উপন্যাস

উপন্যাস।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব- পাঁচ

৫.

স্কুল থেকে ফিরে আমি আর তুষার পাখির মতো উড়তাম। নানা বাড়িতে মেয়ের ঘরের নাতনি হিসেবে প্রথম প্রথম আমার প্রতি সবার অবাধ প্রশ্রয় ছিল। আমার জন্য প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুলের পড়ালেখার ব্যবস্থা তুষারের পাঠের সমান্তরালেই হতো। পড়ালেখায় আমার বিতৃষ্ণা ছিল না কখনও। আমি পড়তে ভালোবাসতাম। পৃথিবীকে জানার অদম্য আগ্রহে রুটিনমাফিক পড়া শেষ করতাম। স্কুলের সেলিনা আপার কারণে পাঠ্য বইয়ের বাইরে দুএকটা বই পাঠের অভ্যাসও আমার হয়েছিল। যদিও মফস্বলে অত বেশি বই পড়ার সুযোগ ছিল না। সেলিনা আপার বাড়িতে ছোটো একটা লাইব্রেরি ছিল। আমাদের স্কুলের শিক্ষক আর ছাত্রীরা নিয়মিত সেই লাইব্রেরি থেকে বই নিতো।

সেলিনা আপা আমার মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করেছিলেন। আপার কাছ থেকে উপহার পাওয়া পাঁচটি বইয়ের মধ্যে চারটি এখনও আমার বুক সেলফে শোভা পায়। অন্য অনেক স্মৃতির মতো আপার দেওয়া একটা বই হারিয়ে গেছে। আপার দেওয়া একটা বইয়ের প্রথম পাতায় ঝকঝকে হস্তাক্ষরে লেখা আছে, ‘নূর তুমি নূর হও।’ এই একজন মানুষ বরাবর আমাকে আলোতে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই মানুষটাও অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। সেলিনা আপার সংস্পর্শে আমার মতো অনেক মেয়েই নিজেকে আলোকিত করতে শিখেছিল। পাঠ্য বইয়ের বাইরে তাকিয়ে পৃথিবীটা দেখতে শিখেছিল।

ছোটোবেলা থেকেই আমাকে পড়ার জন্য কাউকে তাগিদ দিতে হতো না। বাড়ির কাজকর্ম আর তুষারের সাথে অনাসৃষ্টির সময়টুকু বাদে আমি বাকিটা সময় বই পড়েই কাটাতাম। বইপত্রের সাথে সাথে তুষারের দিনলিপি পাঠ করাও আমার রুটিন কাজ ছিল। আমার আর তুষারের মতের মিল ছিল বেশ। দুরন্ত সখা-সখীর মতো অকারণ খুনসুটি বা ঝগড়া-বিবাদ কমই হতো আমাদের। বরং মামীর অহেতুক আক্রমণ থেকে তুষার আমাকে আড়াল করে রাখতো। আমরা দুজনের বুঝতে পারছিলাম, আমরা একটু একটু করে বেড়ে উঠছিলাম আর মামীর আচরণ পাল্টে যাচ্ছিল।

একবার পাখির বাসা নিয়ে এক কা- হলো। আমাদের উঠোন লাগোয়া আদি নিমগাছের সবচেয়ে বড় ডালে একজোড়া বুলবুলি বাসা বাঁধল। তুষার আর আমি দুজনেই চোখের সামনে পাখির বাসাটা তৈরি হতে দেখেছি। কদিন ধরেই বুলবুলি দুটোর খুব আনাগোনা চলছিল। স্কুল থেকে ফিরেই আমরা দেখতাম, পাখি দুইটা শিস দিয়ে এ গাছ, সে গাছ, এ শাখা, সে শাখা করে করে উড়ে বেড়াচ্ছে আর ঠোঁটে চেপে শুকনো ডালপালা, ঘাসপাতা আনছে।

কী যে ব্যস্ততা ছিল পাখিদের! আমি আর তুষার তক্কে তক্কে থাকতাম, কখন ওরা আসবে। আমার গোপন ইচ্ছে ছিল বাসা বানানো শিখব আর তুষারের ইচ্ছে ছিল বাসাটা চুরি করবে। কদিনের মধ্যেই বাসার তিনকোণা কাঠামো তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বুলবুলি পাখি দেখতে বেশ, গায়ে কালো রঙের পালক আর লেজ গুটালেই লেজের নিচে করমচা রাঙা লাল রঙ চোখে পড়ে। দুই পাখির পরিশ্রমে পরিপাটি বাসাটা তৈরি হতেই একদিন খাঁ খাঁ দুপুরে তুষার চুপচাপ পাখি চুরি করতে গেল। আমার বারণ ও শুনবেই না। আমাকে উপেক্ষা করে যেই না গাছের ডালে ঝুলেছে আমিও রান্নাঘর থেকে বঁটি এনে ডাল কাটতে শুরু করেছিলাম। আতংকে তুষার গাছ থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে ওর ডান হাত ভেঙে গিয়েছিল।

সেদিন মামী আর নানি পাড়া বেড়াতে বের হয়েছিল। বাড়ি ফেরার পর মামী আমাকে শুকনো খড়ি দিয়ে সাধ মতো পিটিয়েছিল। মার খেয়ে আমি অনেক কেঁদেছি। কাঁদতে কাঁদতে যখন বুলবুলি দুটাকে ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেখেছিলাম, আমার কী যে আনন্দ হয়েছিল!

সেদিন সন্ধ্যায় মামার সাথে তুষার যখন ডাক্তারখানা থেকে ফিরেছিল তখন ওর প্লাস্টার করা হাতটা গলার সাথে কায়দা করে ঝোলানো ছিল। আমার হাতে-পায়ে কালশিটা দেখে তুষার সেদিন আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিল আর প্রতিজ্ঞা করেছিল, কোনোদিন কারও ঘর ভাঙবে না। এভাবে দিন পার হতো আর আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হতো। স্কুল থেকে ফিরেই আমরা ছুটতাম। আমাদের দুজনের এক সাথে ছুটে বেড়ানোর দিনগুলো সব রঙিন ছিল। আমরা নাটাইয়ে সুতা প্যাঁচাতাম। কাচের গুঁড়ো, আঠা মিশিয়ে ঘুড়ির সুতায় মাঞ্জা মারতাম। কে কাকে আগে ধরতে পারে-প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে গ্রামের সিঁথিকাটা মাটির রাস্তায় ভোঁ দৌড়াতাম। একটা সময়ে ইচ্ছে করেই তুষারের হাতে ধরা দিতাম। পুকুর পাড়ে শামুকের চলতি পথের গতি আটকে মজা দেখতাম। একবার বন্যার পানিতে ভাসলো আমাদের গ্রাম।

ডেঙার বিল উপচে গেল। ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ল অথচ আমার আর তুষারের খুশি দেখে কে! সারাদিন কোমর পানিতে হেঁটে, সাঁতরে কত কী যে করলাম! কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, মাছ ধরা, নৌকা বাওয়া। আরও কত কী! এসব খেলা-আনন্দে খেয়ালে-বেখেয়ালে আমরা দুজনে অনাবিল অন্তরঙ্গতায় বেড়ে উঠছিলাম। প্রথম প্রথম আমাদের প্রতি কারও মনোযোগ ছিল না। ধীরে ধীরে বাড়ির সদস্যরা আমাদের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠল। টের পাইনি প্রথমে। একদিন বুঝলাম আমার কদর কমেছে।

নানি আমার জন্য আগের মতো ভাত নিয়ে বসে থাকছে না, মামী চুলে তেল দেওয়ার জন্য ডাকছে না। বরং স্কুলফেরত আমাকে দেখলে মামী ছলচাতুরী করে ঘরের কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। আমার প্রতি মামীর নজরদারি আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখতো। মামা বাড়ির চৌকাঠ পেরুলেই মামী আমাকে ঘরকন্নার কাজে ঢুকিয়ে দিতো।

কাপড় নিঙড়ে দেওয়া, বাসন গুছানো, মরিচ-ডাল-বড়ি-আচার রোদে দেওয়া, উঠান ঝাঁড়ু দেওয়া, তরকারি কাটাÑএকটার পর একটা ফরমায়েশ আসতেই থাকতো। আমি চোখের আড়াল হলেই মামী ক্ষণে ক্ষণে ডাকতো, ‘অ গেদি, কই মরলি?’ আর তুষার সতর্ক দৃষ্টি রেখে মাকে বলতো, ‘নূরেক আর কত বকবি, কত খাটাবি?’ মামীর চোখ রাঙানির সামনে তুষার টিকতে পারতো না তবু নিরুপায়ের মতো ও আমাকে রক্ষা করতে চাইতো। আমার ত্রাতা হওয়ার ক্ষেত্রে তুষারের স্বার্থও জড়িয়ে ছিল, ও জানতো কাজ শেষ হওয়ামাত্র আমি ওর সব অপকর্মের সঙ্গী হতে পারবো। কিন্তু মামীর সঙ্গে পারে, এমন সাধ্যকার!

আমার মামীর নাম ছিল রাহেলা। তার বয়স তখন চল্লিশের কোঠায়। বয়সের তুলনায় মামীর শরীর ক্ষয়িষ্ণু থাকলেও তার কণ্ঠ জুড়ে থাকতো বেমানান ক্রুদ্ধতা। ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর থেকে মামীর শরীর নাজুক হতে শুরু করেছিল। মামী নিজের সন্তানের প্রতি দুশ্চিন্তা থেকে আমাকে কখনোই ভালোবাসতে পারেনি। ভালোবাসতে চায়নিও।

দেখতে দেখতে এমনও দিন আসে যে আমাকে শাপশাপান্ত না করে মামী এক গাল ভাতও মুখে তুলতে পারতো না। যদিও আমি মামীর সব কথা শুনতাম। আসলে আমি সবার কথা শুনতাম। মামীর হুকুমে ঘরকন্নার যেকোনো কাজই করতাম প্রতিবাদহীন। কিন্তু তুষার বাড়িতে ঢুকলেই আমার অনিচ্ছুক ছায়া স্থানবদলের জন্য আকুল হতো। তারপর মামীকে মুহূর্তের জন্য অমনোযোগী দেখলেই আমি বাড়ি থেকে পালাতাম।

একদিন দুপুরে বাড়ি ফিরতেই মামী আমার কান ধরে বাড়ির খোলা উঠানে আছড়ে ফেলে দিলো। আমার অপরাধের হিসেব নিক্তি পাল্লায় মেপে সবাইকে দেখাতে শুরু করল। মামীর চিৎকার আমার কানে ঢুকছিল না। কানে আর কোমরে ব্যথা নিয়ে অভিমানে কাতর হয়ে শুধু বোঝার চেষ্টা করছিলাম, তুষার কোথায় গেল?
ও কি আমাকে বাঁচাবে না?
কিন্তু তুষারও সেদিন মারের ভয়ে পালিয়েছিল। তুষারকে না পেয়ে মামীর দিকে তাকিয়ে আমি আমার বিকৃত স্বরে জানতে চেয়েছিলাম, ‘কী দোষ আমার?’
মামী আমার দিকে আগুনচোখে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল, ‘বুইড়া ধাড়ি, বুঝিস না কী দোষ! আমারতা খায়া আমার থালি ফুটা করতিছিস?’
আমি সত্যিই সেদিন বুঝিনি কী দোষে দোষী আমি। তবে এখন বুঝতে পারি আমার দোষের কোনো অন্ত ছিল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *