ত থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে অনেকেই কিন্তু ছেড়ে যায় না কেউ। বৃদ্ধরা ছিল না গভীর অবজ্ঞায়, বস্তুত তা শারীরিক অক্ষমতা। মাঝবয়স্করা ছিল শ্রদ্ধাহীন শ্রাদ্ধে নামে মাত্র। তারা বিল ছাড়ার প্রস্ততি নিবো নিবো করে প্রচুর কালক্ষেপণ করলে আলো ফিরে আসে। বিলের আকাশে পাখিরা ওড়ে দল বেঁধে গোল হয়ে, যেন ফিরে পাওয়া আলোয় হঠাৎ আনন্দ দিগন্তজুড়ে।

 দুপুর গড়িয়ে আসর হতে থাকলে কে যেন বলে ওঠে, হেই কবরে নামায় দেন, দেরি করেন কার লইগ্যা!

বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢাকা কবরকে উদাম করে চন্দ্রভানুকে কবরে নামানো দৃশ্যটা দারুণভাবে দেখবার জন্য শেষবারের মতো তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। জীবনকালে দেখা পায়নি বলেই যেন ভয়াবহ এই আকাঙ্ক্ষা আজ। কাফনে মোড়া লাশের দৈর্ঘ্যপ্রস্থ সব মিলিয়ে নেবে এতকালের কল্পনার চন্দ্রভানুর সঙ্গে। যে দু’জন লাশ নামাতে কবরে নামে তাদের একজন আজিবর, মোটা সাদা কাফনে মোড়া চন্দ্রকে মাটিতে নামানোর সময় আজিবরকে যেন একটু বিষণ্নই দেখায়, যদিও এই বিষন্নতায় আস্থা নাই উপস্থিত অনেকেরই, কেউ কেউ বলে ওঠে, এত বছর পর ভোগলামি করতে আইছে আইজ্যা চোরায়! দেলোয়ার কাছে থাকা সত্ত্বেও কেন কবরে নামল না তা নিয়ে প্রশ্ন করার আগেই কে যেন বলে ওঠে, হ, দৌল্লায়ও নামছে!

কবরে নামিয়ে তারা এবার উঠে আসতে চায়, কিন্তু পারে না। দু‘পাশ থেকে কবর চেপে আসে আর তারা অনুভব করে পায়ের নিচের মাটি ক্রমশঃ দেবে যাচ্ছে। আর চন্দ্র যেন মরেইনি, দু’দিক থেকে হাত দিয়ে দু’জনকে টেনে নিতে চাইছে। প্লাবন সমভুমির এই মাটি হাজার লক্ষ বছর পানির নিচে থেকে যে এতটাই নরম অথবা চোরাবালি হয়ে আছে তা এই দু‘জন, অন্তত একজনও আগে থেকে কি জানত!

চন্দ্রভানু চোখ খুললে চোখের মণিতে আটকে থাকে নীল নীল আকাশ কিংবা বহুদূর থেকে ভেসে আসা রঙহীন বাতাস।

 একটা পিঁপড়া বা কেঁচো শরীরের কোথাও কিলবিল করে আর সে পরিষ্কার দেখতে পায় আজিবরদের মাথার উপর শকুনের বন্বন্ চক্কর।

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ষোল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *