শিশুতোষ গল্প- রঙিন ডানার ঝিলিক- মোস্তাফিজুল হক
এক দেশে ছিল এক মায়াবী গ্রাম। গ্রামটা ছিল সবুজে মোড়া, ফুলে ভরা। সেই গ্রামের আদুরে মেয়ে নিপা। পড়াশোনায় যেমন মনোযোগী, তেমনি বেশ কৌতূহলী আর দুরন্ত স্বভাবের। সে সারা দিন মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ায়, পাখির গান শোনে, আর ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতিদের পেছনে দৌড়ায়। একদিন বিকেলে নিপা বাগানে খেলছিল। খেলতে খেলতে সে হঠাৎ ঝলমলে এক প্রজাপতিকে দেখতে পেল। ওটার ডানায় ছিল লাল, নীল, সোনালি আর রুপালি আলোর ঝিলিক। নিপা রীতিমতো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওটার দিকে। থাকবেই তো– সে যে এমন প্রজাপতি আগে কখনও দেখেনি! কখন যেন নিপার হাতে এসে বসে গেল সেই প্রজাপতি। তারপর তাকে মিষ্টি করে বলল, ‘নিপা, তুমি কি আমার সাথে উড়ে বেড়াবে নাকি?’ নিপা প্রজাপতির কথা শুনে চমকে উঠল। সে বলল, ‘এই প্রজাপতি, তুমি কথা বলতে পারো দেখি?’ প্রজাপতি বলল, ‘পারব না কেন? আমি যে অলকার পরি। আমার নাম ঝিলিক। আমি শুধু তাদের সাথেই কথা বলি, যারা ফুল, পাখি আর প্রকৃতিকে ভালোবাসে।’ নিপার আনন্দের শেষ নেই। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘ফুল, পাখি, প্রকৃতি আর তোমাদেরকে আমি খুুব ভালোবাসি। আমাকে নিয়ে উড়ে চলো পরি!’ মুহূর্তেই ঝিলিক নিপার মতো বড় হয়ে গেল। তারপর একটা কৌটা থেকে কিছু আবির বের করে নিপার গায়ে ছড়িয়ে দিলো। নিপা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে একটা মায়াবী পুতুলের মতো ছোটো হয়ে গেল। এরপর সে ঝিলিকের ডানা ধরে পিঠের ওপর বসে গেল। নিপা ঝিলিকের পিঠে ভর দিয়ে উড়ে চলছে। ওর মাথার ওপরে মেঘের পাহাড় আর রামধনুর সেতু; নিচে ফুলের বাগান, পাহাড়, নদী, ঝরনা। একটা সময় ঝিলিক নিপাকে নিয়ে ওদের অলকার বাগানে এসে পৌঁছাল। সেই মায়াবী বাগানে শুধু পরিরাই থাকে। বিশাল বিশাল দারুণ সব ফুলের পাপড়ির নিচে ওদের ঘর। রাতের বাগানে ঝলকে ওঠে তারার প্রদীপ। সে আলোয় পরিরা দলবেঁধে নাচে আর মধুর সুরে গান গায়। ঝিলিক নিপার কপালে আবিরের টিপ পরিয়ে দিতেই সে তার আগের রূপ ফিরে পেল। বাগানে নিপার মতো আরো কয়জন খেলছিল। ওই পরির মেয়েরা ঝিলিকের খেলার সাথি। ঝিলিক ওদের সাথে নিপার পরিচয় করিয়ে দিলো। পরির মেয়েরা বলল, ‘আমাদের এখানে মানুষের আগমন খুবই কম, তবে যারা ফুল, পাখি আর প্রকৃতিকে ভালোবাসে, আমরা তাদেরকেই নেমন্তন্ন করি। পরির দেশে থাকার একটাই শর্ত– গাছ না কাটা, পশুপাখিকে কষ্ট না দেওয়া আর জল নষ্ট না করা।’ নিপা ওদের নিয়ম মেনে চলতে রাজি হয়ে গেল। সে ওদের সাথেই পুরো সাতটা দিন থেকে গেল। পরিরা নিপাকে ফুলের ভাষা, পাখির গান, জলের ছন্দে নাচ শেখালো। অবশেষে একদিন ঝিলিক বলল, ‘নিপা, তোমার এখন ঘরে ফেরার সময় হয়েছে। তোমাকে এবার নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে। তোমার মা খাবার নিয়ে বসে আছেন। তুমি এখানে যা-কিছু শিখেছ, ফিরে গিয়ে সবাইকে তা শেখাতে হবে।’ নিপা ঘরে ফিরে এলেও তার মনটা থেকে গেল প্রজাপতিরূপী পরিদের দেশে। সে মনে মনে বলল, ‘গাছ আমাদের পরমবন্ধু, ফুল আর পাখি আমাদের আনন্দের উৎস। এখন থেকে আমি গাছ লাগাব, পাখিদের খাবার দেবো আর বন্ধুদেরকে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখাব।
