উপন্যাস

উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব-চোদ্দ

চোদ্দ

সকাল দশটায় বিচার বসে মন্টু মাতব্বরের বাড়িতে। গ্রামের অনেকেই এসে জড়ো হয় সেই বিচারসভায়। এ সময় একেকজন একেক কথা বলে। কেউ বলে হাত কেটে দেয়া হোক। কেউ বলে চুল কেটে গলায় জুতার মালা দিয়ে গ্রামসুদ্ধ ঘোরাতে। নানা জনের নানা কথা। আজিরন চুপ থাকে। তার কিছুই বলার নেই। কী আর বলবে সে, চুরির দায়ে অভিযুক্ত সন্তান। সবাই জানবে সে চোরের মা। আহ! এ দুঃখ সে কোথায় রাখবে? এমনও লেখা ছিল তার কপালে?
অন্যদিকে হাত বাঁধা আজিবারের কানে যেন কোনো কিছুই ঢোকে না। তার পুরো শরীর ব্যথায় টনটন করছে। গুরজুড়ে এমন মার পড়েছে, নড়ার শক্তিও নেই। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। মা’র দিকেও তাকাতে পারছে না লজ্জায়। তাকাতে চাইলেও পৃথিবীটা ঝাপসা লাগছে।

সবাই যখন নানা কথা বলছে তখন মন্টু মাতব্বর হুংকার দিয়ে বলেন, ‘চুপ করেন আপনারা। আমি একটা ব্যবস্থা করতাছি।’ তারপর আজিরনের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘শোন আজিরন, তোর ছেলে এ কাজ প্রথম করছে তাই আজ ছেড়ে দিলাম। তবে এমনিতে না, মাথার চুল কেটে তাতে চুন মাখিয়ে জুতার মালা পরিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরানোর পর ছাড়ব। এটাই তার শাস্তি। বছির সিলেট কাবার থেকে ফিরলে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবি তোরা। এটাই চুরির বিচার।’
রায় শুনে আজিরনের বুকটা ফেটে যেতে চায়। সে ভাবতেও পারেনি এমন কঠিন রায় হবে। তাই মাতব্বরের পা ধরে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বলে, ‘আজিবারকে যে শাস্তি হয় দেন, কিন্তু আমগোরে গেরামছাড়া কইরেন না। আল্লাহ্র দোহাই লাগে, এই ছোড পোলাপাইনগোরে গেরামছাড়া কইরেন না।’ বলে সে গুনগুনিয়ে কাঁদতে থাকে।

বিচারসভায় সাইফুলও ছিল। এমন রায় শুনে সে দাঁড়িয়ে বলে, ‘দোষ করলে আজিবার করছে, যে শাস্তি হয় তারে দেন। কিন্তু আজিরন খালারে গেরামছাড়া করা যাইব না। খালা তো কোনো দোষ করে নাই। একজনের দোষের জন্য সবার শাস্তি হইতে পারে না।’ এরপর সে সবার উদ্দেশে বলে, ‘আপনারা কী বলেন?’
সাইফুলের প্রস্তাব সঠিক মনে করায় উপস্থিত সবাই সাইফুলের কথায় সায় দেয়। এমনই হয়, বিচারসভায় যখন যে যেটা বলে তখন বুঝে-না-বুঝে তার কথায় সায় দেয় বাকিরা। যদিও সাইফুলের প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত।
সাইফুলের কথা শেষ হতেই মাতব্বরের নির্দেশে কয়েকজন লোক আজিবারকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর মাথা কামিয়ে চুন মেখে জুতার মালা পরিয়ে সঙের মতো সাজিয়ে গ্রাম ঘুরিয়ে বিচার শেষ হয়।

আজিরনের পক্ষে এ দৃশ্য সহ্য করা সম্ভব না বলে সে মাথানত করে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। তার পিছে পিছে আসে অন্য সন্তানরা। কষ্টে-দুঃখে আজিরনের বুক ফেটে যেতে চায়। সারা জীবন অভাবের সাথে লড়েও এত কষ্ট সে পায়নি, যে কষ্ট আজ তাকে দিল তার গর্ভের সন্তান। নাকি নিয়তি?
এদিকে শাস্তির পর দিনের বাকি সময়টুকু গোয়ালঘরেই লুকিয়ে থাকে আজিবার। তার বুকে ভীষণ কষ্ট। সে চুরি না করেও চোর হয়েছে। এ কষ্ট সে কোথায় রাখবে? কাকে বোঝাবে? যে মা’কে বোঝালে বুঝত, সে মাও তাকে ভুল বুঝেছে। বিচারের পর থেকে এখন পর্যন্ত মা তার কোনো খোঁজ নেয়নি। সে কী অবস্থায় আছে জানতেও চায়নি। তার যে সারা শরীরে তীব্র ব্যথা, অনেক কষ্ট হচ্ছে, তার মা বুঝতে পারছে না? নিজেকে বড়ো অসহায় আর একা মনে হয় তার। বেঁচে থাকা তার জন্য অসহ্য লাগছে। এরই মধ্যে সেদিনের অভিশপ্ত সূর্যটা অন্ধকারে মুখ লুকায়। রাতের আঁধার ঘনিয়ে আসতেই গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে আসে আজিবার। অনেক কষ্টে ধীর পায়ে সে মায়ের ঘরের দরজায় গিয়ে ডাকে, ‘মা, মাগো, দরজাডা একটু খোলো মা।’

আজিরনও চুরির ঘটনার পর কেমন পাষাণ হয়ে যায়। তাই যে সন্তান তার মাতৃত্বের সাধ প্রথম মেটায়, তার একাকী জীবনের না-কাটা সময়-অসময়ের খেলার সঙ্গী হয়ে আসে, সে সন্তানের ডাকেও তার  পাষাণ হৃদয় ভেজে না। সে চুপ করে থাকে।
আজিবার যখন আবার ঘরের দরজা খুলতে ডাকে, তখন আজিরন বলে, ‘দূর হয়ে যা। তোর মুখ দেইখবার আগে আল্লা যেন আমার মরণ দ্যায়। তোর মতো কুলাঙ্গার সন্তান থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।’
মায়ের এমন কথা শুনে আজিবারের বুক ভেঙে আসে। তারপরও সে অশ্রুসিক্ত নয়নে কাতরকণ্ঠে বলে, ‘মাগো, ওরা আমারে খুব মারছে। শরীলডায় এমন কোনো জায়গা নাই যে ওরা মারে নাই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি চুরি করতে যাই নাই। তোমার কাছে কত অন্যায় করেছি, তুমি কোনোদিন গায়ে একটি নখের আঁচড় দ্যাও নাই। অথচ তোমার সেই আজিবারকে তারা এমনভাবে মারার পরও তুমি দেইখবার চাও না! আমি তো চুরি করি নাই মা। তুমি যদি বিশ্বাস না করো তোমার ছেলেরে, তাইলে কিডা বিশ্বাস করবে কও মা? মা কথা কও, দরজাডা একটু খোলো।’

সন্তানের এমন কাতর আবেদনেও মন গলে না আজিরনের। তার ভেতর কেন জানি দৃঢ় বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে আজিবার চুরি করছে। তাই সে অভিমান করে ছেলের মুখ দেখা দূরে থাক, কথাও বলতে চায় না। চুপ মেরে থাকে।
ওদিকে ছেলে আজিবারও মাকে একবার দেখার জন্য ছঁফট করতে থাকে, যেমন মারের বেদনায় তার শরীর কুটকুট করে ব্যথা করছে। মাকে যে তার বোঝাতেই হবে সে চুরি করেনি। সব মিথ্যে। বলতে হবে চুরি নয়, সে চোরকে ধরতেই চোরের পিছু নিয়েছিল। কেন সে চুরি করতে যাবে? কার জন্য, কিসের জন্য চুরি করবে? তার তো আলাদা কোনো সংসার নাই যে, খাওয়া-পরার চিন্তা আছে। তাহলে কেন তার মা বিশ্বাস করছে না সে চুরি করেনি? ভুল ভাঙাতে বারংবার মাকে অনুনয়-বিনয় করে দরজা খোলার জন্য, তার সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু আজিরন চুপ মেরেই থাকে। কোনো কথা বলে না। অগত্যা আজিবার বলে—

‘শেষবারের মতো মুখখানা দেখাইবা না মা?’ এটুকু বলে আর বলতে পারে না সে। বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আজিরনও যেন বুকে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছে। আঠা মেরে রেখেছে মুখে।
মায়ের সাড়া না পেয়ে আজিবার মায়ের ঘরের দরজা ছেড়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। বিশাল আকাশের দিকে তাকায় আর ভাবে, ‘এত বড়ো পৃথিবী আর বিশাল আকাশের নিচে আমার কোনো ঠাঁই নেই? কেউ  নেই আপন? যদি তা-ই হয়, তাহলে এই কলঙ্ক, লজ্জা, অপমান, এই অভিশপ্ত জীবন আর কাউকে দেখাব না। রাতের অন্ধকারেই ঝাপসা আর স্বার্থপর পৃথিবীকে বোঝা হয়ে গেছে, এখন পালা চিরদিনের বিদায়ের।’
দৃঢ় হাতে গরুর লম্বা দড়ি নিয়ে ঘরের ধন্নার সাথে শক্ত করে বাঁধে আজিবার। ভেতরটা তখন বেদনার হাহাকার ঝড় তোলে। চোখ ফেটে অশ্রুর ধারা বইতে থাকে। এ সময় দড়ির দিকে তাকিয়ে বাবার কথা মনে পড়ে। মনে মনে বলে, ‘বাজান আমারে কত আদর করত। মরার আগে বাজানকে শ্যাষ বারের মতো দ্যাখতেও পারলাম না।’ দুই হাতে চোখ মোছে। গলায় পরে ফাঁসির দড়ি। স্থির আর করুণ দৃষ্টিতে তাকায় মায়ের ঘরের দিকে। পরক্ষণেই ধন্না থেকে লাফিয়ে ঝুলে পড়ে সে।

আজিবারের ব্যথাতুর দুর্বল শরীর বেশি নড়তে পারে না। যখন লাফিয়ে ঝুলে পড়ে তখন গোয়ালঘরের গরুগুলো তার দিকে চমকে তাকায়। তারাও ঘটনার আকস্মিকতায় বুঝে উঠতে পারে না কী ঘটছে। বার কয়েক আজিবারের দেহটা নড়েচড়ে স্থির হয়ে যায়। সেই স্থির হওয়া শবদেহের দিকে তাকিয়েই কি না কে জানে গরুগুলোর চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়াতে থাকে। হয়তো তাদের দেখভাল করা মালিকের করুণ বিদায় মেনে নিতে পারেনি। এখন কে তাদের আদর করে গোসল করাবে? ঘাস খাওয়াবে? আহ্!
প্রতিদিনের মতো আজ সকালেও আজিরন ঘুম থেকে উঠে গরু বের করতে গিয়ে আজিবারের ঝুলন্ত লাশ দেখে ‘আজিবার’ বলে চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

আজিরনের চিৎকার শুনে আশপাশের সবাই এসে দেখে ঘরের ধন্নায় ঝুলে আছে আজিবারের নিথর দেহ। আজিবারের ছোট ভাই-বোনরা ভাইয়ের করুণ মৃত্যু দেখে হাউমাউ করে কাঁদে। শোকের শঙ্খনাদে আদরীও কাতর হয়ে পড়ে। ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে ভাইয়ের ঝুলন্ত লাশের দিকে।
একসময় দড়ি কেটে আজিবারের মৃতদেহ নামিয়ে বাইর বাড়িতে রাখে। মৃত দেহর চোখ যেন সাক্ষ্য দিতে থাকে- আজিবার নির্দোষ। আজিবারের বুকের ওপর পড়ে পাগলের মতো চিৎকার করে আজিরন কাঁদতে থাকে, আর প্রলাপ বকে। আজিরনের গগনবিদারি আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় সে বিলাপ করতে করতে বারবার সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। তার সাথে কাঁদে আশপাশের পড়শিরাও। কিন্তু ছেলে হারানোর যে বেদনা তা অন্যকে ছুঁয়ে যেতে পারে অমন, যেমন পীড়ন অনুভব হয় মায়ের বুকে? নাকি মেলে তার কোনো স্বান্ত্বনা? একমাত্র মা-ই জানে সন্তান যখন ভবলীলা সাঙ্গ করে আড়াল হয় কি বিচ্ছেদ জারি হয় বিলাপি মনে। সে মৃত্যুর জন্য যদি নিজেই দায়, অনুভব আর উপলব্ধি তখন কীভাবে তাকে দংশন করতে থাকে। কোনো কিছুর বিনিময়েই যে তার ক্ষতি আর পূরণ হবার নয়।

শোক বিলাপের একটা পর্যায়ে মন্টু মাতব্বর লোকজন নিয়ে এসে থানার বড়কর্তাকে কিছু টাকা দিয়ে আজিবারের দাফন-কাফন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে।
একে একে বিদায় নেয় সবাই। কেবল আজিরনের বুকের ভেতরটা শান্ত হয় না। তার মনের ভেতর অবিরাম হাতুড়িপেটা করে ছেলের শেষ কথাটি—
‘শেষবারের মতো মুখখানা দেখাইবা না মা?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *