উপন্যাস─ আজিরন বেওয়া। রাশেদ রেহমান ─ পর্ব আট-নয়
আট
সেদিনের পর প্রায় রাতেই সাইফুল আসে। আজিরনকে মাস্টার বাড়ি পাঠিয়ে আদিম থাবা ফেলে সুফিয়ার শরীরে। যার ভয়ে সুফিয়ার মামির বাড়ি আসা, সে ভয়ই তাকে গ্রাস করতে থাকে দিন দিন। ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়’—এসব অযাচিত ভাবনা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে সুফিয়ার। হাজারো ভাবনা আর অশনি সংকেতের মাঝেই কেটে যায় তার বিনিদ্র রজনী। সারাদিন কারো সাথে কথা বলে না। ঘৃণায় দিনে কয়েকবার গোসল করে। কিছুতেই মনের পবিত্রতা আনতে পারে না। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে আসে বিকেল। কিন্তু যখনই সূর্য অস্ত যেতে থাকে তখনই শুরু হয় তার শিউরে ওঠা। সেটা ততক্ষণ পর্যন্ত চলে যতক্ষণ না সাইফুল তার কামনা চরিতার্থ করে। তাই অন্ধকার মানেই যেন তার কাছে ভয়ের কারণ।
এদিনও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই ছালার ব্যাগে একটা বড়ো ইলিশ মাছ নিয়ে হাসতে হাসতে আজিরনের ঘরে ঢোকে সাইফুল। তাকে দেখে সুফিয়া ছলনা করে মামিকে বলে, ‘কেরাম ব্যাপারির বউ মাছ কুটে দিতে বলেছে, যাই মামি।’আজিরন একটু মনোক্ষুণ্ন হয়ে বলে, ‘কি গো বাপু, আমি পোয়াতি মানুষ; কোলের ছইল নিয়ে কিছু করতে পারি না। সাইফুল অত বড়ো মাছ আনলো, মাছ কুটে রান্না করে সবাইকে একটু খাওয়া। তা না, ব্যাপারি বাড়ি যাইবার চাস; তোর বুদ্ধিশুদ্ধি কবে অইব?’
মামির কথায় রাগে গা জ্বলতে থাকে সুফিয়ার। তাই মন না চাইলেও মাছ কাটতে বসে। অন্যদিকে সাইফুল কামনার চোখে বারবার সুফিয়ার শরীরের দিকে তাকায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সুফিয়া আঁচলে শরীর ঢাকে। মনে মনে মামির ওপর রাগ ক্ষোভ ঝাড়ে। মানিককে গালমন্দ করে। কিন্তু কিছুই করার নেই। অন্যমনস্ক মাছ কাটতে গিয়ে সুফিয়া হাতের আঙুল কেটে ফেলে সে। ‘মাগো’ বলে কেঁদে ওঠে। আজিরন চমকে ওঠে। তাকিয়ে দেখে সুফিয়ার আঙুল কেটে গেছে। ঘর থেকে কাপড় এনে সুফিয়ার কাটা আঙুলটা বেঁধে দিয়ে নিজে মাছ কাটতে বসে। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে সুফিয়া। হাত কাটার কারণে সাইফুলের থাবা থেকে কয়দিনের জন্য রেহাই মেলে তার।
বছিরের খিয়ারে যাওয়ার প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেলেও আসার কোনো খবর নাই। এদিকে কেরাম ব্যাপারির বাড়িতে আকিকা হয় কিন্তু ব্যাপারির বউয়ের সাথে ঝগড়া হওয়ার কারণে ছেলেদের ঘর থেকে বেরুতে দেয়নি আজিরন। অভাবী মানুষ সে। কোনো বিষয়ে পান থেকে চুন খসলেই শাসিয়ে যায় কেরাম ব্যাপারির বউ। তা নিয়েই ঝগড়া বাঁধে আজিরনের সাথে।
আকিকার দিন বুক ফেটে কান্না আসে আজিরনের। কত দিন হয়ে গেল ছেলেমেয়েদের গোস্ত খাওয়াতে পারেনি। মেজ ছেলে রাতে খাবার সময় বলে, ‘মা, বাজান কবে আইব? আমরা কবে গোস্ত খামু?’ আজিরন সে কথার জবাব দিতে পারে না। হঠাৎই প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। বাড়ির পেছনটায় প্রকাণ্ড বাঁশঝাড় আজিরনের ঘর দুটো কোনোরকম রক্ষা করে। ঝড় থামে। তবে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেসব কাঁটিয়ে উঠতে প্রতি বাড়িতে পাঁচ কেজি চাল ও এক কেজি ডাল রিলিফ দেয়। আজিরনও পায়। কিন্তু পাঁচ কেজি চাল কয়দিন? বছির উদ্দিনের আসারও ঠিকঠিকানা নেই। ঝড়ে পড়ে যাওয়া কলা গাছের কান্দাইল কুচি কুচি করে কেটে অল্প চাল ও ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে ছেলেমেয়ের সামনে দেয়; নিজেও খায়। এমন সময় ভাইয়ের ছেলে আসে এক ব্যাগ চাউল ও দুটি কাঁচকলা নিয়া। ভাইপোকে দেখে খিচুড়ির থাল লুকিয়ে রাখে আজিরন। কিন্তু ভাইপো বলে, ‘অনেক পথ হেঁটেছি, ঘরে খাবার থাকলে কিছু খেতে দেন ফুফু।’তাকে খিচুড়ি খেতে দিয়ে আজিরন চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। ডুকরে কাঁদতে থাকে। তার কান্না দেখে বাকিরাও কেঁদে ওঠে।
নয়
গাণিতিক নিয়মে ঘুরতে থাকে সময়ের চাকা। প্রকৃতিতে আসে ঋতুর বিবর্তন। সুফিয়ার মনেও আসে ইপ্সিত পরিবর্তন। এখন সাইফুলকে না দেখলে ভালো লাগে না। যে সাইফুলকে দেখলে শরীরে কাঁটা দিত, চক্ষুশূল মনে করত, তাকে ঘিরেই এখন সব ভাবনা। তাকে যে সুখ দেয়, তৃপ্তি দেয় সাইফুল, তার ধারে-কাছেও মানিক পৌঁছাতে পারে না। আদিম সুখের যে সন্ধান পেয়েছে তাকে সে হারাতে চায় না। সাইফুলকে নিয়ে পালিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্ন উচিৎ অনুচিৎ বোধের উর্ধ্বে । প্রকৃতির এ প্রবাহ এভাবেই বুঝি মানুষকে বেঁধে ফেলে অক্টোপাসের মতো, যার নাগপাশ থেকে মুক্তি মেলা বড়ো কঠিন।
সাইফুল-সুফিয়ার প্রেমলীলা অগোচরে চলতে থাকে। জানতে পারে না আজিরনও। এমনকি আজিরনের ছেলেরাও। আজিরনের মতো তাদেরও ধারণা সাইফুল তাদের সহযোগিতা করার জন্যই আসে। ভেতরে ভেতরে যা কিছুই ঘটে চলেছে তা তাদের বোধের অগম্য, বুদ্ধির বাইরে।
আজিরনের অভাব-অনটনকে পুঁজি করে মধুর পরকীয়ায় মাতে সুফিয়া। কথার কূট কৌশল চালিয়ে রাতে মামিকে হেকমত মাস্টারের বাড়িতে পাঠিয়ে সাইফুলের সাথে প্রেম যমুনায় নাও ভাসায়। সাইফুল সে নৌকায় শক্ত হাতে বৈঠা চলায়। একসময় সে সুফিয়াকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। সুফিয়া খুশি হয়। পরামর্শ দেয় ধৈর্য ধরার। বলে, ‘মানিক খিয়ার থেইক্যা সিলেট কাবারে গেলে তোমারে নিয়া দেশান্তরী হমু।’
সুফিয়াকে তিলদণ্ড না দেখলে সাইফুল পাগলের মতো হয়ে যায়। সে এতটাই দিওয়ানা হয়ে পড়ে যে খালা আজিরনের প্রতিও তার খেয়াল নেই। যে সাইফুল আজিরনের দুঃসময়ে গোপনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত, সেই সাইফুল পরকীয়ায় মজে সব ভুলে গেছে। তার কাছে এখন সুফিয়ার সান্নিধ্যই বড়ো ব্যাপার, অন্য কিছু নয়। এখন তার আকুলতা শুধু গোপন মিলনের।
সাইফুল-সুফিয়ার প্রেমের খবর যেমন নেই আজিরনের কাছে, স্বামী বছিরেরও নেই খয়-খবর। স্বামীর প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে পথের পানে তাকিয়ে থাকে সে। কবে আসবে বছির, সে অপেক্ষায় দিন-রাত গোনে। স্বামীর সান্নিধ্য তার একান্ত কামনা, স্বামীর সাক্ষাতের জন্য সে ছটফট করতে থাকে।
আজিরন যখন এমনি সময় পার করছে তখন হঠাৎ এক দুপুরে ভয়ানক স্তব্ধতার মধ্য থেকে ঘরের চালে কুটুম পাখি ডেকে ওঠে। সে ডাক যেন খাঁ খাঁ মরুপ্রান্তরে একপশলা প্রশান্তির বৃষ্টি আজিরনের মনে প্রশান্তি এনে দেয়।
ঘরের আঙিনায় কুটুম পাখি ডাকা মানে ঘরের মানুষ ঘরে ফেরা কিংবা আত্মীয়স্বজনের আগমন। আবহমান সংস্কারগুলো যেন নদীপারের সহজ সরল মানুষের চিরহস্বান্ত্বনা। খনার বচনের মতো, সূর্যসভায় বান, চন্দ্রসভায় ধান মানা। রোগ-ব্যাধিতে কবিরাজের হাতুড়ে চিকিৎসাই একমাত্র ব্যবস্থা। তেমনি তার মনে অবস্থা।
কার্তিক মাস এলে প্রায় সব বাড়িতেই মাছ রাখার খালই লম্বা বাঁশে ঝুলিয়ে রাখে। ভাঙা খালই দেখলে কলেরা বাড়ির দিকে তাকাবে না, তাই এই অভিনব পদ্ধতি। ছোট ছেলেমেয়েদের কোমরে সরিষা পড়া, সুতা পড়া বেঁধে দেয় কলেরা-বসন্ত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। ঝাড়-ফুঁ দেয়ার জন্য নানা ধরনের, নানা পোশাকের কবিরাজ পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। অনেকে আবার কবিরাজ দিয়ে ঝাড়-ফুঁক দিয়ে বাড়ি বন্ধ করে নেয়। কার্তিক মাসে ভূতের ভয়ও কম নয়। দাদি-নানির কাছে বিভিন্ন ধরনের ভূতুড়ে গল্প শোনা যায়। এ মাসে নাকি ভূতেরা বংশ বৃদ্ধির জন্য বিয়ে করে। রাস্তায় রাস্তায় নাচানাচি করে। ভয়ে ছোট মানুষ তো দূরেই থাক, বড়োরাও রাস্তায় বের হয় না।
কার্তিক মাসের অমাবস্যা নিয়েও আয়োজন। কবিরাজরা ভূত, কলেরা ও বসন্তকে বার্ষিক ইনকাম ট্যাক্স বাবদ খাজনা দেয়ার জন্য তিন রাস্তার মোড়ে মোড়ে মশাল জ্বালিয়ে উঁচু গলায় মন্ত্র পড়ে পরবর্তী বছরের কবিরাজি জায়েজ করার জন্য। গ্রামের লোকেরা চালকুমড়া, কাঁচা পুঁটি মাছ, মুরগির বাতের খড়, তেঁতুল ঘরের চালের ওপর রেখে শিশিরে ভিজিয়ে পরদিন সকালে বাতের খড় ও চালকুমড়া গবাদিপশুদের খাওয়ায়। এসব এলাকায় একটা অন্ধ ধারণা ও বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে এসব খেলে নাকি গবাদিপশু পরবর্তী সারা বছর কলেরা, বসন্ত, বাতের রোগ, ক্ষুরা রোগ থেকে রক্ষা পাবে। আর তেঁতুল বাচ্চাদের মুখের ঘা না হওয়ার জন্য খাওয়ানো হয়।
গ্রামের সরল বিশ্বাসের মানুষগুলোর মতো আজিরনও কুটুম পাখির ডাকে আত্মহারা। আজ তার স্বামী আসবে। তাই আনন্দচিত্তে কুটুম পাখির দিকে তাকায়। ততক্ষণে কুটুম চলে গেছে তার নিজ ঠিকানায়। কুটুম যেন তার কাছে আনন্দের আগমনী সংবাদ।
