কবিতা

কবি আহমেদ শিপলু’র জন্মদিনে একগুচ্ছ কবিতা

শান্ত, শুভ্র, শনপাপড়ির গোলাপি আভায়
মোড়ানো বিকেল। ক্যামেরার লেন্সে চোখ
রেখে অপেক্ষা করি। আপনাদের
কদর্যকাল শেষ হলে জানাবেন, ছবি শিকারে বেরোবো।
জানালাগুলো বন্ধই থাকুক, এখন শেয়ালের কাল।
ওদেরকে আসতে মানা করে দিও।
চুপি চুপি নয়, ফিরলে দামামা বাজিয়েই ফিরুক।
ভালোবেসে প্রাণ দেয়া নয় আর।
জানালাগুলো বন্ধ রাখো, এখন স্বাধীনতা
মানে পায়রার মাংসে কামড়! তৃপ্ত মানুষের
বাসনা বালিহাঁসের গলায় আটকে থাকা
বরশির মতো বীভৎস! বিকৃত মানুষের
ক্ষুধার কাছে পরাজিত কোয়েলের ক্ষুদ্র ডিম!
চোখ থেকে ঝরে পরুক গোলাপের পাপড়ির
মতো খুচরো দিনলিপি। এমন খুশির দিন!
কেন কাঁদবো! কেউ যেনো ভুলেও ভুলে না যাই।
মাশুল আদায়ে যেনো না হই ক্লান্ত।
বিজয়ের গান লেখা হবে নিশ্চয়, মন ভাঙা
গানের কাল জড় হোক গ্রীষ্মের দুপুরে।
হেলে পরা বিকেলের আকাশে জমানো রক্তের ছোপ!
জানালাগুলো খুলবার আগে বেজে উঠুক বজ্র দামামা!

আমাদের প্রচুর উড়তে হবে
প্রচুর বোয়িং এয়ারক্রাফট নিয়ে যাবে
আকাশের শেষ সীমায়।
কেন না আমরা মিটিয়েছি ভাতের চাহিদা।
মাংস আর মাছের ঝোল চেটেপুটে যেতে পেরেছি পানশালায়।
আমাদের ক্ষুধা এখন আকাশচুম্বী
উড়াল উড়াল জীবন নিয়ে যাবে ব্লুইকোনমির ডুবুজাহাজে।
সাবমেরিনের সাথে আমাদের সাঁতারু পাল্লা!
সুতরাং আমাদের আটা ও মাংস আসবে সুদূর ওয়াশিংটন থেকে।
আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আসবে বানিজ্যের ব্যাপারী।
নিয়ে যাবে কোন দেশে।
আমাদের শ্যামলিমার সারল্য বেচে দেবে যুদ্ধের বাজারে।

ঘন বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল একটা
তাড়া খাওয়া দুপুর। হাঁপানোর ক্লান্তি
পেরিয়ে পাতার ফাঁকে চিকচিক।
বুনো ফুলের ঘ্রাণ। ঝরা পাতার মর্মরে
প্রাচীন সংগীত।
এবার একটু চুপ থাকা যাক।
হেলে পরা বিকেলের কাছে জঙ্গল
একটা ব্ল্যাকহোল, যে রকম মানুষের
জীবন। তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো
কেবল ছুট! অনাদর আর অবহেলার
গ্লাণি যতো দীর্ঘ হয়, ততোটাই গল্প।
মানুষ গল্প ভালোবেসে বাগান করে,
ঘর সাজায়। বিড়াল আর টিয়া পোষে।
এরপর আবার একটু চুপ থাকা যাক।
এখান থেকে একটা নদী যাত্রা করবে।
প্রবল স্রোতের টানে ছুটতে থাকা।
মাঝে মাঝে পলিজমা চরের আভাস।
মানুষের নতুন ঠিকানা গজিয়ে ওঠার
লড়াই। নদীরা বহমান। কোথাও পোঁছে
হয়তো চুপ হয়ে যায় অথবা হারিয়ে
ফেলে আত্মপরিচয়।
সে কথা ভাবতে গিয়ে থামি, চুপ থাকি,
রোদ হারানো গভীর বনের মতো।
লোকালয় মানে টানাপোড়েন, সন্দেহ
আর অবিশ্বাস! ভাতের বীভৎস
কাড়াকাড়ি! মানুষের ক্ষুধার কাছে
পরাস্ত হয় স্বপ্ন!
কোথাও আলো ফুটছে, উঁকি দিচ্ছে
ভোরের শীতল আদ্র সবুজ। খালি পায়ে
হেঁটে যেতে চাইলে চোখ থেকে খুলে
ফেলতে হয় শহুরে কায়দা। বুনিয়াদি
প্রশিক্ষণের বেড়ি ছিঁড়ে আসতে হয় প্রান্তরে।
আপাতত চুপ থাকা শিখে নেয়া গেলে
পদ্মপুকুর কথা বলতে শুরু করবে,
যেখানে ডুবে আছে পাতালপুরীর কিসসা।
মানুষ কিসসা ভালোবেসে শপে দেয় ইহকাল।

এখন হাইওয়ে যুগ, রাজপথ গেছে অদক্ষ
অটোর দখলে। চালকের সম্মতি পেলে
যাত্রীগণ নেমে পড়ে প্রকৃতির ডাকে।
ঘনানো সন্ধ্যার হাইওয়ে যখন দূর দেশের
ঠিকানা, তখন আমাদের ক্ষেত থেকে খুঁটে
খায় ভিনদেশী পায়রা। লোকেরা তুলে আনে।
শান্তির প্রতীক ভেবে উড়িয়ে দেয় মঞ্চ
থেকে। অতি গোপনে হয় সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার।

তারপর একদিন ফিরে আসে গ্যাস বেলুনের
ঝাক। কাকের পৃথিবীতে মানুষের হানা।
বিপন্নতা ঘিরে ফেলছে বেদম! অবশিষ্ট
জায়গাটি রিসোর্ট আর ইকোপার্কের

দখলে। নদীর আকাশ পেরোলে ডানা চায়
জিরোবার মাঠ ও

প্রান্তর…

সেখানে হল্লা খুব, কারা যেনো পুরস্কৃত
করছে পরস্পরকে। লুফে নিচ্ছে সমর্থন
আর করতালি। মানুষ চমৎকৃত হলে
ভাষাহীন হয়ে পরে হয়তো। নইলে এতটা
বোবাকাল! এত দীর্ঘ মৌনতা! কেবলই
অনিচ্ছাকৃত সম্মতির দিকে ধাবিত হওয়া!

ভাবনার গালে হাত রেখে বসে আছে
অপেক্ষা। আয়েশীকালের মতো শ্লথ ও
ক্লান্তিকর বসে থাকা। রাজপথের কোনো
চরিত্র থাকে না। পদচ্ছাপজুড়ে
বেগানাস্পর্শ। প্রসারিত জানু পেতে বসে
থাকার মতো বেহায়া। ওখানে যে কেউ এসে
জুড়ে দিতে পারে চিৎকার এবং শীৎকার।
জন্ম নিতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণ।


জিওভার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে খুঁজে ফিরি
আব্বাসের হোটেল। যেখানে ফেরা হয়নি
আর। শৈশবের হাফ প্যান্ট, রূপসা চপ্পল
আর বুক পকেটের কোনে উইনসন পেনের
কালি লেপ্টে থাকা সাদা শার্ট। আব্বাসের
হোটেলের সামনে দিয়ে যাই। কাছেই স্কুল,
বাজার এবং একটু অদূরে বাড়ি।

পকেটে হয়তো দুটো শিকি কিংবা আধুলি।
সিঙাড়াগুলো ঝকঝক করে, আট আনায়
একটা সিঙাড়া। সিঙাড়ার কোনগুলোর সাথে
কামড়ের সম্পর্ক ভীষণ! সিঙাড়া খেতে হলে
ওই তিনটি কোন ছাড়া কামড় বসানো যায়
না।

একদিন ওই ছোটো শহর ছেড়ে সোজা
রাজধানী! তারপর সারা দেশ চষে বেড়ানো।
বাংলার পথেঘাটে, বাজারে বাজারে অজস্র
আব্বাসের হোটেল। সিঙাড়াগুলো হাতছানি
দেয়। হাতে নিই, কামড় বসাই। কোনা খাওয়া
হলে ভিতর থেকে বেরোতে থাকে আলুর
উত্তপ্ত বাসনা। কখনো বাদাম, কলিজার
টুকরা, কুমড়ো আর কাঁচা মরিচের
সিদ্ধাবস্থা।

কতো বরষা আর শীত আসে আর যায়।
রাস্তায় হাঁটতে গেলে চোখ আটকে থাকে
সাজানো সিঙাড়ার দিকে। আব্বাসের হোটেল
ভেবে এগিয়ে যাই। সিঙাড়ার কোনে কামড়
বসাই। অচেনা লাগে খুব! জিওভার কাছে
অপরাধী হই বারবার।

আব্বাসের হোটেল যেনো ব্ল্যাকহোল!
চক্রাকারে ঘুরছি অনন্তকাল! রিকশায়,
বাসে, ট্রেনে, যেখানেই যাই। সিঙাড়াগুলো
মহাকর্ষ। নামি, এগোই, হাত বাড়াই অজস্র
নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকা মহাকালের দিকে।

ব্যক্তিগত জিরো পয়েন্ট থেকে বৃষ্টি ও
জঙ্গল পর্যন্ত আমাদের হাঁটার কথা
ছিলো। সেই অনেক কালের পুরনো বিকেল।
হলুদাভ সন্ধ্যায় আটকে যাওয়া অতীত।
গ্যালাক্সির ঘূর্ণনে কেবলি পিছনে যেতে
থাকা। ছবিটা কাটা ঘুড়ির মতো নাগালহীন।

দেয়ালের পোস্টার আর পিভিসির ব্যানার।
অদ্ভুত লোকালয়। মুঠোফোন আর মুঠোয়
ধরে না। ডিসপ্লে বড় হতে হতে সিনেমা হল।
একা একদিন রমনায়। রাজনীতি আর
ভবঘুরের উৎপাত পেরিয়ে পৌঁছাতে চাই।
কোথাও অপেক্ষা করে থাকে ব্যক্তিগত
স্পেস। একান্ত জিরো পয়েন্ট। যেখান থেকে
দেখে নেয়া যায়

আন্তঃসম্পর্কীয় দূরত্ব ও ঘনিষ্ঠতা।

তুই, তুমি, আপনির ভিড় ঠেলে অস্ফুট
সম্বোধন। উচ্চারণহীন ভাব সেন্ড হয়ে
যায় এলগরিদমে। রিলস, স্টোরি নিয়ে আসে
চিঠি। আবহসংগীতের মতো বাজতে থাকা আড়াল।

যতোটা অস্পষ্ট হলে কমাতে হয় গতি,
যাত্রীসকল নেমে আসে পথে, ততোধিক
শীত ও কুয়াশা নিয়ে অপেক্ষা করে বৃক্ষ।
প্রিয় কমরেডগণ, বৃষ্টি ও জঙ্গল সেই
কবে থেকেই প্রস্তুত। আসুন হাঁটতে শুরু করি।

এসো স্বাস্থ্য পান করি তাদের
উদ্দ্যেশ্যে, যারা ঘুরে ঘুরে প্লেটে
প্লেটে তুলে নেয় উসুল। তৃপ্তি আর
ক্ষুধার বিপরীতে সাজানো মেনুর
রেলগাড়ী। তাতে চড়ে কড়ায় গণ্ডায়
আদায় করে নেয় মাশুল।

পান করি তাদের কল্যাণ কামনায়, যারা
খাদ্যনালীর সবটুকু পূর্ণ করে জমায়
আড্ডা! বুফেপ্র‍্যাক্টিসে চলনসই হতে
গিয়ে আনাড়ি আবদারে হয়রান।
নিমন্ত্রিত অভ্যাগতদের সাড়ম্বর

স্বীকৃতিপ্রাপ্তি হোস্টের জন্য যুদ্ধবিজয়!

পান শেষে তাদের জন্য পৌনে এক
মিনিট নিরবতা রেখে দিই টেবিলে।
যেখান থেকে একদিন উঠে আসবে
প্রেসক্রিপশন, সার্জারী আর
হাসপাতালের আখ্যান। ফ্যাটি লিভারের
গল্প আর অবসরে ডায়বেটিস হাঁটাহাঁটি।

পান শেষে চলো হাঁটি তাঁদের পাশে, যারা
জগার্স পার্কের প্রেমে অহেতুক
কথাচারিতায় বুনে দেবে ভোজনপর্বের
আদেখলাপনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *