তিনদিনব্যাপি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা- ২০২৬ সম্পন্ন হলো।
সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ড: মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বিশেষ প্রতিনিধি : হলভর্তি দর্শক শ্রোতা। নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড সিটির ইভানজেল ক্রিস্টয়ান সেন্টার বাঙালীদের পদভারে মুখরিত। ১৫ মে ২০২৬ শুক্রবার। মঞ্চে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা)র অর্ধ শতাধিক শিল্পী। শুরু হতে কিছুটা দেরি। অবশেষে হলের মূল ফটকের পাশে একদল বাদ্যযন্ত্রীর ঢোল, মন্দিরা আর নাচে মুখরিতহয়ে উঠলো করিডোর। তখন বিকেল সাতটা। প্রধান অতিথি মার্কিন কবি ও অনুবাদক ক্যারোলিন রাইট। তিনি এগিয়ে এলেন। তাকে স্বাগত জানালেন বইমেলার আহ্বায়ক ড: নুরুন নবী। টিম প্রস্তুত। ফুলের পাপড়িতে অতিথিদের বরণ। লাল ফিতা কেটেউদ্বোধন হয়ে গেল তিনদিনের বইমেলা।

সুসজ্জিত হলে অসন গ্রহণ করলেন অতিথিরা। বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। সাথে গ্র্যান্ড স্পনসরদের কয়েকজন। আহ্বায়ক ড: নুরুন নবীর সাথে- প্রধান অতিথি ক্যারোলিন রাইট, প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড: এ কে এ মোমেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসারের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ী মইনুল ইসলাম, ব্যবসায়ী ময়নুজামান চৌধুরী,ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম জাকির, রাজনীতিবিদ জাকারিয়া চৌধুরী, রাজনীতিবিদ আবদুল কাদের মিয়া, ইফজাল চৌধুরী, প্রমুখ। বিপা গাইলো উদ্বোধনী সংগীত। এর পরেই বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সংগীত। ফুল আর উত্তরীয় দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেয়া হলো। বক্তব্য রাখলেন, ড: নুরুন নবী, ড: এ কে এ মোমেন ও ক্যারোলিন রাইট।বাইরে বইয়ের প্রায় ২০টি স্টল। প্রথম দিনে বইয়ের বেচা-বিক্রি কিছুটা কম হলেও সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল সমৃদ্ধ নান্দনিকতা।

এভাবেই শুরু হয়, ১৫, ১৬, ১৭ মে ২০২৬ এর তিনদিনের বইমেলা।’বই হোক একাত্তরের শাণিত বর্ম’- এই স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে ছিল এবারের বইমেলা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লেখক প্রকাশকরা ছিলেন নিউইয়র্কে। অনেকেই অবস্থান করছিলেন, পাশের হোটেলগুলোতে। তিনদিনের এই আয়োজনে অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন খ্যাতিমান রবীন্দ্রকন্যা শ্রেয়া গুহঠাকুরতা, বিখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী জয় শংকর, শিল্পী দীনাত জাহান মুন্নী, বাউল শিল্পী কালা মিয়া, নতুন প্রজন্মের শিল্পী আলভান চৌধুরী প্রমুখ। গান গেয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পী – তাজুল ইমাম, বিপ্লব মুখার্জি, রাজীব ভট্টাচার্য, সেলিমা আশরাফ, শাহ মাহবুব, নীলুফার জাহান, অনিন্দিতা চৌধুরী, মেলাল করিম, করিম হাওলাদার,পন্ডিত কৃশান মহারাজ, মোরশেদ খান অপু, সেজান মাহমুদ, দিনার মনি, মোহাম্মদ শাহীন, তাহমিনা শহীদ, স্বপন দত্ত, ফাহমিদা এনি, সুকন্যা শৈলী, তপন মোদক, শারমিন আক্তার, সাগ্নিক মজুমদার, মুনমুন সাহা, শীতেশ ধর, শুক্লা রায়, প্রতিমা বসু, বসুনিয়া সুমন, পারভীন সুলতানা, সুতপা মন্ডল, ক্রিস্টিনা রোজারিও প্রমুখ। তরুণ প্রজন্মের নাহিয়ান ইলিয়াস, জনম সাহা, দানিয়া সৈয়দ দিয়া, গুঞ্জরী সাহা, সহ অনেকেই অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানপর্বে।

ছিল বিশিষ্ট আলোকচিত্রী পাভেল রহমান করেছেন একক উপস্থাপনা। নৃত্যে এনি ফেরদৌস ছিলেন বিশেষ পরিবেশনা নিয়ে। বিপা, উদীচী, আনন্দধ্বনি, তালতরঙ্গ, মিথান ড্যান্স একাডেমি, কৃষ্টি, বি কে পি এ, প্রভৃতি সংগঠন অংশ নিয়েছে তিন দিনের প্রোগ্রামে। তরুণ প্রজন্মের জন্য ছবি আঁকা, নাচ গান আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতা ছিল শনি ও রবিবার। পরিচালক নাদিম ইকবাল ও শামীম আল আমীন প্রদর্শন করেছেন কয়েকটি সদ্য নির্মিত ডকুমেন্টারি। যাতে বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ, দখলদার ইউনুসের মবশাসন, দেড় বছরের জুলুম উঠে এসেছে। এবারের তিনদিনের বইমেলায় বিষয়ভিত্তিক কয়েকটি সেমিনার, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও বই পরিচিতি, প্রকাশকদের মুখোমুখি,স্বরচিত কবিতা, আবৃত্তি,নবীন-প্রবীণ যাপনচিত্রের অভিজ্ঞতা, মায়েদের কথা- প্রবাসের প্রতিকূলতা, ইত্যাদি বিষয়ে প্রোগ্রাম ছিল খুবই সুবিন্যস্ত। সবকিছুতেইবইমেলায় মুখ্য ছিলেন থাকবেন ‘বঙ্গবন্ধু’। বিশিষ্ট উপস্থাপক স্বাধীন মজুমদারের নেতৃত্বে, তাহরীনা প্রীতি, পিংকি চৌধুরী, বিথী রায় প্রমুখের একটি অভিজ্ঞ সমন্বয়ক ও সঞ্চালক টিম পুরো অনুষ্ঠানমালা প্রক্ষেপণ করেছেন পুরো তিন দিন।

শনি ও রবিবারনবীন প্রবীণ অনুষ্ঠান মালা ও মায়েদের অভিজ্ঞতা বড় দুটি আয়োজন উপস্থাপনা করেছেন বিশিষ্ট শব্দজন মনজুর কাদের। কবিতা পাঠ ও বই নিয়ে প্রোগ্রামটি ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব। আবু সাঈদ রতনের সমন্বয় সাধনে এর একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন কবি ফারহানা ইলিয়াস তুলি। বইমেলা উপলক্ষে, একটি চমৎকার ম্যাগাজিন ‘উত্থান’ প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান সম্পাদকীয় উপদেষ্টা ড.নুরুন নবীর তত্ত্বাবধানে ও কবি ফকির ইলিয়াসের সংযোগ সমন্বয়ে এটি সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন আসলাম আহমাদ খান। একটি সম্পাদনা পরিষদ নিরলস কাজ করেছে এই ম্যাগাজিনে। প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী তাজুল ইমাম। শব্দ সংযোগ ও গ্রাফিক্সবুনন প্রকাশন, বাংলাদেশ। ছাপা- প্রিন্ট মিডিয়া, নিউইয়র্ক। ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা ও নবী-জিনাত ফাউন্ডেশন সাহিত্য পুরস্কার’ ঘোষণা করা হয় রবিবার রাতে। এবারের ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা ও নবী-জিনাত সাহিত্য পুরস্কার-২০২৬’ পেয়েছেন বিশিষ্ট লেখক ড.মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এই সম্মানী – অর্থমূল্য $ ২০০০/০০ দুই হাজার ডলার ও একটি ক্রেস্ট। মবাক্রান্ত বাংলাদেশ ছেড়ে, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিশ্বের অন্য একটি দেশে অবস্থান করছেন। তাঁর পক্ষে এই সম্মানী গ্রহণ করেন একাত্তরের প্রহরী ফাউণ্ডেশন এর সদস্য সচিব স্বীকৃতি বড়ুয়া। যা লেখকের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। এবারের পুরস্কারের নির্বাচন কমিটিতে, সাত সদস্যের বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক- তাজুল মোহাম্মদ, কানাডা। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক- ড.আতাউল করিম, যুক্তরাষ্ট্র। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক- ড. সালমা বাণী, কানাডা। বিশিষ্ট লেখক- ডা. সেজান মাহমুদ ,যুক্তরাষ্ট্র। ( ২০২৫ এ এই পুরস্কারপ্রাপ্ত) একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ড. নুরুন নবী সদস্য সচিব স্বীকৃতি বড়ুয়া (পদাধিকার বলে) এবং কবি ফকির ইলিয়াস। বিশিষ্ট শিল্পী লুৎফুন নাহার লতা ও খ্যাতিমান শব্দজন মিথুন আহমেদ পরিবেশন করেছেন একক পর্ব দুটি। সবমিলিয়ে, একাত্তরের প্রহরী ফাউণ্ডেশন তিনদিনের বইমেলার সূচি ছিল বর্ণাঢ্য, যার পুরো কো-অর্ডিনেট করেছেন উত্তর আমেরিকার বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী গোপন সাহা ও তার টিম। শুক্রবার ৬ টা থেকে রাত ১১ টা ওশনি ও রবিবার সকাল ১০ টা থেকে রাত সাড়ে দশ টা পর্যন্ত ছিল বইমেলা।

এবারে বইয়ের স্টল নিয়ে ছিল- সময় প্রকাশন, নালন্দা, বাতিঘর, অন্বয়, বিদ্যাপ্রকাশ, কবি প্রকাশনী, কালিক, মুক্তমনা, কবি দিলওয়ার ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, আমরা শিশুদের সঙ্গী, জয় বাংলা পাঠাগার, শব্দগুচ্ছ, বই বিনিময়,মহসীন’স বুকস, সহ অনেকগুলো বুকস্টল। ছিল আর্টস এন্ড ক্রাফটসের পাঁচটি স্টল। রাজনীতির খোলামঞ্চ, আমেরিকা-বাংলাদেশ গোপন বানিজ্য চুক্তি ও খাদ্য সংকট, লেখক বঙ্গবন্ধু, অভিবাসী সাহিত্যের প্রতিকূলতা, লেখক প্রকাশক মুখোমুখি ইত্যাদি সেমিনারে অংশ নেন- ড. নুরুন নবী ,ড. এ কে এ মোমেন, ড. এ বি এম নাসির, দস্তগীর জাহাঙ্গীর, ড. রানা হাসান মাহমুদ, মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, অধ্যাপিকা হোসনে আরা, মিনহাজ আহমেদ, স্মৃতি ভদ্র, মিয়া জাকির, শামসুদ্দিন আজাদ, খুরশীদ আনোয়ার বাবলু, মিলটন আহমেদ, ড. এনামুল হক, মইনুল ইসলাম,ময়নুজামান চৌধুরী, ইফজাল চৌধুরী, জাকারিয়া চৌধুরী, আব্দুল কাদের মিয়া, রাফায়েত চৌধুরী, বেলাল বেগ, রেদওয়ানুর জুয়েল, সুব্রত তালুকদার, সিরাজ উদ্দিন সোহাগ, শাখাওয়াত আলী প্রমুখ।ইন্সাপায়ারিং মোমেন্টস উইথ ক্যারোলিন রাইট- সেমিনারে অংশ নেন এই প্রজন্মের নাহিয়ান ইলিয়াস ও জনম সাহা। স্বরচিত কবিতা, আবৃত্তি ও গানের আরও কয়েকটি পর্বে অংশ নেন, আনোয়ারুল লাভলু, আবু নাসের মানিক, শুক্লা রায়, শ্রেয়া সেন, হাফসা ইমাম, মাহের আব্দুল্লাহ, গীতা রায়, প্রিয়াংকা দাশ, ক্রিস্টিনা রোজারিও, কাওসারী মালেক রোজী, শহীদ উদ্দিন, মিশুক সেলিম, খালেদ সরফুদ্দীন, আনোয়ার সেলিম প্রমুখ। শনি ও রবিবার শিশু কিশোরদের অনুষ্ঠানের পুরো সমন্বয় করেন পারভীন সুলতানা। তিনদিনব্যাপি অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায় ভ্যানগার্ডের মতো কাজ করেছেন- গোপাল সান্যাল, স্বীকৃতি বড়ুয়া, মিলটন আহমেদ, স্বপ্না ইমাম, সুতপা মণ্ডল, মনিরা আকঞ্জি, শাহরিয়ার সালাম, জয়তূর্য চৌধুরী, ঝর্ণা চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন সবুজ প্রমুখ। সাংবাদিক ও কবি ফকির ইলিয়াসের সংযোগ সমন্বয়ে প্রচারের দায়িত্বে কর্মতৎপর ছিলেন প্রচার সম্পাদক আসলাম আহমাদ খান। শেষদিন রবিবারের শেষ শিল্পী ছিলেন খ্যাতিমান বাউল শিল্পী কালা মিয়া। পদকর্তা রাধারমণ, শাহ আব্দুল করিম ও ফকির ইলিয়াসের গান পরিবেশন করেন তিনি। তার ধামাইল গানের তালে তালে মঞ্চে উঠে তখন নৃত্য করতে থাকেন উপস্থিত দর্শক শ্রোতার একাংশ। রাত তখন ১১ টা ছুঁইছুঁই। এই মেলার আহ্বায়ক ড. নুরুন নবী অভিবাসী সমাজ, শিল্পীবৃন্দ, স্পনসর, পৃষ্ঠপোষক, প্রকাশক, স্বেচ্ছাসেবক, ফাউন্ডেশনের সকল সদস্য সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালেন। আমন্ত্রণ রাখলেন ২০২৭ এর বঙ্গবন্ধু বইমেলার। গ্র্যান্ড স্পনসরদের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মইনুল ইসলাম দৃঢ় কন্ঠে বললেন, আগামী বছরগুলোতে আরও বড় পরিসরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা’ অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। এবারের মেলায় খাবারের স্টল নিয়ে ছিল, জ্যাকসন হাইটসের প্রখ্যাত- কথা রেষ্টুরেন্ট।

মেলায় একক লেখক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বই যাদের বিক্রি হয়েছে- তারা হলেন- কবি ফকির ইলিয়াস, কবি ফারহানা ইলিয়াস তুলি ও লেখক ইশতিয়াক রুপু। স্টল হিসেবে সময় প্রকাশন, কালিক ও বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব এর স্টলে বই বিক্রি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বঙ্গবন্ধু, মহান মুক্তিযুদ্ধ, একুশের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিষয়ে ইংরেজী ভাষায় লেখা বইয়ের প্রতি অভিবাসী প্রজন্মের আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। এই বিষয়টি সকলের নজর কেড়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শেষ হয় তিনদিনের অনুষ্ঠান।

