উপন্যাস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর এগারো

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব দুই

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস ─পর্ব তিন

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চার

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পাঁচ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ছয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব সাত

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর আট

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর নয়

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর দশ

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর এগারো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব তেরো

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব চৌদ্দ 

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পনেরো 

১১

তারপর কুরচা যাওয়া মুরগরি মত রজব রাতদিন ঝিমায়। হাইমচর থেকে আসার পর তাকে পরীতে পায়। পরীরা ফিরিয়ে দিয়ে গেলেও রজব ফিরে না আগের জীবনে। পাঁচ ওয়াক্ত আজান দিয়ে নামাজ পড়া আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আরবী শিক্ষা দেয়া আর নামাজ শিখানো এই তো তার কাজ, কিন্তু এখন ক্রমশ নিজেকে সরিয়ে নেয় এসব থেকে।

 শীত আসতে আসতে রজব এক অদ্ভুত মানুষে পরিণত হয়। দক্ষিণধার দিয়ে সোজা নেমে চলে যায় গাঙে, নদীর বালিমাটিতে সে ঘষে ঘষে হাত ধোয় তারপর নদীতে নেমে ডুবাতে থাকে যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়। যোহর যায় আসর যায়, মাগরেবের সময় এসে শুয়ে পড়ে বিছানায়। তার না আছে ক্ষুধা না তৃষ্ণা। তো গ্রামের লোকের স্মৃতি শক্তি প্রখর থাকায় তারা মনে করতে পারে মল্লম মাঝির না খেয়ে মাসের পর মাস বেঁচে থাকার কথা। মল্লমের মত খাঁটি মুসলমান তো আর দ্বিতীয়টি এ গাঁয়ে ছিল না। কোনো দিন নামাজ কাজা না করা মানুষ হিসেবেই সে লেংটার স্নেহভাজন হয়েছিল, তা লেংটা নিজে নামাজ পড়ুক আর নাই পড়ুক। রজব কি মল্লমের উত্তরসূরি! নাকি লেংটার! যদিও লেংটা নিজেকে অতি সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছু বলে বিবেচনা করতে মোটেই রাজি না, তাহলে আর কিসের উত্তরসূরি!

কুলগাছের ফুলগুলি ভোরের কুয়াশায় টুপটুপ করে ঝরে পড়ে অগ্রহায়ণের শুরুতে তখন রজব আর এই গ্রামেই নাই অথচ কার্তিকের শুরুতে যখন হিন্দুপাড়ায় গাইস্যা খাওয়া হয় তখন রজব এই গ্রামেই ছিল, এই কথা মনে করে আসল লোক নকল লোক হাহুতাশ করে। যদিও তাকে খুঁজবার লোক কোন কালে ছিল না, এখনও নাই। আর হারিয়ে যাওয়ার পর মৃধারা কি বিশ্বাসরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। বার বার হারিয়ে যাওয়া মানুষ দিয়ে তো আর মসজিদের কাজ চলে না! আর দ্রতই মসজিদে নতুন মোয়াজ্জিন আসে কালকিনি না কোথা থেকে, বয়স্ক আর খিটখিটে মেজাজের। কিন্তু তারা ভাবে এবার আর যা হোক যুবক হুজুর নিয়ে যেমন দিকদারিতে পড়তে হয় তেমন তো হইব না!

আর অগ্রহায়ণের শেষাশেষি মাঠের সব ধান যখন মাড়াইয়ের জন্য উঠান জুড়ে অপেক্ষা করছে সেই সময় মমতাজের সপ্তম সন্তান প্রসবের বেদনা ওঠে। বেঁচে থাকলে যদিও এটি হবে চতুর্থ তথাপি কামলার ঘরে কী করে এত পোলাপান হয় অনেকেই বুঝে উঠতে না পেরে খালপাড় গুলজার করে। কিন্তু আমেনাবিবি এটাকে আল্লার দান মনে করে যে প্রস্তাব পাঠালে মমতাজের তা সে সানন্দে গ্রহণও করে। মমতাজ তো মনে রাখবেই দ্বিতীয় ছেলেকে চেয়ে পায়নি চন্দ্রভানু অথচ সে ছেলেকে তারাও দুনিয়ায় ধরে রাখতে পারে নাই হাজার চেষ্টায়। ইতিমধ্যে আমেনাবিবি কুদ্দুসের ঘরে সন্তান আগমনের আশা পরিত্যাগ করেছে এরমধ্যে। লোকে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক আমেনাবিবি ইচ্ছা করলে যে কোন সময় কুদ্দুসকে বিয়ে দিয়ে নতুন বউ আনতে পারে, এটা শুধু তার ইচ্ছার ব্যাপার। তবে বংশীয় ঘরের একটা ছেলে পেলে আপাতত সে বিরত থাকবে বলে নিজেকে জাহির করে।

অগ্রহায়ণের মধ্যরজনীতে আকাশে যখন দুর্দান্ত চাঁদ, ঘরে ঘওে ঢেঁকিতে চিড়া কোটার ছন্দময় পাড়ের শব্দ আর সেই রাতে গ্রামের ছেলেরা খেজুরগাছের রস চুরি করে, ডাব নারিকেল চুরি করে। যথারীতি চাচিজেঠিদের দিয়ে কাঁচা রসের ক্ষীর রান্না করে খায়, আনন্দ করে। এ সক নির্দোষ চুরি তারা সমর্থনই করে। এদিকে কুয়াশার সাথে কুলফুল টুপটুপ ঝরে পড়ে চন্দুভানুর ঘরের চালে। একলা বিছানায় শুয়ে সে তাকিয়ে থাকে ঘরের কাঁরের দিকে, ভেরনের তেলে জ্বলতে থাকা আলোয় কাঁরের লতাপাতা মাছ এক বিমূর্ত রূপ নিয়ে চন্দ্রভানুর চোখে এসে পড়ে। মৎসনারীর সাঁতার কাটা, ফুলতোলা আরো কত কী যে ছবি হয়ে হয়ে মিলিয়ে যায়। আর টিনের চালে শিশিরের টুপটুপ শব্দ কত যে ছেলেবেলা এসে হাত ধরে। কিন্তু এ সবে ছেদ পড়ে এত রাতে দরজার ধাক্কায়। আমেনাবিবি শীতে কাঁপতে কাঁপতে ফিশফিশ করে বলে,  চলো আমার লগে চলো, মমতাজের বেদনা উঠছে, কতা কওয়া আছে,  পোলামাইয়া যাই হোক তোমারে দিব।

চন্দ্রভানু বোকার মত তাকিয়ে থাকে, কী ভাষায় যে উনি কথা কইছেন বুঝতেই পারে না! আর চন্দ্রর বিস্ময় দেখে আমেনাবিবি আরো বিস্মিত হয়ে বলে, ক্যান তুমি কতা বোজ না? পারলা না তো এত বছরে একটা পোলা দিতে, এহন ঠিক করছি, আইন্যা পালো।

চন্দ্র কি করে, মাথার ঘোমটা টানে, সলজ্জ হাসে, তারপর বহু বহু বছর পর পায়ে ধরে সালাম করে আশ্চর্য এক কথা শোনায় — আম্মা আমাগো ঘরে সন্তান আসতেছে, আমি আপন সন্তানের মা ডাক শুনুম!

এবার আমেনাবিবি বুঝতেই পারে না চন্দ্রভানু কী বলছে! চাঁদের আলো এসে সোজাসুজি পড়ে চন্দ্রভানুর কপালে, নাকের ডগায় আর ঢেকে রাখা সত্ত্বেও সুগঠিত স্তনে। কয়েক মুহূর্ত তাদের কোন কথা নাই, যেন সত্যি সত্যি কথা বলার সমস্ত প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে কিংবা কথা বলা যায় এমন কোন বিষয়ই এই পৃথিবীতে আর অবশিষ্ট নাই। এমনকি ঢেঁকির পাড় পড়ার শব্দ নাই, মুড়ি ফোটার শব্দ নাই, এমন কি ঝিঁ ঝিঁ জোনাকপোকাও পাখা মেলতে ভুলে গেল! আর বাতাস বিলকুল শব্দহীন। আমেনাবিবির কোন আবেগ কি প্রতিক্রিয়া কোনো শব্দে বোঝা গেল না। খালি বিস্ময় চোখ স্থিও রেখে খালি এক পা দু’পা করে রোয়াক থেকে নেমে আসে, আসতে আসতে একবার ফিরেও তাকায়, চোখে তখনও বিস্ময়।

দশদিন পর সমস্ত গ্রাম আবার নতুন করে চন্দ্রভানুকে আলোচনা করে। গাঁয়ের ফকিরমিশকিন একবেলা পেট ভরে খেতে পায়। একটা করে তাঁতে বোনা লুঙ্গি পায় অন্তত এক’শ জন। দশহাতি শাড়ি পায় জনা পঞ্চাশেক মহিলা আর বিকালে বিকালে পাঁচদিন দু’টাকার বাতাসা হরিলুট। চন্দ্রভানুকে দেখতে আসার জন্য বাপের বাড়ির লোকেরা দাওয়াত পায়। বিয়ের সময় পাঁচটা দাসী দিয়েছিল কন্যার সঙ্গে, পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে জ্বরজ্বারিতে ভুগে ভুগে সবই বিস্মৃতির অতল গহবরে। এবার এক যুগেরও বেশী সময় পর কামারকারা থেকে চাচারা পাঁচটা খাসি আর দুইটা দাসী নিয়ে আসে ভাতিজিকে দেখতে। জমিদার কী, সামান্য সরকার ওমর সরকার যেন নিজেই জমিদারের জমিদার, খরচের বহরে প্রত্যক্ষদর্শীদের চক্ষু চড়কগাছ। বহুদিন পর চন্দ্রভানু পায় পাতলা সিল্কের শাড়ি আর অঙ্গভরা গহনা, পায় অগরু সেন্টের বোতল। আর ঢাকার চকবাজার থেকে আনিয়ে দেয় লিপ্টন চা, অন্তত দশ বছর আগে সেই দুর্ভিক্ষেরও আগে কামারকারায় বাপের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সে লিপ্টন চায়ের গল্প শুনেছে। বড়ো ভাই নবকুমার স্কুলে পড়ার সময় সাহেবরা নাকি স্কুলে বিনা পয়সায় চা খেতে দিয়েছিল, দারুণ খেতে সে পানীয়।

ভয়ানক শীত পড়েছে এবার। বৃদ্ধরা বলাবলি করে এমন শীত তারা এর আগে কখন দেখেনি। উত্তরের কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগে একেবারে হাড়ে। গাল ফাটে ঠোঁট ফাটে আর পায়ের গোড়ালী ফেটে রক্ত বের হয়ে তৈরি হয় গভীর ক্ষত। আর এমনকি বাড়ির পোষা কুকুরটা পর্যন্ত রসিঘরের ওঁমের  জন্য ঘুরঘুর করে। বড়ো বড়ো আইল্যা বোঝাই আগুন যায় চন্দ্রভানুর ঘরে। খাওয়া জন্য ঘণ্টায় ঘণ্টায় যায় গরম পানি। বাপের বাড়ি থেকে আসা দুই দাসী ঘরের বাইরে ঘুরঘুর করে। আইল্যার আগুন পাল্টায় আর তেঁতুলের ভর্তা, বড়ুই ভর্তা আর কাঁচা কলার ভর্তা কী চুলার মাটি জোগান দেয় তারা। আফিম খায় কি কে জানে, তবে জর্দ্দা ঠেসে পান খায়, খেয়ে তুমুল শীতেও কপালে ঘাম জমে বিন্দু বিন্দু। চোখে মদিরা নিয়ে কী যেন ভাবনায় ডুবে থাকে সারাক্ষণ। আর বাড়িতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে নানা পদের পিঠা বানানো। সকালে দুধে ভিজানো চিতুই, ভোররাতে উস্টায় ধরা বকের মাংসে ছিটের পিঠা, বিকালে দৌল্লা কি মুগপাক্কন। প্রতিদিন ভবেরচর ঘোষেদের বাড়ি থেকে আসে দই আর দুধের ক্ষীরের ভাঁড় আর ঘরে কাটা ছানা তো আছেই। নদী থেকে টাটকা পাঙ্গাস আর বাচা মাছ, সবই চন্দ্রকে স্বাস্থ্যবান আর সুখি রাখার আয়োজনে।

 কিন্তু দর্শনার্থী খুব নিকট আত্মীয় হলে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে চন্দ্রকে উঁকি দিয়ে দেখে বিমুগ্ধতা ফুটিয়ে তোলে চোখেমুখে— আল্লায় বাঁচায় রাখ! সরকারের আউস পূরণ হোক!

আর সেই শীতেরই শেষের দিকে এক দুপুরে সাবিহার প্রসব বেদনা উঠলে শাশুড়ির আব্দারে চন্দ্রভানু পালকি চড়ে যায় এই বিশেষ অভিজ্ঞতা নিতে। আর যাওয়ার পর, আশ্চর্য, আমেনাবিবি জানতেনই না যে সাবিহা প্রসবকালে ঘরে কাউকে রাখে না! নিজে প্রসব করাবে, নাড়ি কাটবে, গোসল করাবে তারপর কারো হিল্লায় সন্তান রেখে নিজে খালে যাবে গোসল করতে। ঘরে ঢুকে চন্দ্রকে যে অভিজ্ঞতা দিবে বলে ভেবে রেখেছিল তা ফলপ্রসু না হওয়ায় আমেনাবিবি কিছুটা হতোদ্যম। তবে অল্প সময়ে তা কাটিয়ে উঠে নিশ্চিত না হয়েও বলে যেতে থাকে, উমুক বাড়ির তুমুকে সামনের মাসে প্রসব। আর চন্দ্রভানু হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। আর এদিকে অতি উৎসাহী দু’একজন সাবিহার পর্দাপ্রথা আর সাহসিকতার বার বার প্রশংসা করে এই ব্যবস্থা চন্দ্রসহ সকলেরেই গ্রহণ করা উচিত বলে ঘোষণা দেয়। আর চন্দ্র কখন বাড়ি এসে জর্দ্দা ঠাসা পান মুখে পুরবে তার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

শাশুড়ি-বউ বাড়ি এসে দেখে কামারকারার দাসী ফালু উঠানে বসে পিঠে রোদ ঠেকিয়ে বড়ো বড়ো চিংড়িমাছ কোটে আর পিনপিন করে গান গায় — ইচা কুটলে হয় রে মিছা, রানলে অয় মউ, বেকই খায় কাউল্লার বউ।

উপন্যাস।। চন্দ্রভানুর পিনিস।। নাসিমা আনিস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর দশ উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব তেরো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *