প্রবন্ধ।। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়: সংগীত প্রসংগ।। ড. হাফিজ রহমান
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বিভিন্ন পৌরাণিক উপমার আড়ালে সংগীতের প্রকাশ সমধিক তাৎপর্যপূর্ণ। কবিতাটির অনেক পঙক্তিতে ও ঘটনায় প্রত্যক্ষ সাংগীতিক যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়। এবং সংগীত ধারার গভীর অন্তর্দেশে দ্রোহ-সংগ্রাম-শক্তির অসংকোচ বর্ণনা প্রকৃত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও বোধকে আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সংগীতের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি কবির আত্মবিশ্বাস এবং মানব প্রেমের প্রতীক। পৌরাণিক চরিত্রের প্রতিকৃতির মাধ্যমে সংগীতের অঙ্গীকার বেশ সুন্দরভাবেই বিকশিত। সাথে সাথে সাংগীতিক আবেগ এবং চেতনার বিশেষ প্রকাশ দেখা যায় কবিতাটিতে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার রক্তিম সুরের মধ্যে সংগীতের উপস্থিতি কবির সংগ্রামী মনোভাবকে আরও প্রগাঢ় করে তুলেছে। তাঁর সংগীতের মর্মবাণী সামাজিক অনাচার, বিরূপ-আদর্শ, অসাম্য, দুরাচার, সাম্প্রদায়িকতা এবং অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এই কবিতায় কবির বিপ্লবী মনোভাবকে সাংগীতিক পুরাণ দিয়েছে অমিত শক্তি। কবি প্রতিবাদের সুরে এমন হৃদয়গ্রাহী আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন, যা শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েছে উঠেছে। অর্থাৎ, কবিতায় বর্ণিত সাংগীতিক প্রলয় শুধু কবিতাটিকেই ব্যঞ্জিত করেনি, বরং সংগ্রামী চেতনাও সৃষ্টি করেছে, যা মানুষের মধ্যে নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চার করে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি সংগীতের পরিচয় দিতে গিয়ে বেশ কিছু পৌরাণিক চরিত্রের সমাগম ঘটিয়েছেন। যথা: নটরাজ, হাম্বীর, পিণাক-পাণি, ডমরু, ত্রিশূল, মহাশঙ্খ, প্রণব-নাদ, পূরবী, অর্ফিয়াসের বাঁশরী এবং শ্যাম। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সংগীতের উপর আলোকপাত করতে হলে পৌরাণিক পরিভাষাগুলির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা প্রয়োজন। যদিও এই চরিত্রগুলির বর্ণনা বর্তমান গ্রন্থেরই অন্যত্র লিপিবদ্ধ হয়েছে।
নটরাজ:
আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ‘মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ’ বলেছেন। নটরাজ হিন্দু পুরাণ। ভাষাতে যে বর্ণ ব্যবহার করা হয় সেটির সাথে নটরাজের সম্পর্ক রয়েছে। বৈদিক মন্ত্রে স্বর ও ছন্দ মূলত শিক্ষা। এই ক্ষেত্রে ৬৩ বা ৬৪টি বর্ণের পরিচয় মেলে। এই বর্ণগুলি তথা স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ সৃষ্টি রহস্যের সাথে নটরাজের তাণ্ডবনৃত্য সম্পৃক্ত। এই বিষয়ে পাণিনীয় শিক্ষাতে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
শিব-মহেশ্বরের মতে ৬৩ অথবা ৬৪টি বর্ণ। তার মধ্যে স্বরবর্ণ ও বৈদিক মন্ত্রের স্বর ও ছন্দ-নিয়ামক শাস্ত্রের নাম শিক্ষা। পাণিনীয়শিক্ষাকার ব্যঞ্জনবর্ণগুলিকে নিত্য ব্যবহার করে লেখা, ভাষা ও কথার মাধ্যমে। স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণগুলির সৃষ্টিরহস্যের সন্ধান দিতে গিয়ে ‘কাশিকাবৃত্তি’-কার নন্দিকেশ্বর বলেছেন, নটরাজ তাণ্ডবনৃত্য শেষ কোরে যখন নবপঞ্চবার ঢক্কা নিনাদ (ডমরুধ্বনি) করেছিলেন, তখন ১৪টি পর্যায়ে বর্ণগুলির সৃষ্টি হয়।…নটরাজ-শিবের তাণ্ডবনৃত্যের ধারণা থেকে পরবর্তীকালে শিল্পে নটরাজমহাকালের মূর্তি কল্পিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, নৃত্যের বিচিত্র ভঙ্গীরও বিকাশ হয়েছে সেই অপরূপ কল্পনা থেকে।১
মহাদেবের আরেক নাম নটরাজ। নৃত্যকলার উদ্ভাবক। বিশ্ব ধ্বংসের প্রতীক নটরাজ। ব্রহ্মপ্রলয় মূলত নটরাজেরই কর্মের পরিপূরক। বিশ্ব ধ্বংসের সময়কার নৃত্যকে তাণ্ডব নৃত্য বলে। গজাসুর ও কালাসুরকে ধ্বংস করে নটরাজ তাণ্ডব নৃত্য করেন। অন্য মতে উত্তেজক পানীয় পান করে স্ত্রীর সাথে তাণ্ডব নৃত্যে রত হন নটরাজ। এখানকার সারকথা হলো- পাপ পঙ্কিলতাপূর্ণ বিশ্ব নিধন করে সুন্দর সত্যের সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যাশা। সঙ্ঘবদ্ধ ও কুচক্র থেকে দেশ, সমাজ ও ব্যক্তিকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন সুশাসন। এবং অন্যায় উৎখাত ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা। ‘গীতং বাদ্যং নৃত্যং’ সংগীতের তিন সন্তান। সুতরাং নৃত্য নিঃসন্দেহে সংগীতের অংশ। এসব দিক বিবেচনায় সংগীত অন্যায় নাশের প্রতীক হতেই পারে। বস্তুত এই কারণে বিপ্লবী কবিতা ‘বিদ্রোহী’র পরে নজরুল ভাঙ্গার গান, কাণ্ডারী হুঁশিয়ার প্রভৃতি জাগরণী গান রচনা করেন। নজরুলের ‘দ্রোহ ও সংগীত’ এর উপর পূর্ণাংগ গবেষণা হতে পারে।
হাম্বীর, ছায়ানট ও হিন্দোল: হাম্বীর বল্লদেব। মল্লভূম জনপদের ৪৯তম রাজা। বার ভূইয়াদের মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন যুদ্ধে রাঢ় ও পাঠানদের পরাজিত করেন। রাঢ় বঙ্গে স্বাধীন সনাতন ধর্মীয় রাজ্য মল্লভূম জনপদ সুরক্ষিত রাখেন। রাজত্বকাল ১৫৬৫-১৬২০। হাম্বীর অর্থ বীরত্ব, এবং তা রাগিণী হিশেবে ব্যবহৃত। কারণ ‘হাম্বীর’ এর পর ‘ছায়ানট’ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ছায়ানট’ একটি রাগ। ‘বিদ্রোহী’র এই অনুচ্ছেদে (Stanza) সংগীতের রাগ-রাগিণী ও নৃত্যকলা সম্পর্কে আলোচনা আছে। তবে সেই চিরাচরিত সাংগীতিক আবহে নয়। বরং ছন্দ-হিন্দোলে সমাজ পরিবর্তনের অভিপ্রায় এখানে অনুরণিত। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উক্তি-
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
ছায়ানট: ছায়ানট রাগ, বা অনেকের ভাষায় ছায়ানট রাগিণী। দক্ষিণ এশীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল চর্চিত একটি রাগ। এর উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, সুরের স্বভাব এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সংগীত এরিনায় ব্যাপক। এটি বিশেষত উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি রাগ। রাগটি কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত। ইমন একই ঠাটের আরেকটি প্রসিদ্ধ রাগ। ছায়ানট রাগ সাধারণত রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে (রাত ৯টার পর) পরিবেশন করা হয়। এটি একদিকে শক্তিশালী, অন্যদিকে কোমল ভাবের মিলনে তৈরি গভীর আবেগময় রাগ। পরস্পর বিরোধী দুই সত্ত্বা একই রাগের মধ্যে থাকাতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেই সংঘাত-দ্বন্দ্ব হচ্ছে প্রেমের দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য’ মানব মনের এমন নিগূঢ় দার্শনিক সত্যের দ্বৈতমিলন রাগটিতে লক্ষ্য করা যায়। এটি উচ্চাঙ্গ, গম্ভীর, উজ্জ্বল এবং বীর-রসাত্মক আবহ সৃষ্টি করে। সুরগুলি ঝলমলে, বিশেষ করে তীব্র মধ্যম ব্যবহারের কারণে রাগটিতে একটি অতিপ্রাকৃত দীপ্তি সৃষ্টি হয়। এই রাগে তীব্র মধ্যম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ছায়ানটের সাথে মিল পাওয়া যায়-ইমন, হংসধ্বনী ও কল্যাণের অন্যান্য রাগের। তবে ছায়ানট ইমনের মতো অতটা নরম বা কোমল নয়; এটি বেশি দ্যুতিময় ও স্থির। ছায়ানটের প্রধান রস: বীর রস (উদাত্ত), শান্ত রস। অন্তর্মুখী ঔজ্জ্বল্য এই রাগের সুরের গর্ব, উৎকর্ষ ও ভেতরের প্রতিফলিত আলো।
হিন্দোল: হিন্দোল রাগের রমণী ৫টি। বেলাবলী, দেশাখ, রামকরী, ললিতা এবং পটমঞ্জরী। এই বিষয়ক তথ্য লোচনশর্মা রচিত রাগতরঙ্গিণী গ্রন্থে নিম্নের ছন্দোবদ্ধ চরণে পাওয়া যায়।
বেলাওল দেসাখ অরু রামকরী সুবিশাল
ললিতা অও পটমঞ্জরী হএ হিন্দোল কী বাল।
তাই এটি পুরুষ রাগ এবং বসন্তকালের রাগ। পুরুষ রাগের ধর্ম হচ্ছে বীর রস (Heroic Mood)। পুরুষ রাগে তেমন কোন চাকচিক্য বা সাজগোজ (ornamentaion) থাকে না বা সাজসজ্জা তথা বেশ-ভূষার অতিশয় আতিশায্য থাকে না। এটা সরাসরি সোজা চলে। সামনে চলে। জাগরণী কবিতা-গান বা কাব্যগানে দুরন্ত ভাবের মতো অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সবকিছুর অগ্রনায়ক হয়। যুদ্ধবিগ্রহ করে শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই ধরনের যুদ্ধ ও শান্তির কাব্যকর্ম এবং কাব্যসংগীত অথবা সংগীত এই রাগে গীত হয়। পক্ষান্তরে ছায়ানট একটি রাগিণী এবং শান্ত নরম-কোমল স্বভাবের। রাগিণী নারীদেরই মতোন। এর সুনির্দিষ্ট কাল পাওয়া যায় না তবে বর্ষাকাল এর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে। ছায়ানটের অনেক সাজসজ্জা বা অলংকরণ থাকে। সাজসজ্জা ও রূপ-অভিরূপ এবং বহুরকম আঙ্গিক লক্ষ্য করা যায়।
হিন্দোল উত্তর ভারতীয় সংগীতধারার কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত রাগ। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে ১৮ টি গ্রাম রাগের উদ্ভব হয় যা, নাটকে ‘ধ্রুবাগান’ হিসেবে প্রয়োগ হতো। নাট্যশাস্ত্রবিদ ভরত এগুলোর নামকরণ করেন জাতি গান। পরবর্তীতে ভরত পুত্র ও শিষ্য শার্দুল ‘হিন্দোল’কে ভাষারাগ বলে আখ্যায়িত করেন। ভাষারাগ ‘হিন্দোল’ থেকে পরবর্তীকালে ১৫ টি বিভাষা রাগ সৃষ্টি হয়। সেই সূত্রে ‘হিন্দোল’ ১৫টি রাগের জনক। একসময় এই রাগের গ্রাম ও প্রকৃতি নিয়ে সংশয় ছিলো। কারণ ষড়জ গ্রামে ছিলো চারশ্রুতির। পক্ষান্তরে মধ্যম গ্রামের পঞ্চম তিনশ্রুতির। প্রথমে এটি শৃঙ্গার রসের প্রেম, আকর্ষণ এবং সৌন্দর্যের অনুভূতির প্রকাশক রূপে খ্যাত ছিলো। কিন্তু অধুনা এটিকে গম্ভীর প্রকৃতিরূপে বিবেচনা করা হয়। গভীর ও স্থায়ী প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে শৃঙ্গার রস। কারণ এই রসের স্থায়ীভাব ‘রীতি’ থেকে এসেছে। এটি গভীর আনন্দদায়ক এবং স্থায়ী অনুভূতির জন্ম দেয়।
হনুমন্ এর মতে মূল রাগ ৬টি। ভৈরব, কৌশিক, হিন্দোল, দীপক, শ্রী এবং মেঘ। মৈথিলি ভাষায় ১৬৮১ সালে লোচন শর্মা রচিত গ্রন্থ ‘রাগ তরঙ্গিণী’র ৮-৯ পৃষ্টায় ‘হিন্দোল’ রাগের বিষয়ে বলা হয়েছে-
অথ হিন্দোলঃ॥ অতঃপর হিন্দোল
রূপগর্বযুত খর্বপর্ব হিমধাম সমানন,
গন্ধর্বাধিক সর্বকলা বিদ্যাকুলকানন।
নটবর কলিত সুবেশ বিমল পারাবত সুন্দর।
কুণ্ডল ললিত কপোল লোল হিন্দোল পুরন্দর ॥
হিমধাম-চন্দ্র, পর্ব-দীপ্তি (চন্দ্রের দীপ্তিকেও যে রূপ খর্ব করে);
করেঁ পকরি নারি উর আনি মুখ
নিরখি মুসুকায় পুনি।
রাস করত লঘুলোল গতি সো কহ্যো বীর হমুমন্ত মুনি॥
খর্বরূপ গুণগর্ব গহত সর্বাধিক সুন্দর,
তন কপোতসম বরন করনকুণ্ডল কামুকবর।
নবল নিতম্বিনী অঙ্ক অঙ্কভরি
নিরখি নিরখি সুখ
থোর থোর হিন্দোল চলতহাঁ
করত কেলি সুখ।
পুংরাগরূপবর্ণনং
সব রাগ রাগরাজতর মন গাবত
জেহি গন্ধর্বজন,
লঘু লোল গমন বহুমোল মহ
কহ হিন্দোল জেহি জতি অজন॥
পকরি-ধরে। মুসুকায়-মৃদুহাসে। কহ্যো-কহিও (বলা হয়); রাস করত-রাসক্রীড়ার মতো ক্রীড়া করে। গহত-গভীর; করনকুণ্ডল-কানে কুণ্ডল; জতি অজন=যতিজন (মুনি)।২
‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি হিন্দোল’ থেকে ‘আমি চপলা-চপল হিন্দোল’ পর্যন্ত গভীর মনোযোগে পাঠ করলে পাঠকের হৃদয়ে এক ধরনের ‘দোল’ বা ছন্দায়িত নৃত্য অনুভূত হয়। অর্থাৎ পংক্তিগুলি পাঠকের অন্তরাত্মার সাথে সাথে শারীরিক/ দৈহিক দোল/ ছন্দ সৃষ্টি করে। এই চরণের প্রথম পংক্তি ‘আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল’ পর্যন্ত গুরুগম্ভীর ভাব পরিলক্ষিত হয়; যেটি শৃঙ্গার রসের একটি বৈশিষ্ট্য। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যেহেতু ‘বীর রস’-এ রচিত, সেহেতু একই কবিতায় ‘শৃঙ্গার রস’-এর চরণ সৃষ্টির জন্য তিনি সচেতনভাবেই শৃঙ্গার রসের গুরুগম্ভীর প্রকৃতিকেই বেছে নিয়েছেন। এরপর তিনি লিখলেন, ‘আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি ছমকি’। এখানে ‘আমি চল-চঞ্চল’ লিখলেও বাস্তবিক গতির সঞ্চার হয়নি। বরং যখন লিখলেন ‘ঠমকি ছমকি’ এবং পরে লিখলেন, ‘পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ তখন সত্যিকার ছন্দের দোল বা অসিলেসন (oscillation) সৃষ্টি হলো। এবং তরঙ্গ ধর্ম বিশেষরূপ লাভ করলো। এটি Longitudinal wave তথা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ বা দীঘল তরঙ্গ। এই ধরনের তরঙ্গে, মাধ্যমের কণাগুলো তরঙ্গের সঞ্চালনের দিকের সাথে সমান্তরালভাবে কম্পিত হয় এবং শক্তি সঞ্চালনের দিক বরাবরই কণাগুলো সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। কণাগুলো মাধ্যমের মধ্যে একই বা বিপরীত দিকে কম্পিত হয়, যা তরঙ্গের শক্তি প্রবাহের সমান্তরাল। উদাহরণ: শব্দ তরঙ্গ, স্প্রিং-এর মধ্যে সৃষ্ট তরঙ্গ এবং ভূমিকম্পের প্রাথমিক তরঙ্গ (P-wave) হলো অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের উদাহরণ। এই তরঙ্গগুলির সঞ্চালনের প্রকৃতি হলো: এই তরঙ্গগুলো সংকোচন (compression) এবং প্রসারণ (rarefaction) অঞ্চলের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
——————————————————-
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সন্চারি ভুবনে সহসা সন্চারি’ ভূমিকম্প।
এখানেই নজরুল নিজেই নিজেকে ‘নৃত্য পাগল ছন্দ’ বলেছেন। অর্থাৎ সংগীতের মহামায়া তিনি দ্রোহের মাঝেও ত্যাগ করতে পারেন নি। পক্ষান্তরে উপরে বর্ণিত শেষ দুই পঙক্তিতে তিনি ভূমিকম্পের উদাহরণ এনে সংগীতের তরঙ্গ তত্বকে বিশেষায়িত করেছেন। অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের মতো এই চরণগুলিতে যতো না উত্থান-পতন তার চেয়ে সম্মুখ-পশ্চাৎ Forward-Backward দোল সৃষ্টি হয়েছে। ‘আমি চপলা-চপল হিন্দোল’ কিছুটা স্থিরতা দিয়ে শুরু হলেও
‘আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’তে
এসে সম্মুখ গতির সঞ্চার করেছে। পরক্ষণেই পেন্ডুলামের মতো প্রারম্ভিক বিন্দুতে (Starting Point) আসার মতো করে কবি লিখেছেন ‘আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল’। এরপর আবার নতুন তরঙ্গ সৃষ্টির জন্য যেন লিখলেন,
‘ফিং দিয়া দিই তিন দোল;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
একটি বৃত্তায়িত তরঙ্গ-ছন্দ। এখানে দোলায়িত করে পাঠক হৃদয়। এছাড়াও সমাজের মানুষকে আন্দোলন সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করলেও কিছু মানুষ স্থির থাকে বা সাময়িক সামনে গেলেও আবার পিছিয়ে আসে, তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে সামনে পাঠানোর জন্যই কবির শেষ পঙক্তির প্রয়াস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা।
আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।
এই কবিতাতে যেমন ব্যঞ্জনা তদরূপ নজরুলের বর্ণিত পঙক্তিগুলো-ও একই অর্থবাহক।
পিণাক-পাণি: পিণাক-পাণি হিন্দু পুরাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবং দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। ‘পিণাক’ শব্দটির অর্থ ‘প্রহারক’ বা ‘ধনুক’। পূরাণে বর্ণিত আছে ‘পিণাক’ শিবের একটি উল্লেখযোগ্য অস্ত্র। শিবের পৌরাণিক গল্পগুলোতে উল্লেখিত, পিণাক একটি বিশেষ ধনুক, যা শিব মহাদেব দানবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করতেন। এটি সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, ‘পিণাক-পাণি’ সৃষ্টির সময় স্বর্গের দেবতাদের-আত্মসত্ত্বার সাথে যুক্ত ছিলো এবং এটি দেবশক্তির প্রতীক। এটি আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত, যা ধৈর্য, শক্তি এবং আত্মনিবেদন শেখায়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে, ‘পিণাক-পাণি’র উল্লেখ বিভিন্ন পুঁথিতে এবং বৈদিক শাস্ত্রে পাওয়া যায়, যেখানে এটি ঈশ্বর শক্তির অনন্য প্রতিনিধি। এই কারণেই ‘পিণাক-পাণি’র গুরুত্ব শুধু অস্ত্র হিশেবে নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বহুবিধ।
হরধনু হলো শিব ধনুক বা পিণাক; যা হিন্দু ধর্মে ভগবান শিবের স্বর্গীয় ধনুক। শিব ত্রিপুরান্তক হিসাবে ত্রিপুরা নামক তিনটি শহরকে ধ্বংস করার জন্য এই ধনুক ব্যবহার করেন। শিবের হাতে (পাণি) পিণাক (ধনুক) ছিলো বলে শিব-ই ‘পিণাক-পাণি’। এই ধনুক শিবের শুধু অস্ত্রই নয়, এটি বাদ্যযন্ত্র-ও। তাই ‘পিণাক-পাণি’ ধ্বংস এবং সৃষ্টির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ধারক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাও শুধু ধ্বংসের জন্য নয়, বরং সৃষ্টির এক মহান নেশায় অভিমত্ত প্রতিটি মুহূ্র্তে।
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,
আমি চক্র ও মহা-শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!
ডমরু: ডমরু বা ডুগডুগি-একটি ছোট আকারের দ্বিমুখী ড্রাম। সব্যসাচী ড্রাম। এই বাদ্যযন্ত্র হিন্দু এবং তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মে চর্চিত। ডমরুর উৎপত্তি প্রাক-বৈদিককালে। এই বাদ্যযন্ত্র শিব বা মহাদেবের বাদ্য। প্রথম তাল-বাদ্য ডমরু। ডমরু ভারতীয় সংগীততত্ত্বে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। নাদের জন্ম, তাল-লয় ও মহাজাগতিক সুরের সাথে ডমরুর রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক। এটি দেখতে ক্ষুদ্র, সাধারণ বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভারতীয় সংগীত, আধ্যাত্মিকতা ও নৃত্য-তত্ত্বের বিস্তৃত ইতিহাস। হিন্দু পুরাণে শিবের হাতের ডমরু যেমন সৃষ্টি ও বিনাশের প্রতীক, তেমনি সংগীততত্ত্বে এটি ‘আদি নাদ’ বা আদিম শব্দ-কম্পনের উৎস। সঙ্গীতের সুর, তাল, লয়, ছন্দ এসব কিছুর আদিম স্পন্দন ডমরুর মধ্যে সংগঠিত। তাই ডমরুর সংগীতিক, ধ্বনিতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বিশদ ও সুবিস্তৃত। ডমরুর দু’পাশে দুটি দড়ির মাথায় গুটি থাকে যা বাজালে তালের সঙ্গে পুনরাবৃত্ত তরঙ্গ [repeatitive wave] তৈরি হয়। এর ধ্বনির মূল বৈশিষ্ট্যই রিপিটেটিভ বিট তথা একই কম্পনাংকের (frequency) ধারাবাহিক কম্পন। স্বয়ংক্রিয় লয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাত খুব কম নাড়ালেও ডম-ডম-ডম তাল ধারাবাহিক থাকে। এছাড়াও ডমরুর নাদ আহত নাদ। অর্থাৎ ডমরুর উপর আঘাতের ফলে এই ধ্বনি বা নাদ সৃষ্টি হয়। মানুষের মাঝে সাধারণত অনাহত নাদ থাকে। এই বিশ্ব চরাচরে বিভিন্ন অনিয়ম, অনাচার, অবিচার, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যখন মানুষকে জাগিয়ে তোলা হয় তখন আহত নাদের সৃষ্টি হয়। আর এই আহত নাদ ডমরুর মতো হলে সেটি হয় পুনরাবৃত্ত [Repeatitive]. অর্থাৎ একবার শুরু হলে একটি শান্তি-শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাধান ব্যতীত আর বন্ধ হয় না। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় এই ধরনের অন্তর্গত ধারণা বহু-গবেষণার দাবি রাখে।
ত্রিশূল: একটি অস্ত্র। হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মে শুভ চিহ্ন। এটি দেবতা শিবের প্রধান অস্ত্র। ধারালো তিনটি বর্শার ফলাযুক্ত অস্ত্রই ত্রিশূল। পৌরাণিক, ঐতিহাসিক এবং আধুনিক সংস্কৃতিতে ত্রিশূলের ব্যবহার দেখা যায়। হিন্দু মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল সংযুক্ত থাকে।
ত্রিশূল হলো বহুযোজীতা এবং সমৃদ্ধির প্রতীক। এটি মূলত ভগবান শিবের চিহ্নরূপে তার হাতে বিরাজমান থাকে। পুরাণ মতে নিজপুত্র গনেশ এর অহংকার এবং ঔদ্ধত্য দেখে ক্রোধের বশে তিনি এই ত্রিশূল দিয়েই গণেশের শিরোচ্ছেদ করেছিলেন। দেবী দূর্গাও তার অন্যান্য অস্ত্রের সাথে ত্রিশূল ধারণ করেন। ত্রিশূলের তিনটি ফলার একাধিক অর্থ ও গূরুত্ব রয়েছে৷ এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের খুব সাধারণ একটি বিষয় এবং এর তাৎপর্যের পেছনে একাধিক পুস্তকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। ত্রিশূলের তিনটি ফলা জীবনের বিভিন্ন ত্রিত্বগুণকে উপস্থাপন করে। ত্রিত্ব বৈশিষ্ট্যগুলি হলো, সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত, দেহ-মন-আত্মা, ধর্ম-সিদ্ধি-উদ্গম দিয়ে তৈরী ত্রিকায়া, সমবেদনা-আনন্দ-ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা-মনস্তত্ত্ব-আপেক্ষিকতা, সুখ-স্বস্তি-বিষণ্ণতা, গর্ব-খ্যাতি-আমিত্ব, স্পষ্টতা-জ্ঞান-পাণ্ডিত্য, স্বর্গ-মন-পৃথিবী, অহং-অগ্নি-ভূ, আত্মা-আবেগ-জীব, যুক্তি-আসক্তি-বিশ্বাস, প্রার্থনা-প্রকাশ-মহিমা, প্রজ্ঞা-ধ্যান-বোধিসত্ত্ব, অধ্যয়ন-বোধগম্যতা-জ্ঞান, মৃত্যু-উত্তরণ-পুনরুজ্জীবন, সৃষ্টি-আদেশ-বিনাশ। এরকম তিনটি গুণের প্রকাশকে একত্রে ত্রিশূলের রূপ হিসাবে মনে করা হয়। ত্রিশূলকে যখন ভগবান শিবের অস্ত্র হিসাবে ধরা হয়, তখন ত্রিশূল তিনটি বস্তুকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, যথা, ভৌতিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, পিতৃপুরুষগণের বিশ্ব এবং মনোজগৎ। শিবের একটি হুংকারে তিনি ত্রিভূবন ধ্বংস করতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। ৩
মহা-শঙ্খ: শঙ্খ সামুদ্রিক শামুক। খোলস থেকে অলঙ্কার, বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়। হিন্দুধর্মে, শঙ্খ রক্ষাকর্তা দেবতা বিষ্ণুর প্রতীক। হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ শাস্ত্র অনুযায়ী, শুভকাজে তিনবার শঙ্খ বাজায়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাঞ্চপাণ্ডব ও শ্রীকৃষ্ণের কুরুক্ষেত্র ঠোঁটে শঙ্খধ্বনি ধ্বনিত হয়। দেবী দুর্গার হাতেও শঙ্খ দেখা যায়। শঙ্খ ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রাচীনতম বাদ্যযন্ত্র, যার মধ্যে মহা-শঙ্খ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি সাধারণ শঙ্খের তুলনায় আকারে বড়, স্বরে গভীর এবং অধিক প্রতিধ্বনিযুক্ত। প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক শাস্ত্রীয় ও লোকসংগীত সব ক্ষেত্রেই মহা-শঙ্খ ধ্বনি-ঐতিহ্য সৃষ্টিতে অনন্য। সংগীতে এর অবদান মূলত দু’ভাবে। আধ্যাত্মিক-ধ্বনিগত এবং নির্দিষ্ট সাংগীতিক দিক। ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য ও রাগ-সংগীতের উপর মহা-শঙ্খের প্রভাব সবিশেষ গুরুত্ববহ। মহা-শঙ্খের মূল শক্তি তার তরঙ্গ-ভিত্তিক (waveform) কম্পন। এর সুর সাধারণত গভীর, বিস্তৃত ও অনুনাদক ‘ওম-ধ্বনি’ তৈরি করে। এই কম্পন মানুষের মন-মস্তিষ্কে শান্তি, সংহতি ও মনোযোগ তৈরি করে, যা শাস্ত্রীয় সংগীতে ধ্যানমগ্ন ভাব সঞ্চার করতে সমর্থ। ভাব ও রাগের মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট সম্পর্ক। অনেক রাগের আলাপ, বিশেষত ভোরের রাগ তথা ভৈরব, তোড়ি, বিভাস, শঙ্খধ্বনির মতো দীর্ঘ, প্রশস্ত স্বর ধ্বনিকে অনুকরণ করে। ফলে শঙ্খ সংগীতের ধ্বনিতত্ত্ব রাগসৃষ্টিতেও প্রাথমিক প্রেরণা হিশেবে পরিচিত। এছাড়াও ধর্মীয় সংগীত ও আচার-অনুষ্ঠানে মহা-শঙ্খের অবস্থান বেশ উল্লেখযোগ্য। মহা-শঙ্খ বহু সহস্রাব্দ ধরে ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংগীতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে শঙ্খধ্বনি শুদ্ধতার প্রতীক। মন্দিরে আরতি, পূজা, উৎসব, কীর্তনে মহা-শঙ্খের ধ্বনি সংগীতের ছন্দ ও আবহ তৈরি করে। বৈষ্ণব কীর্তনের সূচনায় মহা-শঙ্খ ধ্বনি একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্য। শঙ্খের কম্পনভিত্তিক শব্দ-তরঙ্গ দলগত সংগীতের সুর-শ্রুতি (tuning)-র ক্ষেত্রেও মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে। অন্যদিকে মহা-শঙ্খ লোকসংগীত ও আঞ্চলিক সুরধারায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বাংলার বহু অঞ্চলে শঙ্খের ব্যবহার পুরোপুরি সংগীতিক। মঙ্গলসংগীতে-ও, বিশেষ করে বিবাহ ও ধর্মীয় রীতিতে মহা-শঙ্খের ধ্বনি সুরের সূচনা করে। বাউল, ভাটিয়ালি বা কীর্তনে শঙ্খের দীর্ঘ টানা স্বরের অনুকরণ অনেক সময় ভোকাল ‘সা’ ধরার কাজে সাহায্য করে। দীপাবলি, রাখালিয়া লোকসঙ্গীত বা বহু উৎসবের শুরুতে শঙ্খধ্বনি সুর তোলার প্রাক-পর্যায়ের কাজ করে।
সম্প্রতি কেউ কেউ আধুনিক সংগীতেও মহা-শঙ্খের ব্যবহার নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। যদিও আধুনিক সংগীতে শঙ্খের ব্যবহার আগের মতো প্রচলিত নয়, তবুও ফিউশন মিউজিক, যোগ-মেডিটেশন সংগীত, ফিল্ম ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং ওয়ার্ল্ড-মিউজিক এক্সপেরিমেন্ট-এ মহা-শঙ্খের গভীর বেস-ফ্রিকোয়েন্সি বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে। বিশেষত ধ্যান-সংগীত ও সাউন্ড থেরাপিতে মহা-শঙ্খের কম্পন-শক্তিকে বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। অন্যপক্ষে মহা-শঙ্খের সাংস্কৃতিক প্রতীকী অর্থ বেশ মজার ও আদ্যোপান্ত কল্পনামিশ্রিত। মহা-শঙ্খ শুধুমাত্র একটি বাদ্যযন্ত্র-ই নয়; এটি শুভ, শক্তি, শান্তি ও পবিত্রতার প্রতীক। সংগীতে এই প্রতীকবোধ সুরসৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। শঙ্খধ্বনির আভা সুরে বীর-রস, শান্ত-রস, ও অদ্বৈত-ভাব তৈরি করে। সংগীতের আধ্যাত্মিকতা ও ‘ধ্যান-ধ্বনি’ প্রসারে শঙ্খ একটি অনন্য অনুষঙ্গ। সংগীতে মহা-শঙ্খের দান কেবলমাত্র একটি বাদ্যযন্ত্র-ই নয়; বরং এটি ধ্বনি-বিজ্ঞান, রাগ-অন্তর্দৃষ্টি, আধ্যাত্মিক-সংগীত, লোকসংস্কৃতি ও আধুনিক সাউন্ড-ডিজাইনের মতো বহু স্তরে প্রভাব ফেলেছে। মহা-শঙ্খের গভীর, পরিষ্কার ও অনুনাদক স্বর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে দিয়েছে প্রাচীন অথচ চিরন্তন পরিচিতি।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন নজরুল। কারণ তিনি লিখেছেন- ‘আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দণ্ড,/আমি চক্র, মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড’। এই চরণেই কবি দুঃশাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে মহা-শঙ্খের মাধ্যমে যে তরঙ্গভিত্তিক গণজাগরণের চিন্তা করেছেন কবি সেটাই এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শঙ্খধ্বনির সুর বীর-রস, শান্ত-রস, ও অদ্বৈত-ভাব সমৃদ্ধ। অর্থাৎ ‘বিদ্রোহী’র কবি বীর রসে বেগমান। স্বাধীনতার্থী জনগণকেও প্রবল উজ্জীবিত করেছেন এই সব বীর রস নির্ভর উপমার মাধ্যমে।
প্রণব-নাদ: যা উচ্চারণ করে স্তব করা হয় তাই-ই প্রণব। প্রণব শব্দের আরো অর্থ হলো, চিরনতুন, চিরসবুজ। নাদবিন্দু উপনিষদ অনুসারে, যোগীরা জাগতিক উদ্বেগকে সংযত করে ব্রহ্ম-প্রণব (ওঁ) এর উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। ওঁ একটি প্রণবীয় শব্দ। ওঁ এর সাথে মা কালীর নাম যুক্ত করে সৃষ্টি হয়- ওঁমা। ওঁমা এর মাধ্যমে হিন্দু যোগীগণ তন্ত্র-মন্ত্রের অন্তরে প্রবেশ করে এবং দেহতত্বে লীন হয়। এটি আত্মদর্শনে যোগীদের উদ্বুদ্ধ করে। লালনগীতি জাতীয় গান ওঁমা জাতীয় প্রণবের বিশ্বাসকে ধারণ করে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে ব্যবহৃত ওঁমা-এর সাথে উপরে বর্ণিত ওঁমা-এর কোন পার্থক্য নেই। ওঁমা যোগীগণের অনুশীলনের শুরুর স্তরে সমুদ্র বা বজ্রধ্বনির মতো এবং গভীর স্তরে বাঁশি, করতাল, বজ্র ও অর্কেস্ট্রার শব্দ। যোগীগণের বহুলক্ষ্যের কয়েকটি হলো- অতীন্দ্রিয় আত্মাকে উপলব্ধি, ব্রহ্মার সাথে ঐকতানে ধ্যান এবং আত্মস্থের মাধ্যমে নাদ (ওঁ ধ্বনি)। এখানে সাংগীতিক বিষয়ের অবতারণা করা হলেও এবং সাধারণভাবে প্রচণ্ড হুংকার বা শব্দনিনাদের কথা বললেও কবি মূলত একটি আধ্যাত্মিক চেতনা জুড়ে দিয়েছেন। সেই চেতনা হলো একত্ববাদের চেতনা। ব্রহ্মার সাথে একতার চেতনা। অর্থাৎ মানুষের দাসত্ব নয়, স্রষ্টার দাসত্বই মানুষের শাশ্বত মুক্তির পথ। প্রণব-নাদ একটি অতিমৌলিক স্বর। এটি কম্পমান। এর মাধ্যমেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি। সংগীতের একটি মৌলিক বিশ্বাস হলো-‘নাদই ব্রহ্ম’। অর্থাৎ সৃষ্টির মর্মমূলেই ধ্বনি। মূলত সংগীত শুরুই হয় ‘নাদ’ দিয়ে। স্বর, সুর বা রাগ সবই নাদ-কম্পনের বিবিধ বিন্যাস বৈ কিছু নয়।
পূরবী: পূরবী উত্তর ভারতের ধ্রুপদ-ধ্রুপদঙ্গ প্রণীত এক প্রাচীন রাগিণী। ‘পূরব’ শব্দের অর্থ পূর্ব। অর্থাৎ পূর্ব দিক বা পূর্বাঞ্চলের সুরভাব। এই কারণে পূরবী রাগিণীর সুরধারা সাধারণত কোমল, শান্ত, গভীর এবং ভোর বা সন্ধ্যার আলো-অন্ধকারের মতো এক মায়াবী আবহ সৃষ্টি করে। স্বরগঠনের দিক দিয়ে পূরবী রাগিণী সাধারণত পূরবী ঠাটভিত্তিক। এতে কোমল ঋষভ, কোমল ধৈবত ব্যবহৃত হয়, যা সুরে কোমল মাধুর্য আনে। এই রাগে স্বরগুলোর বিন্যাস মৃদু ও গম্ভীর প্রকৃতির হওয়ায় রাগিণীর ধরন অধিকতর স্নিগ্ধ ও ধ্যানমগ্ন। ভাবগত দিক দিয়ে পূরবী রাগিণী মূলত বিরহ, মৃদু-শান্ত, অধীর-অপেক্ষা এবং ভক্তি প্রকাশক। এই সব আবেগ প্রকাশ করে বলেই এর সুরে এক ধরনের সন্ধ্যার ধীর-অলস শান্তি অনুভূত হয়। পূরবী রাগের সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। এই সুরের চলন বেশ লঘু, দীর্ঘ ও কোমল। স্বর-প্রক্ষেপণে বক্রতা ও মৃদু গামক ব্যবহার হয়। এটি অন্তর্মুখী, তাই ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুমরিতে খুব মানানসই। পূরবী রাগিণীর মাত্রা-চলন স্নিগ্ধতা সৃষ্টি করে। ফলে রাগিণীটি শাস্ত্রীয় সংগীতে গভীর আবেগময়তার প্রতীক। পূরবী রাগিণী হলো কোমল, গম্ভীর ও মাধুর্যময় রাগিণী, যা পূর্ব ভারতের সাংগীতিক আবহ থেকে অনুপ্রাণিত। এর সুরে সন্ধ্যার শান্তি, মনের বিষণ্নতা এবং নিবিড় অনুভূতির মিলন ঘটে। তাই ভারতীয় রাগসংগীতে পূরবী রাগিণী এক অনন্য রস-ধর্ম বহন করে।
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
এই চরণে কবি বেদনা-সংগীতের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। এখানে দুঃখবোধ সংগীত দর্পণে ভাস্বরিত। পরবর্তী জীবনে কবি অসংখ্য বেদনার গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে কণ্ঠ-ও দিয়েছেন। বাতাসের সাথে বেদনার অসাধারণ মেলবন্ধন এখানে বিশেষ গুরুত্ববহ। অর্থাৎ আনন্দ বেদনার সাথে সৃষ্টি জগতের অতিআধ্যাত্মিক সংযোগ-সেতুঁ নির্মাণে কবি সচেষ্ট। নিজেকে কবি পথিক হিশেবেও পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ দুদিনের দুনিয়ায় সবাই মুসাফির। মানব জীবনের ক্ষণস্থায়ী একটি ভাব এই চরণে প্রবলভাবে বিধৃত।
অর্ফিয়াসের বাঁশরী: অর্ফিয়াস একজন বিখ্যাত গায়ক। গ্রীক মিথোলোজিতে বর্ণিত আছে অর্ফিয়াস অ্যাপোলো ও মিউজের সন্তান। প্রাচীন গ্রীসের কিংবদন্তি সংগীত শিল্পী, কবি ও ধর্মগুরু। তার গীতিকণ্ঠগুণে প্রাণীকুল এমনকি পাথর পর্যন্ত মোহমুগ্ধ হতো। তিনি বাঁশির সুরে মোহাবদ্ধ করে পাতাল থেকে স্ত্রী ইউরিডিসকে উদ্ধার করেছিলেন। অর্ফিয়াসের বাঁশরী সাহিত্যিক-পৌরাণিক প্রতীক যা সংগীতের কিংবদন্তি শক্তির সাথে যুক্ত। যদিও গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীর কাব্যিক ব্যাখ্যা, ফ্যান্টাসি সাহিত্য এবং প্রতীকী আখ্যানগুলিতে অর্ফিয়াসের রহস্যময় যন্ত্রের আধুনিক রূপান্তর দেখা যায়। এটি একটি মোহনীয় সংগীত শক্তি যা বিশুদ্ধ মিষ্ট-সুরশব্দ সৃষ্টি করে। গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে বিশ্বাস করা হয়, এটি প্রচণ্ড ঝড়কেও শান্ত করতে পারে। কঠিনতম হৃদয়কে প্রশমিত করতে পারে এবং প্রাচীন স্মৃতি জাগ্রত করতে পারে। এটি পৌরাণিক সাংগীতিক শক্তির সমান্তরাল। অর্ফিয়াসের বাঁশরী পাতালে অবতরণ এবং বেহালা, সংগীতের সীমানা অতিক্রম করার ক্ষমতার প্রতীক। এটি জীবন-মৃত্যু, দুঃখ-আনন্দ, মানব-ঐশ্বরিকের মধ্যে যোগসূত্র। তবে এক কথায়, এটি আবেগের বাদ্যযন্ত্র। এর সুরগুলি, গভীর বিষণ্ণতা, আবেগপূর্ণ প্রেম, আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা, এবং অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্য প্রকাশ করে কল্পনা করা হয়েছে। অর্ফিয়াসের বেহালা প্রকৃত শিল্প-বিনোদন নয়, বরং মানুষকে সত্য, সম্প্রীতি এবং উচ্চতর চেতনার দিকে পরিচালিত করে। এবং মানবতাকে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার সাথে সংযুক্ত করতে পারে।
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য;
অতিকাব্যিক এই পঙক্তিগুলি আত্ম-পরিচয়ের বহুমাত্রিকতায় সমৃদ্ধ। প্রথম পংক্তিতে কবি বলেন,‘আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী’। অর্ফিয়াস গ্রীক পুরাণের কিংবদন্তী সংগীতজ্ঞ। যার বীণা বা বাঁশরীর সুরে প্রকৃতিও বিমোহিত হতো।
এখানে কবি নিজের পরিচয়কে সংগীত, সৌন্দর্য, মায়া ও সৃষ্টিশীল শক্তির অবিনাশী প্রেরণা রূপে প্রকাশ করছেন। অর্থাৎ, তিনি এমন এক শক্তির অধিকারী, যার সুর মনকে আকর্ষণ করে, জগৎকে রূপান্তরিত করতে পারে। বিশ্বকে নতুন করে গড়ার সক্ষমতা রাখে। দেবশক্তি ও মহাজাগতিক আধিপত্য-ও এখানে সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় পংক্তি-‘আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য’ এখানে ‘ইন্দ্রাণী-সুত’ মানে ইন্দ্রপুত্র যে স্বর্গীয় শক্তির অস্তিত্ব। কবি এখানে মহাজাগতিক নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ, যার নিয়ন্ত্রণে চাঁদ-সূর্য-সমগ্র মহাবিশ্ব। চাঁদ ‘ভালে’ (কপালে) সূর্য। এটি ত্রিনয়নী, শিবসুলভ ক্ষমতার চিহ্নও বটে। বস্তুত এখানে চাঁদ সুশীতল, কোমলতা, লাবণ্য ও স্নিগ্ধতার প্রকাশ। পক্ষান্তরে, সূর্য চিরকাল তেজোদ্দীপ্তি, সংগ্রাম মুখরতা, উত্তেজনা, তপ্ত জাগরণের প্রকাশ। তৃতীয় পঙক্তিতে দ্বৈত অস্তিত্ব বিবৃত হয়েছে। মানব জীবনের সুর ও সংগ্রাম এই পঙক্তির মূলভাব। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর রণ-তূর্য’। এখানে দুটি বিপরীত শক্তির পাশাপাশি অবস্থান বিশ্বজগতের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য বাহক। বাঁশির সুর মূলত: শান্তি, প্রেম, সৃজন, ঐশ্বর্য। পক্ষান্তরে রণ-তূর্য: যুদ্ধ, সংগ্রাম, বিসর্জন, প্রতিরোধের প্রতীক। মানুষ কেবল সৃষ্টিশীল নন, প্রলয়ধ্বনি বাজাতেও সক্ষম। যেমন আক্ষরিক অর্থেও কবি শিল্পী আবার সৈনিক (যোদ্ধা)। এক হাতে সুর, অন্য হাতে সংগ্রাম।
এই তিনটি পংক্তিতে সংগীতের দেবত্ব, মহাজাগতিক শক্তি, সৃষ্টিশীলতার সৌন্দর্য, এবং জাগতিক যোদ্ধার দৃঢ়তা, সংশপ্তকের সমন্বিত প্রতিমা হিসেবে চিত্রিত। এটি মূলত সৃষ্টি ও ধ্বংসের দ্বৈত শক্তির অধিকারী অতিমানবিক সত্ত্বার পরিচায়ক।
শ্যাম: ভগবান খাটু শ্যামের নাম। খাটু শ্যাম কলিযুগের সবচেয়ে ক্ষমতাবান দেবতা বলে পরিচিত। তাঁর প্রতি ভক্তদের রয়েছে গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসা। মূলত শ্রীকৃষ্ণের অনেক নামের একটি নাম শ্যাম। প্রধানত তিন প্রকার বাঁশি কৃষ্ণ বাজাতেন। বেনু, মুরলী এবং বংশী। কৃষ্ণ সর্বদা বাঁশি সঙ্গে রাখতেন। এ বিষয়ে পৌরাণিক একটি গল্প আছে। গল্পটি এইরূপ- একবার বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময়, যেকোন কারণে বিরক্ত হয়ে কৃষ্ণ বাঁশকে প্রাণত্যাগ করতে বলেন। কৃষ্ণের জন্য বাঁশ প্রাণত্যাগ করে। এই বাঁশ দিয়ে তিনি বাঁশি বানান। বাঁশ তার জন্য প্রাণ ত্যাগ করায় তিনি কৃতজ্ঞতা-স্বরূপ সব সময় বাঁশিকে সঙ্গে রাখতেন।
কৃষ্ণের বাঁশি বাজানো নিয়ে আরও একটি গল্প আছে। এক বৃদ্ধের কাছে শিশু কৃষ্ণ বাঁশি বাজানো শিখতে চাইলে বৃদ্ধ অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু কৃষ্ণ অনেক কষ্টে তাকে রাজি করান। বৃদ্ধ বলেন- বাঁশিতে তার মতো করে ফুঁ দিতে। কৃষ্ণ প্রথমবার বৃদ্ধের মতো করে ফুঁ দিলেও পরে নিজের মতো করে ফুঁ দেন। তখন বাঁশিতে এমন এক ঐন্দ্রজালিক সুর উঠলো যা ইহলোক এবং ইন্দ্রলোকে কেউ কখনো শোনে নি। বৃদ্ধ কৃষ্ণকে দৈব শিশু মনে করেন এবং তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণের পদতলে লুটিয়ে পড়েন।
কাজী নজরুল এখানে প্রেমিক হিসেবে বীরকে পরিচয় করিয়েছেন। তবে সেই প্রেম মানব মানবীর প্রেম নয়। বরং ঐশ্বরিক। এখানে বিবৃত প্রেম, নিত্য সত্য ও শাশ্বত। এবং তা প্রেম মূলত মানব প্রেমের রূপান্তর। এমন ঐশ্বরিক প্রেম পৃথিবীতে শান্তি আনতে পারে; যে প্রেমের মাধ্যমে শাসনের নামে শোষণের বিনাশ হয় এবং জালিমের হয় নিঃশেষে নিপাত। এমন শাশ্বত প্রেম ও প্রেমিককে কল্পনা করেছেন কবি।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যবহৃত পুরাণ হিন্দু বা অন্য কোন সুনির্দিষ্ট ধর্মের কোনরূপ প্রচার-প্রসার নয়। পুরাণের মাধ্যমে প্রকাশিত সংগীতের উপাদান বস্তুত প্রেম-দ্রোহের চিরন্তন বন্ধনের প্রবল প্রকাশ।
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সংগীতের উল্লেখ ও প্রতীকী ব্যবহার কবিতাটির শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক রূপকে সমৃদ্ধ করেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল নিজেকে কখনো বীণার ঝঙ্কার, আবার কখনো বাঁশির সুর হিশেবে চিত্রিত করেছেন। এইসব সংগীত-সংক্রান্ত উপমা ও রূপক তাঁর বিদ্রোহী সত্ত্বাকে আরও জীবন্ত ও অনুভবযোগ্য করে তোলে। এই কবিতায় ব্যবহৃত বিভিন্ন পৌরাণিক উপমা সাংগীতিক দ্রোহ-চেতনা ও মানবিক অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ, সাম্প্রদায়িক ঐক্য-সম্প্রীতি দর্শনেরও প্রতিফলন।
তথ্য উৎস
১। ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস (প্রথম ভাগ), স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ, পঞ্চম সংস্করণ, সেপ্টেম্বর, ২০১১, শ্রী রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ, ১৯ এ এবং বি, রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রীট, কলকাতা-৭০০০০৬, পৃ. ২১২।
২। রাগতরঙ্গিণী: লোচন শর্মা, সম্পাদনা ও ভাষান্তর: রাজ্যেশ্বর মিত্র, প্রথম প্রকাশ: ১ বৈশাখ, ১৩৯১, ৮ পটুয়াটোলা লেন, কলিকাতা ৯, পৃ. ৮-৯
