কবিতা

আলমগীর রেজা চৌধুরী’র নির্বাচিত কবিতা

আলমগীর রেজা চৌধুরী
জন্ম : ১০ মার্চ ১৯৫৫, টাংগাইল

বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকের কবি ও কথাসাহিত্যিক আলমগীর রেজা চৌধুরী’র জন্ম টাংগাইলের ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়ার সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতি চেতনালব্ধ পরিবারে। জীবনভর তাঁর চেতনায় ছায়াপাত করেছে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের সম্প্রীতির পরম্পরা। তিনি পছন্দ করেন মানুষের হৃদয়তাপ, হাসি আর আনন্দ। সঙ্গে ব্যথিতও হন তাদের জীবনঘনিষ্ঠ বেদনায়।
আলমগীর রেজা চৌধুরী সর্বোপরি ভালোবাসেন মানুষ। আর মানুষের সরল ভালোবাসা। নানান রঙের মানুষ নিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর লেখার জগত।
শিক্ষায় স্নাতকোত্তর, রয়েছে বয়ন শিল্পের উপর উচ্চতর শিক্ষা। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। কিন্তু বোহেমিয়ান স্বভাব তাঁকে কোথাও স্থির হতে দেয়নি। বিচিত্র পেশা গ্রহণ করেছেন। বেঙ্গল ইন্ডিগো লিমিটেড-এর কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার ছিলেন দীর্ঘ এক যুগের উপর। বর্তমানে দৈনিক সময়ের আলো’র সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। সাহিত্যমহলে আলমগীর রেজা চৌধুরী একটি প্রতিষ্ঠিত নাম।

তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প ,অনুবাদ ও নানান ধরনের প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনায় ফলবান। সারাক্ষণ অজানার টানে মেতে থাকেন। নানান দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেইসব জনপদের মানুষের জীবনকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। স্বভাবতবই ওইসব জীবনকেও এড়াতে পারেননি তিনি। বাংলাদেশ ও বিশ্ব মানবতার প্রতি নিষ্ঠতা নিয়েই তাঁর লেখালেখির ভুবন। এরাই এনেছে লেখকজীবনের সকল সমৃদ্ধি। স্ত্রী রিনি রেজা চৌধুরী, কন্যা নুশরাত তামান্না চৌধুরী মিমি ও পুত্র অরিন্দম খালিদ চৌধুরী রূপম’কে নিয়ে তাঁর পারিবারিক জীবন।

শখ : বইপড়া, ভ্রমণ, ক্রিকেট
প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা- চুয়ান্ন

আঁতুড়কথন

১.

কৈশোরের হৃদয়নাথ আমার বন্ধু ছিল। একাত্তরের
পর তার সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছি। হৃদয়নাথ ওই
বয়সে বেশ আকর্ষণীয় চরিত্রের অধিকারী।
আমাদের মফস্বল শহরের দেয়ালে দেয়ালে শোভা
পেত যেসব রাজনৈতিক দেয়াললিখন, তার সবগুলোর
লেখক হৃদয়নাথ। ’৭০-এর নির্বাচনী সফরে এসে
শেখ মুজিব হৃদয়নাথকে খোঁজ করেছিল। হৃদয়নাথ
সেই বর্ণাঢ্য তরুণ।

২.

একবার জগন্নাথগঞ্জ স্টেশনের অনতিদূর গ্রাম
থেকে ফেরার পথে ঢাকাগামী ট্রেনের কামরায়
প্রিয়াংকার সঙ্গে দেখা। বেশ সাদামাটা তরুণী।
মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি
হয়েছে। পরবর্তীকালে কদাচিৎ ওর মুখটি যখন মনে
পড়ত, তখন-এ দেশের সবুজ মানচিত্রের একটি ছবি
বারবার চোখে ভাসত।

৩.

নব্বই সালের দিকে হৃদয়নাথ-প্রিয়াংকার সঙ্গে
দেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে প্ল্যাকার্ড
হাতে ওরা দুজন আসছে। আর ওদের প্ল্যাকার্ড
থেকে বাংলাদেশে কথা বলে উঠছে।

রচনাকাল : ১৯৯১ সাল

০১.

তখন ফাল্গুন দুপুর, মিষ্টি শীত রোদ্দুর সোহাগ
মেখে আমি তোমার কাছে পৌঁছে গেলাম
একটি চিরকালীন প্রেমময় বিকেলে।
তুমি মিষ্টি হেসে বললে, ‘এত দিন পর…’
ভ্রমণজনিত ক্লান্ত চোখ তুলে আধেক পৃথিবী দেখলাম,
যার নাম প্রিয় প্রিয়াংকা।
অনন্ত পথ হেঁটে এসে, আমি তোমাকে চাই।
কবে কখন কীভাবে পার হয়ে এসেছি জানা নেই;
শুধু একটি বিকেলে প্রিয়াংকার নিমীলিত চোখের
তারায় সারা জীবন জমা হয়ে গেল।
থেমে গেল পৃথিবী,
থেমে গেল প্রিয়াংকার কল্লোলিত যৌবনবেলা
থেমে গেল একজন কাঙাল হৃদয়নাথ।

০২.

ট্রেন থেকে নেমেই আমার পা কেঁপেছিল।
শীতের মধ্যাহ্ন পেরিয়ে বিকেলের ধূসর প্রকৃতিকে
মনে হয়েছিল-এ রকম একটি সময়
কবে কোথায় হারিয়ে ফেলেছি; অথবা
এর সন্ধানে কেটেছে কাল।
রোদ্দুরে আমার ছায়া দীর্ঘ হলো।
আমি আমার হলুদ পুলওভারের দিকে তাকালাম।
চারদিকে শর্ষেফুলের সমারোহ, আরণ্যক নয়,
তবু কোথায় যেন রহস্য ছায়া-
ভালোবাসায় দীর্ঘ হয়ে আছে জনপদ,
আর এভাবেই পৌঁছে গেলাম।
তুমি বললে, ‘স্বপ্নের কাছে সুন্দর।’
আমি বললাম, ‘কেবল তোমার জন্য।’
আমি কেবল স্বপ্নের মধ্যে হারাতে থাকলাম।

০৩.

মধ্যরাতের ধূসর জোছনায় নারকেলের চিরল পাতা
দেখে দেখে রাত ভোর হয় আমার।
আমাদের ছোট শহরজুড়ে নাগরিক জোছনা,
কৈশোর থেকে মোহগ্রস্ত দুরন্ত স্বপ্নের লুকোচুরি
ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণের পাঠ চুকিয়ে
মৌনতায় ডুবে থাকি।
মধ্যবিত্তের অনাবিল সুখ-
একজন প্রিয়াংকাকে নিয়ে স্বপ্নের বসবাস।
প্রিয় পাখিকে বলি, ‘প্রিয়।’
প্রিয় নদীকে বলি, ‘প্রিয়তম কুমারী কন্যা।’
প্রিয়াংকাকে বলি, ‘প্রিয় অনন্তের পাখি।’
আমি কেবলই বেড়ে উঠি-
সমুদ্রের ঢেউয়ের দোলায় ভাঙতে ভাঙতে
ক্লান্ত সিগাল তটরেখায় পৌঁছে যায়,
বাসযোগ্য পৃথিবীর কাছে ফিরে আসে।
কেবল ভালোবাসা, প্রার্থিত একজন প্রিয়াংকার
জন্য নিজ বাসভূমে ফিরে যায়
কাঙাল হৃদয়নাথ।

০৪.

তোমাকে বানাতে চাই রবি ঠাকুরের ক্যামেলিয়ার মতন
অথবা পুরোনো কোনো গল্পে পড়া বিরহকাতর মৌন সাবিত্রী।
রাগ কোরো না! রাধিকা-টাধিকা অনেক পুরোনো-
বরং শেষের কবিতার লাবণ্যলতা;
তা আবার রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ধার করা।
ওই নামটাম বাদ দাও-
বরং তুমি আমার প্রিয়াংকা।
বাহ্ বেশ তো আধুনিক নাম, ভোরের শিউলি
ফুলের মতন আন্তরিক।
আমার নাম হৃদয়নাথ।
তুমি ভাবছ রোমিও অথবা চণ্ডীদাস।
দূর, ও সময় অনেক আগেই পাল্টে গেছে-
এই আধুনিক যুগে বরঞ্চ নিউট্রন-প্রোটন
হলে মানাত বেশ!
ওসবে আমার ঘৃণা আছে।
দেখ না শক্তিধররা কেমন নির্লজ্জের মতো
পারমাণবিক সম্মেলন ডাকে শান্তির নামে।
আমি রক অ্যান্ড রোলের সাথে আলীমের
ভাটিয়ালি শুনতে চাই।
তুমি আমাকে হৃদয়নাথ বলে জেনো।

০৫.

তুমি বললে-ভালোবাসা।
আমি বললাম-জন্মের দাবি।
যমুনার তট ছুঁয়ে যায় জল, কলকল বয়ে যায় স্রোতস্বিনী
তোমার পা ধুয়ে দেয় জল, জলের ছোঁয়ায় তোমার
পা যুগলকে মনে হয় সকালের পুষ্পিত কোনো স্থলপদ্ম
দূরে কুয়াশার আস্তরণ বেয়ে উড়ে চলে ঝাঁক ঝাঁক গাঙচিল
দ্রুতগামী স্টিমার কালো ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যেতেই
তোমার তন্ময়তা ভেঙে যায়;
তোমার চোখে সুন্দর,
তোমার রক্তিমাভা কপোলজুড়ে সুন্দরের লজ্জা
বাতাসে নৃত্য করা চুলের অরণ্যে মৃণ্যয় ব্যাকুলতা
অর্থাৎ তোমাকে আবিষ্কার করি বৈষ্ণবী চালে।
হঠাৎ তুমি বললে-মেলবোর্ন বসবাসরত তোমার
আত্মীয়ের চিঠিতে
পেঙ্গুইন পাখির পালক এবং চঞ্চুর রং-সংক্রান্ত
স্বপ্নিল বর্ণনা-
এ সময় কোথায় যেন আমার সঙ্গে তোমার বিরোধ
তবু তোমাকে সাজাই প্রেমময় চেতনা দিয়ে
আমার মুনিয়াকে নিয়ে যেতে চাই পেঙ্গুইনের বর্ণিল পালকে-
এখানেই আমার সুখ
একজন প্রিয়াংকার জন্যে হৃদয়নাথের চিরন্তন আকুলতা।

০৬.

হৃদয়নাথ,
আমি তোমাকে চিনি, আমার আত্মার কষ্ট দিয়ে চিনি,
একটি ফুরফুরে বিকেল সাক্ষী, আমার প্রথম অঙ্গীকার;
সেই নবীন পরিচয়ে একটি গোলাপ ফোটার মৌসুম টের পেতাম
প্রভাতে শিউলি ফুলের মালা গাঁথার চমৎকার স্পন্দন।
হ্যাঁ তোমাকে চাই, তোমার জন্য একজন
প্রিয়াংকা খুন হয়ে যায়।
বিহ্বল অন্তর বলে ওঠে, ‘হৃদয়নাথ!’
আমাদের বোধ এই রকম-যেন আমরা ভালোবাসার আগে
হারানোর কথাটাই চিন্তা করি। আর তার কারণেই ভয়,
বিরহবেদনায় কষ্ট পাবার ভয়। স্বপ্নে অলৌকিক
বর্ণময় দুঃখ জগতে নির্বাসনে যাবার ভয়। তাই
তোমাকে লিখলাম, ‘হৃদয়নাথ, আমাদের কবে
দেখা হতে পারে?’
তুমি লিখলে, ‘যেদিন তোমার ডাক শুনতে পাব।’
আমি লিখলাম, ‘তোমার জন্যে রোববার সকালে স্টেশনে
অপেক্ষা করব।’
জমজমাট স্টেশনে নিঃসঙ্গ, একাকিত্বের কষ্ট নিয়ে
একজন প্রিয়াংকার কাতর অপেক্ষা।

০৭.

আহ্, কী চমৎকার এই পাইনের চিরল পাতা!
গমগমে রেলস্টেশনের পাশে যেখানে তোমার
অপেক্ষা করার কথা ছিল-
আমি এক মধ্য ফেব্রুয়ারি মধ্যদুপুরে
তোমার প্রতীক্ষা করলাম।
আমার অনুভূতির মাঝে সমুদ্রদোলানো কম্পন,
হঠাৎ তুমি এলে। এসেই বললে, ‘হৃদয়নাথ?’
কিছুটা চমকে গেলাম; আমি যেন তোমাকে চাইনি!
তোমাকে না পাওয়ার বেদনাটুকু চেয়েছি।
তুমি বললে, ‘শেষ পর্যন্ত আমাদের এই ছোট শহরকে
ভালোবেসে ফেললে!’
যার পূর্ব পাশের শরীর দিয়ে গেছে ছলাৎ ছলাৎ নদী
পশ্চিম পাশের শরীর দিয়ে ঘন সবুজ আর
দূরদিগন্ত আস্তরিত গারো পাহাড়।
আমি বললাম, ‘এই আণবিক যুগে হঠাৎ কাব্য করা কেন?’
বরং বলি তোমাকে আমার প্রয়োজন,
তোমার অস্তিত্ব নিয়ে আমি বেড়ে উঠতে চাই-
ভালোবাসায়-প্রেমে-মিছিলে-সংগ্রামে।
এক মধ্য-ফেব্রুয়ারির বিকেল সাক্ষী, তুমি অঙ্গীকার করেছিলে
সেই থেকে প্রিয়াংকার জন্য হৃদয়নাথের
নতুন জীবন নির্মাণ

০৮.

তোমার কাছে অঙ্গীকারে, তাপিত বেদনায়, আরক্তিম ভালোবাসায়,
হৃদয় গেঁথে গেল-হৃদয়নাথ আমার।
আমি বললাম, ‘আমি তোমার মতো বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী
খেলতে পারব না’
এ রকম প্রকৃতি হন্তা আণবিক যুগে!
হায়, প্রকৃতি।
বিশ্ব চরাচরজুড়ে কেবলই মানুষের সুমহান জীবন চাই।
আসলে আমাদের পরস্পরের মাঝে নিকট হবার তরি আছে,
কিন্তু আমরা নিজেরাই নিজেদের জানতে চাইনি।
আমি বললাম, হে স্বপ্নপথিক, মানুষে অবিশ্বাসের শেষ নেই;
তাই তুমি যাদের কথা বলো, তারা তোমাকে গ্রহণ করে কি না?
আমি বিশ্বাসের হিসাব কষে
স্বপ্নের বাগানে যুদ্ধবাজদের নতুন
প্রক্রিয়াসমূহ নিয়ে ভাবতে বসি।
এ সময়টাই তোমার আপত্তি।
তুমি জীবনকে জানতে চাও অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্রের
শৈল্পিক মহিমাসহ সমকালীন মানুষ।
আর আমি শুধু আজকের পৃথিবী।
এখানেই
হৃদয়নাথের জন্য প্রিয়াংকার রহস্যময় আবেগ।

০৯.

আমি ওর সঙ্গে টুকরো টুকরো কথা বলছিলাম। এই সব
কথামালার অন্তর্গত কোনো অর্থ আছে কি না তা আমার
জানা নেই, তবে তাৎক্ষণিক কথাগুলোর একরকম
অনুভূতি আছে
যা ভালোবাসাকে স্পর্শ করায়। ও যখন
আমাকে বলে, ‘দিগন্তের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী?’
আমি বলি, ‘জন্মের সম্পর্ক।’
ঠিক তখনও বলে ওঠে, ‘ভালোবাসার মতন।’
আমি কথা বলি না। অনেকক্ষণ শব্দহীন থাকে পরিবেশ।
ওর নিশ্বাস টের পাই। চারদিক তাকিয়ে প্রিয়াংকা
পাহাড়-দিগন্ত দেখে।
আমাদের এখনকার কথাগুলো এমনই
প্রিয়াংকার নাম আমি প্রথমই দিয়েছিলাম ‘সুখ’।
আমি আমার সুখের দিকে তাকালাম
‘সুখ’ আমার দিকে তাকালে বুকে রক্তের ঝলকানি
খেলে যেত।
আমি তাকিয়ে থাকতাম। কথা বলতাম না।
ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একদিন
আমার চোখে জল এল
হাজার হাজার বছর আমি জলে ভেসে গেলাম।

১০.

কাঁপে শহর, বনভূমির শরীর, স্মৃতির রিনিক-ঝিনিক নূপুর,
এত নিষেধের অর্গল এটে গাঢ় ঘুম দুচোখভর
এই মৌন মানুষ-
অনেককাল কিছু শুনি না, অন্ধ চোখ, ক্ষয়ে যাওয়া হৃদয়।
জল পতনের শব্দ ভেসে আসে-যেন তীব্র আক্রোশে
ভাঙছে পদ্মার পাড়, বানভাসি জীবকুলের তারস্বর চিৎকার।
প্রিয় নিবাস পরিত্যক্ত ভেবে আশ্রয় দেয়নি বলে
অভিমান ছিল দীর্ঘকাল,
যেন চুপি চুপি পলাতক কিশোর
ঘরে ফিরে হয়েছে সুবোধ।
ভালোবাসা বিশ্বাস করেনি বলে হৃদয়ে জমেছে ক্ষোভ
প্রিয় ভালোবাসা বুক কাঁদে, প্রিয় নারীর অবহেলা শেখায়
প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার। ভুল আগুনে পুড়েছে হাত।
জন্মবন্দী শহর, চোখের তারায় স্বপ্নাচ্ছন্ন সময়ের খেলা
ভালোবাসার পাঠ দিয়ে এই আমি দূরে চলে যাচ্ছি ক্রমশ
ধরে রাখেনি কেউ, কবে কোন মহান হৃদয়ের কাছে হেরে
হয়েছে আজন্ম ফেরার।

১১.

চৈতন্যজুড়ে বাতিঘর, প্রিয়াংকার অবাধ দখল-
যেন জোয়ার-ভাটায় তটরেখা প্লাবিত হয়,
প্রিয়াংকা প্রিয়াংকা, কে কথা কয়।
নদী নাকি?
জগৎ-সংসার একাকার হয় বিষণœ দুপুরে
মিছিলের ঢল নামে, একজন নূর হোসেন খুন হয়
কাঁদে দেশ, নিরন্ন মানুষ রক্তের হোলি খেলায়
বারংবার স্বপ্নে ইন্দ্রধনুর নাচন তোলে-
কার দূরাগত আহ্বান জানায়-অধিকার বার্তায়।
চৈতন্যজুড়ে মানুষ, প্রিয়াংকার মানবিক অধিকার!
চৌদিকে ফসল লুণ্ঠন, বোলহীন ঘুঘুপাখি-
স্তব্ধ দেশ, স্বৈরাচার কাঁধে বসে হাঁক ডাকে।
হৃদয়নাথের চৈতন্যজুড়ে প্রিয়াংকা।
স্বদেশ ডাকে, ফসল ডাকে, মানুষ ডাকে,
আমি এখন মিছিলে যাই।

১২.

তোমাকে গল্প বলি-
ইতিহাস আমার প্রিয় বিষয়;
বঙ্গ-ললনারা সম্ভবত এখন আর পিছিয়ে নেই।
আমি অতটা দাবি করি না,
তবে, ইলোরার শিল্পজগৎ থেকে
স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ ধারণ করেছি।
এই শ্যামল মাটির গুণই আলাদা
চর দখল থেকে রাজপথে রক্তপাত;
সব একই রকম!
সাহসী মানুষেরা ভালোবাসায়
ফিরে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে-
তোমার জন্য অপেক্ষা করব।

১৩.

শেষ ট্রেন চলে যাওয়া হুইসেল ধ্বনি শুনে
ঘুম ভেঙেছে বহুবার
আশৈশব পরিচিত সুখ-দুঃখের নস্টালজিক মাতম
ঘিরে আমার জীবন।
নিজেকে চিনি
পরিচিত ভূভাগজুড়ে যে দিনরাত্রির খেলা
তার সাথে মিষ্টি স্মৃতি আছে
এক অতি দূরাগত নক্ষত্রের মুখ।
আমি তাকে মনে রেখেছি
প্রকৃতির সাথে এতটুকু বিশ্বাসের বন্ধন ছিল,
একজীবনে মানুষ যতটা পারে!
যে নারীর রক্তবীজে গড়ে উঠবে আমার সন্তানের ভ্রƒণ
তাকে বলি-বিশ্বাস করো
সবকিছু মেনে নেব-রাজপথ, মিছিল, রক্তপাত,
বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই;
স্বদেশের দলিলনামায়
একজোড়া নর-নারীর স্বপ্নের তীব্র আবেগ জড়িয়ে থাক।
শুধু দূরে যাক শতকের নিউট্রন বারিপাত।

১৪.

দোঁহের জীবন জানে মানুষের পূর্ণতা কোথায়?
ভালোবাসা চাই, বিরহ চাই, যা কিছু আমাদের জন্য-
সবকিছু চাই।
ফসলের মাঠজুড়ে কৃষাণের শ্রম লেগে থাকে-
তেমনি রক্তবীজে চাই-রতির আলাপ;
সঘন কর্ষণজুড়ে তৃপ্তির আবেশ।
আঠারো বর্ষ ব্যাপে জীবন-যৌবনের মহিমা জেনেছি,
প্রিয়াংকার জন্য
একজন হৃদয়নাথ বাবেলের নিঃসঙ্গ পথ হাঁটে,
সহস্রকাল জানে প্রতীক্ষা কারে কয়!
ইভ জানে, প্রিয়াংকা জানে,
ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত দায়ভার পার্কের নিরিবিলিতে জমা থাক
বিপুল নিনাদে বেজে উঠুক ভালোবাসার গাঢ় চুম্বন শব্দ-
শতকের শেষ সন্তানের জন্য ধরে রাখি
একটি মিষ্টি চাঁদনি প্রহর।
গল্প বলি-নিউট্রন বোমা নয়
আয় আয় দুধভাত।

১৫.

বিরান শস্যখেত, খরায় পোড়ে মাটির শরীর
গোয়ালে বলদ বাঁধা, কাতরায় কৃষকের চোখ;
এখনি বৃষ্টি নামুক, আলপথে জলের নহর
বৃষ্টি চাই, কাঁদে মানুষ, বিদীর্ণ ফসলের বুক।
আবার কখনো-সখনো ভেসে যায় জলের ভেলা
একাকার গ্রাম, গঞ্জ, লোকালয়, নিকানো উঠোন;
বানভাসি মানুষ জানে প্রকৃতির দারুণ খেলা
জীবন মৃত্যুরে নিয়ে প্রতিদিন কৃষকসন্তান।
আমি তো নিজেকে চিনি-কতটা কোমল পেলবতা
মিশে আছে মৃত্তিকায়, জীবন-জগৎ-সংসারে,
নতুন প্রজন্ম জানে আমার স্বপ্নের বৃক্ষলতা-
প্রিয়াংকা জল দাও, জীবনের গহন শেকড়ে।
কুটিল সময়ের ফাঁদে নবীন অনার্য সন্তান,
যুদ্ধ নয়, আরাধ্য সুন্দর চাই সমগ্র জীবন।

১৬.

ঝড়-জলে ভিজে আমার খুব জ্বর হয়েছিল
কী নিদারুণ মাদকতায় ভরে ওঠে শরীর
চোখের আলোতে ভেসে থাকে স্বপ্নের নেশা-
হৃদয়নাথ,
মর্মের গভীরে সুবিশাল চাদর মেলে ধরে
আমাদের অতীত থেকে উঠে আসে হেলেনিক ফসিল,
আমাদের বর্তমান থেকে উঠে আসে ব্যালেস্টিক মহড়া,
আমাদের আগামীর জন্য ধরে রাখি হাফিজের গজল।
রাতদিন থাকে জ্বর
জ্বরের কুলঙ্গি-খোপে থাকে ভালোবাসা
প্রত্যাশায় রোগহীন সজীব জীবন।

১৭.

এ কোন আবক্ষমূর্তি-কৃষ্ণ পাখি-নগরে বাউল-
প্রতি দিনমান স্থির হয়ে থাকে অলীক স্টেশনে;
যেন নিদ্রামগ্ন বিজ্ঞ জাদুকর বোলায় আঙুল,
এভাবে ভাসতে থাকে প্রাণপাখি-স্বপ্নের সাম্পানে
অনাদিকালের হাওয়ায় ভাসে নর্ম সহচরী
স্বপ্ন জাগরণে তীব্র খেলা থাক মৃত্যুর বিবরে,
চৈতন্যের গভীরে প্রিয়াংকার মগ্ন লুকোচুরি
ভালোবাসা ধেয়ে যায় কল্লোলিত অসীম সাগরে।
আলিফ লায়লা রাত থেকে এই নিয়নসাইন
সহস্র সময় মিশে আছে বেদনার ইতিহাসে;
মানুষ জেনেছে শুধু ছলনার সুতীব্র দহন
তবু জানি শরমিন্দাময় একজন ভালোবাসে।
একাকার মিশে যাক দুজনার যাবতীয় ভুল
স্বপ্নের শহর হতে তুলে নেব মানবিক ফুল।

১৮.

অতীত ঐতিহ্য আছে আর আছে মানুষে বিশ্বাস-
দীপ্র পেশি জানে-যেভাবে গড়েছে গৌরিক-মৃত্তিকা
পদ্মার জলেতে আছে কৃষকের স্বপ্ন-পুত্তলিকা,
আমার রক্তের মাঝে থাক এর অনন্ত উচ্ছ্বাস!
বাতাসে মিলায়ে গেছে আমাদের কত দিনরাত?
পাথর সময় থেকে চলমান কালের হাওয়া
এ কোন মানুষ আমি ভুলে যাই পিতৃমন্ত্র-কায়া,
তবু রাখি স্বপ্নময় সুবর্ণ আমার দাওয়াত।
পথ চিনি আর চিনি জীবনের আদম সুরত;
কোথা আমাজান কূল, আর প্রমত্তা পদ্মার জল;
একাকার মিশায়ে দিয়েছে নতুন প্রজন্ম দল-
উজান স্রোতের টানে ভেসে যায় প্রেমিক মরদ।
আমি কি তোমার নই? ক্রুশবিদ্ধ প্রেমের মদন
এই হাত বাড়িয়ে দিলাম অধম বঙ্গ লালন।

১৯.

মুখর জংশন কেঁপে উঠে, ওভারব্রিজে তুমি নেই-
মুহূর্তেই ছোপ ছোপ শোক জমে থাকে।
জনাকীর্ণ রেলিং, রংবেরঙের মানুষের মুখ
তিপ্পান্নটি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে থাকে মনবলাকা
ব্রিটিশীয় স্মৃতিচিহ্ন লৌহবিম মাড়াতে মাড়াতে উঠে যাই
হৃদয়নাথ ফেরেনি-
শিরীষের পাতায় হাওয়া নেই
মধ্যদুপুরে আকাশের কাছে ওড়ে চিল
স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে ক্রাচে ভর দেয়া বিষণ্ন যুবক;
মনে হয় একাত্তরে হৃদয়নাথ যুদ্ধ থেকে ফেরে
হৃদয়নাথ, যুদ্ধ থেকে ফেরে
হৃদয়নাথ, ক্ষত নিয়ে ফেরে
হৃদয়নাথ, মিছিল নিয়ে ফেরে
হৃদয়নাথ, ভালোবাসার কাছে ফিরে নাই।

২০.

ভয়ার্ত শহরে ওরা ফিরে আসে পতাকা উড়িয়ে
নিমেষে উজাড় স্ট্রিট ভরে যায় উদ্বেল মানুষ-
চমৎকার বাতাসে ওড়ে ছবি, রঙিন ফানুস;
সহস্র কণ্ঠস্বর মিলিয়ে যায় আকাশ পেরিয়ে।
মিরপুর বধ্যভূমি থেকে ডাকে শহীদ করোটি
রক্তগঙ্গায় ভাসছে যে শহর, কিম্ভূত দেবদূত
যেন বেয়নেট উত্তেলিত অযুত হৃদয়নাথ
একদিন এইভাবে জন্ম নেয় প্রেমের ভ্রুকুটি।
সোনালি বিশ্বাস বুকে লক্ষ্যভেদী কালের অর্জুন,
যেভাবে ফিরেছে ঘরে স্বপ্নভুক যতটুকু প্রেম-
তোমাকে দিলাম সখি স্বদেশের নিকষিত হেম,
প্রাপ্যটুকু চাই, বুকে বাহুলতা-হাতে স্টেনগান।
আগামী ভুবনে তুমি আর আছে অথই নীলিমা-
তুমি হাত দাও, আমি তুলে দেব ভোরের সুষমা।

২১.

পুরোনো শিলালিপির দুটো বয়ান তোমাকে শুনিয়ে নিই-
প্রথম শিলালিপি
জাতি : অনার্য
ধর্ম : মানবতা
ইতিহাস : হাজার বছর
বর্তমান : একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা
আগামী : স্মৃতি-বণিক
পাত্র-পাত্রী : হৃদয়নাথ-প্রিয়াংকা।
দ্বিতীয় শিলালিপি
মধ্যবিত্ত জীবন

২২.

সহস্র যোজন দূর-
শতাব্দীর গায় হরিৎ বসন-ফলবান পুষ্পশাখা-
আকস্মিক আকাশ থেকে গোঁত্তা মেরে ‘স্যাবর’ নামে
মৌন মুগ্ধ সন্ধ্যার মনুমেন্টে প্রিয়াংকা দাঁড়িয়ে-
প্রতীক্ষা কাতর সাধারণ তরুণী
বিশ শতকের মেয়ে।
চোখের কার্নিশজুড়ে ফুলেল উদ্যান,
অভিমানী কৈশোর, স্থবির বর্তমান,
আর রোরুদ্য শঙ্কাতুর ভালোবাসার লোকালয়
জুড়ে অনন্ত নীল দিনরাত।
অনেককাল পর
হৃদয়নাথ লিখে, প্রণয়ের কৃষ্ণ-কাজল পরিহিত
তরুণ; প্রতি প্রহর একটি শান্ত বিকেলবেলার প্রতীক্ষা
করে বর্ণাঢ্য বাসনায়। আদমের কষ্টের পাঁজরে যে
রমণী-তা ছিল রূপকথা।

২৩.

কারো কারো গভীর গোপন কষ্ট থাকে অন্যলোকে,
যেন অসহায় মনুমেন্ট, ক্লান্ত মুগ্ধ সন্ধেবেলা
পার্কের নির্জন অন্ধকারে খুঁজে ফেরে তারাজ্বলা
শহর। রঙিন স্বপ্ন সাধ জাগে মায়াবী পুলকে।
কাকে জাগায়ে রাত্রির রহস্য রেণুতে সাঁতরায়;
মনুষ্য জীবন বাঁধা থাক রূপান্তরে, পৃথিবীর
জাগতিক, প্রাকৃতিক প্রয়োজন এই মানুষের-
প্রিয়াংকা রমণীয় বাসনার স্বাদ পেয়ে যায়।
নিতান্ত সহজবদ্ধ নারী, উষ্ণ পাললিক তনু-
যতটুকু মসৃণ মৃত্তিকা তার চেয়ে মমতায়
কষ্টেরে জাগায়। অলৌকিক রাত যায় দিন যায়,
ক্রমাগত নিজেতে জড়ায় ভালোবাসা পরমাণু।
তুমি কি বর্ষার নদী? বহমান উজাড় যমুনা
শেকড়ের কাছে ঋণী শেকড়েরই মৃত্যু-আলপনা।

২৪.

জন্মধাত্রীর প্রিয় আহ্বান কি এড়াতে পারে স্বপ্নের যুবক?
উত্তুরে হাওয়া বয়
রাতজাগা চোখে যে ভোর উঠে আসে
তাতে জীবন মুগ্ধ হবে,
পুষ্পগন্ধা রাজপথ চিনে জীবনের ঠিকানা-
জন্মান্তরের মুখোশ এঁটে নেমে আসে রমনার মাঠে।
খরতপ্ত বাতাসে বারুদের মাতম,
হৃদয়নাথ হাঁটে-
অনন্ত দিনরাত্রিভর শত শত পদচিহ্ন ভরে থাকে
বিদ্রোহী জনপদ।
সাক্ষী থাকে রেসকোর্স, দোয়েল চত্বর, প্রেসক্লাব,
হাইকোর্টের পুণ্যাত্মার মাজার-
ব্যস্ত টেলিপ্রিন্টার সংবাদ বয়ে নিয়ে যায়
এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে-
‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’

২৫.

শিলা লিপির শেষ বয়ান
মেয়েটি খুব কষ্ট পেয়েছিল,
ছেলেটিও।
মনোরম বিকেলবেলায়
ওদের শেষ কথোপকথন-
গাঢ় সেই সব কথামালায়
কষ্টের স্পর্শ ছিল।
ছেলেটি খুব কষ্ট পেয়েছিল,
মেয়েটিও।
তারপরও ওরা অনেক রাতভর
কেঁদেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *