মুক্তিযুদ্ধের গল্প।। অপেক্ষার দৈর্ঘ্য।। কাজী লাবণ্য
(১)
হাসপাতাল থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায়ই রাত নিশুতি হয়। পাড়া, রাস্তা, এমনকি বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। যত্নস্পর্শ গায়ে মেখে খাবার দাবার ঢাকা থাকে, নিঃশব্দে খেয়ে নিয়ে আমিও শুয়ে পড়ি। আজ দেখি রুনু জেগে আছে, মাঝেমধ্যেই থাকে। বই পড়ুয়া বউ আমার, পড়তে পড়তে জেগে থাকে কাজেই দ্রোহ নেই। ঢোকা মাত্রই নরম কন্ঠে বলল চেঞ্জ কর না, নিচের তলার একজন অসুস্থ হয়েছে দেখতে যেতে হবে। কয়েকবার এসেছিল, এইমাত্রও এসেছিল। কপাল কুঁচকে গেল, হাক্লান্ত হয়ে ফিরলাম মাত্র। কি আর করা! প্রতিবেশি, যেতেই হয়।
ভদ্রলোক শুয়ে ছিলেন। তাঁর পেটে নাকি প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। মুখচোখে সুস্পষ্ট যন্ত্রণার ছাপ। তাছাড়াও মনে হল তিনি জগতসংসারের উপর প্রচণ্ড তিতবিরক্ত। পেটে হাত দিয়ে দেখছি, স্টেথো লাগিয়ে নানা প্রশ্ন করছি। তিনি আবার হার্টের পেসেন্ট। বিছানার ওপাশে একটি হুইলচেয়ার। যেখানে দৃষ্টি আটকে যায়।
তিনি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শেষে কোনরকম ভণিতা ছাড়া মৃদু কিন্তু অনেকটাই উত্তেজিত কন্ঠে বললেন
‘তুই মণি না’?
নিজের অজান্তে আমার বুকের ভেতর দামামা বেজে ওঠে। এ কার কন্ঠ! আমার মস্তিষ্ক এ কন্ঠ ভোলেনি। এই একটিমাত্র বাক্যেই বুঝতে পারি ইনি কে। যদিও বয়স হয়েছে। চেহারা ভেঙে গেছে। এর মধ্যে পৃথিবী বহুবার আবর্তিত হয়েছে। আমি কিশোর থেকে যুবক, যুবক থেকে…
সেই ছোটক্লাস থেকে একজন চিকিৎসক হয়েছি। বড়কথা নতুন একটি দেশের জন্ম হয়েছে, সেও দুযুগ পেরিয়ে গেছে। তাছাড়া আজকাল আর কেউ এই নামে ডাকে না আমাকে। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকি।
ভেতরে তোলপাড়। একি স্বপ্ন! হেলুসিনেশন! নাহ, সেসব কিছু নয়। এটা দুই হাজার সাল আমরা এখন গ্রীনরোডে থাকি।
ফারুক ভাইয়ের সাথে দেখা হলো তিরিশ বছর পরে। এতদিন পরে তাঁকে পেলাম একজন রোগী হিসেবে।
এতদিন হয় উপরনিচ বসবাস কখনও জানতেও পারিনি! হায় নাগরিক জীবন!
(২)
তখন আমরা আজিমপুর কলোনিতে থাকতাম। আমাদের বিল্ডিঙের ঠিক উল্টো দিকের বিল্ডিঙে থাকতেন ফারুক ভাইয়েরা। দুই পরিবারের মধ্যে ছিল অসম্ভব হৃদ্যতা। তরিতরকারীর বাটি আর কুরুশকাঁটার নকশা চালাচালি ছিল নিত্যকার ব্যাপার। তিনি ছিলেন আমার বড়ভাইয়ের বন্ধু, তার একটি মজার ডাক নাম ছিল। ফারুক ভাইয়ের চোখ দুটি বিড়ালের মত ছিল বলে কলোনিতে সবাই ডাকত ‘বিলাই ফারুক’।
ফারুক ভাইয়েরা তিন ভাই আর তাদের একটিমাত্র বোন। অনেকটা অরুণ বরুণ কিরনমালার সেই বোন মানে মিমি আপা ছিলেন মহাসুন্দরী। আমি নানান ছলছুতোয় আপার আশপাশ ঘুরঘুর করতাম। তাছাড়া সেই ছোটবেলাতেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে বড় হয়ে আমি আপাকে বিয়ে করব। যদিও সেকথা আপাকে কখনও বলা হয় নাই। তবে আমার মন বলত আপা বিয়েতে অমত করবে না।
বাসায় গেলে আপা আমাকে না খাইয়ে আসতে দিত না। প্রায় সময় আমার প্রিয় চকলেট এনে রাখত আর আমি গেলে হাতে দিত। কিন্তু মাঝে মাঝে আবার কড়া ধমক ধামকও দিত। লেখাপড়ার খবরও নিত। তা নিক। আপন মানুষ খবর নেবে না তা কি হয়!
এছাড়া টিভিতে খবর পড়ত যে রোকসানা আপা উনিও সামনের বিল্ডিং এর তিন তলায় থাকত। এই দুই রূপবতীর কল্যাণে আমাদের কলোনীর উঠান মত জায়গাটা বিকেল বেলায় উঠতি বয়সের পোলাপানদের মৌমাছির চাক লেগে থাকত। একেবারে স্টেডিয়ামের গ্যালারীর মত। সবাই খেলত, হাঁটত কিন্তু ঘাড় উঁচিয়ে দুই বারন্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যথা করে ফেলত। তবে মাঝে মাঝে সাঁঝবেলায় আপা কিংবা রোখসানা আপা কিংবা দুজনে নেমে এলে সবার ঈদ আনন্দ শুরু হয়ে যেত। আপারা অবশ্য প্রায় সময়ই আমাদের সাথে খেলতে নেমে যেত।
আমাদের বাসার বারান্দাটা ছিল ভি আই পি লাউঞ্জ। ভাইয়ার গুটি কয়েক বন্ধু ছাড়া কারো সুযোগ
হতো না বারান্দায় বসার। আমি টেনিসের বলবয় এর মত চুপচাপ যতটুকু চান্স পাওয়া যায় ততটুকু যেতাম আসতাম। আজকাল ফারুক ভাই, আমার ভাইয়া আর বাকি সবাই দিনরাত কি যেন পরামর্শ করে। কেবল মাঝে মধ্যে আমাকে ডেকে সিগারেট আনতে পাঠায়। সিগারেট নিয়ে ঢুকলে তখন অন্য কথা বলে। সিগারেট দেবার পরও দাঁড়িয়ে থাকি তখন ফারুক ভাই বলে, -আরে বুঝলি, সান্তা ক্লজ যে গাড়িতে করে উপহার বিলান, সেই স্লেজ গাড়ি জেরুজালেমের আশেপাশে কখনই ব্যবহার হয় না। এই স্লেজ গাড়ি টানে যে হরিণ সেগুলোও জেরুজালেম কেন সারা মিডল ইস্ট, ইউরোপ কোথাও বাস করে না। তখন আবার আরেকজন বলে ওঠেন -আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, এই রেইন ডিয়ার কেবল পাওয়া যায় কানাডার উত্তরে, ল্যাপল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেনে। জেসাসের জন্মের সাথে ‘রেইন ডিয়ার’ ‘সান্তা ক্লজ’ ‘স্লেজ গাড়ি’র কোন সম্পর্ক নাই আর… আর অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকি না। দরজা পেরুনোর সাথে সাথে তাদের নিজস্ব পরামর্শ শুরু হয়ে যায়। একবার নয় বারবার এমন ঘটতে থাকে। তাদের চা নাস্তাও আমি এনে দেই কিন্তু আমার অবস্থানকালটুকু তারা সম্পুর্ণ আলাদা কথার তুবড়ি ছোটায়। বানানো কথা যেন রেডিই থাকে। অভিমান নামের কিরি পোকা আমাকে কুটকুট কামড়াতে থাকে।
অচেনা অনেকের আসা যাওয়া শুরু হয়, যাদেরকে আগে কখনই দেখিনি।
সেই জমজমাট রাস্তাটা আস্তে আস্তে একেবারে খালি হতে থাকে। কোন আড্ডা নেই, খেলা নেই, কোলাহল নেই কেমন যেন ধুধু করে।
ভাইয়ারা আর হাসাহাসি করে না। সকলের চেহারা কেমন যেন গম্ভীর, বয়স বেড়ে বেড়ে সবাই যেন বড় মানুষ হয়ে যায়। এখন ভাইয়ার বন্ধুর সংখ্যাও অনেক। তারা আসে যায় প্রায় সময় কারো কারো হাতে চটের ব্যাগ থাকে।
একটু একটু করে সব বুঝতে পারি। ব্যাগে কি থাকে তাও জানি। কিন্তু আমাকে কেউ জানায় না। আমার খুব ইচ্ছে করে ভাইয়াদের সাথে যোগ দিতে। মনে মনে ভাবি আমি কি বড় হইনি! আমি কি দেশকে ভালোবাসি না! দেশ কি আমারও নয়! ভাইয়া আমাকে দূরে সরিয়ে রাখে কেন! ভাইয়া যেমন দূরে সরিয়ে রাখে ফারুকভাইও তেমনি। কঠিন কঠিন যুক্তি আমার মনে জমা হতে থাকে।
বাসার সামনে প্রায়ই ইপিআর এর জিপ দাঁড়িয়ে থাকত ফারুকভাইয়ের বাবাকে অফিসে নিয়ে যাবার জন্য। উনি ছিলেন একজন বড় সরকারি কর্মকর্তা।
একদিন দেখি ফারুকভাই আর ভাইয়া একটা বাজারের ব্যাগে করে কি যেন নিয়ে যাচ্ছে ঐ জিপের পাশ দিয়ে। তীব্র কৌতুহলী হয়ে উঠি। ব্যাগের ভেতরে কিছু গোল গোল জিনিস ছিল এবং আরো যেগুলি ছিল সেগুলি যে আগ্নেয়াস্ত্র তা বোঝাই যাচ্ছিল। আমাদের ভি আই পি বারান্দায় বসে সেই দৃশ্য দেখছিলাম। যতক্ষন ব্যাগটা চোখের আড়াল না হচ্ছিল আমার বুকটা ঢিপঢিপ করছিল। ভাইয়ারা আমার চেয়ে বড় হলেও কত আর বড়! কিন্তু কী অসীম সাহস ওদের!
প্রায়দিন এধরনের লুকানো ব্যাগের আনা নেওয়া দেখি।
একদিন সকালবেলা জানা গেল ভাইয়া আর ফারুকভাই নেই। চলে গেছে। সেসময়য় যুবক ছেলেদের চলে যাওয়ার মানে সবাই বুঝত। এরপর কলোনির বহু যুবক ছেলে নিখোঁজ হয়ে গেল। আমার ভাইয়া আর ফারুকভাই একেবারে যেন হারিয়ে গেল। অতি দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হতে লাগল। এরপর ফারুকভাইদের পরিবার কোথায় যে চলে গেল। যাবার আগে আপা আমার হাত ধরে বলেছিল,‘তোর ভাইয়া ফিরে আসবে। সে আমাকে কথা দিয়েছে, আমি জানি সে কথা রাখবে। তুই খালা খালুকে দেখিস। যেখানেই থাকিস সাবধানে থাকিস। দেখা হবে, স্বাধীন দেশে আমাদের দেখা হবে’। আপার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, কি বলব বুঝতে পারি না। লাজুক, নিভৃতচারী অথচ কী ভীষণ দৃঢ়চেতা আপা আমার।
আমি জানি ভাইয়া আর আপা মাঝে মাঝে আপাদের ছাদে গিয়ে টবের গোলাপগুলোর পরিচর্যা করে আর গুটুর গুটুর গল্প করে। ছাদে আপার চমৎকার গোলাপ বাগান আছে। ভাইয়া মাঝে মাঝে আপাকে নতুন গোলাপের চারা এনে দেয়। আপার হাতের ছোঁয়ায় সে চারাগাছ বড় হয় ফুল ফোটায়। মাঝে মাঝে আপা গোলাপের তোড়া বেঁধে আমার হাতে দিয়ে ভাইয়ার টেবিলের উপর রাখতে বলে। একটি ছোট্ট ভূখণ্ড যখন তীব্র প্রসব বেদনায় থরথর কাঁপছে, একটা ভরপুর কলোনি যেন খাঁ খাঁ শ্মশান হয়ে গেল। কে কোথায় ছিটকে পড়ল কারো আর হদিস রইল না।
(৩)
আমরা আর কোনোদিন ভাইয়াকে খুঁজে পাইনি। তাড়া খাওয়া পশুর মতো আব্বা নিজ পরিবার নিয়ে আজ এখানে কাল ওখানে পালিয়ে বেড়ান আর ভাইয়ার খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করেন। গোপনে ভাইয়াকে খুঁজে বেড়ান কখনও আজিমপুর থেকে তেজগাঁও থানা, তেজগাঁও থানা থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। আবার কখনও ক্যান্টনমেন্ট বন্দি শিবির।
দেশ একদিন স্বাধীন হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। রেডিওতে ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সংগীত বাজতে থাকে। কিন্তু তবুও আমাদের দিশেহারা অবস্থাটা যায় না। শহরের রাস্তায় দিন-রাত্রি আনন্দ মিছিল চলছে তখন।
তারপরও আমরা স্তব্ধ। বাবা ভীড়ের মধ্যে ভাইয়াকে খুঁজে ফেরে। রায়েরবাজারে লাশের স্তুপে ছিন্নভিন্ন শরীরগুলো খুঁচিয়ে খুঁচিয়েও ভাইয়াকে পাওয়া গেল না। কত মানুষ ফিরে আসে কিন্তু ভাইয়া আসে না। আব্বা যাকে পায় তাকেই ভাইয়ার বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞেস করে। ভাইয়ার অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে একদিন আব্বা আম্মা জীবনের মায়া ত্যাগ করেন।
আমি সারাজীবন ভাইয়াকে খুঁজেছি পথে ঘাটে, দেশের নানা বধ্যভূমিতে কিন্তু কোথাও তাকে পাইনি, না জীবিত না মৃত।
ঐ বয়সেই প্রতীক্ষা আর অপেক্ষার পার্থক্য বুঝেছি। যেখানেই স্মৃতি সৌধ দেখি সেখানেই যাই। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার বিশ্বাস ভাইয়া বেঁচে আছে। একটা সময় আসে খোঁজাখুঁজিটা বাহ্যিকভাবে স্তিমিত হয় কিন্তু মনের গভীরে থেকে যায়। অজান্তে পাগল, পঙ্গু, লুলা পথচারীদের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকি। আজ ত্রিশ বছর পরে ফারুক ভাইকে পেয়ে পেলাম! অবিশ্বাস্য মনে হয়! তিরিশ বছরের তোলপাড়! অস্থির লাগে। বুকের ভেতর খাণ্ডবদাহন। ভাইয়া কি বেঁচে আছে কোথাও! ফারুক ভাই তো বেঁচে আছে। নিশ্চয়ই আমার ভাইয়াও আছে, দেশে কিংবা বিদেশে! সুস্থ কিংবা পঙ্গু হয়ে। ভাইয়ার কথা শুনব বলে ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করি। আব্বামার কথা মনে পড়ে। তাঁরা আমৃত্যু কেবল অপেক্ষাই করে গেছেন। পৃথিবীর গভীরতম বিষাদের নাম অপেক্ষা।
(৪)
ফারুকভাইয়ের ব্যথা তীব্র আকার ধারন করলে তাঁকে হসপিটালে নেয়া হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম সহ বিভিন্ন টেস্ট করে দেখা যায় দীর্ঘ বছর ধরে পেটে বুলেটের একটা বাজে ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন। তার একটি পা নেই, বোমায় উড়ে গেছে। পেটে গুলির ক্ষত। আমার সেই পরমা সুন্দরী মিমি আপা পাকবাহিনীর ক্যাম্পে বন্দী ছিল কয়েকমাস। পরিবারের সবার সামনে দিয়ে তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় তাঁর সেই লম্বা বেণী ধরে টানতে টানতে সবুজ জিপে তোলা হয়েছিল। সে বর্বর অত্যাচারের কারনে তাঁর কোন সরলরৈখিক জীবন হয়নি। কথা প্রায় বলেই না। দুভাইবোনে এক অবরূদ্ধ জীবন কাটান। আপার ছোটভাইয়েরা প্রবাসী, তাদের সাথে ফোনে কথা হয়, তাদের কাছ থেকেই আপা সম্পর্কে সামান্য কিছু জানতে পারি। আমাকে দেখে আপার চোখ দুটি পলকে ঝিকমিক করে উঠে কিন্তু দীর্ঘ সময়ের অভ্যস্ত নির্লিপ্ততা তাঁকে মুহূর্তেই আবার নিষ্প্রভ করে দেয়। ডুবে যায় গভীর বিষাদে।
ফারুকভাইয়ের অপারেশন হয়ে যায়। সকল কাজ স্থগিত রেখে সারাক্ষণ ফারুক ভাইয়ের পাশে থাকি। মনে মনে ভাবি এ কেমন নিয়তি, দেখা হলই যদি তা এমন জটিল অথবা অন্তিম সময়ে! যেন এও এক অমীমাংসিত রহস্য। চিকিৎসার সামান্যতম বিচ্যুতিও ঘটতে দেই না। ফারুকভাই আমার হাত ধরে থাকেন। আমি অপলক তাকিয়ে দেখি, ছোটবেলায় যাকে পৃথিবীর সমান বিশাল মনে হত সেই অসহায় পঙ্গু সরল রেখার মত শায়িত মানুষটাকে। কেউ কি শুনতে পাচ্ছে, বুঝতে পারছে কোথাও একটা তীব্র ভাঙনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সন্তপর্ণে। জগত সংসার মিছে হয়ে যাচ্ছে, নস্টালজিয়া গন্ধ আসছে। হুড়মুড় করে আমার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে অগণিত গোলাপের টব, সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন বারান্দা, কলহাস্য বিকেল, ব্যাডমিন্টন, কলোনী, ভাইয়া, মিমিআপা, ফারুকভাই!
তিনি একবার পুর্ণ চোখ মেলে তাকান। কোনকিছু জিজ্ঞেস করার সময় এটা নয়। কিন্তু সময় যদি আর ‘সময়’ না দেয়! পায়ের নিচে চোরাবালি। মাকড়শা জাল বুনতে থাকে, আব্বামা, শৈশব কৈশোরের আজিমপুর কলোনী। শত সহস্র বেদনার ভার বুকে, একেক বেদনার ভার একেক রকম কিন্তু সব বেদনার রঙ একই। নয় মাসের অজানা কাহিনীর, আমার ভাইয়ার একমাত্র দোসর জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ভুলে যাই আমি একজন পুর্ন বয়স্ক মানুষ, দায়িত্ববান একজন চিকিৎসক। কেবল একজন ছোটভাই হয়ে যাই, টেনিস বলবয় হয়ে যাই। যাকে সেসময় সবকিছু থেকে ‘ভাইয়ারা’ সরিয়ে রেখেছিল, আগলে রেখেছিল। আমি কেবল তাঁর উপর ঝুঁকে আস্তে করে বলি ‘ভাইয়া’!
ফারুকভাই হাতের মুঠি আরো শক্ত করেন। তাঁর চোখ প্রথমে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এরপর অশ্রুগ্রন্তি ভরে আসে জলে, আমার হাতে আলতো চাপ দিতে থাকেন…বুঝতে পারি বহু কথা জমে আছে বুকের ভেতর, বলবেন, নিশ্চয়ই বলবেন।
আরো কয়েক মুহূর্ত নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে তিনি চোখের পাতা বন্ধ করেন। আমি অপেক্ষা করি, তিরিশ বছর অপেক্ষা করেছি, জানি না এবারের অপেক্ষার দৈর্ঘ্য কতটা…
