উপন্যাস

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব- শেষ

উপন্যাস ।। আজিরন বেওয়া - রাশেদ রেহমান

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব দুই

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব তিন

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব চার

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব পাঁচ

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব ছয়

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব সাত

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব দশ-এগারো

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব বারো-তেরো

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব- শেষ

পনেরো

আজিবারের মৃত্যুর তিন দিন গত হলো। আর এ তিন দিন আজিরনের ঘরে চুলা জ্বলেনি। হাফিজা বেগম ভাত দিয়ে যান। তিনিই দুঃসময়ে বুদ্ধি দিয়ে, খাদ্য দিয়ে সাহায্য করেন। হাফিজা বেগমের দেয়া খাবার হারান, পরান, আদরীকে খাওয়ায় আজিরন।

ছেলে পরপারে মুখ তোলার পর আজিরনের পেটে দানাপানি পড়েনি। সে নিথর হয়ে মরার মতো পড়ে থাকে। দুনিয়াদারির কোনো কিছুতে তার মন নেই।

আজিরন যখন ছেলে হারানো বেদনায় ছন্নছাড়ার মতো দিন কাটায়, তখন তার মানসিক দুর্বলতার সুযোগে সাইফুলের হাত ধরে গভীর রাতে মামির ঘর থেকে পালিয়ে যায় সুফিয়া। ঘটনাটা এত আকস্মিকভাবে ঘটে যে আজিরন কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। সে না বুঝলেও গ্রামের লোকজন কিন্তু তাকে ছেড়ে কথা বলে না। এ নিয়ে তাকে শুনতে হয় অনেক কথা। নানা জন নানা কথা বললেও আজিরন কাউকে কিছুই বলে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তাদের মুখের দিকে।

আজিরন বুঝে উঠতে পারে না কখন সাইফুল-সুফিয়ার ভেতর এত ঘনিষ্ঠতা হলো। অথচ সে মানিককে কথা দিয়েছিল সুফিয়াকে দেখে রাখবে। সুফিয়া যে এমন কাজ করবে তা ভাবতে পারেনি। এমনিতে ছেলের শোকে তার মাথা ঠিক নাই। সুফিয়ার দিকে নজর দেয়ার সময় কই? এখন সে কী জবাব দেবে মানিককে? সে চিন্তাও তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। অবস্থা এখন ঝড়ের কবলে পড়া আহত পাখির মতো।

কিছুদিন পর হাফিজা বেগম এসে আজিরনকে বলেন, ‘আজিবারের খবরডা বছিরকে জানালে ভালা অইতো না?’

আজিরন বলে, ‘না খালা, সে বিদেশে আছে, এ খবর হুনলে সইতে পারবো না। সহিসালামতে দেশে আসলে হুনতে পাইরবো।’

এরপর কিছুক্ষণ চুপ থাকে আজিরন। তার চুপ মেরে থাকা দেখে হাফিজা বেগম বলেন, ‘কি রে, কী হইছে?’

আজিরন বলে, ‘খালা একটা কথা কমু; আমি প্রতি রাতেই স্বপ্নে দেহি ঝড়ে আমার ঘরের চাল উইড়া যায়। আর ছেলেমেয়ে নিয়া বৃষ্টিতে ভিজছি আমি। স্বপ্নডা দ্যাখলে আমার মন সবসময় আনচান করে। না জানি আবার কোন ক্ষতি অয়!’

‘দূর পাগলি, আজিবার বাঁইচা থাকলি তোরে কামাই কইরা খাওয়াইত। বিপদে-আপদে তোরে ছাতার মতো ছায়া দিত। হেই পোলাডাই তোর মইরা গ্যাছে। এ জন্য দুঃস্বপ্ন দেহিস। এ নিয়া ভাবিস না তো। জুয়ান পোলা মইরা গ্যালে হগলেরই এমন দশা হয়।’

একপর্যায়ে হাফিজা বেগম কথা তোলেন সাইফুল-সুফিয়ার।

‘আচ্ছা আজিরন, এই যে সুফিয়া এমন একটা কাম করল, তুই  একটুও ট্যার পাইস নাই?’

‘না খালা। সাইফুল তো প্রায়ই আমগো বাড়িতে আসত। আমারে বিপদে- আপদে সাহায্য করত। কোনোদিন তার ভিতর খারাপ কিছু দেহি নাই। সন্দেহ যে করব, তার তো কোনো কিছু চোখে পড়ে নাই। আমারে তো সে সম্মানই করত। আমার পোলাপানগোও আদর করত।’

‘তাইলে ক্যামনে কী অইল?’ জানতে চান হাফিজা বেগম।
‘এই কথা আমি ক্যামনে কই খালা!’

ষোল

আজিরনের কান্নায় কেঁটে যায় অপেক্ষার আরও দুটি মাস। সময় বসে থাকে না। তার কর্ম যমুনা জলের দুর্বিপাকে হারিয়ে যাওয়া। আজিরন তাই ভাবে, কীভাবে কেটে গেল তার শোকের দুটি মাস। ছেলে হারানোর দুটি মাস। আহ! নিয়তি বুঝি তার বেলাতেই এত নিষ্ঠুর।

আজ অনেক কথাই মনে পড়ে আজিরনের। আজিবার যখন তার কোলজুড়ে আসে, তখন ভারি অভাব ছিল তাদের। কোনোমতে দিন এনে দিন খেত তারা। তার স্বামী বছির তখনো কাবার শুরু করেনি। গ্রামেই এর-ওর কাজ করে সংসার চালাত। সেও এর-ওর বাড়ি কাজ করে স্বামীকে সহযোগিতা করত। তখন অভাব থাকলেও দুঃখ ছিল না। বরং সুখ অনুভব করত। তারপর তো একে একে তার কোল জুড়ে আসে আরও দুটি ছেলে সন্তান। দিন দিন তাদের স্বচ্ছলতা আসতে থাকে। তারপর এলো আদরী। আদরীকে পেয়ে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই খুব খুশি। আদরীর জন্মের পর থেকেই তাদের সংসারে অভাব দূর হতে থাকে। দিন দিন সচ্ছলতার মুখ দেখতে থাকে তারা। তাই তো সে স্বামীকে কাবারে যেতে দিতে চায় নাই। এবার যদি বছির সে কথা শুনত তাহলে আজিবারকে হারাইতে হইতো না। এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারত না।

নাহ, আর ভাবতে পারে না আজিরন। তার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। একদিকে ছেলে হারানোর শোক, আরেকদিকে সুফিয়ার পলায়ন—এ দুটি বিষয় তাকে বেশ কাবু করে ফেলে। সে আর কিছু ভাবতে পারে না। অন্যদিকে স্বামী তার হাওরে কাবারে গেছে। কোনদিন ফিরবে তার ঠিক নাই। ঘরে আছে আরও তিনটি সন্তান। তাদের খাওয়া-দাওয়ার দিকেও ঠিকমতো খেয়াল করতে পারছে না। ছেলেমেয়ে তার আশপাশে ঘুরঘুর করে। কিন্তু মায়ের অবস্থা দেখে তারা কিছু বলার সাহস পায় না। আজিরনও তাদের কাছে ডাকে না। আদর করে না। তার বড়ো মায়া লাগে, বড়ো কষ্ট হয় সন্তানদের জন্য। স্বামী পাশে থাকলেও না-হয় একটা কথা ছিল। সে নারী হয়ে কীভাবে এ শোক সামাল দেবে! এ বোঝা বওয়া যে তার সাধ্যের অতীত। হায়! বিধাতা কেন যে তার মরণ দিল না!

এদিকে সিলেটে ধান কাটতে যাওয়া কাবারের নৌকাগুলো একে একে ভিড়তে থাকে ঘাটে। নৌকা ঘাটে পৌঁছার সাথে সাথে কামলারা আল্লাহ্ আল্লাহ্ রসূল বলো—আল্লাহ্, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ধ্বনি বোল দেয়। এ সময় নদীর কিনারে মেলা বসে। প্রতিবার কাবার থেকে ফেরার সময় হলে এ মেলার আয়োজন করে স্থানীয়রা। অন্যদিকে কামলাদের স্ত্রী, ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, আত্মীয়-স্বজন অপেক্ষায় থাকে প্রিয় মানুষটির। কারো বাবা আসবে, কারো ভাই। কারো প্রিয়তম স্বামী।

এক এক করে আসে নৌকা। ঘরের মানুষ ঘরে ফেরার সে যে কী আনন্দ! সে যারা কাবারে যায় আর দীর্ঘদিন পর ফিরে আসে তারাই জানে। নৌকা থেকে নেমেই ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলে অনেকে।

এবারেও সে দৃশ্যের ব্যতিক্রম হয়নি। নদীর কিনার গ্রামের মানুষে গিজগিজ করছে। প্রিয় মানুষকে খুঁজছে তারা। চোখে-মুখে তাদের খুশির ঝিলিক। কেবল আজিরনই ঘরে বসে আছে। ছুটে যায়নি যমুনার কোলে। তার মনে চিন্তা ও ভয় জড়ো হয়। তার ভেতরে খুশির বদলে ভর করেছে অজানা শঙ্কা। তাই সে খুশি হতে পারে না। চিন্তিত মনে ভাবে, কীভাবে আজিবারের মৃত্যুর খবর স্বামীকে জানাবে! যে ছিল আঁধার ঘরের বাতি। স্বামীর দেয়া ভালোবাসার প্রথম চিহ্ন। গর্ভধারিণী মা হয়ে কীভাবে সন্তানের মৃত্যুর খবর জানাবে জন্মদাতা পিতাকে! যার জন্মের পর খুশিতে পুরো গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করেছিল তার স্বামী। এসব কথা ভাবতে গিয়ে তার চোখের কোণে নোনা পানি জমতে শুরু করে। একসময় তা গড়িয়ে পড়ে।

ঘাটজুড়ে মানুষের হৈ-হল্লা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খুশিতে নাচানাচি করছে। গ্রাম্য বধূদের মুখে চাপা হাসি। খুশির ঝিলিক তাদের চোখে-মুখে।

আশপাশে কত কিছু হয়ে যাচ্ছে অথচ আজিরন ঘরে বসে আছে চুপচাপ। তার ভেতরে কোনো আনন্দ নেই। মুখ তার বড়োই মলিন আর বিমর্ষ। একই ভাবনা তার ভেতর বারবার উঁকি মারে। ভাবনারা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধছে ক্রমাগত। ছেলের বিষয়টিই তাকে বেশি পীড়া দিচ্ছে। কী করে সে স্বামীকে জানাবে এমন করুণ কথা! তার কেন মৃত্যু হলো না!

মৃত্যু কি বাজারে চাউল, নিত্য পন্য, চাইলেই মিলে যায়? মৃত্যু চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে জড়িয়ে কি? নাকি জন্মের পূবে সর্ষে খেতে বুনে আসা ভূত? কিন্তু আজিরনের কেন এমন লাগছে? তার কেন মরে যেতে ইচ্ছে করছে? স্বামীকে কী জবাব দেবে। আমি যে পাপে পাপী। তার প্রায়শ্চিত্তের ভার আজিবন/আজীবন/আজিরন সবে বইতে শুরু হয়েছে। আর মানিককেই বা কী জবাব দেবে? সুফিয়া হয়তো সাইফুলকে নিয়ে সুখী হবে। কিন্তু মানিকের কী হবে? আমি দায়িত্ব না নিলে মানিক তো কাবারেই যাইত না।’

কোনোভাবেই জীবনের অঙ্ক মেলাতে পারে না আজিরন। অজানা এক ঝড়ে ভুলে গেছে সে গাণিতিক নামতা। আসলে অঙ্কুরেই সে ভুল করেছে। তা না হলে অভাবের সংসারে এতগুলো সন্তান নিল কেন! তাই মনে হয় ভুল করেছে সে জীবন নামের অঙ্কের সূত্রে। আর এ কারণেই শত চেষ্টা করেও সে অঙ্কের যোগফল আজ শূন্য।

আজিরন যখন এমন ভাবনা ভাবছে তখন হঠাৎ ঘাটের দিক থেকে কেমন হুলস্থূল আওয়াজ আসে। হোসেন ব্যাপারির নৌকা এসেছে অথচ কোনো ধ্বনি বোল শোনা যাচ্ছে না। আজিরনের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। এ কোন অশনি সংকেত? নৌকায় লাশ নিয়ে এলে বা নৌকার কোনো কামলা মারা গেলে সে নৌকায় ধ্বনি বা বোল দেয় না। ধ্বনি বোল না শোনায় তার ভেতরে কেমন ছটফটানি শুরু হয়। তার একবার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে নৌকার কাছে। কিন্তু সাহস ও মনোবল কোনোটাই তার পক্ষে না থাকায় ঘর থেকে বের হয় না। অসহ্য যন্ত্রণা পীড়া দেয় তাকে। অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিপর্যেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

আজিরন যখন নানা ভাবনার ঘোলা দরিয়ায় হাবুডুবু খাচ্ছে তখন মানিক এসে সামনে দাঁড়ায়। দু’হাত দিয়ে চোখ মুছতে থাকে।
আজিরন একবার ভাবে, নৌকা থেকে নেমেই বুঝি আজিবারের খবর শুনেছে, তাই মানিক কাঁদছে। সে মানিকের দিকে তাকিয়ে থাকে।
একসময় মানিক হাউমাউ করে কাঁদে আর বলে, ‘মামি, মামা আর নাই। মামা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।’

মানিকের মুখে এমন কথা শোনার পর আজিরন কেমন কঠিন  প্রস্তররূপ ধারণ করে। এতটুকু নড়ে না। চোখে পলক পর্যন্ত নামে না।

অন্যদিকে মানিক কাঁদে আর বলতে থাকে, ‘মামার ডায়রিয়া হইছিল। মনে করছিলাম অল্প দিনেই ভালো হইয়া যাইব। কিন্তু ভালো কেমনে অইবো! ঠিকমতো ওষুধপানি পড়ে নাই। ভালো কোনো চিকিৎসারও ব্যবস্থা হয় নাই। কে করবে কার চিকিৎসা! চিকিৎসা না হওয়ায় মামা মারা গেছে। হাওরেই মাটি দেয়া হইছে…’

আরও কত কি মানিক বলে যায়, তার কোনো কিছুই আজিরনের কানে আসে না। সে তখন সমস্ত চিন্তা-চেতনার ঊর্ধ্বে। দেখে মনে হয় মানিক কোনো কাহিনিকার আর আজিরন নির্বাক এক মুগ্ধ শ্রোতা।

আহ্! দারিদ্র্য বুঝি এভাবেই দরিদ্রকে দিনমান উপহাস করে চলে। আজিরন বেওয়াদের মতো মানুষ সেসব জীবন-নাটকের কুশীলব মাত্র।

উপন্যাস ।। আজিরন বেওয়া - রাশেদ রেহমান

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব বারো-তেরো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *