উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব-দশ
উপন্যাস।। আঁধারে থাকি ।। সাদিয়া সুলতানা
১০.
একটা বয়স ছিল যখন কুয়াশার ঘন ঘোর ভীত করতে পারতো না। ভয়-ভীতি এখন কোথা থেকে যে উড়ে উড়ে আসে, শরীর-মনে জুড়ে বসে, জানি না। পৌষ-মাঘের পালায় কুয়াশা বাড়তে থাকলে সব এলোমেলো হতে হতে ভয়ের সমুদ্রে পৃথিবীর সব নূর নিমজ্জিত হয়ে যায়। আর আমি অন্ধকারে খাবি খেতে খেতে নিজের উদ্ধারকর্তা হয়ে উঠতে চাই।
সেদিন ভোরবেলাও কুয়াশার মধ্যে ডুবে ছিলাম। এই কুয়াশা ছিল আনন্দের আচ্ছাদন। গ্রামীণ জীবনে কুয়াশার আড়ম্বর তখন ছিল উৎসবমুখর। শহরের শীতবিলাসী মানুষের জন্য গ্রামের ঘরে ঘরে সাজ সাজ রব উঠতো। এরই মাঝে খেজুরের রস, ঝোলা গুড় আর বাইনের মধ্যে বসানো হাড়িতে ফুটতে থাকা রসের ঘ্রাণে মামাবাড়ির উঠান ম ম করতো। মামা খুব কর্মঠ মানুষ ছিল। কামলাদের সাথে হাত লাগিয়ে সারাদিনই কাজ করতো।
দোকানের জন্য মামা কর্মচারি রেখেছিল নিজে গৃহস্থালি কাজে মন দিবে বলে। দোকান আর ক্ষেত খামারের আয় উন্নতি মামার পরিশ্রমের ইঙ্গিত দিতো। মামী অসুস্থতার জন্য গৃহস্থালি সব কাজে হাত লাগাতে পারতো না। এদিকে শীতের আগমনে নানির শ্বাসের টান বেড়ে যেত আর মানুষটা কোনো কোনো দিন জীবন-মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বাড়ির পরিবেশ শোকার্ত করে তুলতো।
সেদিন বাড়ির সবাইকে অবাক করে দিয়ে নানি কুঁজো পিঠে কাঁপতে কাঁপতে বিছানা ছেড়ে উঠে উঠানে সপ পেতে বসে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছিল। গল্প না বলে সেসব বিলাপই বলা ভালো।
আমি নানির কথা শুনছি আর আপনমনে কাজ করছি। যেন কাজই আমার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। হঠাৎ কোথা থেকে যেন মামী ছুটে এলো। আমি হাতে খেজুর গাছের মরা ডাল নিয়ে খড়ির জন্য ছাঁটছি, বাইনের ভেতর দিতে হবে। মামী এসে আমাকে হুড়মুড় করে টেনে চালতা তলার নিচে নিয়ে গেল। তারপর পশ্চিমমুখী হয়ে কিরা কাটালো, এই সপ্তাহের মধ্যে আমি যদি সোনারা গ্রামে আমার বাপের বাড়িতে ফিরে না যাই তবে আমি তার গ্যাদা তুষারের মাথা খাই।
ধর্মেকর্মে আমার মন কম। বয়সের ছটফটানিতে দিব্যি-টিব্যিও মান্যগণ্য করি না তখন। কিন্তু তুষারের নাম উচ্চারণ করে মামী নির্লিপ্ত মুখে কিরা কাটাতেই আমার মনে ভয় ঢুকে গেল। আমি ঝটকায় দূরে সরে যেতে চাইলাম, মামী আমাকে টেনে ধরে রাখলো। সেদিন মামীর মুখটা অদ্ভুতুড়ে দেখাচ্ছিল। কেমন নিষ্ঠুর আর হিংস্র হয়ে উঠছিল চোখ দুটো! আমার বুকের ভেতরে এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে যাচ্ছিল তার চোখের অদ্ভুত দৃষ্টি। আমি ভয়ে ভয়ে তুষারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অথচ সেদিন তুষার আসেনি।
ঐ রাতে আমার প্রচণ্ড জ্বর এসেছিল। জ্বরের ঘোরে বিছানায় উথাল-পাথাল করতে করতে মাথার কাছে বসা মায়ের শরীরের ঘ্রাণ পেয়েছিলাম। মা সত্যি সত্যি আমার কাছে এসেছিল। কিশোরীর মত দুই বেণী ঝুলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তারপর মাথায় হাত রেখে বলেছিল, ‘আসেক দেখি।’
‘কোটে মা!’
‘তুই মোর কাছে আসেক তো। দুইজন মিলি এক্কা দোক্কা খেলি।’
কী যে মধুর ছিল মায়ের মুখের হাসি! মা দুলে দুলে হাসছিল। যেন খুব দুষ্টুবুদ্ধি ফেঁদেছে। আমি অবাক হয়ে মাকে দেখছিলাম। আমার মা কত সুন্দর! তার বয়স যেন শিশুকালেই স্থির হয়ে আছে! মায়ের শরীর থেকে অদ্ভুত এক সুঘ্রাণ আসছিল। মনে হচ্ছিল চারপাশে থোকা থোকা সাদা হাসনাহেনার সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে। মা আমার কপালে হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিল, ‘আসেক নূর। আরও মেলা নতুন খেলা শিখছম রে মা। আয় আয়…’
‘চল।’
‘ম্যালা মজা হোবে। সারাদিন দুইজনে খেলিম।’
মায়ের ডাকে ভালোবাসার উজানে বুকের ভেতরটা কেমন যে করছিল! মায়ের শিশু রূপান্তরে আমিও ক্রমশ মা হয়ে উঠছিলাম। মাকে বুকে আগলে রেখে কত যে আদর করেছি! আদর নিতে নিতে মা-ও আমাকে আদরে আদরে ভরিয়ে তুলছিল। থেকে থেকে বলছিল, ‘আয় মা বুকত আয়, হামরা দুইজনে শলক নিয়া খেলমো। ম্যালা শলক চরুপাকে। এ্যানাও আন্ধার নাই!’
শুনেছি স্বপ্নের রঙ নেই। অথচ সেই রাত ছিল বাস্তবের চেয়েও বেশি রঙিন। মায়ের পরনে ছিল লাল শাড়ি, দুই হাত ভর্তি ছিল লাল লাল কাচের চুড়ি। মা তার হাতের চুড়ি খুলে আমার দুই হাতে পরিয়ে দিয়েছিল। ঐ লাল চুড়ির রঙের সে কী তীব্রতা যে ছিল! বেশিক্ষণ চোখ রাখা যাচ্ছিল না।
চুড়িতে সুরেলা আওয়াজ তুলে আমি আর মা হাতে হাত রেখে অচেনা কত জায়গায় যে ঘুরে বেড়িয়েছি! আর ছুটে ছুটে বেণী দুলিয়ে খেলেছি! রাতভর আলো-আঁধারিতে মায়ের সাথে খেলতে খেলতে আমি তুষারের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। পরে ভোরবেলায় জ্বর নামার সাথে সাথে শরীর-মন শান্ত হয়ে উঠছিল। মামীকে জানিয়েছিলাম, আমি আমার বাপের বাড়িতে যাবো। আমার কথা শুনে মামী খুশি হয়ে উঠেছিল। তার বুকের ভেতর থেকে পাথর নেমে যাওয়ার আনন্দে আমাকে ডেকে নিয়ে অনেক বছর বাদে নিজ হাতে থালা সাজিয়ে ভাত খেতে দিয়েছিল। আমার পাতে মুরগির রানের টুকরো তুলে দিয়েছিল। আমি চোখভর্তি পানি নিয়ে ভাতের লোকমা মুখে তুলেছিলাম। তুষারকে আড়াল করে আমার বাবার বাড়ি ফেরার দিনক্ষণ ঠিক হয়েছিল। ঐবার আর আয়োজন করে আমাকে কেউ নিতে আসেনি।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মামাই আমাকে নিয়ে যাবে। বিষয়টা তুষারকে জানানো হয়নি। তবু আমি তুষারের জন্য অপেক্ষায় থেকেছি। কিন্তু সেদিন তুষার বাড়িতে আসেনি। আমি বার বার দরজার দিকে তাকিয়েছি। যেন কোনো দেবদূত উড়ে এসে আমার প্রস্থান ঠেকাবে। কেউ আসেনি। কেউ আমাকে আটকাতে চায়নি। মামা না, এমন কি নানিও না। উপায়ন্তর না দেখে সেই রাতে আমি তোশকের নিচে থাকা ব্লেড নিয়ে হাতের নখ কাটার বদলে শিরা কাটতে কাটতে নিজেকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেছিলাম, সেলিনা আপা কি এভাবেই নিজেকে মেরে ফেলেছিল? কখন মানুষ নিজেকে মেরে ফেলে? যখন বেঁচে থাকাটা একেবারে অর্থহীন হয়ে ওঠে তখন কি? আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল।
হাত-পা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম, আমি মারা যাচ্ছি। শারীরিক ব্যথার অনুভূতি তুচ্ছ লাগছিল। আমার সাড়াশব্দ না পেয়ে মামী জোরে জোরে দরজাতে বাড়ি দিচ্ছিল। দরজার খিল খুলে যেতেই মামী চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে ডেকেছিল, ‘নূরেক বাঁচাও। কে আছো, নূরেক বাঁচাও।’যেই মানুষটা দিনরাত মা-মরা, বাপ-খেদানি নূরের মৃত্যু কামনা করতো সেই মানুষটাই সেদিন আমাকে বাঁচানোর ব্যাকুলতায় উথাল-পাথাল কাঁদছিল। আমার মনে আছে, রক্তের ধারা দেখে মামী কেঁদে উঠেছিল, আমাকে বুকে নিয়ে জোরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেছিল, ‘তাকা নূর, তাকা হারামজাদি, শান্তি দিলি না এট্টু।’মামীর কণ্ঠের বেদনামিশ্রিত ক্রোধ টের পেয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়েও আমি লজ্জা পেয়েছিলাম আর মনে মনে মামীর কথা মতো কিরা কেটেছি, ‘আমি যদি চাটমোহর না ছাড়ি তবে….।’ সত্যি সত্যি সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যদি বেঁচে উঠি তবে এই বাড়ি থেকে চলে যাবো, কোনোদিন আর আসবো না…তুষারের মুখোমুখি হবো না…হলে…।
কুয়াশাঘেরা মেঠো পথে ভ্যান নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে বেশ সময় লেগেছিল। কুয়াশা কেটে কেটে বিপদগ্রস্তরা সামনে এগোচ্ছিল আর আমি মৃত্যু থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসছিলাম। নাহ, আমি মরতে পারিনি। তুষার সেবার বাড়ি ফিরে আমাকে খুব বকেছিল। গালমন্দ করতে করতে আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল। ধাক্কা সামলাতে না পেরে আমি মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম। এই আঘাত যে ওর ভালোবাসার দাবী থেকে সৃষ্ট তা বুঝে সেদিন আমি জীবনকে নতুন করে ভালোবেসেছিলাম। আর মনে মনে নিজের প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করার পথ খুঁজছিলাম। মামী দূরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকেছে। সেটাই ছিল আমার প্রথম আর শেষবারের মতো আত্মহননের চেষ্টা। এর পরে জীবনে বহু বার খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছি কিন্তু মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মতো দুঃসাহস আর কখনও হয়নি।
