উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পনেরো
উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস
১৫
কার্তিকের কুয়াশাময় ম্লান জোৎস্না। শেষরাতের জোয়ার তখনো শুরু হতে অনেক দেরি, বস্তুতঃ ভাটায় পানি নেমে যাওয়ার সময় মল্লম মাঝির ছেলে মিহির মাঝি খালে জাল পেতে বসেছিল। না খেয়ে বেঁচে থাকার মন্ত্র তার বাপ মল্লম মাঝি মেঘনার তলদেশের খিজির আলাইহে সাল্লামের মসজিদের ইমামের কাছ থেকে চেয়ে এনে থাকলেও মৃত্যুর সময় মিহিরকে তিনি তা দিয়ে যান নাই। তো ভাটির টানে পানি নামবে নদীতে আর যত মাছ এসে জালে আটকাবে আর সকালে তা আড়ংএ নিয়ে বেচে চাল নুন কিনে সকাল সকাল বাড়ি ফিরবে, এই তো!
মিহির তখন পানিতে নেমেছে কেবল জালের ছটফটানি দেখে, খুব আলতো হাতে জাল টেনে টেনে সে ডাঙায় তুলবে, দু’এক খ্যাপেই ডুলা উঠবে ভরে। কিন্তু খুব শীত শীত করে, চেয়ে দেখে এমন অন্ধকারে ধরতে গেলে রাতই, অচেনা এক কেরায়া নাও এসে ভিড়ে খালপার ছাড়িয়ে একটু সামনে, বাঁশের সাঁকোটার কাছাকাছি। মিহির বুঝতেই পারে না এত অন্ধকারে কে গ্রাম ছাড়বে, সেই দুর্ভিক্ষের কালে দু’এক জন আর হিন্দুস্থান পাকিস্তান হওয়ার বেলায় বহু হিন্দু পরিবার এভাবে গ্রাম ছেড়েছে বলে সে শুনেছে কিন্তু দেখেনি কখনো, এ দৃশ্যটা কী তেমনি! নাকি অন্য কিছু! মিহির হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে জাল তুলতে ভুলে যায়। নৌকাটা থেমে থাকে, না কেউ নামে, না কেউ ওঠে। ঠিক ঠিক এটা নৌকা তো! নাকি ভূতেরই এক ধরনের কারসাজি, নৌকার ভাও নিয়ে এসেছে, তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কোন রকম তুলতে পারলেই কেল্লাফতে! সেই যে একবার মধ্যরাতে— মিহির জাল বাইতে ল্, গভীর রাতে সকলের অগোচরে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে, পিছু পিছু হাঁটে জাল ঘাড়ে করে। তারপর সুবিধামত জায়গায় বিলের শেষ মাথায় নিয়ে কাদায় পুঁতে রাখে। ভোরের কুয়াশায় বক ওড়ে, শিং মাছ পিঠের কাছে কিলবিল করে কাঁটা দিতে চায়, কিন্তু গায়ে শক্তি নাই এক ফোঁটা। কীসের জাল বাওয়া কীসের কী, জানে বেঁচে গেছে এইটাই তখন তার কাছে বিরাট পাওয়া। এটা কি তেমনি কোন ঘটনা ঘটার পূর্বমুহূর্ত! কী সব ভাবতে ভাবতে সে নিঃশব্দে এসে নদীতে নেমে পড়ে, নামতে নামতে ভাবে এবার কি সে সাঁতরে নৌকায় গিয়ে উঠবে! তারপর আলিঝালি কী সব দৃশ্যমান হয়। না নেমে এ দৃশ্য অবলোকন তো সত্যি অন্যায়! হাঁটুপানিতেই ঝুপ করে বসে পড়ে সে। শুধু মাথাটা জাগিয়ে দেখতে পায় নৌকায় এসে উঠে এক অতি সুন্দরী, কোলে সন্তান, পিছনে তিনটা দাসী, যাদের একটাকে সে চিনতে পারে, সে কাবান্নি। সব শেষে বয়স্ক মত যে লোকটা ওঠে তাকে মোটেই চেনে না। তারপর দৃশ্যটা আরো পরিষ্কার হয়, সরকার আর আব্বাস মাস্টার ঘাট থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বিদায় দিচ্ছে আর কুদ্দুস একেবারে পানির গা ঘেঁষে দাঁড়ায় পানিতে হামলে পড়ার মতো। কী যেন বলে চেঁচায়, বোঝা যায় সামান্য— আমাল এক দিনের মাইয়া, ঠান্ডা না লাগে, আব্বা, আমিও যামু ওগো লগে! নৌকার গলুই শক্ত করে ধরে রাখে কুদ্দুস কিন্তু সরকারের ঈশারায় এবার ছপ্ করে লগি পড়ে, নৌকা ঘাট ছেড়ে সরতে থাকে। এবার বোকা কুদ্দুস হাঁটুপানিতে মাজা ডুবিয়ে বসে পড়লে হাবা তাকে টেনে তোলে।
আর মিহির মনে করতে পারে সেই দিনের কথা, ধান কর্জ করতে গেলে ওমর সরকার সবাইকে ধান দিলেও তাকে বলে ওঠে, কীরে আবাগীর পোলা, বাপের কাছ থেইক্যা না খাইয়া থাহার মন্ত্রটা শিক্খা নিতে পারছ নাই?
কুদ্দুস হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলে সরকার বলে ওঠে, ভাউড়া, বাড়ি ল!
গ্রামের লোকের কথায় কান রাখা যায় না। চন্দ্রভানু সন্তান নিয়ে চলে গেলেও এখনও রাতবিরাতে চালে মাটির ঢিল পড়ে। যারা মারে তাদের প্রাণের ভয় থাকায় গোপনে মেরে পালিয়ে যায়। আর পরদিন চাঁদপুর থেকে সরকারের সবচে বুদ্ধিমান লেঠেল ফিরে এলে তাকে হাবাকে দিয়ে চিঠিসহ পাঠায় কামারকারা। রাতে পৌঁছে শ্বশুরের হাতের লেখা চিঠিটা দেয় চন্দ্রভানুকে, হাবার কথা মত কাজ হইবে। তুমি বাধা দিবার চেষ্টা করিও না।
হাবা আর কাবান্নি এখন কামারকারায় চন্দ্রভানুর মুখোমুখি। শেষ পর্যন্ত কেন এমন হলো, দশ এগারমাস সব কিছু তো ঠিকঠাক মতোই চলেছে, তাহলে শেষটা এমন হলো কেন? কাবান্নি শুধু একবার বলে, বাচ্চাটা একদিন পরে প্রসব করাইলে এমন অইতো না, হাক্কা দিয়া আওয়ার সময় কাঁইন্দা উডনেই সব গণ্ডোগোল হইল। আর হালার জাউল্লারাও কান পাইত্যা রইল কান্দন হোনার লাইগ্যা!
— নাকি সবই বানাইন্যা কতা! সন্দহ!
— না, কীয়ের বানাইন্যা কতা!
কাবান্নি আর হাবা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। চন্দ্রভানু বুঝতে পারে না শ্বশুর কী করতে হাবাকে এখানে পাঠিয়েছে। ওরা কী আমার মেয়েকে শিমুলচর ফিরিয়ে নিতে এসেছে! নিয়ে কুশাইর বউকে দিয়ে বলবে আমাদের ভুল হইয়া গেছে! তাহলে চন্দ্রও ওদের সঙ্গে ফিরে যাবে, কুশাইর বউর হাত ধরে বলবে তোমাদের তো আরো চাইরটা বাচ্চা আছে, এইটা আমারে দাও বিনিময়ে তোমাওে তোমার পছন্দমত ৫/৭ কানি জমি লিখ্খা দিব। কুশাইর বউ গদগদ হয়ে বলবে, বইন তোমরা আমার বাচ্চাডা নিতে চাও সেইডা তো বালা কতা কিন্তু চুরি করলা ক্যান, আমি বাভছিলাম ভাঙা বেড়া দিয়া হিয়ালে নিয়া গেছে, বেইন্যা থেইক্যা বিয়াল পর্যন্ত গ্রামের সবাই যহন খোঁজা শুরু করলো তহনই না জানা গেল ঘটনা। চন্দ্র আর ভাবতে পারে না, ঘুমে ঢুলে পড়তে পড়তে সে কুশাই মাঝিকে একটা বড়ো নৌকা কিনে দেয়, বলে কেরায়া নাও চালাও, কষ্ট কম ট্যাহা বেশী, এখন তো বুড়া হইছ!
ঢুলতে ডুলতে সে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়, দেখতে একদম তার নিজের মতো। মাথায় কোকড়া চুল পাতলা ঠোঁট। ঘুমের মধ্যে মেয়ে কাঁদে হাসে। চন্দ্রভানু ঠিক করে ঘরে সে কাউকে ঢুকতে দিবে না। দশমাস সে মা হওয়ার জন্য একটু একটু করে স্বপ্ন বুনেছে, সে স্বপ্ন সফল হয়েছে। একজোড়া গোলাপ বালা সে কাবান্নিকে দিয়েছে আর হাবাকে দিবে বড়ো একটা নৌকা, দরকার হলে নিজের গহনা বেচে নৌকা করে দিবে। আর কাবান্নির হাতে একটা কঙ্কণ দিয়ে পাঠিয়েছে সেই রাতে কুশাইর বোনকে দেয়ার জন্য …….রাইতে কফিডা নিবায় রাহিছ, নিবাইলেই বুজুম কুশাইর বউ ঘুমাইছে। জোড়া কঙ্কণ পাবি, পরথমে একটা পরে আরেকটা। আর কীভাবে কুপি নিবলো, ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাচ্চা সরানোর সময় কুশাইর বউ পাশ ফিওে শোয়ার সময় কীভাবে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, সে কথা বলতে গিয়ে হাঁপাতে থাকলে চন্দ্র থামিয়ে দিয়ে বলে, বারবার এক কথা কওয়ার দরকার কী! এই সব কতা ভুইল্যা যাও। দরকার থাকলে শিমুলচর গিয়া আরেক জোড়া কঙ্কণ দিমু, এহন চুপ কর!
ঘরের দরজা আটকে বাচ্চা কোলে বসে থাকে চন্দ্র, পাশে এ বাড়ির কাজের লোক জমিলা চুপচাপ। হাবা আর কাবান্নি বসে থাকে ঢেঁকিঘরে, ভাবে নিজেদের ভূতভবিষ্যত।
কাজ হয় পর দিন, একেবারে সরকার যেমন চেয়েছে তেমন।
বাচ্চা কোলে জমিলা বসে থাকে আর তিনদিনের নির্ঘুম চন্দ্র ঘুমায়। ঘুমের মধ্যে সে হঠাৎ
হঠাৎ জেগে উঠে উৎকন্ঠায়। দেখে জমিলা জেগে আছে।
তারপর খুব সকালে জমিলার চোখটা একটু লেগে আসলে হাবা আর কাবান্নি সফলতার সাথে কাজটা করতে পারে, চন্দ্র ঘুমে স্বপ্নের ভিতর শুধু দুঃস্বপ্ন দেখে তখন।
সকালে জমিলার কোলে শক্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে চন্দ্র যেন কিছু চিনতে পারে না।
কাবান্নির বুকে এক বিশাল পাথর চেপে বসলেও এমনকি চন্দ্রর শুন্য দৃষ্টি সহ্য করতে না পারলেও সে জানে এবার শিমুলচর ফিরে যেতে আর ভয় নাই।
