অণুগল্প

অণুগল্প। এক বুক শূন্যতা। ‎হানিফ রাজা

বিয়ের সাত বছর পেরিয়ে গেছে আনিকা আর আদনানের। ভালোবাসার সংসার তাদের, কিন্তু একটা অভাব যেন সব সুখকে ঢেকে রেখেছে—একটা সন্তান। শুরুর দিকে আশেপাশের কেউ কিছু বলত না। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, মানুষের কথাও ততই বদলে যেতে লাগল। ‘ডাক্তার দেখাও, সমস্যা কার? আর কতদিন এভাবে?’ আনিকা সব শুনত, কিছু বলত না। রাতে বালিশে মুখ গুঁজে চুপচাপ কাঁদত। আদনান কিছু বলত না, শুধু পাশে বসে থাকত—ভিতরে ভাঙত, কিন্তু বাইরে শক্ত থাকার চেষ্টা করত। তাদের দুজনের রাতগুলোও ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল। একদিন আনিকা বলল, ‘চলো না, একবার ভালো কোনো ডাক্তারের কাছে যাই।’ আদনান রাজি হলো। ‎ময়মনসিংহের এক প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে দুজনেই পরীক্ষা করাল। ফলটা সহজ ছিল না। জানা গেল—দুজনেরই সন্তান জন্মদানে সমস্যা আছে। কথাটা শোনার পর তারা চুপ হয়ে গেল। কেউ আর বেশি কিছু বলল না। সময় এগিয়ে যেতে লাগল। আর মানুষের কটু কথাও যেন আরও ধারালো হতে থাকল। একসময় আনিকা খুব আস্তে করে বলল, ‘চলো… আমরা একটা বাচ্চা দত্তক নিই!’

আদনান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘হ্যাঁ… ওরাও তো আমাদের ভালোবাসা পেলে আমাদেরই হয়ে যাবে।’ কয়েক মাস পর তারা গেল ময়মনসিংহের একটি অনাথ আশ্রমে। সেখানে এক কোণে ছোট্ট একটা মেয়ে চুপচাপ বসে খেলছিল। কারও সাথে মিশছিল না, চোখেও ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা। আনিকা ধীরে ধীরে তার কাছে গেল। মেয়েটা কোনো কথা না বলে শুধু তার হাতটা ধরল।

‎সেই মুহূর্তে আনিকার মনে হলো—যেন বহুদিনের ফাঁকা জায়গাটা একটু নড়ে উঠল। তারা মেয়েটার নাম রাখল আরিবা। দিনগুলো বদলে যেতে লাগলো ঘর ভরে উঠল হাসি, দৌড়াদৌড়ি, ছোট ছোট দুষ্টুমিতে। আরিবাকে তারা অনেক কিছু কিনে দিল—পুতুল, বাঁশি, দোলনা, খেলনা ঘোড়া… ‎সারাদিন সে খেলত, আর ঘরটাকে হাসিতে ভরিয়ে রাখত। আনিকা যেন আবার বাঁচতে শিখল। ‎কিন্তু সুখটা বেশি দিন টিকল না। ‎একদিন হঠাৎ আরিবা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ‎ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানা গেল—তার রক্তের জটিল রোগ। চিকিৎসা দীর্ঘ আর ব্যয়বহুল। আদনান আর আনিকা সব দিয়ে দিল—জমানো টাকা, গহনা, এমনকি নিজেদের স্বপ্নও। ‎হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আরিবা হাসত,

‎’মা, আমি ঠিক হয়ে যাব তো?’ আনিকা শুধু মাথা নাড়ত। কথা বের হতো না। ‎এক ভোরে সবকিছু থেমে গেল। ‎আরিবা আর ফিরল না। ‎হাসপাতালের করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ‎আনিকা কেঁদে ভেঙে পড়ল। আদনান দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল—চোখে জল, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। যে ছোট্ট হাতটা একদিন তাদের শূন্যতা ভরিয়ে দিয়েছিল, আজ সেটাই নিথর হয়ে পড়ে আছে। বাড়ি ফিরে এল তারা। ‎সবকিছু আগের মতোই ছিল, কিন্তু আসলে কিছুই আগের মতো ছিল না। ঘরের কোণে আরিবার খেলনা পড়ে আছে। ছোট জামাগুলো, দেয়ালে আঁকা আঁকিবুঁকি—সব যেন চুপচাপ জিজ্ঞেস করছে, ‘আমি কোথায়?’ ‎আনিকা প্রায়ই তার বিছানার পাশে বসে থাকে। ‎চুপচাপ বলে, ‘আরিবা… মা এসেছি।’

‎আদনান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সময়ের সাথে সাথে কষ্টটা চিৎকার করা বন্ধ করে দিল, কিন্তু ভেতরে থেকে গেল এক গভীর শূন্যতা। কয়েক মাস পর তারা আবার সেই অনাথ আশ্রমে গেল। সেখানে অনেক শিশু এগিয়ে এলো তাদের দিকে। ছোট ছোট হাত, ছোট ছোট চোখ—সবাই ভালোবাসা চাইছে। আনিকা একে একে প্রতিটি শিশুকে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হচ্ছিল—প্রতিটি স্পর্শেই যেন কোথাও আরিবার ছায়া আছে। চোখে জল ছিল, কিন্তু এবার ঠোঁটে একটা ছোট হাসিও ছিল। এক বুক শূন্যতা হয়তো আর কখনও পুরোপুরি ভরবে না… তবে অনেকগুলো ছোট ছোট ভালোবাসা মিলে সেই শূন্যতাকে বাঁচার মতো করে দিল। আর দূরে কোথাও, হয়তো ছোট্ট আরিবা হাসছে— দেখছে, তার মা-বাবা আবার বাঁচতে শিখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *