গল্প- আক্রোশ- ফারহানা নীলা
মেয়েটা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। জেগে আছে না কি ঘুমে?
আজকাল আঁধার আঁকড়ে ধরে মেয়েটা। আলোতে এলেই ভীষণ অস্থির হয়ে যায়। কথা বলতে চায় না। আগেরমত প্রাণবন্ত নেই আর। ঘরে কাউকে ঢুকতেও দেয় না। লেখাপড়া মাঝপথে হোঁচট খেয়েছে। খাওয়া দাওয়া, গোসল– সবকিছুই এলোমেলো।
একসময়ে ওকে খুব শাসন করতাম। চোখে চোখে রাখতাম। একা কোথাও যেতে দিতাম না।এসবে ওর আপত্তি ছিল যতটা তারও বেশি ছিল বিদ্রোহ বিদ্বেষ।
জি আমার মেয়ে নবনীতা। যদিও আমি ওকে আদর করে কুটুস ডাকি। তবে এই নামটা বাড়িতেই সীমাবদ্ধ।
শাসন করলে কখনো চুপসে যেত আবার কখনো তর্ক জুড়ে দিত আমার সাথে। বন্ধু নিয়ে অযথা সব পাগলামি ছিল কুটুসের।একটা বয়সে এইসব থাকে, আমি জানি। আমিও তো ঐ বয়সটা পেরিয়ে এসেছি।
আমার বিভিন্ন ধরনের টানাপোড়েন। নিজস্ব বলয়ে বাঁধা আমি। কুটুসকে ঠিকমত সময় দিতে পারিনি।
ঘরের দরজায় মৃদু টোকা দিই। আস্তে করে ভেড়ানো দরজা খুলি।
‘কুটুস তুই কি ঘুমে?’
কোনো উত্তর নেই।
‘কুটুস একটু আসি তোর ঘরে’
এবারও উত্তর নেই
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। কেমন শূন্য লাগে সবকিছু।
সুইসটা টুক করে শব্দ করে। আলো জ্বালি। মাথা মুড়ে শুয়ে আছে কুটুস। আমি কাছে যাই। চাদরটা সরিয়ে নাকের কাছে হাত দিই।নিশ্বাস পড়ছে। আমার হাতে বাতাস লাগছে। একটা পাথর নেমে গেল বুক থেকে। পাথরের সেই খালি জায়গাটায় দুমড়ে মুচড়ে ওঠে দীর্ঘশ্বাস। কোনো জায়গাই খালি থাকে না। শূন্যস্থান ভরে।
ছোটবেলায় মা কতভাবে শূন্যস্থান পূরণ করতে দিত সেইসব কথা মনে আলোড়ন তোলে। তবে কি মা এটাই শেখাতে চেয়েছিল শূন্য আপেক্ষিক — শূন্য থাকে না আদতেই।
কুটুসের চাদরটা টেনে দিয়ে আলো নিভিয়ে দরজাটা টেনে চলে আসি।
‘ঘুমা কুটুস। ঘুমের চেয়ে শান্তি আর হয় না। ঘুমে যতক্ষণ ততক্ষণ আরাম। জেগে গেলেই আবার সেই ঘুর্ণি’
আমি নবনীতা। বয়স বিশ। একটা নামিদামি কলেজে পড়ি। আমাদের বাড়ি তেজকুনি পাড়ায়। কলেজটা বেশি দূরে নয়। বন্ধু আর মজা মাস্তি নিয়ে ভালোই কাটে দিন। লেখাপড়া করতে ভালো লাগে না একদমই। তবুও ছাত্রী টিকিট ঝুলিয়ে রেখেছি নামের সাথে।
আমি তখন ছোট। বয়স সাড়ে চার বছর। অথচ সব কথাই কেমন করে মনে আছে আমার! আমার মায়ের বিয়ে। বিশাল আয়োজন চারিদিকে। মায়ের শরীরের গন্ধে আমি ঘুমোই আবার জাগি।
অবাক হচ্ছেন? মায়ের বিয়ে শুনে অবাক হচ্ছেন?
আমি অবশ্য অবাক হইনি। আমার ভীষন কষ্ট লেগেছিল ছোট্ট সেই বুকে। আমাকে অবশ্য মা কিছু বলেনি। বলেছিল আমার দীদা। নানীকে আমি দীদা ডাকতাম।
‘কুটুস কাছে আয়।’ দীদার ডাকে খেলা ফেলে কাছে বসি। দীদার হাতে উলের কাটা। ক্রমাগত বুনে চলেছে উল। শীতের দুপুর। আমি দীদার কোলের কাছে উলের গোলাটা নিয়ে খেলতে থাকি।
রোদের তেজ কমে এসেছে। বেশ লাগছে রোদটা। এই সময়টাতে বারান্দার এইখানে চিলতে রোদের ছোঁয়া পাওয়া যায়। যদিও নারিকেল গাছ আর খেজুর গাছের পাতাগুলো পথ আগলে দাঁড়ায়। মা ঘরে। হয়তো শুয়ে আছে। আজ কয়দিন মায়ের মুখটা কেমন জানি ভার ভার?
আমার বাবাকে আমি কখনো দেখিনি। কোনো ছবিও নেই। তাই কোনো আদলও নেই আমার চোখে। সেই বয়সে আমার অবশ্য বাবা নিয়ে তেমন কোনো ভাবনা ছিল না, থাকার কথাও নয়।
দীদা উল বুনে যাচ্ছে। আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে নরম রোদ। রোদের আলতো ছোঁয়া খুব পরিচিত লাগছে। কিন্তু মনে করতে পারছি না ঠিক কিসের মতো? নারিকেল গাছের পাতা আলপনা আঁকছে রোদ কেটে কেটে। আমাদের বেড়ালটিও গুটলি পাকিয়ে তাকিয়ে আছে। দীদা কিছু বলতে গিয়ে আবার চোখ নামিয়ে উল বুনছে।
আমি সেদিন বুঝতে পারিনি দীদা কেন আমাকে ডেকে এনে কিছু বলছে না।
ছোট মানুষেরও অনেক কিছু বোঝার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা দিয়েই পাঠান এই নিষ্ঠুর নির্দয় পৃথিবীতে। আমি কি বুঝলাম সেটা জানি না। তবে দৌড়ে ঘরে গেলাম। মা শুয়ে আছে। বেড়ালটার মতো গুটলি পাকিয়ে আমি তাকিয়ে আছি মায়ের দিকে।
সংসারে কতরকমের ঘটনা ঘটে। কত সমীকরণ মেলানোর জন্য চেষ্টা চলে। আসলে হয়তো কোনো সমীকরণ সমাধান হয় না বলেই মানুষ বড় বেশি অসহায়। একজন মানব শিশুর অসহায়ত্ব কি অন্য কোনো প্রাণীর শাবক বোঝে?
মা আমাকে কোলের মধ্যে টেনে নিল। আমি মায়ের গন্ধ নিতে নিতে কখন জানি ঘুমিয়ে গেলাম।
জাদুবাস্তবতার জগতে বাস আমাদের। আমরা কল্পনার ঘের সাজাই আপন মনে। ওখানে বাস্তব চিত্র ভেসে উঠতেই খেই হারাই,হোঁচট খাই– এসব জীবনের কথা। ওখানে জাদু নেই। এতটুকু মানুষ আমি অথচ আমারও পঞ্চেন্দ্রিয় কিছু অজানা আভাস আগাম দিচ্ছে আমাকে। আমি কিছু বুঝছি তা নয়– তবে একটা ভোঁতা অনুভূতি সারাক্ষণ বিদ্ধ করছে।
জেগে যাবার পরও ঘাপটি মেরে শুয়ে আছি মায়ের বুকে। এই ঘ্রাণটা তো জন্মের থেকেই আমার চিরচেনা। এই ঘ্রাণ পেলে আমার কান্না থেমে যেত। এই ঘ্রাণ পেলে আমার নির্ভরতা জেনে নিতাম আমি।
দীদার নিজেকে তৈরি করতে বেশ বেগ পেতে হলো আমাকে কথাটা জানাবার জন্য। দীদা নিজেও হয়তো কিছুটা অপ্রস্তুত! অথবা কোমল মনে যদি ব্যথা লাগে সেই ভেবে আকুল।
আমি মায়ের কাছে প্রশ্ন করি। মা চুপ করে থাকে।
‘মা বাড়িতে এত মানুষ কেন?’
‘বেড়াতে এসেছে।’
‘কোনো ঘরে জায়গা নেই। আমার সব খেলনা দিয়ে ওরা সবাই খেলছে!’
‘খেলুক মা। ওরা সবাই চলে যাবে।’
কেমন একটা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠান আমেজ। সবাই কথা বলে,হাসাহাসি করে। কিন্তু আমি গেলেই কেমন চুপ করে যায়। আমি মায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকি। ওখান থেকেও আমাকে ডেকে আনে দীদা।
‘কুটুস’ দীদার গলাটা ভারি শোনা যায়। রাজ্যের কফকাশি যেন আটকে গেছে গলায়। দীদা এমন কেন করছে? আমার মন কি কিছু বুঝছে?
দীদা সেদিন অনিশ্চয়তা আর দ্বিধার প্রাচীর টপকাতে পারেনি। কেবল আমাকে জড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিল। গরম জলে আমি ভিজে গেলাম যেন। দীদার কান্নায় ভেঙে পড়া সেই দিনে হয়তো জীবনও কেঁদেছিল অসহায় একটি শিশুর আগামীর সূর্য কেমন হবে সেই ভাবনায়।
অতটা অবুঝ হয়তো ছিলাম না আমি। বিষয়টি বুঝতে সময় লাগলেও বুঝে নিলাম। আমার মায়ের বিয়ে– এতে আনন্দ হবারই কথা হয়তো আমার! বাড়িঘর সাজানো হয়েছে। রান্নার মৌ মৌ গন্ধ। ডেকোরেটর থেকে চেয়ার টেবিল ছাদে এসে বসেছে। বাড়ির গেটটা রঙিন কাগজের চেইন বানিয়ে সাজানো।পাশে দুটো কলাগাছ আর আঁকানো কলসের মাঝে কাগজের ফুল মায়ের গায়ে সবাই হলুদ মাখছে। রঙ নিয়ে মাতামাতি চলছে। আমি বিষ্ময় চোখে মাকে দেখছি। কেমন ভাবলেশহীন চোখ। সেই বয়সে অই চোখকে বর্ণনা করতে পারিনি আমি। তবে এখন হলে বলতাম মৃত মাছের চোখের মতন। হলুদ শাড়ি পরে বসে আছে মা।হাতে মেহেদী। বিকেল নাগাদ সবাই মিলে মাকে গোসল করায়। তুমুল জোরে গান গায়।
আমার নানা মারা যাবার পর নানাকে গোসল করানোর পর আমার মনে হয়েছিল মানুষ মারা গেলে কেবল গোসল করিয়ে দেয় সবাই।
তবে যে মাকে গোসল করিয়ে দিচ্ছে? মা কি বেঁচে আছে?
সারাদিন আমার খোঁজ নেবার সময় হয়নি কারও। দীদা এসে আমাকে ভাত দেয়। আমার চোখে রাজ্যের ঘুম এসে বসে। ভীষণ ক্লান্ত লাগে আমার।
ঘুমের মধ্যে টের পাই আমাকে জড়িয়ে আছে মা। হলুদের গন্ধ পাই। মা কাঁদছে।
নানা মারা যাবার পর আমি সহ মা এই সংসারে বাড়তি বোঝা। আমার মামা এমনিতেই হিমশিম খায় সংসার চালাতে।
মা আমাকে নিয়ে এখানেই থাকতে চেয়েছিল। কিছু একটা কাজ জুটিয়ে নেবে ভেবেছিল। দুটো পেট চলবে তাতেই।
সমাজ বড্ড আজব জটিল ধাঁধা। অল্প বয়সী মাকে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসানোই যেন সমাজের দায়।
সেইরাতেই সবার ফিসফাস শুনি। আমার জন্মদাতা বাবার কথা প্রথম জানি। দোষ না করেও জেল খেটেছে বাবা। টাকার জোরে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় বাবাকে। মামলাটা ছিল জমি নিয়ে বিরোধ আর একটা খুন।বাবা না কি এই কথা আমাকে জানাতে বারণ করে গেছে। কথাগুলো গেঁথে যায় আমার মনে। আমি ঘুমের ভাণ করে আছি। মা ডুকরে ডুকরে কাঁদে।আমাদের ঘরে বিছানায়, মেঝেতে কতজন যে শুয়ে আছে!
আমি বাবার আদল আঁকি মনে মনে।
বিয়ের ফুল ফুটলে তো বিয়েই হবে। আমার মায়ের বিয়ে হয়ে গেল। লাল শাড়ি পরা মাকে দেবীর মতন লাগছে।এত সুন্দর আমার মা?
মা আমাকে পাশে বসিয়ে রাখে। আমি চুরি করে বারবার মাকে দেখি। খাওয়া দাওয়া চলছে। বরযাত্রী সবাইকে খুব যত্ন করে খাওয়ানো হয়।
কেউ একজন মায়ের জন্য খাবার বেড়ে আনে।
থালাটা হাতে নেয় মা। পোলাও মাংস মাখিয়ে আমাকে খাইয়ে দেয়। পরম তৃপ্তির সাথে আমি খাই। খাওয়ার সাথে মায়ের চোখের কফোঁটা জল মেশে– তার হিসাব কেউ রাখে না।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়। মাকে এবার যেতে হবে। যে লোকটার সাথে বিয়ে হলো তাকে আমি ভালো করে দেখিনি। গাড়িতে মাকে উঠানোর জন্য তাড়া দেয় লোকটা। আমি মায়ের আঁচল ধরে আছি। মা কাঁপছে। দীদা কান্নায় ভেঙে পড়ে। মা কাঁদে না। কেমন শক্ত হয়ে যাচ্ছে মায়ের শরীর। আমার মনে হলো একটা খড়খড়ে গাছ ধরে আছি আমি।
‘কুটুস আমার সাথে যাবে’ এই প্রথম কথা বলে মা।
‘তুই যা। সকালেই আমরা কুটুসকে নিয়ে তোকে দেখতে আসব’ মামার কথায় মা ফণা তোলে।
লোকটা বেশ বিরক্ত হয়েই বলে– ‘চলুক।’
গাড়ি চলতে শুরু করে। মায়ের পাশে লোকটা বসা। আরেক পাশে আমি। আমাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে ধরে আছে মা।
সেই লোকটার বাড়িতে পৌঁছে গেলাম আমরা। মাকে গাড়ি থেকে নামানো হলো। আমার সাথে দীদা একজন খালাকে দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি আমাকে ধরে আছেন। আমি মায়ের আশেপাশে ঘেষতে পারি না আর।
এতো মানুষের ভিড়ে মাকে দেখা যায় না। কেবল একটা লাল শাড়ি উঁকি দেয়।
ঘরটাতে পুরোনো রঙচটা দেয়ালে রঙিন কাগজের ফুল লাগানো। বিছানায় নতুন চাদর। কিছু কাগজের ফুল ছিটানো বিছানায়। এটাই না কি আজ থেকে মায়ের ঘর। আমি মায়ের বিছানায় বসি। মায়ের কোলে মাথা রাখি। এক হাত লম্বা ঘোমটা টেনে মা একা বসে আছে। মানুষজন কমতে শুরু করেছে।
লোকটা ঘরে ঢোকে। আতরের গন্ধ ভুস ভুস করে।
‘কী নাম মেয়ের?’ মা কোনো উত্তর দেয় না।
‘অন্য ঘরে ওর শোয়ার ব্যবস্থা আছে। দিয়ে আসো কোলে করে।’
মা চুপচাপ বসে আছে। লোকটা কী জানি করছে। মনে হয় কাপড়চোপড় ঠিক করছে।
‘কী হলো? রাত হয়েছে। ওকে রেখে আসো।’
এবার মা কথা বলে। ‘ঘুমটা একটু গাঢ় হোক। নইলে জেগে যাবে। আমাকে খুঁজবে আর কাঁদবে। আমাকে ছাড়া কখনোই ঘুমোয়নি।’
‘এসব আদিখ্যেতা তো এখন কমাতে হবে!’
আমি টের পাই আমাকে কোলে করে সেই খালার পাশে শুইয়ে দেওয়া হলো। এই খালা দীদাকে কাজে সাহায্য করে। আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি।
স্বপ্নে মনে হয় বাবাকে দেখলাম। বাবার চোখে পানি। উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কত ডাকছি।বাবা শুনছেই না। বাবার চেহারাটা দেখতে পেলাম না।
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো। আমি দৌড়ে মায়ের নতুন ঘরে যাই। দরজা বন্ধ। দরজার পাশে বসে বসে ঝিমোতে থাকি আর অপেক্ষা করি দরজা খোলার জন্য।
দরজা খুলে লোকটা বের হয়ে বাড়ির ভেতরে গেলো। আমি ঘরে ঢুকতেই দেখি কচুরিপানা ফুলের রঙ শাড়ি পরেছে মা। মায়ের ভেজা খোলা চুল থেকে মুক্তোর দানার মতো জলের বিন্দুতে রোদ খেলা করছে। জানালা দিয়ে নতুন সকাল ঢুকছে।
‘ঘুম ভেঙেছে কুটুস’?
আমি বেড়ালের ছানার মতো মায়ের কোলে ওম নিতে ঢুকি। কী অবাক? মায়ের শরীরের ঘ্রাণ বদলে গেছে। কেমন নতুন একটা গন্ধ আসছে। বোটকা গন্ধ না কি সেই আতরের গন্ধ? আমি ঠাওর করতে পারি না।
এক রাতেই আমার মা অন্যের হয়ে গেল। আমার খুব কান্না পায়।ফুঁপিয়ে কাঁদছি আমি।
বিকেল হতেই দীদা আর মামা এল। সবার সাথে কথাবার্তা বলে ঠিক হলো আগামীকাল মাকে নিয়ে যাবে। আজ আমাকে নিতে এসেছে।ততক্ষণে আমি অনেক বড়র মতন হয়ে গেছি। অনেক কিছু বুঝতে শিখে গেছি মনে হলো।
কোনো কথা ছাড়া,কান্না ছাড়া শক্ত পাথরের মতো আমি দীদার সাথে রওনা হলাম। পেছনে মা দাঁড়িয়ে আমি জানি। কিন্তু আমি ভুলেও পেছনে তাকাইনি। হয়তো বুঝে গেছি পেছনে তাকানোর কোনো মানে নেই আর!
আসা যাওয়ার মধ্যে আছে মা। লোকটা আমার নাম জেনেছে।
আমাকে কুটুস বলেই কথা বলতে চায়।
‘কুটুস তুমি কি আইসক্রিম পছন্দ করো?’ আমার হাসি পায় শীতকালে আহাম্মকের মতো কথা শুনে।
‘আমার নাম নবনীতা। কুটুস আমাকে মা আর দীদা ডাকে।’
‘আমিও তোমাকে কুটুস ডাকব! কেমন?’
‘আমি নবনীতা।’ আমার গলায় ঝাঁঝ।
এই লোকটা কোনোদিন আমার কাছের কেউ হতে পারে না। আমার মাকে যে দখল করে নেয় সে কখনোই আমার কেউ হতে পারে না।
এর মধ্যে মা নিজেকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। এরজন্য নিজেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয়েছে সেটা মা ছাড়া আর কেউ কি জানে?
শুনলাম বাসা বদল হবে তাদের। মা একটা চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছে। আমি জানি এসব সবই মা আমার জন্য করছে।
‘কুটুস আমি দুদিন এখানে থাকব। তোর ব্যাগ গুছিয়ে আমরা নতুন বাসায় যাব।’ মায়ের কথা শুনে আমার আনন্দ বা অন্য কোনো উচ্ছ্বাস কিছুই হয় না।
দীদার কপালে চিন্তার রেখায় জমাট অন্ধকার গেঁড়ে বসে।
মায়ের সাথে আমি ব্যাগ,বই খাতা,কাপড়চোপড় সব গুছিয়ে নতুন বাসায় আসি।
দরজা খুলে আমার ঘরে ঢুকতেই অবাক হই।কী সুন্দর করে ঘরটা সাজিয়েছে মা! ততদিনে মা চাকরি শুরু করেছে।
আমার স্বপ্নে এমন একটা ঘরই ছিল।
আমাকে স্কুলে ভর্তি করা হলো। বটমলি স্কুল,তেজকুনি পাড়া– নতুন বাসার কাছেই স্কুলটা।
আমি ততদিনে বেশ বড় হয়ে গেছি। সংসার চাকরি নিয়ে মা ভীষণ ব্যস্ত। আমাি ব্যস্ত লেখাপড়া আর বন্ধু নিয়ে। লোকটা ব্যবসা করে। তাকে আমি বাবা ডাকতে পারিনি। সম্বোধন ছাড়া কথা হয় প্রয়োজনে। মায়ের সাথে আগের সেই বন্ধন এখন বেশ ঢিলেঢালা আমার।
লোকটা আমাকে পাত্তা দিয়েই চলে আজকাল।
মায়ের মুখেও একটু স্বস্তি উঁকি দেয়।
আমাকে নিয়ে বেড়াতেও যায় দুজন। আমরা বাইরে খাই, সিনেমা দেখি আরও কত কিছু। কিন্তু লোকটাকে আমার কখনোই আপন মনে হয় না।
এক গাছের ছাল আরেক গাছে লাগতে সময় লাগে। আমাকে মনে হয় এই লোকটার গাছে কলম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেকড়ের কোনো আভাস নেই।
মা একটা বেসরকারি স্কুলে পড়ায়। পরীক্ষার সময়ে এক গাদা খাতা নিয়ে আসে বাসায়। খাতার স্তুপে মুখ গুঁজে থাকে মা কয়েকটা দিন।
আমার মাসিক শুরু হয়েছে। প্রথম প্রথম ভয় পেতাম খুব। এখন আর ভয় করে না। রক্ত দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে। অভ্যাস হয় আবার বদলও হয় অভ্যাস সময়ের দাবিতে। আমার কত অভ্যাস এখন বদলে গেছে মনেই পড়ে না আর।
বন্ধুদের সাথে এত মাতামাতি মা আজকাল একদমই পছন্দ করছে না।
‘এত বন্ধু বন্ধু করলে লেখাপড়া উচ্ছন্নে যাবে!’ মায়ের তাতানো কথায় আমি ঝিম মেরে থাকি। বাধ্য মেয়ের মত পড়ার টেবিলে বসি। কিন্তু মা জানে না বইয়ের আড়ালে গল্পের বই শেষ হয় একের পর এক।
লোকটা বই পড়ে অনেক। এতে আমার সুবিধা। বইয়ের জন্য বেগ পেতে হয় না।
আমার জন্মদিনে মা ভালোমন্দ রাঁধে। লোকটা এটা ওটা কিনে দেয়। বোকা মানুষ এটা বোঝে না যে এসবে খাতির টাতির হবে না।
আমাকে পাজামা আর ওড়না পরিয়ে দেয় মা। বড় হলে না কি এসবই পরতে হয়। আমি অবশ্য খুব তাড়াতাড়ি বড় হতে চাই। বড় হলেই কেবল নিজের মত থাকা যায়– আমার বিশ্বাস।
ওড়না নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ নেই আমার।
সেবার মায়ের স্কুল পরিদর্শন করতে আসবে। ভীষণ ব্যস্ত মা। বলতে ভুলে গেছি আমার দেবীর মতন মা কেমন জানি মুটিয়ে গেছে।নিজের কোনো যত্ন নেয় না। মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে।
মাঝেমধ্যে মাকে খুব মনমরা দেখি। লোকটা রগচটা। গায়েও বোধ করি হাত তোলে! মা আমাকে কিছু বুঝতে দেয় না।
আমার সারা শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো। জ্বরের ঘোরে ভুল বকি। মা অস্থির হয়ে মাথায় জলপট্টি দেয়। শরীর মুছে দেয়। লোকটা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ওষুধ কিনে নিয়ে এলো। কিন্তু আমার জ্বর যেন রূপকথার সেই দৈত্যের মতন।
আজ মাকে সকাল সকাল যেতে হবে। পরিদর্শক টিম আসবে আজ। কিছু না খেয়েই আমার খাবার তৈরি করে মা বেরিয়ে গেলো।
ওষুধের প্রভাব যতক্ষণ থাকে,ততক্ষণ জ্বরটা একটু কম থাকে।
আবার বাড়ছে জ্বর। আবোলতাবোল করছি আমি।
লোকটা আমার মাথায় পানি দেয়। ওষুধ খাইয়ে দেয়। আমি তখন বেসামাল। কোথায় ওড়না, কোথায় কী?
একটু পর টের পাই রূপকথার সেই দৈত্য দানবের মতো করে কেউ আমাকে আটকে রাখছে। আমার পা দুটো ত্রিভুজাকার করে কেউ কী জানি খুঁজছে? এরপর একটা সাপ সুড়ঙ্গপথ ধরে অন্ধকারে কিলবিল করতে থাকে। মনে হলো একটা সাগরের জোয়ার ভাটা আমার শরীরে — ঢেউ আসছে আবার চলে যাচ্ছে। একটা ছন্দের দখল নিচ্ছে কেউ আমার শরীরে। আমি জোরে শ্বাস নিই। আমার নিশ্বাস চেপে আসছে। একসময় শেষ হয় সুনামি। ধীরে ধীরে জলের গর্জন থামে। জ্বরের ঘোরে টের পাই ততোধিক গরম কেউ ঢেলে দিল আমার গহিনে।
সেই থেকে শুরু। আমার জ্বর সেরে গেছে।
অথচ লোকটার খেয়াল বেড়েছে আমার দিকে,আমার ভালোমন্দে।
মা ফিরতে প্রায়শই দেরি হয়। স্কুল থেকে আসার পরই লোকটা আমাকে নিয়ে খেলতে থাকে। আদিম এই খেলায় আমি ভয় পাই,ব্যথা পাই।
‘মাকে বলবি না ভুলেও। তাহলে তোর মায়ের সংসার টিকবে না’
‘কেন? রোজ রোজ এমন কেন করেন?’
‘কেন তোর মজা লাগে না? ’
মা ক্লান্ত হয়ে ফেরে। মাকে আমার কিছুই বলা হয় না। লোকটা যদি মাকে কোনো কষ্ট দেয়? মা তো এমনিতেই ভীতু হরিণের মতো থাকে এই বাড়িতে।
কতদিন মায়ের কাছে গেছি বলব বলে– কিন্তু একদলা কষ্ট নিয়ে ফিরে এসেছি।
ক্রমেই বাড়তে লাগল এই অত্যাচার।
লোকটা তক্কে তক্কে থাকে। ভালোমানুষের মত চেহারা নিয়ে ঘোরাফেরা করে। আমার ঘরের সাথে লাগোয়া বাথরুম নেই। আর সেই সুযোগটাই সে নেয়। ক্লান্ত মা আমার বেঘোরে ঘুমায়।
একদিন শেষমেশ টের পেয়ে যায় মা। আমাকে নিয়ে দরজা আটকে দেয় ঘরের।
‘কেন বলিসনি?’ ঠাস করে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে যায় আমার গালে। মা হিসহিসিয়ে তেড়ে আসে পাগলের মতো।
লোকটা কয়েকবার দরজা খোলার চেষ্টা করে।এরপর টের পাই পেছন থেকে হুড়কো লাগিয়ে দিয়েছে।টানা তিনদিন আমরা এই ঘরে আটকে আছি।
‘শেষ করে ফেলব সব’ মা নিজে নিজে বলে। শান্ত হয়েছে মা।
লোকটা কী করছে আমরা জানি না।
একদিন বাইরে হইচই শুনতে পাই।
লোকজন এনে দরজা খুলে দিয়ে সে আমার চরিত্রে, মায়ের চরিত্রে কালিমা লেপে দেয়।
ছি ছি করতে থাকে সবাই।
‘দুধ কলা দিয়ে সাপ পুষেছি বুঝলেন’ বলে অভিনয় সাজায় লোকটা। এত আজেবাজে কথা বলে যে উগরে বমি আসে। আমার শরীরে তখন সেই বোটকা গন্ধ বা আতরের গন্ধ।
এক কাপড়ে আমাকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে আসে মা।
থানায় যাই আমরা। অভিযোগ দাখিল করি।
এরপর বিরাট প্রক্রিয়া। লোকটা জামিন পায়।
আমার উপর আজাব চলতে থাকে।
খবরটা আমি জেনেছি। মা হয়তো সেটাই বলতে এসেছিল ঘরে। ৭২ ঘন্টা পর ধর্ষনের আলামত না পাওয়ায় আসামী বেকসুর খালাস।
আমি ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছি। আমার খুব বাবার কথা মনে পড়ছে। অদেখা সেই মানুষটা বিনা দোষে ফাঁসিতে ঝুলেছে।
নিজেকে বাঁচানোর জন্য মাথার কাছে একটা ছুরি রাখতাম আমি। যদিও বাঁচাতে পারিনি নিজেকে।
আস্তে আস্তে উঠে বসি। শালটা জড়িয়ে নিই ভালো করে। ছুরিটাতে জোছনা এসে জমাট বাঁধে। চিকচিক করছে ধারাল ছুরিটা। ঘরে আলো নেই কিন্তু জানালা গলে জোছনারা হাসে।
আমি জানি মা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছে। আর কোনো আশা নেই বেঁচে থাকবার।
আমারও বাঁচার ইচ্ছে নেই, ছিল না কখনোই। শুধু মায়ের জন্য বেঁচে থাকা আমার।
বিচার তো হয়। হতেই হবে বিচার। দরজাটা ভিড়িয়ে আমি রাস্তায় নামি। আমার ভেতরে দানবের আস্ফালনের ক্ষত। আমি জানি লোকটা এখন কোথায়! ছুরিটা অস্থির হয়ে গেছে — আমারও সময় নেই। দেরি করার মত সময় একদমই নেই হাতে।
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে অঝোরে।
জলে টইটম্বুর নদীটা যেন পিছু ডাকে।
ফারহানা নীলা
