উপন্যাস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব বারো

১২

ফাল্গুনের হাওয়া বয় এলোমেলো। আমের মুকুলের গন্ধে দক্ষিণধার মদিত আর সেই গন্ধে প্রজাপতি-মৌমাছির আগমন যায় বেড়ে। বাতাবিলেবু ফুলের সুগন্ধ পাগলা হাওয়া কোথাকার ঘ্রাণ যে কোথায় নিয়ে যায় বলা মুশকিল। মাস কয়েক পর ঘর থেকে বেরুনো এক রকম ছেড়েই দেয় চন্দ্রভানু। দুর্লভ চন্দ্রভানু এবার আরো দুর্লভ হয়ে গেলে তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা মানুষের যেন আরো বেড়ে যায়। ততদিনে চন্দ্রর পেটের সন্তান বড়ো হয়েছে, বড়ো হয়েছে পেটও। চলাচল তো সীমিত হবেই! আর খোলতাই হয়েছে রূপ আগের চেয়ে বহুগুণ। চন্দ্রকে যারা দেখতে আসে সবাই যে তার সাক্ষাৎ পায় তাতো না। আর দেখতে না পাওয়ারা যে কত কথা বলে! সত্যমিথ্যা গল্পের কারিগর শিমুলচরের মানুষ। গল্প বলার সময় পুরো দৃশ্য উঠে আসবে শ্রোতার চোখের সামনে, শ্রোতা গল্প বর্ণনায় হাসবে, কাঁদবে, রাগ করবে, তবে না গল্প!

ভাওয়ালচক থেকে আসে সরকারের দূরসম্পর্কের চাচাতো বোন ময়না সঙ্গে মেয়ে মায়া। মায়া সারা জীবন কুদ্দুস ভাইয়ের বউয়ের গল্পই শুনেছে, দেখেনি জীবনেও। আর এত বছর পর সন্তান হওয়া সংবাদে একবার দেখতে আসতেই পারে। আসার সময় নিয়ে এসেছে পোয়াটাক মিছরি, এই নিয়ম এই গ্রামের। ময়না বহু বছর আগে একবার দেখা করতে এসেছিল সে অভিজ্ঞতা তার ভালো না কিন্তু এবার সে সন্তানসম্ভবা, নিশ্চয় দেখা দিবে, দুটো কথাও হয়তো বলতে পারে।

সারা রাস্তা, এমন কি চিকন নালার উপর যে বাঁশের হাক্কা, মানে একটা বাঁশ নিচে চলাচলের জন্য আর একটা বাঁশ উপরে ধরার জন্য, তার উপর দিয়ে আসার সময়ও তাদের কল্পনা আর বাস্তব মেশামেশি হয়ে তুবড়ি ছোটে — মা, হেরা বলে অনেক বড়োলোক, গরে ডুকতে দিবো তো? — দিব দিব, মিছরি নিছি না!

মিছরির পোটলা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে উঠানে। চন্দ্র এখন বিশ্রামে, দরজায় ঠায় বসে কাবান্নি। মায়ার হাতের মিছরির পোটলা ঘেমে পোটলা ছিঁড়ে হাতে লেগে যায় মিষ্টি। হাত বদলে আঙ্গুল চাটে মায়া। তারপর আবার হাত বদল হাত চাটা। ময়নাই বলে, একটু বাইর কইরা খা। কিন্তু খায় না। কিন্তু কতক্ষণ আর অপেক্ষা করা যায়! ময়না অসহ্য হয়ে স্বগতোক্তি করে কাবান্নিকে লক্ষ্য করে, মাগি খাইয়া খাইয়া লুমদি বানাইছে কত! মায়া ধৈর্য্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেও কাবান্নি বিরক্ত হয়ে বলে, আরেক দিন আইয়ো, এহন মিছরি রসি গরে রাইখ্যা যাও, আমি কমুনে তুমি আনছো।

ঘণ্টা খানেক পেরিয়ে গেলেও ওরা মিছিরি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। দেখা হবে, মিছরি দিবে, তবে যাবে — মনস্থির নড়নচড়ন নাই। কিন্তু সন্ধ্যা যখন সমাগত, ময়না যায় আমেনাবিবির কাছে, নামাজ শেষ করে সালাম ফিরিয়ে বহুক্ষণ ধরে মুনাজাত করে আমেনাবিবি। তারপর ময়নাকে কোন কথা বলতে না দিয়ে নিজেই নরম সুরে বলে, ওর মনে কয় শইলডা ভালা না, আইজকা যাও, আরেকদিন আইয়ো।

সন্ধ্যা উৎরে যাবার পরও কাবান্নি বিরক্ত হয়ে বসে থাকে দুয়ার আগলে, ময়না মনে মনে গোঁ ধরে, দেখা সে করবেই এবং নিজ হাতে মিছরির পোটলা দিয়ে তবে যাবে। এবং শেষ পর্যন্ত চন্দ্রভানু দরজা খুললে সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে তাকে পরীর মত দেখায়। টসটসে গাল দিয়ে যেন আলোর বিচ্ছুরণ দেখে ওরা। কাবান্নি ধরানো হারিকেনটা এগিয়ে দিতে সামনে দাঁড়াতেই মা মেয়ে ছুটে গিয়ে ঘরের পিড়ার উপর উঠে দাঁড়ায়, অস্থির হয়ে ঘরে ঢুকতে চায়। কাবান্নি চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ে, খাড়াও খাড়াও, এহানেই কতা সারো! আর আমেনাবিবি এই ভরা সন্ধ্যায় পোয়াতি বউমার দরজায় দাঁড়ানো দেখে ভীষণ রুষ্ট, হাইঞ্জা বেলায় তোমরা কী ক্যাঞ্জালা শুরু করছ মায়ার মা! নামো নামো পিড়া থেইক্যা নামো!

এইবার ওরা থমকে দাঁড়ায়, ভিতরে ঢুকার বাসনা ইতিমধ্যে ভূমিসাৎ হয়েছে, চন্দ্রভানুর মুখের দিকে তাকিয়ে কোন কথা বলার ফুরসৎ না পেয়ে হতাশ হলেও হাত বাড়িয়ে মিছরির পোটলাটা দিতে চায় এবং দিয়েও প্রায় ফেলে। কিন্তু তার সে ইচ্ছা পূরণ হওয়ার নয়, কাবান্নির ধাক্কায় পিড়া থেকে ছিটকে পড়ে ময়না। উঠান থেকে উঠতে উঠতে তার আর কিছুই মনে নাই, কোন কাজেই এখানে সে যেন আসে নাই, এমন ভাব করে মেয়ের হাত ধরে বলে, ল তাতাড়ি। ময়নার হাতে কিন্তু মিছরির পোটলা অটুট। এবার সত্যি তাড়াতাড়ি হাঁটা দেয়। আর পিছন থেকে আমেনাবিবির গলা শোনে, মিছরির পোটলা ফিরায় নিতাছো, এইডা তো ভালা কতা না মায়ার মা!

  কিন্তু কে শোনে কার কথা, মিছরি নি মাগনা? হুদাহুদি দিয়া যামু!

আমেনাবিবি শুনতে না পেলেও দক্ষিণধারের অনেকেই মায়ার মায়ের কথা কয়টা শুনতে পায়। তাদের বড়ো তাড়া এখন, সন্ধ্যার আলোটুকু থাকতেই ভাঙাচুরা পুল পেরিয়ে তাদের বাঁশের হাক্কাটাও পেরিয়ে যেতে হবে।

রাতে ভাত খেতে গিয়ে চন্দ্রর গা রিরি করে ওঠে। বড়ো বড়ো কৈ মাছ বিরন, সীম ভর্তা আর জামবাটিতে ঘন দুধ সঙ্গে গাছপাকা কবরী কলা। খাবার সময় কেউ থাকলে খেতে পারে না বলে একলা খায়। খেতে বসে বার বার মনে হচ্ছিল একটা নোংড়া শরীর তাকে ছুঁয়ে সমস্ত শরীর অশুচি করে দিয়েছে। না খেয়েও সে বহুবার বমি করে একেবারে নেতিয়ে পরে। এক সময় চোখের সামনে কী যেন দুলতে দুলতে সরে যায়। কাউকে যে ডাকবে দরজা খুলে; ক্লান্ত শরীরে সাহস শক্তি কিছুই জোগায় না। কাহিল হয়ে শুয়ে পড়ে মনে হতে থাকে আসলে হয়তো ওরা ভাওয়ালচকের ওঝা, ওরা ওকে তাবিজ দিতে এসেছিল অথবা কোন গাছগাছড়া। তারপর সে স্বপ্ন দেখে ভাওয়ালচকের কোন যোগিনী এসেছে তার বাড়িতে, মাথা ভরা জট, আরক্ত চোখ, ঠোঁট চুঁইয়ে লোভের লালা। যোগিনী ঘরে ঢুকে প্রথমেই একটা ভয়ংকর ঘুর্ণি দেয়। তারপর চোখ পাকিয়ে বলে, কই, পালঙ্কের নীচে পোলারে গুঞ্জায় রাখছোছ, বাইর র্ক, বাইর র্ক, তোর তো কোন ক্ষমতা নাই গুঞ্জায় রাহার। দ্রুত হাতে সে চন্দ্রকে উদাম করে বাচ্চার নাড়িনক্ষত্র খোঁজ করে। বলে, কই, তোর বাচ্চা তো নড়েই না, মনে কয় মইড়া গেছে। তারপর যোগিনী বলে, একদিন ভাওয়ালচকে আইছ, বাচ্চা জন্ম দেয়ার যাবতীয় তরিকা শিখায় দিমু, বাচ্চা কি অতো সহজ জিনিস লো! 

সাধারণত যা হয়, চন্দ্রভানু ঘুমিয়ে পড়ার অনেক পরে কুদ্দুস ঘরে ঢোকে তারপর আলাদা আরেকটা বিছানায় চুপচাপ শুয়ে পড়ে। এই নিয়ম বহু বছরের। শুয়েই কুদ্দুস নাক ডাকতে থাকে, মহাজগতে তার মত সুখিলোক তুলনারহিত।

যোগিনীর স্বপ্নতেই শেষ না। আবার শেষরাতে দেখে তার ঘরে ফুটফুটে একটা মেয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে, হাতে মুড়ির পুরা, পায়ে ঝুমঝুম ঘুঙুর। কোলে নেয়ার জন্য বাড়ির লোকজন অস্থির হয়ে গেলেও মেয়ে কারও কোলে কিছুতেই ওঠে না। কথা বলে পরিষ্কার আর আল্লাদে আত্মহারা। কিন্তু অল্পক্ষণেই এক কঠিন দৃশ্য, কুদ্দুস মেয়ের কোমরের কাইতনে বেঁধে দেয় একটা নেংটি ইঁদুর, জীবন্ত ইঁদুর পালাতে চায়, ভয়ে মেয়েও ইঁদুরকে ঠেলে দূরে দিতে চায়। কিন্তু না পেরে চিৎকার করে কাঁদলেও কেউ সেটা খুলে দেয় না। যেন বেশ একটা আনন্দের ঘটনা হচ্ছে, সবাই মিলে এটা নিয়ে তামাশা করা যায়। তারপর আরো কিছুক্ষণ এসব চলতে থাকলে চন্দ্র চিৎকার করে ওটা খুলে দিতে বলে কিন্তু এ বারও কেউ এগিয়ে আসে না। পরক্ষণেই সবাই দেখতে পায় মেয়ের নীল হয়ে যাওয়া মুখ, ঝুলে পড়া থুতনি। ঠোঁট গড়িয়ে উথলে পড়ে ফেনা, এটা ঘটেছে কোনো বাড়িতে কোনদিন সে শুনে থাকবে বাস্তবে!

পরদিন চন্দ্রকে অসুস্থ মনে করে পূবকান্দির অভিজ্ঞ ধাত্রী মধুর মাকে পালকি পাঠায় আমেনাবিবি। বুড়ি মধুর মা এখন আর কোন প্রসব করায় না। কিন্তু তার হাতযশ এতটাই যে অবস্থাপন্নরা একবার অন্তত গর্ভবতীকে না দেখিয়ে স্বস্তি পায় না। কী কারণে এতদিনও চন্দ্রভানুকে দেখানো হলো না ভেবে আমেনাবিবি নিজেকে কিঞ্চিত ভর্ৎসণা করে আর দ্রুত পাঠায় বুড়িকে আনতে। বুড়ি অথর্ব, তদুপরি ভাঙা বাঁশের সাঁকো, কিন্তু সরকার বাড়ির জন্য তাকে আনা তেমন ঝক্কির কথা না। পালকি তো লাগবে, লাগবে নৌকা। হাবা আর কাবান্নি তো রয়েছেই। কাবান্নি যাওয়ার কারণ কোন মহিলা না গেলে তিনি বাড়ি থেকে নড়েন না। খাল পাড় হবে নৌকায় তারপর ঘণ্টা খানেকের পথ। সরকারের নির্দেশে পালকি বের হয়, হাবা আর কাবান্নির সঙ্গে যায় নকিব। কী কান্ড, এই শীতে নকিব কবরে বাস বাদ দিয়ে সরকার বাড়ির কামলা! নাকি এ বছর কবরে বাস তাড়াতাড়ি শেষ হয়েছে! খাল পাড় হয়ে যেতে যেতে হঠাৎ হাবা নকিবকে উদ্দেশ্য করে বলে — তোমার বউ বলে আবার হাঙ্গা বইছে! শীতের আগে না হেয় আইয়া গেছে!

 কী কথা যে হাবা বলে, নকিব বোঝে না, কাবান্নি বোঝে কিনা বোঝা যায় না। বাকি পথটুকু চুপচাপ হাঁটে নকিব। হাবা কিন্তু থামে না। সারা রাস্তা বকবক করে নকিবকে উত্তেজিত করার অনেক চেষ্ট করে কিন্তু নকিবের উত্তেজনা নাই। ছোট পাল্কিতে সের দশেক ওজনে বুড়িকে নিয়ে আসার পথে নকিবের কী হয় কে জানে, বুড়িকে ফেলে দেয় অর্ধেক রাস্তায়, কাবান্নি বহু কষ্টে পালকি থেকে টেনেটুনে বের করে খানেক খেদমত যদিও করে কিন্তু বুড়ি বেঁকে বসে, তার পক্ষে এই অবস্থায় এতটা পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া আসা অসম্ভব। কী আর করা, বুড়িকে বাড়ি পৌঁছে সে পথেই নকিব বিলের শেষ প্রান্তে কবরে গিয়ে এই শীতের শেষ কয়টা দিন পার করবে। আর আমেনাবিবি জানবে নকিবকে এখন মারধর করে কিছুই হবে না, সে এখন অন্য মানুষ। সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে কাজ করবে না, খাবে না; এমনকি কথাও বলবে না কারো সাথে। এ বছর আগেভাগে কবর ছাড়লেও শীতকালের কয়মাস কবরে বাস তার বহু বছরের অভ্যাস। যদিও প্রত্যেক বছর গ্রামের মানুষ শীতে অন্তত তার মৃত্যু কামনা করে। কারণ তারা মনে করে ঘরহীন নকিবের কবরে বাস তাদের জন্য বিরাট অবমাননাকর। ঘর নাই তো কী? ঘরের বাঁশবেড়া পচে ভেঙেচুরে গেলে বহু মানুষই ঘরহীন এই শিমুলচরে। ঘর না থাকায় ছেলেমেয়েকে নিয়ে বউ বাপের বাড়ি চলে গেলেই যে তাকে কবরে বাস করতে হবে তার কী মানে আছে! বছরের ছয়মাস যেমন এর ওর বাড়ির আঙিনায় কাটিয়ে দেয় বাকি সময়টাও তেমনি কাটাতে পারে! নতুন মানুষ তাকে নিয়ে উৎসাহ দেখালেও তাকে নিয়ে কোন আগ্রহ নাই গ্রামবাসীর। শীত শেষে পাগলের মত চুলদাঁড়ি আর খড়ি ওঠা শরীর নিয়ে যখন লোকালয়ে আসবে তখন তার জন্য থাকবে সীমাহীন ভর্ৎসনা আর যতকিঞ্চিত আপ্যায়ন। কিন্তু মজা অন্য জায়গায়। পূবকান্দির শেষ মাথায় বাস করা কামারকুমারতাঁতি পাড়ায় তার তখন বড়ো কদর। তারা বলে এখন পাপপূণ্যের উর্ধে অবস্থানকারী এক শিশুই বটে নকিব। শিশি ভরে খালের পানি নিয়ে আসবে নকিবের ফুঁ নেয়ার জন্য। এই পানিপড়ায় বারমাসি রোগীও উঠে বসবে, সংসার কর্ম করে খাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *